Published : 28 Jan 2026, 10:06 PM
চব্বিশের অভ্যুত্থানে ইন্টারনেট বন্ধ করাই ‘তরুণদের ক্ষোভকে বিস্ফোরণে পরিণত করেছিল’ এবং এর পরিণতিতে ‘একটি মহাশক্তিশালী সরকারকে পালাতে হয়’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে চার দিনব্যাপী ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “ইন্টারনেট যখন বন্ধ করে দেওয়া হল, তখন সারাদেশের তরুণরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সে বিক্ষোভের মাত্রা এতটাই ছিল, তারা ফুটন্ত তেলের মত টগবগ করছিল।
“কী হয়েছে? ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন বুঝতে পারেন, ইন্টারনেট তাদের জীবনে কতটা প্রিয়। তারা এটি সহ্য করতে পারেনি। এই উত্তেজনা ও ক্ষোভের ফলেই শেষ পর্যন্ত একটি মহাশক্তিশালী সরকারকে পালাতে হয়েছে।”
এই বাস্তবতা সামনে রেখে প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের সঙ্গে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারণকে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান ইউনূস।
তিনি বলেন, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম শুধু বাংলাদেশের নাগরিক নয়, তারা বিশ্বনাগরিক।

“তাদের ঠেলে ঠুলে খালি বাংলাদেশে ঢুকায়ে দিয়েন না। বাংলাদেশের কাজ করবে সে বাংলাদেশের জন্যই, কিন্তু বিশ্বনাগরিক না হলে সে গর্বটাও পূর্ণ হয় না।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিশ্ব এখন এমন গতিতে বদলাচ্ছে, যা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় দ্রুততর।
“যেগুলো আমরা এখনো চিন্তাও করতে পারছি না, সেগুলো সত্যি হবে, বাস্তব হবে।”
এই গতির সঙ্গে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারণের মিল না হলে বাংলাদেশ ‘দ্রুত পিছিয়ে পড়বে’ বলে সতর্ক করেন নোবেল বিজয়ী ইউনূস।
তিনি বলেন, “আমরা চিন্তায় পেছনে, কাজে পেছনে, নীতিতে পেছনে–সবদিক থেকেই।”
তার উপলব্ধি, প্রযুক্তিকে এখনও একটি আলাদা ‘খাত’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা একটি বড় ভুল।
“এই খাতটাই মূল খাত। এখান থেকেই ভবিষ্যৎ রচনা হবে, আমাদেরও, সারা পৃথিবীরও।”
তরুণদের চিন্তাভাবনা ও আগের প্রজন্মের চিন্তার মধ্যে যে ‘বিশাল ফাঁক’ তৈরি হয়েছে, সে কথা তুলে ধরে ইউনূস বলেন, “আমাদের কাছে যেটা আধুনিক, তাদের কাছে সেটা গুহা-যুগের।”
তার ভাষায়, এখনকার তরুণরা “পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজন্ম” এবং তাদের শক্তির মূল উৎস প্রযুক্তি, যা তাদের হাতে “আলাদিনের চেরাগের মত” কাজ করছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “পরিসংখ্যান দেবে, এত করেছি, এত হাজার করেছি। কিন্তু আমরা দেখি নাই, আপনারাও দেখেন নাই।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “প্রকৃত ডিজিটাল সরকার মানে মানুষকে সরকারের কাছে যেতে হবে না, সরকারী সেবাই মানুষের কাছে যাবে। নাগরিককে সরকারের কাছে আসতে হয় বলেই দুর্নীতি হয়।”
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ১২টি স্কুলে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা যারা ইন্টারনেট পাচ্ছি, একদিন বন্ধ হলে পাগল হয়ে যাই; অথচ ওরা বছরের পর বছর পায় না, এটা আমাদের নীতির ব্যর্থতা।”

চাকরির ধারণা মানুষকে ‘দাসত্বের নতুন সংস্করণে আটকে রাখছে’ মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “মানুষ জন্মেছে সৃজনশীল জীব হিসেবে।”
তিনি তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দেন এবং বলেন, “সরকারের কাছে কিছু চাইবেন না, নীতি ঠিক করে দিতে বলুন।”
প্রযুক্তির অপব্যবহার করে জালিয়াতির সংস্কৃতি গড়ে ওঠার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইউনূস।
ভুয়া সার্টিফিকেট, ভুয়া ভিসা ও ভুয়া ব্যাংক ডকুমেন্টের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এই প্রবণতা বন্ধ না করলে প্রযুক্তি ‘আশীর্বাদ নয়, অভিশাপে’ পরিণত হবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “সরকারের ধর্ম হলো পুরনোকে আঁকড়ে ধরা, আর প্রযুক্তির কাজ হল সেগুলো ফেলে দেওয়া।”
এই দ্বন্দ্বে প্রযুক্তিকেই জিততে দিতে হবে, নইলে রাষ্ট্র ‘অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে’ বলে তিনি সতর্ক করেন।
তরুণদের ওপর আস্থা রেখে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই শক্তিটাকে স্বীকৃতি দিলে তারা নিজেরাই বাংলাদেশকে সামনে নিয়ে যাবে।”
‘বাংলাদেশ টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ এক্সপো ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) চার দিনব্যাপী এই প্রযুক্তি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।