Published : 21 Jan 2026, 04:22 PM
ট্রান্সকম গ্রুপের শেয়ার আত্মসাতের মামলায় গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহনাজ রহমান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা-সিইও সিমিন রহমানকে জামিন দিয়েছে আদালত।
তার আগে এই দুইজনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
বুধবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন শাহনাজ রহমান ও সিমিন রহমান।
শুনানি নিয়ে আদালত তাদের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মোক্তার হোসেন জানিয়েছেন।
তার আগে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে তিনজনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেন।
পরোয়ানার অপর আসামি হলেন- ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক সামসুজ্জামান পাটোয়ারী।
‘ভুয়া স্বাক্ষর ও স্ট্যাম্প জালিয়াতি করে’ ট্রান্সকমের ১৪ হাজার ১৬০ শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা লতিফুর রহমানের মেয়ে শাযরেহ হক ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গুলশান থানায় মামলাটি করেন।
গেল ১১ জানুয়ারি পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে সিমিন রহমানসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
এদিন ছয় আসামির মধ্যে ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো. কামরুল হাসান, মো. মোসাদ্দেক, আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
তাদের স্থায়ী জামিন চেয়ে আবেদন করেন আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন। শুনানি নিয়ে আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করে।
সিমিন রহমানসহ তিন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরে শাহনাজ রহমান ও সিমিন রহমান আদালতে আত্মসমর্পণ করেন এবং তাদের জামিন চেয়ে আবেদন করেন আইনজীবী মামুন।
২০২০ সালের ১ জুলাই লতিফুর রহমান মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী শাহনাজ রহমান ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান হন। তার বড় মেয়ে সিমিন রহমান গ্রুপের সিইও।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১৬ জুন ঢাকায় ট্রান্সকম গ্রুপের বোর্ড সভা হয়। সভার এজেন্ডা ছিল-আগের সভার সিদ্ধান্ত অনুমোদন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় অংশগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক সিগনেচার অনুমোদন, লতিফুর রহমান কর্তৃক শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে অনুমোদন।
এই সভার হাজিরা তালিকায় লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হয়েছে। সেখানে তার ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর থাকলেও ওই সময় তিনি কুমিল্লায় অবস্থান করেন।
এই বোর্ড সভায় তৃতীয় এজেন্ডার মাধ্যমে লতিফুর রহমানের ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে তার বড় মেয়ে সিমিন রহমানকে ১৪ হাজার ১৬০, ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও ছোট মেয়ে শাযরেহ হককে চার হাজার ৭২০টি করে শেয়ার হস্তান্তর করা হয়।
এই সভার বিষয়ে মামলার বাদী শাযরেহ হক বলেছেন, এই ধরনের বোর্ড সভা ১৬ জুন অনুষ্ঠিত হয়নি। তদন্তকালে কোম্পানির বোর্ড সভা ও সংশ্লিষ্ট নথি উপস্থাপনের জন্য বলা হলেও আসামিপক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।

এ ছাড়া তদন্তে বোর্ড সভর আগে কোনো ই-মেইল অথবা ডাকযোগে পাঠানো কোনো নোটিস বা চিঠির কপি পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর-আরজেএসসিতে দাখিল করা দলিলে শেয়ার হস্তান্তরে ‘জালিয়াতির আশ্রয়’ নিয়েছেন সিমিন রহমান।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৬ জুন ট্রান্সকম লিমিটেডের শেয়ার হস্তান্তরের নথি আরজেএসসিতে জমা দেওয়া হয়। ১৭ জুন শেয়ার হস্তান্তর হলেও আরজেএসসির নিয়ম অনুযায়ী ফি পরিশোধ করা হয়নি। পরে ২ সেপ্টেম্বর শেয়ার হস্তান্তরের ফি পরিশোধ করা হয়েছে।
শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় ‘অনিয়মের’ বিষয়টি তুলে ধরে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহিতা কোনো পক্ষই আরজেএসসিতে উপস্থিত ছিলেন না। শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলাকালে শেয়ার গ্রহিতা অর্থাৎ আসামিদের পক্ষে শুধু আইনজীবী নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহিতা উভয় পক্ষকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আরজেএসসির প্রতিনিধির সামনে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি, যা ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৩৮ ধারার লঙ্ঘন।
এ ছাড়া ২০২০ সালে ভাই-বোনের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে বেশির ভাগ শেয়ার নিজের নামে নেওয়ার জন্য সিমিন রহমান গ্রুপ অব কোম্পানির নথিপত্র ও পারিবারিক সম্পত্তি ভাগাভাগির দলিল (ডিড অব সেটলমেন্ট) তৈরি করেন।
এ জন্য সিমিন রহমান দুটি ভুয়া স্ট্যাম্প এফিডেভিটের মাধ্যমে ট্রান্সকমের বেশিরভাগ শেয়ার হস্তান্তরের দলিল তৈরি করেন, সেখানে ছোট বোন শাযরেহ হক, বাবা, ভাই ও অন্যদের স্ক্যান করা স্বাক্ষর ব্যবহার করেন তিনি। এ দলিল আরজেএসসিতে দাখিল করেন সিমিন।
শাযরেহ হকের নামে আরজেএসসিতে সিমিনের করা এফিডেভিটের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ২০২৩ সালে সৃজনকৃত বলে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে দেওয়া ডাক বিভাগ ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জাল সন্দেহ হওয়ায় দুটি স্ট্যাম্পের সত্যতা নিয়ে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে একটি প্রতিবেদন চায় আদালত। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, যে ভেন্ডর এই স্ট্যাম্প দুটি সরবরাহ করেছেন, তার লাইসেন্স ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাতিল করা হয়েছে। তিনি ২০২৩ সালের স্ট্যাম্প অসদুপায়ে সংগ্রহ করে আসামিপক্ষকে ২০২০ সালের ৩ মার্চ নিজ স্বাক্ষরে সরবরাহ করেন।
এ মামলা ছাড়াও ট্রান্সকম গ্রুপের ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও সম্পত্তি দখলের অভিযোগে ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গুলশান থানায় আরও দুটি মামলা করেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতার মেয়ে শাযরেহ হক।
মোট তিন মামলায় আটজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সিমিন রহমানের ছেলে যারাইফ আয়াত হোসেনকেও আসামি করা হয়েছে। যারাইফ ট্রান্সকম গ্রুপের হেড অব স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন।
আগের খবর:
ট্রান্সকমের সিমিন রহমানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
হাসিনাকে '১০০ কোটি ঘুষ': ট্রান্সকম সিইও সিমিনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে দুদক
ট্রান্সকমের সিমিনের বিরুদ্ধে ভাই হত্যার অভিযোগে বোন শাযরেহের মামলা
ট্রান্সকম গ্রুপের সিমিনসহ তিনজনকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ
ট্রান্সকম: মা ও বোনের বিরুদ্ধে শাযরেহর যা যা অভিযোগ
ট্রান্সকম গ্রুপের ৫ কর্মকর্তার জামিন বাতিল
শাযরেহ হকের মামলায় গ্রেপ্তার ট্রান্সকমের ৫ জন, আসামি মা-বোন-ভাগনেও