Published : 16 Aug 2026, 06:44 PM
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের মৃত্যু ও আত্মহত্যার একাধিক সংবাদে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন।
রোববার সংগঠনটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১০ অগাস্ট ফল প্রকাশের পর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, শেরপুর, গোপালগঞ্জ, মেহেরপুর, কুমিল্লা ও চুয়াডাঙ্গা থেকে অন্তত ১০ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, এসব ঘটনার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া বা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর ‘তীব্র মানসিক চাপে’ পড়েছিল।
এছাড়া পরীক্ষা আশানুরূপ না হওয়ায় পরীক্ষার সময় গত মে মাসে ভোলায় এক নারী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
সংগঠনটি বলছে, ফলাফল প্রকাশের পর এমন ঘটনা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনছে।
“প্রতিনিয়ত এসব আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের মুখস্থ ও ফলাফল ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার অসাড়তা প্রমাণ করছে।”
বাস্তবমুখী, কর্মমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও আনন্দময় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে সরকারের মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, ফলাফলনির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
২০২৫ সালে ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য
আঁচল ফাউন্ডেশনের সঙ্কলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩১০, ২০২৩ সালে ৫১৩ এবং ২০২২ সালে ৫৩২।
সংগঠনটি বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে। ২০২৫ সালের তথ্যের ক্ষেত্রে ১৬৫টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছিল।
ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে পড়াশোনার চাপ ও পরীক্ষার ফলাফলকে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া কিংবা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া কোনোভাবেই একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্য বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নির্ধারণ করে না। তবে ফলাফলকে জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হলে হতাশা, লজ্জা, ভয় ও সামাজিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলোকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার, সমাজ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করে আঁচল ফাউন্ডেশন।
গবেষণাতেও ফল প্রকাশের সময় ঝুঁকির ইঙ্গিত
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রবণতার সঙ্গে পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সময়ের সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
‘সুইসাইড আফটার দ্য পাবলিকেশন অব পাবলিক এক্সাম রেজাল্টস ইন বাংলাদেশ: আ নিউজ কনটেন্ট অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক গবেষণায় ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ১৪২টি আত্মহত্যার ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ঘটনার বড় অংশ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ঘটেছে এবং একাডেমিক চাপ, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, আশানুরূপ ফল না পাওয়া ও ফল নিয়ে ভয়কে সংশ্লিষ্ট কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে।
গবেষকেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল কাউন্সেলিং ও জীবনঘটনাভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা জোরদারের সুপারিশ করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে আঁচল ফাউন্ডেশন সরকারের প্রতি বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
>> পরিবার থেকে পরীক্ষার সময় এবং ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী অন্তত দুই সপ্তাহ শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ ও নজরদারি জোরদার করা।
>> প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা ও প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
>> এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের জন্য হটলাইন বা বিশেষ মানসিক পরামর্শ ও মানসিক সহায়তা কার্যক্রম চালু করা।
>> শিক্ষক ও অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট, আচরণগত পরিবর্তন এবং আত্মহননের সম্ভাব্য ঝুঁকির লক্ষণ শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
>> পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীদের অপমান, শাস্তি, ভয় দেখানো এবং অন্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তুলনা না করার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে অভিভাবক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা।
>> শিক্ষার্থী আত্মহত্যা প্রতিরোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।