Published : 05 Jul 2026, 08:11 PM
বিয়ের দীর্ঘ সময় পর দেনমোহর পরিশোধের ক্ষেত্রে টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে একটি সমন্বিত নীতিমালা জারির নির্দেশনা চেয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাহমিদা আখতার রোববার ‘জনস্বার্থে’ এই রিট আবেদন করেন।
রিট আবেদনে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারার অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়নের আরজি জানানো হয়েছে।
এর উদ্দেশ্য হবে— বিয়ের দীর্ঘ সময় পর দেনমোহর আদায়ের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়ন বিবেচনা করে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি, নীতি ও মূল্যায়ন কাঠামো নির্ধারণ করা।
আবেদনে সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮ ও ৩১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব (আইন ও বিচার বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ), মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে ওই আবেদনে।
রিটকারী আইনজীবী ফাহমিদা আখতার বলেন, "দেনমোহর হচ্ছে দেশের আইন ও ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী স্ত্রীর একটি বৈবাহিক অধিকার এবং স্বামী তা দিতে বাধ্য। তবে আইন ও ধর্মে বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে দেনমোহর ফাঁকি দেওয়ার জন্য সমাজে এক ধরনের অপসংস্কৃতি রয়েছে।"
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কাবিননামায় কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম উল্লেখ না থাকলে সম্পূর্ণ দেনমোহরই 'প্রম্পট' বা আশু (চাওয়া মাত্র পরিশোধযোগ্য) হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।
"কিন্তু বাস্তবে গয়না বা কাপড় বাবদ কিছু উসুল দেখিয়ে বাকি অংশ বিলম্বিত রাখা হয়, যা স্ত্রী লোকলজ্জায় বা সম্পর্কের খাতিরে সংসার বহাল থাকা অবস্থায় দাবি করেন না। বিষয়টি সামনে আসে মূলত ডিভোর্সের পর।"
মূল্যস্ফীতির কারণে দেনমোহরের অর্থের অবমূল্যায়নের একটি উদাহরণ টেনে এই আইনজীবী বলেন, কারও বিয়ে যদি ২০ বছর আগে হয় এবং তখন তার দেনমোহর ২ লাখ টাকা ধার্য করে ১ লাখ টাকা উসুল দেখিয়ে বাকি ১ লাখ টাকা বিলম্বিত হিসেবে রাখা হয়, তাহলে ২০ বছর পর ডিভোর্সের সময় সেই ২০ বছর আগের ১ লাখ টাকাই দেনমোহর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
"তিন মাসের ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ দিয়ে পুরো বিষয়টা সেটেলমেন্ট করে ফেলা হয়, যা আইনত কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। এই ২০ বছর ধরে ওই নারীর দেওয়া শ্রম ও সময়ের পাশাপাশি টাকার মূল্যায়ন বা ক্রয়ক্ষমতাও পরিবর্তিত হয়েছে এবং ২০ বছর আগের ১ লাখ টাকা আর বর্তমানের ১ লাখ টাকার মূল্য কোনোভাবেই এক নয়।"
এর ফলে বৈবাহিক জীবনে নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে মূল উদ্দেশ্য, তা বজায় থাকছে না বলে মনে করেন এ আইনজীবী।
ফাহমিদা আখতার বলেন, এ ধরনের সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা সম্ভব হলে তা স্বামীদের 'তাৎক্ষণিক বা আশু দেনমোহর' পরিশোধ করতে উৎসাহিত করবে।
"বিলম্বিত দেনমোহর পরবর্তীতে দিতে গেলে টাকার মূল্যমানের সমন্বয়ের কারণে অংকের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। এতে বৈবাহিক সম্পর্কে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ডিভোর্সের পর দেনমোহর আদায়ের জন্য যে অসংখ্য মামলা রুজু হয়, নীতিমালা হলে সেই মামলার জটলা ও সংখ্যাও অনেক কমে যাবে।"
স্ত্রী নিজের ইচ্ছায় চলে গেলে বা সামাজিকভাবে ডিভোর্স হলে দেনমোহর মওকুফ হয়ে যায়–সমাজে প্রচলিত এমন ধারণা ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলে মন্তব্য করেন এ আইনজীবী।
তিনি বলেন, "স্ত্রী নিজে তালাক দিলে বা সংসার করতে অনিচ্ছুক হয়ে চলে গেলেও স্বামী সম্পূর্ণ দেনমোহর পরিশোধ করতে বাধ্য। কে তালাক দিল বা ডিভোর্সের কারণ কী— দেনমোহর আদায়ের আইনি অধিকারে তা কোনো প্রভাব ফেলে না।"