Published : 27 Mar 2026, 12:10 AM
৫৫ বছর আগের যুদ্ধদিনে লড়াইয়ের গল্প এখনও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল অশীতিপর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগের; সেই গৌরবগাঁথা নিয়ে দেশ কতটা পথ কীভাবে এগিয়েছে, তা অবিরাম ভাবায় তাকে।
মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে তৈরি বাংলাদেশের সাড়ে পাঁচ দশকের গতিপথ ভাবলে আশা-নিরাশার দোলাচল তৈরি হয় তার মনে। সে কারণে, এই পথচলাকে ছোটবেলায় অঙ্কের প্রশ্নে ‘তৈলাক্ত বাঁশে বানরের ওঠানামার’ হিসাবের সঙ্গে তুলনা করতে চাইছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক আয়োজনে ‘ক্যাপ্টেন বেগ’ নামে বেশি পরিচিত এই যোদ্ধাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পেছনে তাকালে বাংলাদেশের বিগত পথচলা কী রকম দেখতে পান তিনি?
উত্তরে তিনি বলেন, “আমরা ছোটবেলায় একটা অঙ্ক করতাম, একটা বানর কয় ফুট উঠলে কয় ফুট নামত, ৫৫ বছরে তো ওঠানামার মধ্যেই আছি আমরা।”
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা করে ক্যাপ্টেন বেগ বলেন, “আমাদের আদর্শতো প্রায়শই পরিবর্তন হতে থাকে। আজ আপনি যদি ক্ষমতায় থাকেন, আমি দৌড় দিয়ে যাব আপনাকে তোষামোদ করতে, বা আপনার সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় যাওয়ার জন্য। আবার ওই লোকটা যদি ক্ষমতায় না থাকে, অন্য কেউ আসে, তার দিকেও আমরা যাব।
“তার মানে, মূলত এটা আমাদের বাঙালিদের রক্তের দোষ। আমরা স্বাধীনতাটা পেয়েছি, কিন্তু স্বাধীনতাকে না আমরা ঠিকমত ব্যবহার করতে পেরেছি, বা স্বাধীনতাকে আদৌ কোনোদিন রক্ষা করতে পারব কিনা, এই রকম নিশ্চয়তা নাই।”
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন তৎকালীন স্পেশাল ফোর্সের এই সদস্য। সেখান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। শুরুতে ছিলেন নয় নম্বর সেক্টরের অপারেশনাল কমান্ডার। পরে তাকে দেওয়া হয় শমশেরনগর সাব-সেক্টরের পূর্ণ দায়িত্ব।
তিনি ‘হার্ড কোর অব সার্জেন্টস’ নামে কিশোরদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘বিচ্ছু বাহিনী’। সমগ্র সাতক্ষীরা অঞ্চলে গেরিলা, সম্মুখ ও নৌকমান্ডো যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এছাড়া বরিশালের দোয়ারিকায় পাকিস্তানি সেনাকে আত্মসমর্পণেও বাধ্য করেন।
বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ এর তৃতীয় খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসেন তিনি।
চার মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ, কাজী আশরাফ হুমায়ুন বাঙ্গাল, লুতফা হাসীন রোজী ও মুক্তিযোদ্ধা কামরুল আমান।
বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীতের মতো মৌলিক বিষয় মুক্তিযোদ্ধাদের এক জায়গায় নিবদ্ধ রাখে মন্তব্য করে ক্যাপ্টেন বেগ বলেন, “সবই আমাদের মৌলিক বিষয়। আমরা কোনোটির সঙ্গে আপস করতে পারি না।”
দেশ নিয়ে নানা কিছুতে হতাশ হলেও প্রতিবাদী চেতনা ও সমাজের একটি অংশের ইতিবাচক কাজের কারণে আশাবাদী হওয়ার কথা বলেন এই মুক্তিযোদ্ধা।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “এখনও মানুষজন প্রতিবাদ করে, এখনও অনেক জায়গায় আছে, যারা খেলাধুলাকে উৎসাহিত করে, পড়াশোনাকে উৎসাহিত করে।
এসবের উল্টো পৃষ্ঠায় থাকা মন্দ কাজের বিষয় তুলে ধরে ক্যাপ্টেন বেগ বলেন, “আরেক গ্রুপ আছে যারা পোলাপানকে গাঁজা খাওয়ায়, বাপেরা আনন্দ পায়, তার ছেলে কী সুন্দর সিগারেট খাচ্ছে, ধোয়া ছাড়তেছে, দেখো, ‘আমার ছেলেটা কী স্মার্ট’!
“আরেকটা গ্রুপ আছে, টাকাপয়সাওয়ালা একটা গ্রুপ, যারা সোসাইটি ধ্বংস করার পেছনে বড় একটা কারণ। কেননা, তাদেরকে টাকাপয়সার কোনো হিসাব দিতে হয় না যে, ‘আমি কত টাকা আয় করলাম, কোথা থেকে আয় করলাম’। হিসাব কিতাবতো নাই। যে যত বেশি খরচ করবে, সে সমাজে তত বেশি সম্মানিত।”
ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসার উপর জোর দিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি মনে করি, আমাদেরকে বাংলাদেশের ২০, ৩০, ৫০ বছর আগের ধর্মীয় অনুভূতিগুলোতে ফিরে যাওয়া উচিত। কারণ, এখন যত গোঁড়ামি দেখতে হয়, আমরা কিন্তু এত গোঁড়ামি দেখি নাই।
“আগে তো সুন্দর একটা ধর্ম চর্চা ছিল। যার যার ধর্ম, তারা পালন করেছে। আমরা হিন্দুদের খাবার খাইছি, সেটাতে আমার ধর্ম নষ্ট হয় নাই।”
নিজের বাবাকে দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার বাবা বরিশাল বিএম কলেজের প্রথম মুসলিম অধ্যাপক ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিলেন। ওইদিকে আবার টাইটেল পাস মাওলানা।
“আব্বাওতো দেখতাম যে, তিনি যখন বিএম কলেজ হোস্টেলের সুপারিন্টেন্ডন্ট ছিলেন বহুদিন, এক নাগাড়ে প্রায় ১৬-১৭ বছর, আব্বাকে হিন্দুদের পূজাতেও যেতে দেখতাম, খ্রিষ্টানদের গির্জাতেও যেতেন রোববারের প্রার্থণার সময়ে।”
ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, বিকৃতির চেষ্টা থাকলেও সঠিক ইতিহাস থাকবে। এটাকে কোনো দিন পাল্টে দেওয়া যায় না।
“আজকে হাজার হাজার বছর আগের ইতিহাস যখন বিকৃত হয় নাই, আপনি কীভাবে চিন্তা করেন, আজকে কেউ ইচ্ছা করলে ইতিহাস বিকৃত করবে। তাহলেতো কোনো ধর্মগ্রন্থের প্রতি মানুষের আস্থা থাকত না, এত এত হাজার বছর আগের বলে মানুষ বাদ দিয়ে দিত।”
মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে বিভিন্ন রকম উদ্যোগের কারণে অনেক সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাও বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধা বাছাইয়ে জাতীয় পর্যায় থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত সর্বদলীয় কমিটি করার প্রস্তাব দিয়ে ক্যাপ্টেন বেগ বলেন, “কে মুক্তিযোদ্ধা, কে মুক্তিযোদ্ধা না, সেটা যদি যদি আমরা সত্যিকার অর্থে বের করতে চাই, তাহলে সর্বদলীয় একটা কমিটি করা হোক।
“মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, গবেষক ও শিক্ষক— সবাই থাকবে এখানে। সর্বনিম্ন কমান্ডার ছিল, এই লোকগুলোকে নিতে হবে, যারা জানে কারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। কেবল জোয়ান এবং সুন্দর চেহারা দেখে না, বয়স্ক দেখে নিতে হবে, যারা ওই সময় যুদ্ধ করেছে।”
মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলার শুরুটা মুক্তিযুদ্ধের পরপরই হয়েছিল মন্তব্য করে ক্যাপ্টেন বেগ বলেন, “নয় মাস যুদ্ধ করার পরে একটা ছেলে যখন, তার দাঁড়ি ছিল, জামা ছিল ছেঁড়া, পায়ে আর পিঠে চুলকানির দাগ, শরীর নোংরা; আর একদল এখানে মাখন রুটি খেয়েছে, মায়ের আদর পেয়েছে বসে বসে, চেহারা তেলতেলে হয়েছে। যারা বাছাই করেছে, তারা তেলতেলে দেখে বাছাই করেছে।
“সত্যিকারের যারা মুক্তিযোদ্ধা, অভুক্ত, নয় মাস যারা যুদ্ধের ময়দানে ছিল, তারা সেই সময়টাতেই বাদ পড়ে গেছে।”
আগের খবর
'রক্তরেখায় বাংলাদেশ': সাড়ে পাঁচশ দুর্লভ আলোকচিত্রে বাঙালির মুক্ত
জয় বাংলা বললে গ্রেপ্তারের ভয়, এমন দেশ তো চাইনি: লুতফা হাসীন
'রক্তরেখায় বাংলাদেশ': সাড়ে পাঁচশ দুর্লভ আলোকচিত্রে বাঙালির মুক্ত
রক্তরেখায় বাংলাদেশ: দ্বিতীয় খণ্ডে বাঙালির বহুমাত্রিক জনযুদ্ধের ইত