২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

হাতেগোনা গোলাপি বাস, চলার পথ ও সূচি জানেন না অনেকেই

“এর আগেও তো নারীদের জন্য আলাদা বাস চালু হয়েছিল। কিছুদিন পর আর দেখা যায়নি। এবারও শুরুতে অনেক প্রচার হচ্ছে। কিন্তু ছয় মাস পরও বাসগুলো রাস্তায় থাকবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়,” বলেন এক নারী যাত্রী।

সাখাওয়াত সুপন কৌশিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Oct 2026, 11:48 AM

Updated : 29 Oct 2026, 11:48 AM

নারীদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলে দুই মাস আগে গোলাপি বাস চালু হলেও এখনো সেই বাসে ওঠার সুযোগ হয়নি সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সাবরিনার; তার কথায়, ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ হয় না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এ শিক্ষার্থী বলেন, “যেসব জায়গায় যাওয়া হয়, তার কোথাও পিংক বাস সার্ভিস আজ অবধি পাইনি। তাই এখনো ওঠা হয়নি। আমার রুটে থাকলে অবশ্যই পিংক বাসই অগ্রাধিকার দিতাম।”

মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা হাবিবা সুরভী বলেন, “অনেক নারী জানেই না যে পিংক বাস সার্ভিস কোন রুটে আছে, কখন ছাড়ে। এসব বিষয়ে আরও ভালোমতো প্রচার দরকার। পাশাপাশি বাসের সংখ্যা ও রুট আরও বাড়াতে হবে।”

গত ১৮ অগাস্ট নারীদের জন্য ঢাকার ১০টি রুটে নামানো হয় ১০টি গোলাপি বাস। ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় এসব বাস চলাচল শুরু হলেও যাত্রী সংকটের কথাও উঠছে।

যদিও নারী যাত্রীরা বলছেন, হাতেগোনা বাসগুলো নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট সময়ে ছেড়ে যাওয়ার ফলে সেগুলো সব নারীর নাগালে নেই। ফলে ওই বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকারও যৌক্তিকতা দেখেন না অনেকে।

তাদের ভাষ্য, সবসময় নাগালে থাকলে গোলাপি বাসেই চলতেন, কিন্তু সেই সুযোগ না থাকায় অপেক্ষা বাড়ানোর প্রয়োজনও মনে করেন না তারা।

নারীদের যাতায়াত সহজ করতে আরও ১০০টি গোলাপি বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপরিবহনে ‘বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি’ চালু ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত না করে শুধু নতুন বাস নামালে অতীতের মতই ব্যর্থ হবে উদ্যোগ।

‘পুরোপুরি নির্ভর করতে পারি না’

ঢাকার মোহাম্মদপুর বাস ডিপোতে সাত-সকালে গোলাপি বাসের ভেতরে বসেছিলেন চার-পাঁচজন নারী, অপেক্ষায় ছিলেন কখন ৮টা ৪০ বাজে।

সোয়া ৮টায় কয়েকজনকে ভেতরে দেখা গেলেও বাস ছাড়ার সময় কয়েকটি বাদে অন্য আসনগুলো যাত্রীতে ভরে গেল। তবে গোলাপি বাসের আগেই ওই ডিপো থেকে অন্য বাসগুলো যাত্রী নিয়ে ছুটেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো নারী-পুরুষ যাত্রীতে ভরে গেছে।

ওই ডিপো থেকে ছাড়া গোলাপি বাসের যাত্রীদের একজন সানজিদা জাহান বললেন, “এই বাস তো সবসময় থাকে না। তাই পুরোপুরি এর ওপর নির্ভরও করতে পারি না। অন্য সময় যেহেতু সাধারণ বাসে চড়তেই হয়, তাই কেউ আলাদাভাবে নির্দিষ্ট করে এই বাসে ওঠার জন্য বসে থাকেন না।”

তবে পাশে বসা আরেক যাত্রী মাকসুদা সুমি বলেন, “এখান থেকে বের হওয়ার সময় কিছুটা ফাঁকা থাকে। দুয়েকটা স্টপেজ পার হলেই ভরে যায় যাত্রীতে।”

আরেক যাত্রীর ভাষ্য, “বাসে যাত্রী কম দেখে বলা হচ্ছে, নারীরা পিংক বাস ব্যবহার করেন না। কিন্তু আমার মনে হয়, আগে দেখতে হবে বাসটা নারীদের প্রয়োজনের সময়ে এবং প্রয়োজনীয় রুটে চলছে কি না।

“বাসের ব্যবস্থা না রেখে যাত্রী কেন কম, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করলে তো হবে না।”

সাধারণ বাসে যাতায়াতে বিড়ম্বনায় পড়ার অভিজ্ঞতার কথা বললেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী বৈশাখী কর্মকার। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “প্রতিদিন অফিসে যাতায়াতের সময় সাধারণ বাসে ভিড় ঠেলে ওঠা-নামার সময় দুঃসহ লাগে। পিংক বাসে সেই অস্বস্তিটা নেই বললেই চলে। তবে বাসটার আরও কয়েকটা রুটে আরও বেশি ট্রিপ থাকলে ভালো হত।”

পিংক বাসে যাতায়াত করা মাজেদা বেগম বলেন, “অন্য বাসের তুলনায় যাত্রী কম থাকায় বসে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। দমবন্ধ করা পরিবেশও অন্য বাসের মত না। কিন্তু সবসময় এই বাসের জন্য অপেক্ষা করা সম্ভব হয় না, পাওয়াও যায় না। তাই অন্য বাসেই উঠতে হয়।”

আবার গোলাপি বাসের সুযোগ থাকলেও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতার কথা বললেন নারগিস খন্দকার নামে আরেক যাত্রী।

তার কথায়, “এই বাসে অনেক সুবিধা, সেটা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমার বাসা থেকে অফিস পর্যন্ত সরাসরি এই বাসের ব্যবস্থা নেই। মাঝপথে নেমে আবার অন্য বাস ধরতে হলে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে, তাই চাইলেও উঠতে পারি না।”

মিরপুরের বাসিন্দা নিশাত জাহান নূপুর বলেন, “কাজের সূত্রে প্রায়ই মতিঝিল যেতে হয়, তবে জানতাম না যে এখান থেকে মতিঝিলে পিংক বাস যায়। অবশ্যই সামনে থেকে পিংক বাস ধরেই যাব।

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একদিন আজিমপুর থেকে 'অপরাজিতা' নামের একটা ফিমেল ফ্রেন্ডলি বাসে উঠেছিলাম। একজন মহিলা কন্ডাক্টর সবার কাছ থেকে টাকা তুললেন, বিষয়টা খুবই ভালো লাগল। পিংক বাসের তো শুনছি বাসের ড্রাইভারও মহিলা, বিষয়টা সত্যিই খুব চমৎকার।”

কোথায় থেকে কখন ছাড়ে

বিআরটিসির পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন) মো. রাহেনুল ইসলাম বলেন, ঢাকার পিংক বাসগুলো সকাল ৭টা থেকে ৮টা ৪০ মিনিটের মধ্যেই সব ডিপো থেকে ছাড়ে। ছাড়ার সময় সময়ের কোনো হেরফের হয় না।

তবে ফেরার সময় বিকাল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে ফেরার কথা থাকলেও যানজটের কারণে কখনো কখনো সন্ধ্যা ৭টারও বেশি বেজে যায়।

ডিপো রুট আপ ডাউন
মতিঝিল কোকাকোলা-নতুন বাজার-মতিঝিল ৮:১০ ৫:১০
তালতলা-মতিঝিল ৮:৪০ ৫:১০
যাত্রাবাড়ী ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার-জিপিও-গুলিস্তান ৮:৩০ ৪:৩০
কল্যাণপুর মিরপুর ১০-মতিঝিল ৮:৩০ ৪:১০
মিরপুর মিরপুর-মতিঝিল ৭:০০ ৪:০০
মিরপুর ১২-মতিঝিল ৭:৩০ ৪:৩০
নারায়ণগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ-মতিঝিল ৮:০০ ৪:৩০
মোহাম্মদপুর মোহাম্মদপুর-মতিঝিল ৮:৪০ ৪:৩০
জোয়ারসাহারা আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল ৭:৩০ ৪:৩০
গাজীপুর শিববাড়ী-এয়ারপোর্ট ৭:৩০ ৪:৩০
বগুড়া শেরপুর-মাটিডালী ৮:০০ ১:০০
বনানী-মোকামতলা ৮:১৫ ১:০০
চট্টগ্রাম কালুরঘাট-পতেঙ্গা ৭:৩০ ৩:০০
কালুরঘাট-পতেঙ্গা ৮:০০ ৩:৩০

গোলাপি বাস চালু থাকবে? যাত্রীদের ‘শঙ্কা’

বিআরটিসির অধীনে ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু হয়। এরপর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে মহিলা বাস সার্ভিস উদ্বোধন করা হয়। বহরে ১২টি বাস থাকার কথা থাকলেও সড়কে নামে মাত্র চার-পাঁচটি। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও বাসের দেখা পেতেন না যাত্রীরা।

২০০৯ সালে এই সেবা ফেরানোর উদ্যোগ নিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। সবশেষ ২০১৮ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ‘দোলনচাঁপা’ নামে চারটি বাস চালু হলেও ২০২২ সালের অক্টোবরে তা বন্ধ হয়ে যায়।

এবারের বাস সার্ভিসও আগের মত থেমে যায় কিনা, সেই শঙ্কার কথা বললেন মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো যাত্রী শামীমা খাতুন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এর আগেও তো নারীদের জন্য আলাদা বাস চালু হয়েছিল। কিছুদিন পর আর দেখা যায়নি। এবারও শুরুতে অনেক প্রচার হচ্ছে। কিন্তু ছয় মাস পরও বাসগুলো রাস্তায় থাকবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।”

তার সঙ্গে থাকা আরেক যাত্রী বলেন, “আমরা চাই না, এই বাসও আগেরগুলোর মত কিছুদিন পর বন্ধ হয়ে যাক। বরং বাসে সংখ্যা আরও অনেক বাড়াতে হবে। যে যাই বলুক, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নারীদের জন্য আলাদা বাসের প্রয়োজন আছে।”

‘শুধু নারীদের জন্য বাস বড় চ্যালেঞ্জ’

গত ২৭ সেপ্টেম্বর সংসদ ভবনে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে গোলাপি বাসের সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হয়। দ্রুত আরও ১০০ বাস নামানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়।

বিআরটিসি পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন) মো. রাহেনুল ইসলাম বলেন, “নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিসের চাহিদা যাচাইয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। এর চূড়ান্ত ফল এখনও পাওয়া যায়নি।

“পিংক বাস সার্ভিস টেকসই করতে বিআরটিসি বিশেষ কিছু কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে সার্ভিসটির পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।”

কেবল নারীদের জন্য বাস পরিচালনা করা ‘চ্যালেঞ্জ’ মনে করেন রাহেনুল ইসলাম। তিনি বলেন, “পুরুষদের তুলনায় নারীরা রাস্তায় কম বের হন। একটি বাসে ৫০ জন পুরুষ যাত্রী থাকলে নারী যাত্রী থাকেন পাঁচ থেকে সাতজন। এভাবে ১০টি বাসের যাত্রী এক করেও একটি বাস পূর্ণ করা কঠিন। ফলে শুধু নারীদের জন্য বাস পরিচালনা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।”

আগের কয়েক দফা নারী বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যা কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, উপযুক্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে এটি টেকসই করা সম্ভব।”

তার কথায়, “ঢাকার বড় বড় বিপণিবিতান যেমন বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কে কর্মরত নারী বিক্রয়কর্মীদের নিয়ে একটি ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাদের বেতন পাওয়ার পর মাসিক ভাড়ার বিনিময়ে বাসে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হলে পাড়া-মহল্লা থেকে কর্মীদের তুলে বিপণিবিতানে পৌঁছে দেওয়া এবং সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

“মতিঝিলের ব্যাংকপাড়া ও বিভিন্ন করপোরেট অফিসে কর্মরত নারীদেরও অঞ্চলভিত্তিতে সংগঠিত করা যেতে পারে। তাদের জন্য নির্দিষ্ট পরিবহন ব্যবস্থা করা গেলে নারীরা সুবিধা পাবেন, পাশাপাশি বিআরটিসির সার্ভিসের যাত্রীও নিশ্চিত হবে।”

রাহেনুল বলেন, এসব পরিকল্পনা এখনই বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। বিআরটিসির বর্তমান বাসের মান ও সেবা এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই।

“এসি বাস, আরামদায়ক আসন এবং নির্ধারিত সময়সূচি নিশ্চিত করা গেলে এসব নারী যাত্রী অবশ্যই আসবেন। তাদের উপযুক্ত সেবা দিতে না পারা বিআরটিসির একটি সীমাবদ্ধতা।”

তিনি বলেন, “এ ধরনের উদ্যোগকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। নারীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে বিআরটিসির ইলেকট্রিক ও আরামদায়ক বাস চালু করা গেলে মানুষ এতে আকৃষ্ট হবেন। এতে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা ও পরিবারের পরিবহন ব্যয় কমবে। স্কুলে সন্তানকে আনা-নেওয়ার জন্য মায়েদের সারাদিন গাড়ি নিয়ে বসে থাকতে হবে না। জ্বালানি খরচও বাঁচবে।”

নতুন বাস কেনার পরিকল্পনা নিয়ে রাহেনুল ইসলাম বলেন, “মোট ২০০টি ইলেকট্রিক বাস আসবে। এর মধ্যে ১০০টি নারীদের জন্য এবং বাকি ১০০টি ঢাকা শহরের সিটি সার্ভিসের জন্য।

“বাসগুলো ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে সড়কে নামানো হতে পারে। বর্তমানে দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান। এরপর বিদেশ থেকে বাস আনা ও উৎপাদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগবে।”

‘নতুন সার্ভিস, সময় তো লাগবেই’

নতুন বাস সেবা হওয়ায় শুরুর দিকে যাত্রী কম পাওয়ার কথা বলছেন মিরপুর বাস ডিপোর ম্যানেজার ওমর ফারুক মেহেদী। তবে ধীরে ধীরে যাত্রী বাড়ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

মেহেদী বলেন, “এটা নতুন সার্ভিস, একটু সময় তো লাগবেই। আগের তুলনায় যাত্রী বাড়ছে। ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। যাত্রীসংখ্যা বাড়তে আরও কিছুটা সময় লাগবে। নারীদের মধ্যে সেবাটি নিয়ে আস্থা ও অভ্যস্ততা তৈরি হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।”

ভবিষ্যতে ইলেকট্রিক বাস যুক্ত হলে নারী যাত্রীর সংখ্যা বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন মেহেদী।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাস ডিপো থেকে একটি গোলাপি বাস চলছে। এ ডিপোর হিসাব সহকারী (গ্রেড-১) মো. সুমন মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নারী যাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় গোলাপি বাস পরিচালনায় লোকসান হয়। বাসের আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয়ও মেটানো যায় না।”

তার কথায়, “একটি বাসে দুজন চালক ও দুজন কন্ডাক্টর থাকেন। চারজন কর্মীর গড় বেতন ও জ্বালানি খরচ মিলিয়ে দৈনিক পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার টাকা। কিন্তু বাস থেকে প্রতিদিন সেই আয় হয় না।

“শুক্রবার ও শনিবার গোলাপি বাস চলাচল বন্ধ থাকে, কারণ কর্মজীবী নারী যাত্রী পাওয়া যায় না। কিন্তু বাস বন্ধ থাকলেও স্থায়ী কর্মীদের সরকারি স্কেল অনুযায়ী বেতন দিতে হয়। অন্য বাসে নারী-পুরুষ, শিশু সবাই উঠতে পারে, ফলে আমাদের অন্যান্য সব বাস থেকে লাভ হয়।”

তবে মিরপুর বাস ডিপোর ম্যানেজার ওমর ফারুক মেহেদী বলেন, “আমরা এখন আস্তে আস্তে লাভজনক অবস্থার দিকে এগোচ্ছি।”

‘নতুন বাস কেনার আগে ইতিহাস জানা উচিত’

অতীতে নারী বাস চালুর একাধিক উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় সেই অভিজ্ঞতা ও ব্যর্থতার কারণ বিবেচনা করে নতুন বাস কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আগে অতীত ইতিহাস জানা উচিত।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. শামসুল হক বলেন, “অতীতে সরকারি উদ্যোগে একাধিকবার নারী বাস সার্ভিস চালুর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো সফল হয়নি। অতীতের এসব অভিজ্ঞতা ও ব্যর্থতা কারণ বিবেচনা না করেই নতুন করে বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

“যারা সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্প গ্রহণ ও কেনাকাটায় আগ্রহী, তারা অতীতের অভিজ্ঞতা সামনে আনেন না। বিআরটিসির মত প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তাদের অতীতের ইতিহাস জানা উচিত। কিন্তু এসব বিষয় না বলে নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এতে শুধু প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি নয়, সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”

পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বাসের বিশৃঙ্খলা কমানো। পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু বা মেগা প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যাত্রী বহনকারী গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করতে হবে। এ জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। 'বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি' চালু করে নির্দিষ্ট করিডোরে নির্দিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।”

বিআরটিসির কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি লোকসানকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না, কারণ ভর্তুকি পাওয়া যায়। সরকারি প্রকল্প ও কেনাকাটায় সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ থাকলেও জনগণ প্রকৃত সেবা পাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।”

তার পরামর্শ, “সরকারকে আরও চৌকসভাবে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু করতে হবে এবং প্রধান সড়কে ছোট ছোট যানবাহনের প্রতিযোগিতা নিরুৎসাহিত করতে হবে।

“তা না করে নতুন নতুন রঙের বাস নামালে অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সেগুলো টেকসই হবে না। জোর করে চালু রাখলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অপ্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় হবে।”

বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু করা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল প্রকল্প নয় বলে মনে করেন শামসুল হক।

তার মতে, “হাতিরঝিল ও গুলশানে এ ধরনের উদ্যোগের পাইলটিং হয়েছে। এসব উদ্যোগে বড় বিনিয়োগ ছাড়াই নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে নির্দিষ্ট করিডোরে বাস পরিচালনা করা হয়েছিল।

“বাংলাদেশে বিপুল জনসংখ্যা একটি বড় বাজার। সরকার চাইলে ঢাকার গণপরিবহনের যাত্রীদের নির্দিষ্ট রুটে ভাগ করে কয়েকটি কোম্পানিকে বাস পরিচালনার দায়িত্ব দিতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের ব্যবসায়িক মডেল তুলে ধরে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব। সরকারকে মূলত নীতিগত সহায়তা ও ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”

তিনি বলেন, “হাতিরঝিলের বাস সার্ভিসে চালক যাত্রী উঠানোর জন্য প্রতিযোগিতা করেন না। কারণ সেখানে চালক বেতনভুক্ত কর্মচারী। কিন্তু ঢাকার অন্য বাসে চালককে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা মালিককে দিতে হয়। এরপর বাকি আয় চালক ও হেলপারের। ফলে তারা যাত্রীকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতায় নামেন।

“হাতিরঝিলে যাত্রী উঠুক বা না উঠুক, চালক মাস শেষে বেতন পান। অন্যদিকে ঢাকার প্রচলিত ব্যবস্থায় একজন চালককে সারাদিন বাস চালিয়ে ৮ হাজার টাকা মালিককে দিতে হয়। এই দুই ধরনের ব্যবসায়িক কাঠামোর পার্থক্য না বুঝলে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা দূর করা যাবে না।”