“চিকিৎসা দেওয়ার জন্যই আমাদের প্রশিক্ষিত করা হয়েছে, অন্যকে সহযোগিতা করব কেন?”, বলেন ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের নেতা।
Published : 22 Aug 2024, 12:46 AM
চিকিৎসক ও ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টদের পাল্টাপাল্টি সামাল দিতে না পেরে চিকিৎসক নিবন্ধনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল, বিএমডিসি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকার পতনের পর বিভিন্ন শ্রেণির ও পেশার মানুষদের নানা দাবিতে রাজধানীতে মিছিল ও অবস্থানের মধ্যে রোববার বিএমডিসিতে নিজেদের ‘প্র্যাকটিশনার’ হিসেবে নিবন্ধন করাতে যান ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টরা।
কার্যালয়ে গিয়ে নিজেদের পদবি নিজেরাই ঠিক করে দিয়ে এসেছেন তারা। এর জেরে বিক্ষুব্ধ চিকিৎসকরা বুধবার বিএমডিসি কার্যালয়ে যাওয়ার কর্মসূচি দেয়।
স্বাস্থ্যখাতের এই দুই পেশাজীবীর দ্বন্দ্বের জেরে কার্যত অচল বিএমডিসি কার্যালয় বুধবার বন্ধ ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির রেজিস্ট্রার লিয়াকত আলীর স্বাক্ষরে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএমডিসি অফিস সংস্কার কাজ চলছে বিধায় ২১ অগাস্ট থেকে অফিসে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তবে কতদিন বন্ধ থাকবে সে বিষয়ে নোটিশে কিছু বলা হয়নি।
চিকিৎসকদের অভিযোগ, ডিপ্লোমা স্বাস্থ্য সহকারীরা রোববার বিএমডিসি কার্যালয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের হেনস্তা করে। জোর করে আইটি শাখায় যায়।
তারা বিএমডিসির ওয়েবসাইটে মেনুবারে ‘ফাইন্ড রেজিস্ট্রার্ড ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট’ বদলে ‘ফাইন্ড ডিপ্লোমা মেডিকেল প্র্যাকটিশনার’ লিখে দেয়।
বিষয়টি জানতে পেরে রোববার থেকেই প্রতিবাদ শুরু করে সারাদেশের চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠন। বুধবার চিকিৎসকরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিএমডিসি অভিমুখে লংমার্চের কর্মসূচি দেন। এর জেরে বুধবার সকালে বিএমডিসি কার্যালয় বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ বা দেশের বাইরের যেকোনো মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস বা বিডিএস পাস করে চিকিৎসাসেবা দিতে হলে বিএমডিসির নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল বা ম্যাটস থেকে কোর্স করে আসা স্বাস্থ্য সহকারীদেরও এই নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
বিএমডিসি দুই এমবিবিএস /বিডিএস ডিগ্রিধারীদের ক্যাটাগরি-এ এবং স্বাস্থ্যসহকারীদের ক্যাটাগরি-বি ধরনের নিবন্ধন দেয়।
বিএমডিসির আইন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য সহকারীরা নিজেদের নামের পাশে ডাক্তার, প্র্যাকটিশনার লিখতে পারবেন না। তারা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করবেন। যেখানে চিকিৎসক নেই সেখানে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ লিখতে পারেন। তবে সব ধরনের ওষুধ তারা লিখতে পারেন না।
তবে নিজেদের চিকিৎসক দাবি করে বিএমডিসি নিবন্ধনে তাদের পদবি ‘ডিপ্লোমা মেডিকেল প্র্যাকটিশনার’ হিসেবে নিবন্ধনের দাবি জানিয়ে আসছেন।
বিএমডিসির নিবন্ধনে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টস ইনফরমেশনের স্থলে ডিপ্লোমা মেডিকেল প্র্যাকটিশনার এবং অনলাইনে ম্যাটস রেজিস্ট্রেশনের স্থলে বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন উল্লেখ করা,২০১০ সালের বিএমডিসি আইনের ২৯ ধারা সংশোধনসহ ৮ দফা দাবি নিয়ে গত রোববার বিজয় নগরে বিএমডিসি কার্যালয়ে যায় বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন।
বিএমডিসির একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, সেখানে গিয়ে রেজিস্ট্রার মো. লিয়াকত হোসেনসহ কর্মকর্তাদের হেনস্তা করেন তারা। তাদের দিয়ে বিএমডিসির ওয়েবসাইটে ‘ডিপ্লোমা মেডিকেল প্র্যাকটিশনার’ হিসেবে নিজেদের নাম নিবন্ধন করান তারা। নতুন রেজিস্ট্রেশন নম্বরও দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার বিএমডিসি একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়, সেখানে বলা হয়, ২০১০ সালের বিএমডিসি আইন অনুযায়ী এমবিবিএস এবং বিডিএস পাস করা চিকিৎসক ছাড়া আর কেউ ‘ডা.’ পদবি ব্যবহার করা যাবে না, এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও একটি বিজ্ঞপ্তি দেয় যেখানে বলা হয়, এমবিবিএস এবং বিডিএস উত্তীর্ণ ছাড়া কেউ নিজেদের ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। বিএমডিসির কোনো কর্মকর্তা এই আইনের পরিবর্তন বা পরিমার্জন করার ক্ষমতা রাখে না। শুধু জাতীয় সংসদ এই আইন পরিবর্তন বা পরিমার্জন করার ক্ষমতা রাখে।
বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক নিরুপম দাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আইন অনুযায়ী তারা ডাক্তার লিখতে পারেন না। কিন্তু রোববার তারা বিএমডিসিতে গিয়ে নিজেরাই ওয়েবসাইটে সেগুলো আপলোড করে দিয়েছে।
“স্বাস্থ্য সহকারীরা বিএমডিসিতে গিয়ে কর্মকর্তাদের জিম্মি করে আইটি সেকশনে গিয়ে ওয়েবসাইটে ডিপ্লোমা প্র্যাকটিশনার লিখে এসেছে। নামের পরিবর্তন করে ডিপ্লোমা প্র্যাকটিশনার। এর প্রতিবাদে সারাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চিকিৎসকরা বিএমডিসি ভবনের লংমার্চের ঘোষণা দেন। তবে বুধবার গিয়ে বিএমডিসি ভবন বন্ধ পাওয়া গেছে।”
চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটি, এফডিএসআরআরের উপদেষ্টা আবদুন নূর তুষার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টরা যদি বিএমডিসির কাছে রেজিস্ট্রেশন চায় তাহলে ওই আইনটা মেনেই তা করতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
“আইন অগ্রাহ্য একটা প্রতিষ্ঠানের কাছে আপনি ইচ্ছামত দাবি করতে পারেন না। আমি যদি বাংলাদেশের পাসপোর্ট চাই তাহলে নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করতে হবে, ওইভাবেই পাসপোর্ট পেতে হবে। কিন্তু আমি যদি আমার নিজের মত করে পেতে চাই, তাহলে তো হল না, আমি প্রতিষ্ঠানটিকে অগ্রাহ্য করলাম। তারা বিএমডিসিকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করেছে। এটা তো বেআইনি।”
বিষয়টি জানতে চাইলে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রোববার কিছু দাবি দাওয়া নিয়ে তারা বিএমডিসিতে গিয়েছেন। সেখানে কারও সঙ্গে কোনো অসদাচরণ করা হয়নি।
“আমরা রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়েছিলাম। সেখানে আগের কিছু দাবি দাওয়া নিয়েই কথা হয়েছে। জোর করে কিছু করা হয়নি।”
আবুল কালাম আজাদ বলেন, এক সময় বিএমডিসির নিবন্ধনে তাদের ‘মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট পেশাদার’ লেখা হত। নতুন আইনে এটি পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে।
“এখন লেখা হয় মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ইনফরমেশন। এটা ঠিক কী, তা বোঝা যায় না। এ কারণে আমরা এটা লেখার দাবি জানাচ্ছি। আগে রেজিস্ট্রেশন দিত মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট পেশাদার মানে প্র্যাকটিশনার। ডিপ্লোমা ডিগ্রি দেওয়ার ফলে রেজিস্ট্রেশনে ডিপ্লোমা মেডিকেল প্র্যাকটিশনার লেখার কথা। আমরা সেই অনুরোধ করেছি। চিকিৎসা দেওয়ার জন্যই আমাদের প্রশিক্ষিত করা হয়েছে, আমরা অন্যকে সহযোগিতা করব কেন?”
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বিএমডিসির সভাপতি অধ্যাপক মাহমুদ হাসান এবং রেজিস্ট্রার মো. লিয়াকত হোসেনের মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তারা ধরেননি।