Published : 01 Jan 2026, 11:27 PM
ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে কংক্রিট বোল্ডার দিয়ে মাথা-শরীর থেঁতলে হত্যার ঘটনার পাঁচ মাস পর ২১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
তবে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ না মেলায় এই হত্যা মামলা থেকে ১০ আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার ইন্সপেক্টর মো. মনিরুজ্জামান।
তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, “মামলাটি তদন্ত করে ২১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে গত ৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগ পত্র দিয়েছি। ৮ আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছি।
“সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্যের মাধ্যমে মামলার অভিযোগ প্রমাণ করবেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ১০ আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।”
অভিযোগপত্রে নাম আসা আসামিরা হলেন-মাহমুদ হাসান মহিন, সারোয়ার হোসেন টিটু, মনির ওরফে ছোট মনির, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু ওরফে নান্নু কাজী, সজিব ওরফে সজিব বেপারী, টিটন গাজী, তারেক রহমান রবিন, অপু দাস, রিজওয়ান উদ্দিন ওরফে অভিজিৎ বসু ওরফে অভি, জহিরুল ইসলাম, পারভেজ, সাগর, রুমান বেপারী, আবির হোসেন, মো. জহির , ইমরান হোসেন, শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম, হোসেন চৌকিদার, জিয়াউদ্দিন রাজি।

এই ২১ জনের মধ্যে ৮ জন পলাতক আছেন।
তারা হলেন- মো. জহির, মো. ইমরান, মো. শারাফাত ওরফে শফিউল, মো. জিয়াউদ্দিন রাজিব, হোসেন চৌকিদার, সারোয়ার হোসেন টিটু, মনির ওরফে লম্বা মনির ও অপু দাস পলাতক রয়েছে।
এছাড়া রাজীব বেপারী, সাবা করিম লাকী, কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু, রজব আলী পিন্টু, সিরাজুল ইসলাম, হিম্মত আলী, আনিসুর রহমান হাওলাদার, মিজান, নাইম ও রিয়াদকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে তদন্তে উঠে আসে, সোহাগকে হত্যার পর ‘চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে পৈশাচিক উল্লাস করে আসামিরা’।
ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও পূর্ব শত্রুতার জের ধরে গত ৯ জুলাই মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেইটের সামনে কংক্রিট বোল্ডার দিয়ে শরীর ও মাথা থেতলে হত্যা করা হয় ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে।
এরপর এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে সামলোচনার ঝড় ওঠে।

পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, ওই হত্যাকাণ্ডে যাদের অংশ নিতে দেখা গেছে এবং নেপথ্যে যাদের নাম আসছে, তারা সবাই পূর্ব পরিচিত। তাদের কয়েকজন সোহাগের ব্যবসার সহযোগীও ছিলেন এক সময়। ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধে এমন ভয়ংকরভাবে কাউকে হত্যা করা হতে পারে, তা পরিচিতজনদের ধারণারও বাইরে।
এ ঘটনায় তার বড় বোন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। আর পুলিশ দায়ের করেছে অস্ত্র মামলা। অভিযান চালিয়ে হক্যাতাণ্ডের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র্যাব।
মামলার অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে, “সোহাগ আনুমানিক ২০/২৫ বছর যাবৎ ঢাকায় বসবাস করে। বংশাল থানাধীন ডিসি রয় রোডস্থ ৪ নং রজনী বোস লেন সংলগ্ন মসজিদের পাশে সোহানা মেটাল নামক ভাঙারির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দিয়ে ব্যবসা করে আসছিলেন। ভাঙারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করাসহ এলাকার আধিপত্য সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আসামি মাহমুদ হাসান মহিন ও সারোয়ার হোসেন টিটুর সাথে বিরোধ চলে আসছিল। সেই বিরোধের জের ধরে তারা সোহাগের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গোডাউন তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। সোহাগকে ওই এলাকা থেকে বিতারিত করতে জিয়াউদ্দিন রাজিবের পরিকল্পনায় বিভিন্ন ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে আসছিল। কিন্তু সোহাগ তাদের হুমকির বিষয়টি কর্ণপাত না করে গোডাউনের তালা খুলে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল।
“এতে আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে গত ৯ জুলাই বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে ধারালো দা, প্ল্যাস্টিকের পাইপ, লোহার রড, লাঠি, সিমেন্টের কনক্রিট, ইট, পাথরের টুকরা ইত্যাদি নিয়ে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে সোহাগের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে তাকে ঘিরে ধরে। আসামি সারোয়ার হোসেন টিটুর সঙ্গে ভিকটিম সোহাগের তর্কাতর্কি শুরু হয়। এক পর্যায়ে আসামিরা ভিকটিমকে দোকান থেকে টেনে হেঁচড়ে বের করে হত্যার উদ্দেশ্যে এলোপাতাড়ি মারপিট শুরু করে। তাকে মারতে মারতে চ্যাংদোলা করে টেনে হিঁচড়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নং গেইটের ভেতর নিয়ে যায়। তারা সোহাগের পরিহিত অন্তর্বাস ছাড়া বাকি সব কাপড়চোপড় ছিড়ে খুলে ফেলে। ৩ নং গেইটের ভেতরে নিয়ে আসামিরা ভিকটিমকে এলোপাতারি মারপিট করে বুকে, মাথায়, মুখে কংক্রিট দিয়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। বিকাল ৬টা ২০ মিনিটের দিকে সোহাগের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নং গেইটের সামনে তাকে নিয়ে আসলে আসামিরা ‘আমার সোনার বাংলায়, চাঁদাবাজের ঠাই নাই’ বলে স্লোগান দিয়ে আসামিরা পৈশাচিক উল্লাস করে। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামিরা ভিকটিমের লাশ রাস্তার উপর ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।”
পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সোহাগের পরিবার।
সোহাগের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, “মোজাফ্ফর হোসেন বাবুল, রাকেশ ও কাইয়ুম মোল্লা আমার ভাইকে হত্যার মাস্টারমাইন্ড। কিন্তু তাদের নাম চার্জশিটে আসেনি। আমি তাদের নাম এজাহারেও দিয়েছিলাম। পরে দেখি ওদের নাম নাই। থানায় বসে তাদের নাম কেটে দেয়া হয়েছে। ওই দিন জনের নাম না আসায় আমরা অসন্তুষ্ট।”
এই হত্যার ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের ধরা হয়নি অভিযোগ করে তিনি বলেন,“যে দোষ করে সে প্রকৃত দোষী। বাকীরা তো তাদের মদদে কাজ করে। প্রকৃত দোষীরা আইনের আওতায় আসেনি। আমার ভাইকে হারিয়েছি, বুক খালি হয়েছে। যেভাবেই হোক তাদের যেন আইনের আওতায় আনা যায় সেই জন্য লড়াই করবো।”
হত্যাকাণ্ডে আসামিদের কার কী ভূমিকা
অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে, মামলার ভিকটিম সোহাগ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্বদানকারী হলেন মাহমুদুল হাসান মহিন ও সারোয়ার হোসেন টিটু।
তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সোহাগকে মারপিটে নির্দেশনা দেয় এবং ঘটনার সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব দেয়। হত্যার পর তার মৃতদেহের চারপাশে ঘুরে তার অনুসারীদের নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।
আসামি মনির ওরফে ছোট মনির ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ভিকটিমকে এলোপাতারি মারপিট করেন, ভিকটিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশের বুকের উপর লাফিয়ে দুই হাত উপরে তুলে পৈশাচিক উল্লাস করেন।
আসামি আলমগীর তার হাতে থাকা স্টিলের ব্যাটন দিয়ে ভিকটিমকে এলোপাতারিভাবে মারতে মারতে ভাঙারির দোকান থেকে টেনে হিঁচড়ে উলঙ্গ করে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেইটের মধ্যে নিয়ে যায়। তিনি তার শার্ট খুলে খালি গায়ে ভিকটিমের মুখে থাপ্পড় মারতে থাকেন মারে এবং ডান হাতে লাশের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে তার বুকে মেখে উল্লাস করেন।
আসামি লম্বা মনির কংক্রিট দিয়ে ভিকটিমের মাথার উপরে আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। তিনি লাশের পা ধরে টেনে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের গেইটের সামনে নিয়ে আসেন। ভিকটিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশের উপরে উঠে লাফাতে থাকেন লম্বা মনির।
আসামি মো. নান্নু কাজী ভিকটিমের বুকের উপরে ও মুখে ইট দিয়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর স্লোগান দিয়ে পৈশাচিক উল্লাস করেন।
আসামি সজীব বেপারী অন্য সব আসামিদের সাথে মিলে ভিকটিমকে মারপিট করে হত্যায় সহযোগিতা করেন এবং পৈশাচিক উল্লাস করেন। টিটন গাজী লোহার লাঠি দিয়ে আর সব আসামির সঙ্গে ভিকটিমকে এলোপাতারি মারেন মারপিট করেন এবং উল্লাস প্রকাশ করেন ও হত্যায় সহযোগিতা করেন।
আসামি তারেক রহমান রবিন ভিকটিমকে মারপিট করে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার জন্য লাশের মাথায় ও মুখে লাথি মারেন। আসামি অপু দাস আর সব আসামিদের সাথে মিলে ভিকটিমকে মারার পরিকল্পনায় অংশ নেয়।
মো. রিজওয়ান উদ্দীন ওরফে অভিজিৎ বসু তার হাতে থাকা কালো রংয়ের হেলমেট দিয়ে ভিকটিমের মাথায় ৫/৭ বার আঘাত করলে ভিকটিম রাস্তার উপরে লুটিয়ে পড়েন। তখন কংক্রিট দিয়ে ভিকটিমের বুকে এবং শরীরের বিভিন্ন স্বানে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
মো. জহিরুল ইসলাম, মো. পারভেজ, সাগর, মো. রুমান বেপারী, মো. আবির হোসেন, মো. জহির ও মো. ইমরান আসামিদের সাথে ভিকটিমকে এলোপাতারি মারপিট করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে পৈশাচিক উল্লাস করেন।
মো. শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম ভিকটিমের ডান পাশে দাড়াইয়া ঘেরাও করে রাখে এবং সকল আসামিদের সাথে মিলে ভিকটিমকে এলোপাতাড়ি মারপিট করে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর পৈশাচিক উল্লাস করেন।
আসামি হোসেন চৌকিদার ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন। এছাড়া আসামি মো. জিয়াউদ্দিন রাজিব আসামিদের সাথে মিলে ভিকটিমকে হত্যার পরিকল্পনায় অংশ নেন।