Published : 21 Apr 2026, 02:23 PM
সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্থাপনায় যারা হামলা করেছে, তাদের বিচার এবং স্মারকগুলো পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন একদল নাগরিক।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানান মুজিবনগর পরিদর্শনকারী নাগরিক প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
মুজিবনগর দিবসে বেসরকারি সংস্থা নাগরিক উদ্যোগ’র আয়োজনে ১৭ সদস্যের প্রতিনিধি দল মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ স্থান পরিদর্শন করে।
সংবাদ সম্মেলনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, “আপনারা অবহিত আছেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে ছদ্মবেশী কিছু দুর্বৃত্ত মুজিবনগর কমপ্লেক্স ভাঙচুর করেছে, বেশকিছু ভাস্কর্য ভেঙে ফেলেছে।
“এসব ছদ্মবেশী দুর্বৃত্তরা গণঅভ্যুত্থানের আগে ও পরে মব সৃষ্টি করে দেশের নানা স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ধ্বংস করেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য—অন্তর্বর্তী সরকার নির্লিপ্ত থেকেছিল, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্মারক রক্ষায় কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করেনি।”
মুজিবনগর কমপ্লেক্সে পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “কিছু ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কিছু ভাস্কর্য ভগ্ন অবস্থায় আছে। সেখানে উপস্থিত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, জনসাধারণ ও সাংবাদিকরা জানান যে, এবার দিবসটিতে সরকারিভাবে কোনো কর্মসূচি নেই। সরকারের কোনো মন্ত্রী বা কর্মকর্তা শ্রদ্ধাঞ্জলিও অর্পণ করেননি।
“আমরা দেখলাম, কেবলমাত্র স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও কতিপয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় সাংবাদিক বন্ধুরা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তারা বলেছেন, দিবসটি পালনের কোনো নির্দেশনা তারা পাননি। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ সরকারের শপথ দিবসে সরকারের এ নিস্পৃহতা আমাদের হতবাক ও ব্যথিত করেছে।”
মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক দল বা ব্যক্তি বা পরিবারের সম্পত্তি নয় মন্তব্য করে আবু সাঈদ খান বলেন, “রাজাকার-আলবদর-শান্তি কমিটি-জামায়াত-নেজামে ইসলাম-মুসলিম লীগ-পিডিপি ছাড়া সেই সময়ের প্রায় সব দল, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল: মুক্তিযুদ্ধ সব মানুষের যুদ্ধ, জনযুদ্ধ।
“…সবাইকে মনে রাখতে হবে, যে জাতি তার ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে না, সে জাতি সামনে এগোতে পারবে না।”
নাগরিক অধিকার সুরক্ষা জোটের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, “জাতির একটি শূন্যতার মুহূর্তে এই মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়।
“আর তাদের নেতৃত্বেই ১১টি সেক্টরে ভাগ হয়ে দেশব্যাপী প্রতিরোধ ও সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালিত হয়, যা সারাদেশ ও বিশ্বব্যাপী মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে অনন্য অবদান রাখে।”
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের শপথ গ্রহণ বা মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রাম কোনো একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ঘটেনি, বরং অনেকগুলো ঘটনার প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ একটি সাংগঠনিক রূপ নিয়েছিল।
“মুজিবনগর গোটা জাতির সম্পদ, গোটা জাতির অহংকার। এই স্মৃতি ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে।”
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “ছোট-বড় মিলে প্রায় ৩০০ ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। জাতীয় চার নেতার ভাস্কর্য, অপারেশন সার্চলাইটের ঘটনা চিত্র, স্বাক্ষর স্থানসহ প্রায় সকল স্থাপনাই আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে।
“শুধু তাই নয়, সারা বাংলাদেশ থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্থাপনায় আক্রমণ হচ্ছে। আর এর পেছনে রয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি, যারা মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দিতে চায়।
“আমরা জেনেছি এইসব স্থানে হামলা হওয়ার পরও কোনো মামলা নেওয়া হয়নি এবং এখন পর্যন্ত সরকারের পদক্ষেপ থেকে কোনো পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার কাজ গ্রহণ করা হয়নি।”
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, “মুজিবনগর এলাকাটি আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। এখানে ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনাবলির সাক্ষী এই মুজিবনগর এলাকাটি। এটি আমাদের দেশের প্রথম রাজধানী।
“এটিকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ আমাদের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। স্বাধীনতার মুল ইতিহাসকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ ও নতুন প্রজন্মকে জানানোর জন্য মুজিবনগরে একটি মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স তৈরির বা রূপান্তরের জোর দাবি জানাচ্ছি।”
প্রতিনিধির দল সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবির তুলে ধরেছে—
১. অবিলম্বে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সসহ সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্ত স্মারকগুলো পুনর্নির্মাণ করতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, স্মারক, গণকবর, বধ্যভূমিসহ স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলোতে হামলাকারী দুর্বৃত্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে।
৩. যথাযোগ্য মর্যাদায় রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিবনগর দিবস পালন করতে হবে।
৪. মুজিবনগরে নির্মাণাধীন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাদুঘরটির কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি সেখানে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
৫. দলমতের ঊর্ধ্বে নির্মোহভাবে রচিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরত্বগাঁথা পাঠ্যপুস্তকে স্থান দিতে হবে।
পরিদর্শনকারী দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন— মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী রফিক আহমেদ সিরাজী, দোলন চন্দ্র রায়