Published : 02 Sep 2026, 09:17 PM
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে অংশ নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূতের কাছে তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
বুধবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জাহানাবাদী সাক্ষাৎ করতে গেলে ঢাকার অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ইরানে আগ্রাসন বা আক্রমণের লক্ষ্য নিয়ে ওই জোটে যোগ দিচ্ছে না বাংলাদেশ।
বরং ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী ‘হুতিদের ঠেকানোর ক্ষেত্রে সৌদি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়’ ওই জোটে ঢাকার অংশগ্রহণের কথা বলেছেন তিনি।
পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব।
ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে তেল ও গ্যাস পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাব আল-মান্দাব হয়ে লোহিত সাগরের নৌপথের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।
কিন্তু ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা সম্প্রতি লোহিত সাগরে সৌদি আরবসংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালায় এবং সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয়। তাতে গুরুত্বপূর্ণ এ সমুদ্র পথ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়।
বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেলও এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২৯ কিলোমিটার। সেখানে মাত্র দুটি নৌ চ্যানেল দিয়ে জাহাজ চলাচল সম্ভব। ফলে ওই পথ বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এ অবস্থায় বাব আল-মান্দাব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে নতুন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা আসে গত ৩১ জুলাই।
রিয়াদে ৪৩টি দেশের সামরিক প্রতিনিধি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পর জোট গঠনের ওই ঘোষণা দেওয়া হয়।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশ ৪৩টি হলেও জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে।
‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামের এই জোটের লক্ষ্য হলো বাব আল-মান্দাব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের রুট সুরক্ষিত রাখা এবং সদস্য দেশগুলোর সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষা করা।
জোটের যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগ। কোনো রাষ্ট্র, জোট বা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে লক্ষ্য করে এটি গঠন করা হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কনভেনশন এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান রেখেই এর কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, সৌদি আরব হবে জোটের স্থায়ী সদর দপ্তর। সেখানে যৌথ অভিযান সমন্বয় কেন্দ্র, সামুদ্রিক অভিযান কেন্দ্র এবং সচিবালয় স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
ওই জোটে ঢাকার অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনার মধ্যে ৭ অগাস্ট নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা জোট গঠনে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যে তিন দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা এর লক্ষ্য।
চুক্তির একটি বিষয় হল, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদেরও সম্মিলিত প্রতিরক্ষার আওতায় আসার কথা রয়েছে।
ইউরোপ-আমেরিকার জোট নেটোর আদলে এমন সম্মিলিত প্রতিরক্ষার কারণে এই জোটকে ‘ইসলামিক নেটো’ও বলা হচ্ছে।
চুক্তিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামরিক সমন্বয়, যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নামে পরিচিত এই জোটেও অংশগ্রহণের বিষয় ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা বলেছে বাংলাদেশ সরকার।
বুধবার রাষ্ট্রদূত জাহানাবাদীর সাক্ষাতশেষে দুপুরের ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন বলেন, “কিছু নিরাপত্তা সহযোগিতায় বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে আমরা মতবিনিময় করেছি। হুতিদের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে গঠিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় আমরা যোগ দিয়েছি।
“এটা আমরা করেছি, কেননা দুই পবিত্র মসজিদের রক্ষক হওয়ার কারণে সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ এবং উনারা এটা বুঝতে পারছেন যে, ওখানে অবস্থানটা খুবই স্পষ্ট।”
তিনি বলেন, “আমি আগেও যেমনটা বলেছি, ইরানের উপর আক্রমণ চালানোর কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমরা ওখানে আমরা কাজ করতেছি না, এটা হুতিদের বিরুদ্ধে। এটা হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের যে চ্যালেঞ্জ আছে, সেটাতে আমরা সহায়তা করতে চাচ্ছি।”
‘খুবই ভালো ও সৌজন্যমূলক’ বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা আবারও উত্তেজনা কমানোর জন্য আমাদের আহ্বান জানিয়েছি। এটি শুরু থেকেই আমাদের একটি ধারাবাহিক ও স্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান, যেন এই সংঘাত প্রশমিত হয়।”
ওই অঞ্চলে প্রায় ৮০ লাখ বাংলাদেশি থাকার প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের সার্বিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সরকারের ‘অগ্রাধিকারে’ থাকার কথা বলেন হুমায়ুন কবির।
বাংলাদেশমুখী জাহাজ চলাচলে সহযোগিতার চাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সংঘাত প্রশমনের পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাংলাদেশের যেসব কন্টেইনার আটকে আছে, সেগুলো যেন দ্রুততার সঙ্গে পার হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, সেই আলোচনা হয়েছে।