Published : 06 Nov 2025, 04:27 PM
আগামী সংসদ নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি চেয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা।
সনদের আইনি ভিত্তি দিয়ে না গেলে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ‘বাংলাদেশের কলঙ্ক’ হিসেবে বিবেচিত হবেন বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কারওয়ান বাজারে ঢাকা ট্রেড সেন্টারে এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।
জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে নভেম্বরে গণভোটের দাবি জানিয়ে আসা জামায়াতে ইসলামসহ আট দল বৃহস্পতিবার ঢাকার পল্টন মোড়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে।

সেখানে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের দাবি আদায়ে প্রয়োজনে ‘আঙ্গুল বাঁকা’ করবেন।
প্রায় একই সময়ে গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা সংসদ নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দাবি করেছেন। প্রয়োজনে গণঅভ্যুত্থানের মতো রাজপথে নামারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, “জুলাই বিপ্লবের পরে আমরা নতুন বাংলাদেশ চেয়েছি; কিন্তু সেই বিপ্লব এখনো রাষ্ট্রীয় ও আইনি মর্যাদা পায়নি। জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা ও অধিকার এখনো সুনিশ্চিত নয়। এটা আমাদের জাতির জন্য অপমানজনক।”
এক বছরেও ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও তাদের পরিবারের আইনি ভিত্তি না দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বিপ্লবকে ‘ঝুঁকিতে ফেলছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা সরকারের প্রধান প্রতিশ্রুতি জুলাই সনদকে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করবেন। অন্যথায় আপনি বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হবেন।”
শহীদুল ইসলামের ভাষ্য, রক্তের উপর গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, সরকারের ‘নিজের অস্তিত্বের জন্য’ হলেও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রয়োজন।
“জুলাই সনদ যদি আইনি ভিত্তি নাই পেল, তাহলে আপনাদের সরকারটাই তো অবৈধ হয়ে যাচ্ছে। কেন পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসে এটাকে আইন ভিত্তি দেবে?”

তিনি বলেন, “জুলাই বিপ্লব সংবিধান মেনে হয়নি। তাহলে সেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে দিয়ে কারা আপনাদেরকে নির্বাচনের কথা বলতেছে? আমরা ইলেকশন চাই, কিন্তু ইলেকশনের আগে আপনারা প্রয়োজনে গণভোটটা দেন।”
শহীদ আসহাবুল ইয়ামিনের বাবা মহিউদ্দিন জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলো সই করলেও সেখানে ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন।
জুলাই সনদ লিখিত হওয়ায় এর আইনি ভিত্তি দরকার মন্তব্য করে তিনি জানান, এজন্য গত ২৬ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে তারা দেখা করে ১০ দফা দাবি জানিয়ে এসেছেন।
জুলাই সনদের ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ৫৪টি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে উল্লেখ করে মহিউদ্দিন বলেন, “যদি একমত হয়, তাহলে এর জন্য কোনো ইলেকশনের দরকার নেই। যেখানে তারা দ্বিমত পোষণ করেছে, সেটার জন্য গণভোট দরকার।”
তিনি বলেন, “জুলাই সনদ যদি আমরা প্রথমেই বাস্তবায়ন না করি বা এটা যদি আইনি ভিত্তি না দিই, তাহলে সরকারের তো কোনো ভিত্তি নেই। এই সরকার যে বাজেট পেশ করলো, বাজেট পেশ করতে হয় সংসদে। কিন্তু তারা বাজেট পেশ করছে টেলিভিশনের মাধ্যমে।

“তাদের এতগুলো যে কার্যকলাপ করে যাচ্ছে, প্রতি পদে পদে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং এই সরকারকে যারা সংবিধান মানতে হবে বলে পিছনের দিকে টানছে…তাহলে এই সরকারের নিজেরই তো অস্তিত্ব নেই এবং তারা বিপদে পড়বে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে মহিউদ্দিন বলেন, “আপনাদের অস্তিত্ব, শহীদ এবং আহত যোদ্ধাদের সুরক্ষা যদি নিশ্চিত করতে চান, তাহলে অবশ্যই আপনারা বিপ্লবী সরকারের মত দায়িত্ব পালন করুন। জুলাই সনদের জন্য আপনারা অর্ডার পাস করেন এবং আইনি ভিত্তি দিয়ে তারপর আপনারা ইলেকশন করতে চাচ্ছেন, আমাদের কোনো আপত্তি নাই।”
শহীদ শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বক্তব্যের শুরুতেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দেওয়া বক্তব্যের বিরোধিতা করেন।
তার কথায়, “স্বাধীন আমরা ’৭১ সালে হয়েছি। আর জুলাইয়ে যে বিপ্লব হয়েছে, আমি মনে করি একাত্তরের মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেই আকাঙ্খা পূরণ করতে হয়েছে।”
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগামী দিনে মানুষের মৌলিক অধিকারের জন্য আর যেন কোনো অভ্যুত্থানের দরকার না হয়, সেজন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন দরকার।
“সংস্কার, বিচার এবং বিশেষ করে যারা শহীদ হয়েছে ও আহত হয়েছে, তাদেরকে এবং এই আন্দোলনকে আইনি ভিত্তি দিতে এই জুলাই সনদ। যারা আহত হয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে নির্বাচনের পূর্বে জুলাই সনদের একটা আইন ভিত্তি দেওয়া দরকার।”

শহীদ শেখ শাহরিয়ার মতিনের বাবা আব্দুল মতিন বলেন, “আমার একমাত্র ছেলেকে আমি হারিয়েছি। এ পরিবারগুলোর এখন কী অবস্থা? এখনই মনে হচ্ছে সারাদেশে আমাদের গুরুত্ব কমে গেছে।
“দুর্নীতি, হত্যা, খুন, লুটপাট চাঁদাবাজি সবই যদি ঠিক থাকে, তাহলে জুলাই বিপ্লবের কী দরকার ছিল? দেশে একটা অরাজকতা বিরাজ করতেছে। তাই নির্বাচনের পূর্বেই জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়া হোক।”
শহীদ মনিরুল ইসলামের মেয়ে রুফাইদা ইসলাম চাঁদনি তার বক্তব্যে বাবাহীন অসুস্থ্ মাকে নিয়ে তাদের তিন ভাই-বোনের ‘অসহায়’ জীবন যাপনের কথা তুলে ধরেন।
চাঁদনি বলেন, “আমরা আমাদের নিরাপত্তা চাই, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি চাই।”

গণঅভ্যুত্থানের পরে এখনও কোনো সমন্বয়ক বা সরকারের কোনো উপদেষ্টা তাদের পরিবারের খোঁজ নিতে যায়নি বলে জানান তিনি।
শহীদ শেখ ফাহমিন জাফরের মা কাজী লুলুল মাখমিন বলেন, “সন্তানকে ছেড়েছি দেশের জন্য, আর আমরা এখনও সনদ চাচ্ছি; কিন্তু পাচ্ছি না।”
জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি চেয়ে গণঅভ্যুত্থানের মতো ফের রাজপথে নামার হুঁশিয়ার উচ্চারণ করেন তিনি।