ধর্ষণ মামলা: বিয়েতে ‘রাজি’ নারী কনস্টেবল, আসামি সহকর্মী বললেন ‘চাপে আছি’
“এটা আপনাদের বিষয়, আমার বা আদালতের বিষয় না। আদালতের বাইরে করতে পারেন,” বলেন বিচারক।
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ব্যারাকে ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগে যে নারী কনস্টেবল মামলা করেছেন তিনি আসামিকে বিয়ে করে ‘ঝামেলা’ মিটিয়ে ফেলার কথা আদালতকে বলেছেন।
আদালতে বিয়ের উদ্যোগ নিয়েও পরে ভেস্তে যায়। যদিও তার আগে মামলার আসামি একই থানার কনস্টেবল সাফিউর রহমান বলেছেন, তিনি ‘চাপে’ আছেন।
ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তাজুল ইসলাম সোহাগের আদালতে রোববার সাফিউরের রিমান্ড আবেদন শুনানি ছিল।
ধর্ষণের অভিযোগ এনে ওই নারী কনস্টেবল মামলা দায়েরের পর শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে ঢাকার মিল ব্যারাক পুলিশ লাইন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ।
তার আগে মঙ্গলবার থানার ওসির কাছে সেই নারী কনস্টেবল সহকর্মী সাফিউরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেন।
তিনি বলেছেন, তিনি গত ফেব্রুয়ারিতে আশুলিয়া থানা থেকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় যোগ দেন। তাকে পাঁচ মাস ধরে ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ করে আসছেন’ সাফিউর।
বৃহস্পতিবার ঢাকার পুলিশ সুপারের তরফে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তিনি বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে উভয় পুলিশ সদস্যকে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করেন এবং ঘটনাটি তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করেছেন।
সেদিন কনস্টেবল সাফিউরের নাম না বলেই এ বিষয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।”
এ ঘটনায় ওই কনস্টেবল ‘দোষী সাব্যস্ত হলে’ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথাও বলা হয়।
পরের দিন শুক্রবার ধর্ষণের অভিযোগ এনে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেন ওই নারী কনস্টেবল।
শনিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই জুলফিকার আলী তার পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
তবে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে না আসায় সাফিউরকে কারাগারে পাঠিয়ে রিমান্ড শুনানির দিন রোববার ধার্য করা হয়।
রোববার শুনানিকালে সাফিউরকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার বাদীও আদালতে উপস্থিত হন।
শুনানি শুরুর আগে সাফিউরের আইনজীবী আব্দুস ছালাম সিকদার সাংবাদিকদের বলেন, “১৫ লাখ টাকা দেহমোহরে বাদী বিয়েতে রাজি হয়েছেন। এখানেই তাদের বিয়ের কাজ সম্পন্ন হবে।”
বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠেন। তখন সাফিউরের আইনজীবী আদালতকে বলেন, “বিষয়টি আপনিও অবগত। গ্রামের একটা প্রবাদ আছে, ‘মিয়া বিবি রাজি তো…’। উভয়ে বিয়েতে সম্মত। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করি, যদি অনুমতি দেন। পরে কাগজ উপস্থাপন করবো।”
বিচারক বলেন, “এটা স্পর্শকাতর বিষয়।”
তখন আইনজীবী বলেন, “তারা প্রাপ্ত বয়স্ক। বাদীর ২১, আর আসামির ২৮ বছর বয়স।”
তখন বিচারক বলেন, “এটা আপনাদের বিষয়, আমার বা আদালতের বিষয় না। আদালতের বাইরে করতে পারেন। আদালতের আগ্রহ নাই। আপনাদের ওপর নির্ভর করছে।”
তখন আইনজীবী ছালাম সিকদার বলেন, “বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আদালতকে অবহিত করবো।”
আগে থেকেই আসামিপক্ষের আইনজীবীরা কাজী সিরাজুল ইসলামকে আদালতে নিয়ে আসেন। পরে এজলাসের পেছনের বেঞ্চে বসে বিয়ের কাজ শুরু করছিলেন কাজী।
তবে আসামির কবুল বলার সুযোগ না পাওয়ায় এবং স্বাক্ষর না করায় বিয়ের কাজ আর শেষ করা হয়নি।
আদালত আসামিকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুস ছালাম সিকদার আদালতকে বলেন, “তাদের দুইজনের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে, তারা বিয়ে করবেন। নিবেদন করছি, রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে জামিনের। বিয়ে করে ৫/৭ দিনের মধ্যে কাবিনামা দাখিল করবো। প্রয়োজনে আজই দিতে পারবো।”
এ সময় বাদীপক্ষের আইনজীবী রেজাউল করিম বলেন, তারা জামিনের বিরোধিতা করছেন না।
শুনানি শেষে আদালত সাফিউরের রিমান্ড ও জামিনের আবেদন নাকচ করেন।
এসময় সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ওই নারী কনস্টেবল আদালতকে বলেন, “আমি আর কোনো ঝামেলা চাই না। বিয়ে করতে না চাওয়ায় মামলাটা করেছি। রিমান্ড চাচ্ছি না। বিয়ে করে সংসার করতে চাই।”
মামলায় নারী কনস্টেবল অভিযোগ করেছেন, ‘বিয়ের প্রলোভন’ দেখিয়ে সাফিউর রহমান ১৫ অগাস্ট রাত আড়াইটা থেকে ৪টা পর্যন্ত দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা ভবনের দ্বিতীয় তলায় দক্ষিণ পাশের নারী ব্যারাকে তার শয়নকক্ষে তাকে ‘ধর্ষণ’ করেন।
তার অভিযোগ, একইভাবে বিগত পাঁচ মাসে সপ্তাহে দুইবার করে তাকে ধর্ষণ করার পাশাপাশি তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও চিত্র তার ব্যবহৃত আইফোনে ধারণ করেন সাফিউর। এই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ‘হুমকিও’ দেন তিনি।
শনিবার ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সালেহ সাফিউরের কাছে ঘটনা জানতে চান। তিনি জানতে চান, এই কনস্টেবল আগে বিয়ে করেছেন কি না।
জবাবে সাফিউর বলেন, গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী আছে। এক বছর আগে বিয়ে করেছেন।
বাড়িতে স্ত্রী রেখে আরেকজনের সাথে প্রেম করেন কেন? বিচারকের এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ইসলামি শরিয়ামতে তাকে বিয়ে করবেন।
কিন্তু রোববার বিচারক এজলাসের ওঠার আগে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সাফিউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি। চাপে আছি, এখন এ বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না।”
তার আগে বাদীকে বিয়ে করার বিষয়ে সাফিউরের আইনজীবী ছালাম সিকদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা ওর সিদ্ধান্ত। দুইজনকে নিয়ে থাকতে চাইলে, চলতে চাইলে চলবে।”
শুনানির পর বিষয়টি নিয়ে নারী কনস্টেবলের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মান-সম্মান যেহেতু গেছে। সতীনের সংসার করতে হলে করবো।”
পুরনো খবর:
