Published : 25 Aug 2026, 06:18 PM
কয়েকটি ব্যাংকে লেনদেনের মাধ্যমে ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা তুলে আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে আরও তিনটি মামলা অনুমোদন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
এসব মামলায় আসামি করা হচ্ছে তার স্ত্রী রুকমীলা জামানসহ আরও ২৮ জনকে।
মঙ্গলবার দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখা থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্টের নামে সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার জন্য অর্থ নেওয়া হয়েছিল। দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, কোনো প্রকৃত কেনাবেচা না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার ব্যবহার করে ব্যাংকের অর্থ তুলে নেওয়া হয়।”
দুদক বলছে, এ ধরনের লেনদেনে মোট ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৭টি লেনদেনের মাধ্যমে ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করে আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে, অভিযোগ দুদকের।
আকতারুল ইসলাম বলেন, “অনুসন্ধানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় কমিশন তিনটি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
তিনি বলেন, তিন মামলায় আলাদাভাবে ১৬ জন, ১৬ জন ও ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে কয়েকজন একাধিক মামলার আসামি হওয়ায় মোট আসামির সংখ্যা ২৯। সাইফুজ্জামানের স্ত্রী ও আরামিট সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমীলা জামানসহ কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এসব মামলার আসামি হচ্ছেন।
যেভাবে তিন মামলা
প্রথম মামলার অভিযোগ ২০১৮ সালের ২০ মার্চের একটি লেনদেন নিয়ে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের জুবিলি রোড শাখার গ্রাহক আরামিট সিমেন্টের আবেদনে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে একটি লেনদেন হয়েছে। এর মাধ্যমে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় মামলার অভিযোগ ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭টি লেনদেন নিয়। আরামিট সিমেন্টের আবেদনে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির কামালবাজার শাখার ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে এসব লেনদেন হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, এর মাধ্যমে ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই মামলাতেও ১৬ জনকে আসামি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় মামলার অভিযোগ ২০২০ সালের ৬ অগাস্ট থেকে ২০২১ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত নয়টি লেনদেন নিয়ে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সদরঘাট শাখার ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে এসব লেনদেন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছে দুদক। এই মামলায় ২০ জনকে আসামি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তিন মামলার অর্থের পরিমাণ যোগ করলে দাঁড়ায় ১৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
তবে দুদকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যে মোট অঙ্ক ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা বলা হয়েছে।
‘ভুয়া সরবরাহকারী’
তিনটি মামলাতেই সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী রুকমীলা জামান, আরামিট সিমেন্টের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ আলম, ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল আজীজ এবং আরামিট সিমেন্টের এজিএম এ কে এম মারুফের নাম রয়েছে।
মামলায় আরামিট এবং ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও আসামি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী হিসেবে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করে ব্যাংক ঋণ অনুমোদনে ভূমিকা রেখেছিলেন।
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক-ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য না হয়েও তিনি পর্ষদের সভায় অংশ নিতেন এবং সিদ্ধান্ত দিতেন। আরামিট গ্রুপের কর্মচারীকে ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী দেখিয়ে লেনদেন অনুমোদন করানোর অভিযোগও আনা হয়েছে।
দুদকের দাবি, আরামিট গ্রুপের এজিএম এবং সাইফুজ্জামানের ব্যক্তিগত সহকারী মো. আব্দুল আজীজকে ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তার প্রতিষ্ঠানকে সিমেন্টের কাঁচামালের সরবরাহকারী দেখিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলা এবং লেনদেন অনুমোদনের জন্য নথি তৈরি করা হয় বলে তাদের অভিযোগ।
দুদক বলছে, প্রকৃতপক্ষে মালামাল সরবরাহ হয়নি বলে তাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
‘অর্থ পাচারের’ অভিযোগ
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুদকের অভিযোগ, ব্যাংক থেকে তোলা অর্থ বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এর একটি অংশ নগদে তোলা হয় এবং কিছু অর্থ আগের দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হয়। একাংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করা হয়। এ অর্থ দিয়ে সেখানে সম্পদ কেনা হয়।
সেখান থেকে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করে সম্পদ কেনার অভিযোগও রয়েছে সাবেক এই ভূমিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে।
সাইফুজ্জামানকে এসব লেনদেনের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী ও হোতা হিসেবে তুলে ধরেছে দুদক।
রুকমীলা জামানের বিরুদ্ধেও ঋণ অনুমোদনে প্রভাব খাটানো এবং অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ এনেছে সংস্থাটি।
চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি দুদকের আবেদনে সাইফুজ্জামানের যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিপিন্স, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে থাকা ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেয় আদালত।
দুদকের হিসাবে, এসব সম্পদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুটি কোম্পানিতে তার বিনিয়োগের মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩২১ কোটি টাকা।
পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যে তার নামে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। দুদকের আবেদনে এসব সম্পদের মূল্য ২৭ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ পাউন্ড দেখানো হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে তার ৩৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং ২৩টি কোম্পানির শেয়ার জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। একই অনুসন্ধানের বিভিন্ন পর্যায়ে তার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও ব্যাংক হিসাব ও বিও হিসাবও অবরুদ্ধ করা হয়।
গেল ১৯ জুলাই ঢাকার গুলশানে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর দুটি ফ্ল্যাট ক্রোক করা হয়।
এদিকে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ২৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে করা এক মামলায় চলতি বছরের মার্চে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রীসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় চট্টগ্রামের একটি আদালত। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।
দুদকের বিভিন্ন আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সাইফুজ্জামান অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
সাইফুজ্জামান এর আগে বিদেশে তার সম্পদ নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, বৈধ ব্যবসার আয় দিয়েই তিনি সম্পদ কিনেছেন। তার দাবি, তার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’।
আগের খবর:
জাবেদের ফ্ল্যাটে শত শত কোট-টাই, রোলেক্সের চারটি বক্স
সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের যুক্তরাজ্যের ৫১৮ ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন