১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর: অনিশ্চিত প্রত্যাবাসন, মিয়ানমারের পুরনো বাহানা

মিয়ানমার প্রতিশ্রুতি দিয়েও নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি। বরং তারা নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে রোহিঙ্গা-বাঙালির সেই পুরনো বয়ান।

মাসুম বিল্লাহ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2026, 01:50 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, জন্মভূমি থেকে সমূলে উৎপাটনের ছক তৈরি করেছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, শুরু হয়েছিল জাতিগত নিধনযজ্ঞ। 

রাখাইনে প্রিয়জনের লাশ আর জ্বলতে থাকা ঘরবাড়ি পেছনে ফেলে সেইসব রোহিঙ্গার বাংলাদেশমুখী ঢলের নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে মঙ্গলবার। 

২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট মানবিক কারণে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারে পৌঁছায়। টেকনাফ-উখিয়ার পাহাড়ি ভূমিতে বাঁশ, দড়ি আর ত্রিপলে তৈরি ঘরে জায়গা হয় তাদের।

উখিয়া পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে। যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ৪৫ হাজার শরণার্থীর বসবাস।

রাখাইনে জাতিগত সংঘাতের পর ২০২৪ সাল থেকে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিবছর যুক্ত হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার নতুন জন্ম নেওয়া শিশু। নতুন-পুরনো মিলিয়ে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এখন জাতিসংঘের হিসাবে ১২ লাখের বেশি। 

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার প্রতিশ্রুতি দিয়েও নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি। বরং তারা নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে সেই পুরনো বয়ান। সংকটের নয় বছর পূর্তির আগে আগে তারা আবার বলেছে, রোহিঙ্গা বলে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই, তারা রাখাইনের ‘বাঙালি’ অধিবাসী!

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং বাংলাদেশের ডেটাবেইজে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার তথ্য থাকলেও মিয়ানমার বলছে, ২০১৭ সালের পর বাংলাদেশে এসেছে ৫ লাখ ৪০ হাজার ‘বাঙালি অধিবাসী’।

গত ১৫ অগাস্ট মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের কাছে ৩১ জুলাই, ২০২৬ পর্যন্ত আট লাখ ২৮ হাজার ৮২৪টি নাম জমা দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে তিন লাখ আট হাজার ৭৯৭ জনকে বাংলাদেশে থাকা রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা বলে নিশ্চিত হয়েছে তারা।

রাখাইনের ‘পরিস্থিতি অনুকূল’ হলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এই বাসিন্দাদের ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ওই বিবৃতিতে দিয়েছে মিয়ানমার। তবে, তাদের এই প্রতিশ্রুতিকে ‘নাটক’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা রিপ্রেজেন্টেটিভের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ।

ওই বিবৃতির পরদিন ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ থান সোয়ে মোয়েকে ডেকে কথা বলেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঢাকার বক্তব্য হল, নেপিদোর বক্তব্য ‘ভুল পরিসংখ্যান নির্ভর’। রোহিঙ্গাদের সঠিক সংখ্যার প্রতিফলন জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় তাদের নিবন্ধনের মধ্যেই রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলারও বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ। দ্বিপক্ষীয় মতৈক্যের ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা নবাগতদেরও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী জীবন যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তাদের জন্য দাতাদের সহায়তার পরিমাণও দিনে দিনে সংকুচিত হচ্ছে।

ঘিঞ্জি, মানবেতর পরিবেশে অনিশ্চিত জীবন কাটাতে বাধ্য হওয়া দেশহারা এই মানুষগুলোর একটি অংশ মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তাতে সরকারের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। 

দালালের খপ্পরে পড়ে অনেকে সাগরপথে বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়ছেন। ইউএনএইচসিআর বলছে, বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াগামী মানবপাচারের এই রুটটি সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী, যেখানে ২০২৫ সালে প্রতি সাত জনে একজন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকার যে শিগগিরই এ সংকট সমাধানের কোনো আশা দেখছে না, তা ফুটে উঠেছে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের একটি বক্তব্যে।

রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্তির আগে রোববার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের কাঁধে তুলে নিয়ে এখন নিজেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। রাখাইনে তৈরি হওয়া সমস্যার সমাধান রয়েছে তাদেরকে সেখানে প্রত্যাবাসনের মধ্যেই।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সেই লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, “একটি সাধারণ বার্তা আমি দিতে চাই। দশ বছরকে কোনোভাবে বিশ বছর হতে দেওয়া উচিত হবে না।”

দেশহারা রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত আগামী

ইউএনএইচসিআর এবং বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন, যাদের অর্ধেকের বেশি বয়সে শিশু।

৩১ জুলাই পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, আঠারোর বেশি বয়সি রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫৭ জন। নবজাতক থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুর সংখ্যা ৬ লাখ ২৬ হাজার ৪৭৭ জন। 

শিশুদের মধ্যে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৫১৮ জনের বয়সই ১১ বছরের নিচে, যা মোট শরণার্থী জনসংখ্যার সাড়ে ৩৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলছেন, এই শিশুদের একটি অংশ যদি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়, তাদের সঙ্গী হবে কেবল ক্যাম্প জীবনের কঠিন সময়ের স্মৃতি। তাদের অনেকেরই মিয়ানমারের কোনো স্মৃতি নেই। 

একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “রাখাইনে তাদের বাড়িঘর থিমে একটা চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা হয়েছিল। দেখা গেল, তারা মাত্র একটি দরজা দিয়ে ঘর এঁকেছে। তখন আমরা বয়স্কদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনাদের রাখাইনের ঘর কি কেবল এক দরজার হয়?’ 

“তারা বলল, ‘না, রাখাইনে আমাদের ঘরে একাধিক দরজা থাকত’। কিন্তু এখানে শিশুরা মাত্র একটি দরজার ১৫ বর্গফুটের ঘরে বেড়ে উঠছে। এটা আরেক ধরনের সমস্যা।”

এ কারণে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মকে ইতিহাস ও সংস্কৃতি শেখানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন প্রত্যাবাসন কমিশনার।

ক্যাম্পে শিশুদেরকে মিয়ানমারের কারিকুলামে পড়ানোর ব্যবস্থা থাকলেও সেটা পর্যাপ্ত নয়। এর মধ্যে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। সেসব নিয়ে রোহিঙ্গা অভিভাবকরাও শঙ্কিত। 

উখিয়ার ১৯ নম্বর ক্যাম্পে স্বামী ও ছয় সন্তান নিয়ে থাকেন ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা মল্লিকা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে আমার কোনো আয় নেই। আমার স্বামীরও কোনো আয় নেই। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে আমাকে অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়।

“আবার অপহরণের ঝুঁকি থাকায় আমার স্বামীকে ব্লকের বাইরে যেতে দিতে ভয় লাগে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আমাদের পরিবার চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। রেশন সহায়তাও কমে এসেছে। এখন আমরা মাত্র ১০ ডলার পাই।”

চাল, তেল, সামান্য কিছু ডাল এবং পেঁয়াজ-রসুন কিনতে এই টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে এই শরণার্থী নারী বলেন, “কোনো কোনো সময় আমরা ডিম পাই, কিন্তু সেটা পুষ্টির জন্য যথেষ্ট নয়। যখন ১২ ডলার পেতাম তখন বাচ্চাদের জন্য ভালো জিনিস কিনতে পারতাম। মাছ, মাংস কেনা যেত।” 

বাচ্চাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা তুলে ধরে এই রোহিঙ্গা নারী বলেন, “আমার ছয়টা বাচ্চা আছে। আমাদের পর্যাপ্ত টাকা না থাকার কারণে সবাইকে পড়াইতে পারি না। কোনোমতে দুইজনকে স্কুলে পাঠাতে পারি। বাকিদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।”

ক্যাম্পের এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর চাপ যে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ছে, সে কথাও তুলে ধরলেন প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা এখন সংখ্যায় স্থানীয়দের দ্বিগুণ। এর ফলে দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা থাকে। ক্যাম্পের মানুষ কাজের সন্ধানে বাইরে আসতে চায়।

“এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ক্যাম্পের ভেতরে অলস বসিয়ে রাখায় আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। কোথাও কোথাও তারা অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে।”

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনিশ্চিত জীবনের কথা তুলে ধরে রোববার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, “দশ বছর অনেক লম্বা সময়। সরকারের জন্য এটা একটা নীতিগত চক্র। প্রতিষ্ঠানের জন্য এই পরিকল্পনার দিগন্তরেখা। কিন্তু ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্য দশ বছর হচ্ছে তার শৈশব। 

“একজন যুবকের জন্য এটা পড়াশোনাহীন থাকা। একটি পরিবারের জন্য এটা ঘরবাড়িহীন একটি দশক। আর একটি সম্প্রদায়ের জন্য এটি অনিশ্চয়তায় জন্ম নেওয়া প্রজন্ম। আমরা দশ বছরকে বিশ বছর হতে দিতে পারি না।”

প্রত্যাবাসন কতদূর?

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৭ সালের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয় মিয়ানমারের অং সান সু চি সরকার। ওই বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতেও সই করে।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলার এক পর্যায়ে ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের প্রতিশ্রুতিতে রোহিঙ্গারা আস্থা রাখতে না পারায় সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়।

এরপর আসে করোনাভাইরাস মহামারী, রোহিঙ্গাদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগে ঢিল পড়ে। বিশ্বজুড়ে সেই সংকটের মধ্যেই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সু চির দ্বিতীয় দফার সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন সামরিক জান্তা জেনারেল মিন অং হ্লাইং।

এখন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আর সেভাবে আলোচনায় নেই।

সামরিক জান্তা মিয়ানমারের ক্ষমতা দখলের কয়েক দিন আগে চীনের নেতৃত্বে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছিল। তার চূড়ান্ত ফল আর পাওয়া যায়নি।

ওই সময় বাংলাদেশ আশা করেছিল, ২০২১ সালের দ্বিতীয়ার্ধে হয়ত প্রত্যাবাসন শুরু করা যাবে। সেই পরিকল্পনা আর আলোর মুখ দেখেনি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকারে রাখা বাংলাদেশ সরকার বারবার অভিযোগ করে আসছে, আন্তর্জাতিক মহল প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করতে ‘ব্যর্থ’ হয়েছে।

এখন মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের কারণে প্রত্যাবাসনের আলোচনা আপাতত বন্ধ, উল্টো রাখাইনে যুদ্ধের কারণে ২০২৪ সালের পর নতুন করে অনুপ্রবেশ করেছে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা জেনারেল মিন অং হ্লাইং নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন দিয়ে এখন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন; চেষ্টায় আছেন আসিয়ানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর স্বীকৃতি আদায়ের।

এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে চীন। অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাবও দিয়েছে চীন।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর মিয়ানমার সরকারের আচরণে অনেকগুলো পরিবর্তন দেখার কথা বলছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান। 

এখনকার গতিতে এগোলে বছর দুয়েকের মধ্যে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে বলেও ধারণা করছেন এই বিশ্লেষক।

তিনি বলেন, “সবকিছু মিলিয়ে আসলে হতাশ হওয়ার কোনো জায়গাই আমি এখন দেখছি না। তবে দুটা জিনিস আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, পলিসি বা ডিপ্লোম্যাটিক ইনিশিয়েটিভ যথেষ্ট নয়। 

“সেই সাথে আমাদেরকে আরও অনেকগুলো কাজ করতে হবে। অর্থাৎ তাদেরকে ফেরত পাঠানোর জন্য যে ধরনের সহায়ক পরিবেশ দরকার, যে ধরনের রাজনৈতিক যোগাযোগ দরকার এবং অবকাঠামো বা বাণিজ্য বিষয়ক যে জায়গাগুলো আছে, সেগুলোকে উন্নত করলে আমার মনে হয় না যে, এই প্রত্যাবাসন খুব বেশি কঠিন হবে।”

সাহাব এনাম খান বলেন, “শতভাগ প্রত্যাবাসন এই মুহূর্তে হয়ে যাবে ভাবলে সেটা অতিচিন্তা হয়ে যাবে। তবে ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়াটা, আমার ধারণা যে, বছর খানেক, বছর দুয়েকের মধ্যেই শুরু করা সম্ভব।”

মিয়ানমার ও রাখাইন রাজ্যে অনেকগুলো পরিবর্তন, দেশটির প্রতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও মানবিক সহায়তায় ধস নামার মত বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে প্রত্যাবাসন আটকে থাকার কথা বলেন তিনি।

“সবকিছু মিলিয়ে দেখলে, আমাদের অতীতে সরকারগুলোর যতটুকু ব্যর্থতা, তার চেয়ে বেশি হল ভূরাজনৈতিক এবং ভূ-কৌশলগত পরিবর্তনগুলো বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না।” 

বর্তমান সরকারের উপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন থাকার কথা তুলে ধরে সাহাব এনাম খান বলেন, “এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আন্তরিক হচ্ছে এবং এই আন্তরিকতাটাকে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটা বাংলাদেশ সরকারের প্রধান কর্তব্য।”

কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “শুধুমাত্র কনভেনশনাল ডিপ্লোমেটিক বা পলিটিক্যাল চ্যানেল মনে করলে হবে না। সেখানে ট্রেড, ইনভেস্টমেন্ট এবং হোল অব দ্য গভর্মেন্ট এবং হোল অফ সোসাইটি অ্যাপ্রোচ নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সংযোগ ঘটানো দরকার।

“তবে আমি মনে করি, শুধুমাত্র রাখাইনের স্থিতিশীলতা আমাদের মূল ইন্টারেস্ট হওয়া উচিত না। ওভারঅল মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা দরকার, যাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে মিয়ানমার একটা ভূমিকা রাখতে পারে এবং সেই সাথে যাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন টেকসই হয়।”