Published : 07 Sep 2026, 09:20 PM
গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ব্যবস্থাপনার জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সঙ্গে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের করা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাই কোর্ট।
সোমবার বিচারপতি ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করে।
আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, রাজউক চেয়ারম্যান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ডিএমপি কমিশনার ও গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সভাপতিসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
ওই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে পার্ক ও খেলার মাঠ ব্যবহারের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং সেখানে বেআইনি স্থাপনা নির্মাণের কার্যক্রম কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।
একইসঙ্গে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ও মাস্টার প্ল্যানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পার্ক পরিকল্পনা-বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কমিটি গঠনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সেটিও জানতে চেয়েছে উচ্চ আদালত।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি আদিল মোহাম্মদ খান, সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ, পরিবেশকর্মী আমিরুল রাজীব এবং পরিবেশ ও নাগরিক অধিকারকর্মী সৈয়দা শাহীন মাহবুব ৬ সেপ্টেম্বর এ রিট আবেদন করেন।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম, নিশাত মাহমুদ ও মুহাম্মদ আওলাদ হোসেন।
আইনজীবী নিশাত মাহমুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সমঝোতা স্মারকের বৈধতা নিয়ে রুল জারির পাশাপাশি আদালত ওই স্মারক অনুযায়ী পার্কের মাঠ ব্যবহারের জন্য অর্থ আদায় এবং সেখানে বেআইনি স্থাপনা নির্মাণের কার্যক্রম কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা-ও জানতে চেয়েছেন।”
গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের (শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক) ভেতরে অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগে সেখানে থাকা গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের কার্যালয় সিলগালা করেছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। পাঁচ মাসের মাথায় সেই একই ক্লাবের কাছে পার্ক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তুলে দেয় সংস্থাটি।
৮ দশমিক ৮৭ একর জায়গাজুড়ে থাকা গুলশানের ১৩০এ নম্বর প্লটটি মূলত পার্ক হিসেবে নির্ধারিত। পার্কটি ঘিরে বছরের পর বছর গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের দখল, স্থাপনা নির্মাণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
পার্কটিতে কোনো ধরনের স্থাপনা না রাখতে রায় দিয়েছিল হাই কোর্ট। এরপর ডিএনসিসি ও সংশ্লিষ্টদের আদালত অবমাননা সংক্রান্ত আইনি নোটিশও দেওয়া হয়েছিল।
এরপরও রাজউক চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতেই গত ২৫ এপ্রিল সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মাধ্যমে পার্ক পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ইয়ুথ ক্লাবকে। ফলে আদালতের নির্দেশ অমান্য পার্কের নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবাদীরা।
তাদের সবশেষ রিট আবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন জায়গাটি তিন বছরের জন্য ইজারা দিলে সেখানে ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক’ চালু হয়। ওই ইজারা নিয়ে করা মামলায় ২০০৭ সালের ২৪ মে হাই কোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করেন। পরে ২০০৯ সালের ৯ মার্চ আপিল বিভাগ ওই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। আপিল বিভাগ রাজউকের অনুমোদন ছাড়া দেওয়া ইজারা আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং পার্কটিকে বিনোদন কেন্দ্রে রূপান্তরের সুযোগ নেই বলে সিদ্ধান্ত দেয়।
২০১৩ সালে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব পার্কটির ওপর তাদের অধিকার দাবি করে হাই কোর্টে রিট করে। ২০২২ সালের ৩১ আগস্টের রায়ে হাই কোর্ট ক্লাবটির পার্কটির ওপর কোনো বৈধ অধিকার, স্বত্ব বা স্বার্থ নেই বলে তুলে ধরে এবং অবৈধ ও অনুমোদনহীন স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বর্তমানে আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
রিটে আবেদনে অভিযোগ করা হয়, রাজউক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ইয়ুথ ক্লাবের অবৈধ স্থাপনা সিলগালা করলেও পরে পার্ক পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। এমওইউর ২০ থেকে ২৪ নম্বর ধারায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পার্ক ও খেলার মাঠ ব্যবহারের জন্য ফি আদায়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। ক্লাবটি পার্কের বিভিন্ন অংশ ভাড়া দিয়ে আসছে এবং আদালতের আগের রায়, আদেশ ও মাস্টার প্ল্যানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছে বলেও রিটে অভিযোগ করা হয়েছে।
রিটে ২০০০ সালের মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সকল পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন- এর ৫ ধারার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
রিটকারীদের বক্তব্য, ওই আইনে পার্ক ও খেলার মাঠের শ্রেণি পরিবর্তন, অন্য কাজে ব্যবহার, ভাড়া বা ইজারা দেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে ১৩০/এ নম্বর প্লটের পার্কটির বাণিজ্যিক ব্যবহার, ফি আদায় এবং অননুমোদিত স্থাপনা নির্মাণ আইনটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
“কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, জনপরামর্শ বা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন ছাড়াই পার্কটির ব্যবস্থাপনা গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের পার্ক ব্যবহারের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
ইয়ুথ ক্লাবের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা, পার্কের অননুমোদিত স্থাপনা অপসারণ এবং মাস্টার প্ল্যানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক স্থাপনা চিহ্নিত করতে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিট আবেদনে। পাশাপাশি রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এমওইউর কার্যক্রম স্থগিত ও পার্ক ব্যবহারের জন্য ফি আদায় বন্ধের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন-