১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

সিলগালার পরও কেন ইয়ুথ ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে গুলশান পার্ক?

২০২২ সালে সব অবৈধ স্থাপনা ভেঙে পার্কের মূল চরিত্র ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।

বিডিনিউজ২৪

সাখাওয়াত সুপন কৌশিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Aug 2026, 12:07 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

রাজধানীর গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের (শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক) ভেতরে অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগে সেখানে থাকা গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের কার্যালয় সিলগালা করেছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। পাঁচ মাসের মাথায় সেই একই ক্লাবের কাছে পার্ক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তুলে দিয়েছে সংস্থাটি।

পার্কটিতে কোনো ধরনের স্থাপনা না রাখতে রায় দিয়েছিল হাই কোর্ট। এরপর ডিএনসিসি ও সংশ্লিষ্টদের আদালত অবমাননা সংক্রান্ত আইনি নোটিশও দেওয়া হয়েছিল।

এরপরও রাজউক চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতেই গত ২৫ এপ্রিল সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মাধ্যমে পার্ক পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ইয়ুথ ক্লাবকে। ফলে আদালতের নির্দেশ অমান্য পার্কের নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবাদীরা।

৮ দশমিক ৮৭ একর জায়গাজুড়ে থাকা গুলশানের ১৩০এ নম্বর প্লটটি মূলত পার্ক হিসেবে নির্ধারিত। পার্কটি ঘিরে বছরের পর বছর গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের দখল, স্থাপনা নির্মাণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

কী বলেছিল উচ্চ আদালত

গুলশানের এ পার্কটির পরিচালনা নিয়ে তিন দশক ধরে আইনি লড়াই চলেছে।

১৯৯০ সালে তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন পার্কের একটি অংশ ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কের জন্য ইজারা দিয়েছিল। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালে হাই কোর্ট সেই ইজারা বেআইনি ঘোষণা করে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০১২ সালে রাজউক ওয়ান্ডারল্যান্ড উচ্ছেদ করে।

পার্কের আরেক অংশে থাকা গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে উচ্ছেদে ২০১৩ সালের ৫ মার্চ পুলিশ চেয়ে চিঠি দেয় রাজউক। এর বিপরীতে ক্লাব কর্তৃপক্ষ রিট আবেদন করে। নয় বছর পর ২০২২ সালের ৩১ অগাস্ট হাই কোর্ট সেই রিট খারিজ করে দেয়।

তখন উচ্চ আদালতের রায়ে বলা হয়, জায়গাটি সেন্ট্রাল পার্ক বা শিশুপার্ক হিসেবে নির্ধারিত। এটি কোনো অবস্থাতেই পার্ক ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না। সাধারণ মানুষের বিনা বাধায় ও বিনা খরচে এটি ব্যবহারের অধিকার রয়েছে।

সব অবৈধ স্থাপনা ভেঙে পার্কের মূল চরিত্র ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।

নির্দেশ অমান্য করে চুক্তির মাধ্যমে পার্ক পরিচালনার দায়িত্ব ইয়ুথ ক্লাবকে হস্তান্তর করায় ডিএনসিসি ও সংশ্লিষ্টদের আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছিল গত বছরের ১ অক্টোবর। পরিবেশবাদীদের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ ওই নোটিশ পাঠান।

নোটিসে বলা হয়, পার্কটি অবৈধভাবে হস্তান্তরের মাধ্যমে ডিএনসিসি ও গুলশান ইয়ুথ ক্লাব আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে। এই চুক্তি মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন এবং রাজউকের সঙ্গে ঢাকা সিটি করপোরেশনের চুক্তির শর্তের পরিপন্থি।

গত বছরের ১৬ নভেম্বর রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লিটন সরকারের নেতৃত্বে একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পার্কের ভেতরে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের কার্যালয় সিলগালা করে। রাজউকের ভাষ্য ছিল, পার্কের লাইব্রেরির জায়গা খাবারের দোকান হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি অনুমোদন ছাড়াই ক্লাবের কার্যালয় ও অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল।

কিন্তু পাঁচ মাসের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যায়। গত ২৫ এপ্রিল রাজউক ও গুলশান ইয়ুথ ক্লাব লিমিটেডের মধ্যে পার্ক পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি এমওইউ সই হয়। 

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন ও ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের উপস্থিতিতে চুক্তির নথিপত্র ক্লাবের সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামানের (তমাল) হাতে তুলে দেন রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, অনুমোদন ছাড়াই ক্লাবের কার্যালয় ও অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে যে ক্লাবের বিরুদ্ধে রাজউক আইনি ব্যবস্থা নিয়েছিল, পাঁচ মাসের মধ্যেই সেই ক্লাব কীভাবে গুলশান পার্ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পেল।

সবুজ পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার

২০২২ সালের ডিসেম্বরে ডিএনসিসি প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্কটি শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। সেখানে দৃষ্টিনন্দন হাঁটাচলার পথ, শিশু-কিশোর ও প্রতিবন্ধীদের জন্য প্লেয়িং জোন এবং দেশিয় ফলদ, বনজ ও ওষুধি গাছ লাগানো হয়।

পার্কটির নকশা প্রণয়নকারী দলের প্রধান, বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক জাকিউল ইসলাম বলেন, “পার্কটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যাতে দুটি অংশ এক হয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকে। কিন্তু এখন পার্কটিকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়েছে, যা মূল নকশার পরিপন্থি।”

গুলশান পার্কে ঢুকতেই খোলা সবুজ জায়গা চোখে পড়লেও কিছুদূর এগোতেই চিত্র বদলে যায়। খোলা জায়গার মাঝেই লোহার গ্রিল, নেট বা স্থায়ী কাঠামো দিয়ে একাধিক ঘেরাটোপ তৈরি করা হয়েছে।

টেনিস, ব্যাডমিন্টন, বাস্কেটবল কোর্ট থেকে শুরু করে সুইমিং পুল- প্রতিটি ঘেরাটোপের প্রবেশপথে রয়েছে আলাদা নিয়ন্ত্রণ। সাধারণ দর্শনার্থীরা বাইরে দিয়ে হাঁটলেও ভেতরে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট ফি বা সদস্যপদ বাধ্যতামূলক। পার্কের উন্মুক্ত অংশে গড়ে তোলা হয়েছে একটি খাবারের দোকান, যেটি ইয়ুথ ক্লাব পরিচালনা করে।

পার্কের একটি বড় অংশে এখন ক্লাবের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে। ইয়ুথ ক্লাবের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, সপ্তাহের প্রতিদিনই নির্দিষ্ট ফি দিয়ে বিভিন্ন স্লটে খেলাধুলার সুবিধা রয়েছে।

আর্টিফিশিয়াল ফুটবল টার্ফ ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা, সুইমিং পুল ৬০০ থেকে ৬ হাজার টাকা, বাস্কেটবল ২ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা এবং জিমনেসিয়াম ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় ব্যবহার করা যাচ্ছে। টেনিস ও ব্যাডমিন্টন কোর্টের ভাড়া ৮০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকার মধ্যে।

মূল ক্রিকেট মাঠে এক ম্যাচ খেলতে গুনতে হয় ২৫ হাজার টাকা এবং কোচিং ফি মাসিক দেড় হাজার টাকা। আর ক্লাবের সদস্য হতে ফি লাগে ৩০ হাজার টাকা। শিগগিরই বিলিয়ার্ড বা পুল খেলার স্লট বুকিংও চালু হতে যাচ্ছে।

সবুজ পার্কের ভেতরে এই বিভাজনে ক্ষুব্ধ দর্শনার্থীরা। দুই সন্তান নিয়ে পার্কে আসা এক মা বলেন, “বাচ্চাদের নিয়ে পার্কে আসি। কিন্তু কোনটা পাবলিক স্পেস আর কোনটা ক্লাবের অংশ, সেটা সবসময় ঝামেলা তৈরি করে। বাচ্চারা নেটের ভেতরে যেতে চাইলেও সুযোগ নেই। রিকুয়েস্ট করলেও ঢুকতে দেয় না।”

আরেক দর্শনার্থী বলেন, “বাচ্চাদেরও যদি তারা সব জায়গায় প্রবেশের সুযোগ না দেয়, তাহলে দেয়াল তুলে দিলেই হয়। বাচ্চারা দেখবেও না, কাঁদবেও না।”

গুলশানের এ পার্ক নিয়ে ইয়ুথ ক্লাবের সঙ্গে এমওইউ এর পর ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) এক বিবৃতিতে বলেছে, এমন সিদ্ধান্তের ফলে জনসাধারণের অবাধ প্রবেশাধিকার সংকুচিত হচ্ছে এবং নগর ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা বাড়ছে।

‘পার্ক নিয়ে ঝামেলা করে কোনো লাভ হবে না’

আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন ইয়ুথ ক্লাবকে উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না, এমন প্রশ্নে ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই সংগঠনের পেছনে কারা আছে, সেটা দেখলেই উত্তর পাওয়া যাবে।”

নাম প্রকাশ না করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এ পার্ক নিয়ে ঝামেলা করে কোনো লাভ হবে না। অতীতে আমরা বহু চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল থেকে চাপ আসে। কেউ কথা বলতে গেলে উল্টো রোষানলে পড়তে হয়।”

গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সদস্য তালিকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে মেয়র, সাবেক বিচারপতি, আমলা, সামরিক কর্মকর্তা ও ক্রিকেটারদের নাম রয়েছে। 

ক্লাবটির প্রয়াত সদস্যদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং ডিএনসিসির সাবেক মেয়র আনিসুল হক। সম্প্রতি ক্লাবের ‘অনারারি সদস্যদের’ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম, সাবেক বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার, ভারতে বাংলাদেশের সাবেক হাই কমিশনার সি এম শফি সামি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদ, সাবেক ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুল এবং বিসিবির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। তালিকায় বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের নামও রয়েছে। 

ডোনার সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।

রাজউকের যে কর্মকর্তাদের অবৈধ স্থাপনা তদারকি ও উচ্ছেদের দায়িত্ব, তাদের অনেকেই ইয়ুথ ক্লাবের সদস্য। স্থায়ী সদস্যদের তালিকায় রয়েছেন রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) রাহত মুসলেমিন, প্রধান নগর স্থপতি (চলতি দায়িত্ব) মোস্তাক আহমেদসহ বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা।

ইয়ুথ ক্লাব সদস্যদের তালিকায় রয়েছেন রাজউকের অথরাইজড অফিসার মো. হাসানুর রেজা, যিনি গুলশান (রাজউক অঞ্চল ৪/২) এলাকার দায়িত্বে রয়েছেন।

কী বলছে ডিএনসিসি ও ইয়ুথ ক্লাব

ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগ বলছে, পার্কটি ২০১৭ সালে তিন বছরের জন্য রাজউকের তরফ থেকে ডিএনসিসিকে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সময় না বাড়ানোয় পার্কটি বর্তমানে রাজউকের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।

ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০২০ সালের পরে রাজউকের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় এটি স্বাভাবিকভাবে রাজউকের কাছে চলে যায়। তবে আমরা চুক্তি নবায়ন করতে চেয়েছিলাম এবং এ বিষয়ে রাজউককে চিঠিও দিয়েছিলাম। কিন্তু রাজউক আমাদের সঙ্গে চুক্তি করেনি।”

তিনি বলেন, “চিঠি চালাচালি চলছিল এবং আমাদের উন্নয়নমূলক কাজও চলছিল।”

২০২২ সালে পার্কটির উন্নয়নে ডিএনসিসির প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়ে শওকত ওসমান বলেন, জনস্বার্থে এবং নাগরিক সেবার জন্য একটি আধুনিক পার্ক করার উদ্দেশ্যেই উন্নয়নকাজ চালানো হয়েছে।

গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান তমাল বলেন, “আমরা ১৯৮১ সালের আগে থেকেই এখানে ফুটবল-ক্রিকেট খেলতাম। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমেই আমরা এখানে আছি। তবে কখনো কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক চুক্তি হয়নি।”

বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, “এখানে ওয়াকওয়ে, লাইটিং, মাঠের রক্ষণাবেক্ষণ সব আমরাই করি। মাসে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার মত খরচ হয়। কিছু চার্জ না করলে তো রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে না। এটা ‘অলাভজনক’ হিসেবে হয় এবং আমাদের অডিট হয়।”

তবে ক্লাবের কর্মচারীদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করে বলেন, পার্কে উন্মুক্ত যেসব স্থাপনা রয়েছে, তার সবই ডিএনসিসির করা। গুলশান ইয়ুথ ক্লাব কেবল রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

গত বছরের ১৬ নভেম্বর ইয়ুথ ক্লাব কার্যালয়ে রাজউকের সিলগালার বিষয়ে তমাল বলেন, “রাজউক তালা দেওয়ার পর দেখল, ঠিকভাবে মেইনটেইন না করলে তারা টিকতে পারবে না। নতুন সরকার গঠনের পর রাজউক আমাদের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি করেছে।”

‘এমওইউতে সই করা প্রত্যেকেই অপরাধী’

পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ ও এমওইউ নিয়ে ইয়ুথ ক্লাবের দাবির সমালোচনা করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান।

তিনি বলেন, “সাড়ে ৮ কোটি টাকা দিয়ে জনগণের যে মাঠটি সংস্কার করা হল, সেটি তুলে দেওয়ার এমওইউতে যারা অংশ নিয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই অপরাধী। রাষ্ট্রের সম্পত্তি জনগণ যেন বিনা বাধায় ব্যবহার করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করাই তাদের দায়িত্ব।”

পার্কে খেলাধুলার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “পাবলিক প্রপার্টিতে অ্যাক্সেস বৈষম্যহীন হওয়ার কথা। যে শহরে খেলার মাঠ প্রয়োজনের তুলনায় ১০ ভাগের এক ভাগও নাই, সেখানে খেলতে গেলে টাকা দিতে হবে—এই বৈষম্য তৈরি করার অধিকার রাষ্ট্রকে কেউ দেয় নাই।”

রক্ষণাবেক্ষণের যুক্তিকে ‘বানোয়াট’ আখ্যা দিয়ে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “রমনা পার্ক তো করের টাকা দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। আমরা যে হোল্ডিং ট্যাক্স বা ইনকাম ট্যাক্স দিই, সেখানেই তো রক্ষণাবেক্ষণের টাকা আছে।”

‘বাণিজ্য নয়, উঠছে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ’, বলছে রাজউক

রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পার্ক ও মাঠগুলো রাজউক মূলত জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য তৈরি করে। এগুলো তৈরির পর সাধারণত সিটি করপোরেশনকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে চুক্তির অন্যতম শর্ত থাকে, এসব জায়গা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না বা লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করা যাবে না।

“আমরা প্রথমে সিটি করপোরেশনকে দিয়েছিলাম। কিন্তু দেখা গেল, তারা আমাদের শর্তের অনেক ধরনের ব্যত্যয় করেছে। পরবর্তীতে আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পরে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আমাদের এমওইউ বাতিল করে একটি ম্যানেজমেন্ট কমিটি তৈরি করি। ওই কমিটিতে রাজউকের সদস্য (এস্টেট), অথরাইজড অফিসার, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, ক্রীড়া সংগঠক বা ক্রীড়াবিদ, গুলশান সোসাইটি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি রাখা হয়েছিল। 

তবে ওই ব্যবস্থাপনাও সফল হয়নি জানিয়ে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “এখানে ম্যানেজমেন্ট করাটা একটা অভিজ্ঞতারও বিষয়, আবার সার্বক্ষণিক সময়ও লাগে। আমরা যাদের দিয়ে কমিটি করেছি, তাদের আসলে সেই সময় নেই। কাজেই দেখা গেল আমরা এটা সফল হতে পারি নাই।

“সফল না হওয়ার পরে আমরা তখন ইয়ুথ ক্লাবের সঙ্গে একটা একই রকমের চুক্তি করি, যেটা আমাদের সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ছিল। আমরা যে পলিসিটা তৈরি করেছি, এরাও এখানে কোনো লাভজনক ব্যবসা করতে পারবে না। তবে এটার যে পরিচালনা খরচ, সেইটুকু তারা আয় করতে পারবে।”

ইয়ুথ ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমের পক্ষে যুক্তি দিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, “ক্লাবটি খেলাধুলার প্রশিক্ষণ দেয় এবং সেখান থেকে খেলোয়াড় তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় হকার ও রিকশাচালকদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও ওয়াশরুম ব্যবহারের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে।

“এখানে প্রচুর বিদ্যুৎ বিল আসে, সিকিউরিটি আছে। সিকিউরিটির খরচটা দেয়, বিদ্যুৎ বিলটা দেয়। এই খরচটাই তাদের নেওয়ার কথা। খেলার কিছু অংশ তারা ‘ফ্রি অফ কস্ট’ দেয়, কিছু অংশ ‘অন পেমেন্ট’ দেয়।”

তিনি বলেন, “আমি কিন্তু দেখছি যে কন্ডিশন একটাই, তারা সেই জায়গায়ই পেমেন্ট নিবে যেখানে কোচিংয়ের প্রশ্ন আছে বা কোনো টার্ফ বানিয়েছে, এস্টাবলিশমেন্টের প্রশ্ন আছে। সেসব জায়গায় তারা শুধু ‘নো লস, নো প্রফিট’ বেসিসে একটা কস্টিং নেবে। এই হল তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি।”

তবে নতুন কোনো স্থাপনা বা কার্যক্রম রাজউকের অনুমোদন ছাড়া করা যাবে না জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, “তারা কোনো কিছুই আমাদের অনুমোদন ছাড়া করতে পারবে না। করতে গেলেই এই চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। আমরা এই বেসিসে আছি।”

টার্ফ ব্যবহারের ফি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “পুরো মাঠের একটি অংশে বিনামূল্যে খেলার সুযোগ রয়েছে। তবে টার্ফের ক্ষেত্রে খরচ বেশি হওয়ায় ফি নেওয়া হচ্ছে। টার্ফটা ফ্রি নেই। কিন্তু ওপেন স্পেস তো খেলার জন্য আছে।”

টার্ফের ফি স্থানীয়দের জন্য বেশি হলে তা পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, “যারা স্থানীয়, তাদের জন্য একটা ডিসকাউন্ট রেট রাখার কথা আমরা তাদেরকে বলব। তাদেরকে অন্তত তাদের খরচটা তো তুলতে হবে। কিন্তু তারা যেন ব্যবসা করতে না পারে, এ বিষয়টা আমরা দেখব।”

ইয়ুথ ক্লাবের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাইরের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে অডিট করানোর কথাও বলেন রাজউক চেয়ারম্যান।

“আমরা অলরেডি অডিট টিম করে দিয়েছি। একদম বাইরের সিএ ফার্ম থেকে অডিট করে রিপোর্ট দিবে। ইন্টারনাল তো ওরা দেয় আমাদেরকে। আমি বলেছি ‘নো’, এটা দিয়ে হবে না।”

রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা অবশ্যই এটাকে জাস্ট অলাভজনক বলতে চাচ্ছি। এখানে কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য হবে না।”

মাঠে নতুন নির্মাণকাজের বিষয়ে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, তিনি সরেজমিনে কিছু অংশ দেখেছেন এবং অভিযোগগুলো যাচাই করছেন।

তার ভাষ্য, “এটা ছাড়া নতুন কোনো নির্মাণ নেই। মাস্টারপ্ল্যানে ফুডকোর্ট এবং ক্যাফেটেরিয়া অনুমোদিত আছে।”

ইয়ুথ ক্লাবের ‘অনারারি মেম্বারশিপ’ রিয়াজুল ইসলাম বলেন, গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সদস্যপদ তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি।

“কে এটার মেম্বার, কে মেম্বার না—দিস ইজ নট ইম্পরট্যান্ট। এনিবডি মেম্বার হতেও পারে, নাও হতে পারে, সেটা ইয়ুথ ক্লাবের ব্যাপার। কিন্তু আমার কথা হল, আপনারা একটু এমওইউটা দেখেন। যদি বলেন যে এই চুক্তিটা সঠিক না, বা এই চুক্তির ব্যত্যয় হচ্ছে, আপনারা বলবেন, আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নিব।”

ইয়ুথ ক্লাবকে দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপ নেই দাবি করে তিনি বলেন, “না না, কোনো প্রভাবশালী শক্তি নেই।”

আদালতের রায় অনুযায়ী বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি বলেন, “যেহেতু খরচটা তোলার জন্য এবং যেখানে একটা ক্রীড়াবিদ তৈরি হচ্ছে...তার জন্য খরচটা তুলতে হবে।”

রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, “এটার মালিক হলো সর্বসাধারণ। এটার মালিক হল জনগণ।”