Published : 26 Apr 2026, 05:51 PM
সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল করে জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়েছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান রোববার জাতীয় সংসদে ‘দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বিলটির ওপর কোনো সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না। কোনো আলোচনা ছাড়াই বিলটি পাস হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ আইনের খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সংসদ সদস্যদের জন্য বিদ্যমান শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিল পাসের ফলে ‘দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস অর্ডার, ১৯৭৩’ এর আর্টিকেল থ্রি সি বিলুপ্ত হল।
এই ধারায় বলা ছিল, একজন সংসদ সদস্য তার পুরো মেয়াদকালে শুল্কমুক্তভাবে মূল্য সংযোজন কর, উন্নয়ন সারচার্জ এবং আমদানি পারমিট ফি ব্যতীত সরকার নির্ধারিত বিবরণ ও শর্ত অনুযায়ী একটি গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানি করার অধিকারী হবেন।
আরও বলা ছিল, সর্বশেষ আমদানির তারিখ থেকে পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর আরেকটি নতুন গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানির অধিকারী হবেন তিনি।
রোববার পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, আইনটি দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬ নামে অভিহিত হবে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, “জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদ-সদস্যদের নিজের নামে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি একদিকে যেমন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, অন্যদিকে এ ধরনের শুল্কমুক্ত সুবিধা কর প্রদানের ক্ষেত্রে দেশের মালিক জনগণের সাথে দৃশ্যমান বৈষম্য তৈরি করে।”
সেখানে বলা হয়, “এই প্রেক্ষিতে মাননীয় সংসদ নেতার দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের জন্য বিদ্যমান শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।”
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সঙ্গে সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে’ ওই সুবিধা বাতিলের জন্য আর্টিকেল থ্রিসি বিলুপ্তির উদ্দেশ্যে বিলটি আনা হয়েছে।
বিলের কপিতে বলা হয়েছে, এটি একটি অর্থ বিল। সংবিধানের ৮২ অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতীয় সংসদে উত্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপতির সুপারিশ পাওয়া গেছে।
সরকারি দল ও বিরোধী দল আগেই জানিয়েছিল, তারা কেউ শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবে না।
ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন।
সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা স্বাধীনতার পর থেকেই ছিল না। ১৯৮৮ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের পর এ সুবিধা যুক্ত হয়।
২০২৪ সালের বাজেটেও এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব এসেছিল। ওই সময় সংসদে কয়েকজন সদস্য আগের মতই বিনা শুল্কে গাড়ি আমদানির সুবিধা রাখার দাবি তুলেছিলেন।
জ্বালানি পরিস্থিতিতে বিশেষ কমিটি
জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে সুপারিশ দিতে এদিন জাতীয় সংসদে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৬ বিধি অনুযায়ী চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম সংসদে কমিটি গঠনের প্রস্তাব তোলেন; পরে তা পাস হয়।
প্রস্তাবে বলা হয়, “মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল নিয়ে বৈশ্বিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, যার আঁচ বাংলাদেশে এসে লেগেছে।”
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে সংসদে ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিরোধী দলের নেতার প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠনে ‘একমত’ হন।
প্রস্তাবে বলা হয়, সংসদে ওই কমিটির জন্য সংসদ নেতা সরকারি দলের পাঁচজন সদস্যের নাম প্রস্তাব করেন। সংসদ নেতার অনুরোধে বিরোধী দলের নেতাও বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্যের নাম প্রস্তাব করেন।
এরপর সংসদ নেতার অনুমতিতে তার পক্ষে বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৬ বিধি অনুযায়ী বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
প্রস্তাবে বলা হয়, “সাম্প্রতিক জ্বালানি নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে সংসদে সুপারিশসহ রিপোর্ট প্রদানের জন্য কার্যপ্রণালী-বিধির ২৬৬ বিধি অনুযায়ী নিম্নলিখিত সদস্যদের সমন্বয়ে (নিম্নবর্ণিত কার্যপরিধি ও মেয়াদসহ) একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হোক।”
কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে। তিনি সিরাজগঞ্জ ২ আসনের সংসদ সদস্য।
কমিটির সদস্যরা হলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (যশোর ৩); হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান (লক্ষ্মীপুর ৪); হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু (শরীয়তপুর ৩); মঈনুল ইসলাম খান (মানিকগঞ্জ ২); মো. সাইফুল আলম (ঢাকা ১২); মো. নুরুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৩); মো. আব্দুল বাতেন (ঢাকা ১৬); মো. আবুল হাসনাত (কুমিল্লা ৪) এবং মোহাম্মদ আবুল হাসান (সিলেট ৫)।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক জ্বালানি নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে সংসদে সুপারিশসহ রিপোর্ট দিতে হবে। কমিটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ থেকে ৩০ দিন।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে আলোচনার পর বিরোধী দলীয় নেতার প্রস্তাবে বিশেষ কমিটি গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একমত হয়। সেদিন দুই পক্ষ থেকে পাঁচজন করে ১০ সদস্যের নাম প্রস্তাব করা হয়।
সাম্প্রতিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয়, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা এবং দেশের ভেতরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার চাপ নিয়ে সংসদে কয়েক দিন ধরেই আলোচনা চলছে। এর মধ্যে জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে সংসদীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হল।