Published : 10 Jun 2026, 11:00 PM
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
গেল ফেব্রুয়ারি মাসে নিয়োগের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া ১৪ হাজার ৩৮৪ প্রার্থী এখনও সহকারী শিক্ষক পদে যোগ দিতে পারেননি।
বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে দ্রুত নিয়োগের দাবি তুলে ধরে তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
‘চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকবৃন্দ-২০২৫’ ব্যানারে জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন নেত্রকোণা জেলার প্রার্থী দেবব্রত সরকার।
এতে বলা হয়, “চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার প্রায় পাঁচ মাস অতিক্রম হলেও এখনো আমাদের বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতা হাজারো পরিবারের জীবনে অনিশ্চয়তা, দুর্ভোগ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে।”
প্রার্থীদের অনেকেই আগের সরকারি ও বেসরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন দাবি করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “অনেকে আরও ভালো বেতনের চাকরিতে যোগদান করেননি। কারণ শিক্ষকতাকে তারা শুধু চাকরি হিসেবে নয়, বরং স্বপ্নের পেশা এবং জাতি গঠনের একটি মহান দায়িত্ব হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
“চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।”
এছাড়া পুলিশ ভেরিফিকেশন ফরমে আগের চাকরি থেকে অব্যাহতির তথ্য দেওয়ার প্রয়োজনে অনেকেই চাকরি ছাড়তে বাধ্য হওয়ার কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে, “ফলে অসংখ্য পরিবার আজ আয়-রোজগারহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমাদের মধ্যে অনেকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। চাকরিতে যোগদানের এই দীর্ঘ বিলম্ব আমাদের সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলেছে।”
সুপারিশ পাওয়া শরীয়তপুর জেলার প্রার্থী ফারজানা আক্তার বলেন, “আমরা প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষক, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার পরিবার। চূড়ান্ত সুপারিশের সংবাদে যে পরিবারগুলো আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল, আজ তারা উল্টো সামাজিক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন প্রশ্ন করেন-আসলেই কি চাকরি হয়েছে, নাকি এটি শুধুই কাগজে-কলমে?"
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ইতিহাসে চূড়ান্ত সুপারিশের পর বিদ্যালয়ে পদায়নের জন্য এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষার নজির নেই বলে তুলে ধরেন তিনি।
এই প্রার্থী বলেন, দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
“নীলফামারী জেলার একজন চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষক সম্প্রতি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তার বাবা নেই, তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বর্তমানে তার পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ এবং তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছেন।”

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের শেষ দিকে ৬১ জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
প্রথম ধাপে গত ৫ নভেম্বর রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের স্কুলগুলোর ১০ হাজার ২১৯টি সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পায়।
দ্বিতীয় ধাপে গত ১২ নভেম্বর ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের স্কুলগুলোর ৪ হাজার ১৬৬টি সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।
৯ জানুয়ারি দুই ধাপের মোট ১৪ হাজার ৩৮৫টি পদে নিয়োগে ৬১টি জেলায় প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ১০ লাখ ৮০ হাজার ৯৫ জন প্রার্থী আবেদন করলেও ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৮ জন প্রার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন।
২১ জানুয়ারি ফল প্রকাশ করা হয়, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থী। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলো লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসে নিয়োগের জন্য ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করেছে।
এরপর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরীক্ষা নিয়ে ‘তড়িঘড়ি’ এই প্রার্থীদের নির্বাচিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিএনপি সরকারের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ফলে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীদের এখনও সহকারী শিক্ষক পদে পদায়ন করা হয়নি।
সর্বশেষ গত ১০ মে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের আগের কার্যকলাপ ‘পুলিশি তদন্তের’ মাধ্যমে যাচাই করতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
এর আগে ৩ মে জেলা প্রশাসক সম্মেলনের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক আলোচনা শেষে প্রার্থীদের যাচাই বাছাই করে যোগদান করানোর কথা বলেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী।
যোগদানের পর এ প্রার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ওই প্রশিক্ষণে অকৃতকার্য প্রার্থীরা শিক্ষক হতে পারবেন না।
এ প্রশিক্ষণ সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে দেবব্রত সরকার বলেন, “চূড়ান্ত সুপারিশের পরও আবার এক ধরনের যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যুক্ত করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ড নয়। আমরা আমাদের যোগ্যতার যথেষ্ট প্রমাণ দিয়েই চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি।”
সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্তরা নিয়োগের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নামতে চান না তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা শিক্ষক। আমাদের স্থান রাজপথে নয়, শ্রেণিকক্ষে। আমরা আন্দোলন নয়, পাঠদান করতে চাই। আমরা শিক্ষার্থীদের মাঝে থাকতে চাই। কিন্তু চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে কোনো ধরনের বৈষম্য, বিধিমালা বহির্ভূত সিদ্ধান্ত বা অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করা হলে তা কেউ সহজভাবে মেনে নেবে না।”
পাঁচ মাসের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রার্থীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ‘চরম অসন্তোষ’ সৃষ্টি হয়েছে দাবি করে দেবব্রত সরকার বলেন, দ্রুত বিদ্যালয়ে পদায়ন নিশ্চিত করার পরিবর্তে যদি নতুন কোনো অনিশ্চয়তা, বৈষম্য বা জটিলতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে সেই অসন্তোষ আরও গভীর ক্ষোভে রূপ নিতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কিশোরগঞ্জ জেলার সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী জান্নাতুল ইসলাম টনি।