Published : 09 Mar 2026, 02:54 PM
কোনো ঘটনা ঘটলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে যেটুকু সময় দরকার, পুলিশকে তা দিতে সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন এ বাহিনীর নতুন মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির।
তার ভাষ্য, “মিডিয়া প্রেশারের কারণেই জজ মিয়া নাটক তৈরি হয়েছিল।”
২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকায় শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনায় পুলিশ জজ মিয়া নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাকে ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে ‘ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে’ সাজানো স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল।
কিন্তু পরে তদন্তে দেখা যায়, জজ মিয়া মূল হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তখন অভিযোগ ওঠে, আসল অপরাধীদের আড়াল করতে ‘জজ মিয়া নাটক’ সাজানো হয়েছিল।
ঘটনার ২১ বছর পর কথা প্রসঙ্গে ‘জজ মিয়া নাটকের’ কথা তোলেন আইজিপি। ঢাকার একটি সড়কে মাদক কেনাবেচার বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমাদেরকে রেসপন্স টাইম দিতে হবে।”
তার ভাষ্য, যখন কোনো ঘটনা ঘটে, তখন সংবাদমাধ্যম এমনভাবে প্রশ্ন করে যে, এখনই এটার বিচার শেষ করতে হবে। কিন্তু কোনো কোনো হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনে ২০-২৫ বছরও লেগে যায়।
“তো আপনারা এমনভাবে প্রেশার করবেন না যেটা পুলিশের উপর একটা মেন্টাল প্রেশারে চলে যায় এবং ওরা তড়িঘড়ি করে দেখা যায় যেটাই পায় একটা স্বীকারোক্তি নিয়ে….।
“তার প্রমাণ আপনারা দেখেছেন জজ মিয়া নাটক… আমি মনে করি মিডিয়া প্রেশারের কারণে এই জিনিসগুলা তৈরি হয়েছে। যাই হোক, এগুলা এখন যাতে না হয়।”
আইজিপি বলেন, “আপনারা দেখেন, আমি আসার পরে যতগুলা ঘটনা ঘটেছে, প্রত্যেকটা ঘটনা আমরা আইডেন্টিফাই করতে সক্ষম হয়েছি। সুতরাং আপনারা সহযোগিতা করবেন।”

বিএনপির নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে রদবদলের ধারাবাহিকতায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মো. আলী হোসেন ফকিরকে পুলিশ মহাপরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সোমবার পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এসে একগুচ্ছ পরিকল্পনার কথা বলেন আইজিপি। সেইসঙ্গে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নেরও উত্তর দেন।
তেমনই এক প্রশ্নের উত্তরে ২১ বছর আগে বিএনপি সরকারের সময় বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া নাটকের’ প্রসঙ্গ টানেন তিনি।
এদিন প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতেই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যার প্রধান অসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় আইজিপির কাছে। শনিবার রাতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বনগাঁ থেকে ওই দুজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে সেখানকার পুলিশ।
আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, “মিনিস্ট্রি থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে কার্যক্রম গ্রহণ করছে, হয়ত অচিরেই আমরা তাদেরকে বাংলাদেশে আনতে সফল হব ইনশল্লাহ।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি চাঁদাবাজ ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তালিকা করে অভিযানের যে ঘোষণা দিয়েছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আইজিপি বলেন, “আমরা ইনশাল্লাহ অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করব। যে তালিকাটা আসছে এটা থেকে আবার একটু… আমরা অনেকগুলো এজেন্সি থেকে পেয়েছি। এটা আবার আমরা সবকিছু মিলিয়ে কমন যেগুলা, সেগুলার বিরুদ্ধে আমরা অভিযান চালাব।”
শনিবার ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অপরাধ কি-না জানতে চাইলে পুলিশ প্রধান বলেন, “একটা বিষয় আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমাদের পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করা হবে না। কিন্তু নাগরিককে আইন মানতে হবে, আইন নিজের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।
“তাহলে দেশকে দেশ একটা অকার্যকর দেশে পরিণত হবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পুলিশ কাজ করবে।”
তবে ‘নিষিদ্ধ সংগঠনের কেউ বিভিন্ন অজুহাতে’ রাস্তায় নেমে আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটালে এবং সন্ত্রাসকে ‘উসকে দিলে’ মেনে নেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
‘মব সন্ত্রাসের’ বিষয়ে প্রশ্ন করলে পুলিশ প্রধান বলেন, “আমাদের দেশে যে আনএমপ্লয়মেন্ট আছে, এটার কারণে যে সংগঠনই কোনো প্রোগ্রামের ডাক দেয়, সেখানে লোকের সমস্যা হয় না। কিশোর গ্যাং একটা, অলরেডি তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা শুরু করেছি। বিশেষ করে মাদকের সাথে রিলেটেড লোকজনই কিন্তু এই জিনিসগুলোর সাথে বেশি জড়িত।”
আবার কিছু লোক ‘ফায়দা লোটার জন্য লুটপাট এবং বিভিন্ন রকমের অপকর্মের জন্য মব করে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা মূল মব তৈরিকারী যারা, তাদেরও লিস্ট তৈরি করতেছি। সে যত ক্ষমতাবানই হোক, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।”
আলী হোসেন ফকির বলেন, দেশে আইন মানা নাগরিকের সংখ্যা ‘কমে যাওয়াকেই’ তিনি ‘মূল চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন।
তার ভাষ্য, “যে কোনো ঘটনা ঘটলে সবাই রাতারাতি বিচার চায়।”
এজন্য থানা পর্যায়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে আইজিপি বলেন, তাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে টাকা ও জমি সংক্রান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান সম্ভব।
পুলিশের বদলি ও পদায়নের বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তারা অবশ্যই মূল্যায়িত হবেন।
২ লাখ ১৫ হাজার সদস্যের এই বাহিনীকে একটি পরিবার হিসেবে তুল ধরে তিনি বলেন, “যদি দুষ্ট কেউ থাকে, সে বিদায় হবে। আর যারা সৎ, দক্ষ ও যোগ্য, তারাই বাংলাদেশ পুলিশের জন্য কাজ করবে।”
পুলিশের পোশাক পরিবর্তন বা আগের পোশাকে ফিরতে চাওয়ার বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, সরকার ‘পর্যালোচনা করে’ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরা হলেও তাদের নেপথ্যে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন–এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আপনি কি আপনার বাবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন?”
আইজিপি বলেন, “দেশের রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি রাজনৈতিক দল। তারা পলিসি মেকার, তারা পার্লামেন্টে নীতি নির্ধারণ করে কোথায় যাবে, পুলিশ কীভাবে চলবে, সমাজ কীভাবে চলবে।
“তো তারা যদি ভুল করে, তারা সবাই মিলে সমঝোতার মাধ্যমে টেবিলে আলোচনা সিদ্ধান্ত নেয়, তাদেরকে কন্ট্রোল করার দায়িত্ব তো আমাদের না। কিন্তু সে যদি কোনো ক্রিমিনাল অ্যাকটিভিটিস করে বা কোনো আইন ভঙ্গ করে, সেক্ষেত্রে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।”
সবশেষে এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেছেন, জুলাই আন্দোলন নিয়ে যারা ফায়দা লুটতে চায়, তাদেরকেও শনাক্ত করা হচ্ছে।
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে নিজেও রাস্তায় ছিলেন দাবি করে আলী হোসেন ফকির বলেন, “জুলাই বিপ্লব কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি না।… দেখা গেল অনেক লোক আছে জুলাই বিপ্লবের সাথে জড়িত ছিল না, এখন বড় জুলাই বিপ্লবী হয়ে গেছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার পিছনে জুলাই বিপ্লবকে ‘খাটো বা ধংস করার উদ্দেশ্য ছিল’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইজিপি বলেন, “কোনো ভালো কিছু আমরা গ্রহণ করতে চাই না। সেটাকে নষ্ট করার জন্য এই কাজগুলা করা হচ্ছে… সুতরাং সাবধান।”