দেশলাইয়ের কাঠি বাঁচানোর শহরে এলএনজির অপেক্ষা
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা মনে করেন, গ্যাসের চাহিদা থাকবেই; ফলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে।
মোহাম্মদপুরের আঁখিরা ইসলামের এখনও দুই দশক আগের কথা মনে পড়ে, যখন দেশলাইয়ের কাঠি বাঁচাতে কিংবা কাপড় শুকাতে ঢাকার অনেক বাসায় দিনের পর দিন গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা হতো।
স্বামীর সরকারি চাকরির কারণে দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকতে হয়েছে আঁখিরাকে। পরে সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার সময় তিনি ভেবেছিলেন, রান্নার ঝক্কি বুঝি এবার অনেকটাই কমবে। পাইপলাইনে গ্যাস থাকবে; চুলা জ্বালালেই রান্না করা যাবে।
রান্নাঘরের সেই নিশ্চয়তা এখন তার কাছে অনেকটাই অতীত। গ্যাসের চাপ কখন বাড়বে, কখন চুলা জ্বলবে, তার ঠিক নেই। ফলে চুলা জ্বললেই রান্নার কাজ যতটা সম্ভব সেরে ফেলার চেষ্টা করেন আঁখিরা।
এর মধ্যে আরেকটি বিষয়ও তাকে ভাবায়। তার চুলায় যে গ্যাস জ্বলে, তার একটি অংশ কাতারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জাহাজে করে আনা হয়। একসময় এত সহজে পাওয়া গ্যাসের জন্য এখন বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, বিষয়টি এখনও তার কাছে বিস্ময়ের।
“আমাদের দেশের এত গ্যাস গেল কোথায়,” প্রশ্ন করেন আঁখিরা।
তার বাসা থেকে হাঁটা পথের দূরত্বে মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেডে থাকেন সুরাইয়া জান্নাত। তার অভিজ্ঞতা কিছুটা আলাদা। তবে বদলে যাওয়া জ্বালানি পরিস্থিতি তার রান্নাঘরও পাল্টে দিয়েছে।
উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে প্রথমে হোস্টেলে থাকতেন সুরাইয়া। মাঝেমধ্যে নিজেরাই রান্না করতেন। সেই সময় তিনিও অনেককে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে কাপড় শুকাতে দেখেছেন।
সংসার শুরুর পর ধীরে ধীরে গ্যাসের সেই প্রাচুর্য হারিয়ে যেতে দেখেন তিনি। নানা সংকটের মধ্যেও কয়েক বছর পাইপলাইনের গ্যাসে রান্না করেছেন।
ছয় মাস আগে বাসা বদলের পর বদলে গেছে রান্নার জ্বালানিও। নতুন বাসায় পাইপলাইনের গ্যাস নেই। এখন এলপিজি সিলিন্ডারই তার ভরসা। কিন্তু সেখানেও নিশ্চয়তা নেই।
সুরাইয়ার অভিযোগ, সরকার যে দাম ঠিক করে দেয়, সেই দামে তিনি সিলিন্ডার কিনতে পারেন না। বাজারে বাড়তি টাকা দিতে হয়। আবার দাম বাড়ার খবর ছড়ালে কখনও সিলিন্ডার পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।
একসময় যে গ্যাসের আগুনে মানুষ কাপড় শুকাত, সেই গ্যাসই এখন তার সংসারের বড় খরচগুলোর একটি, বলছিলেন সুরাইয়া।
আঁখিরা অপেক্ষা করেন পাইপলাইনে চাপ বাড়ার; আর সুরাইয়া অপেক্ষা, সহনীয় দামে সিলিন্ডার পাওয়া।
ঢাকার এই দুই রান্নাঘরকে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বদলে যাওয়া চেহারার প্রতিচ্ছবি বলা যায়।
একসময় দেশীয় গ্যাস ছিল সহজলভ্য জ্বালানি। এখন সেই সরবরাহে বড় জায়গা করে নিয়েছে আমদানি করা এলএনজি ও এলপিজি।
এমন বাস্তবতায় ৯ অগাস্ট পালিত হচ্ছে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস।
১৯৭৫ সালের এই দিনে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকা তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, রশিদপুর ও কৈলাসটিলা গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নেয় বাংলাদেশ।
যুক্তরাজ্যের শেল অয়েলের হাতে থাকা পরিচালনাকারী কোম্পানির ৭৫ শতাংশ শেয়ার প্রায় ৪৫ লাখ পাউন্ড স্টার্লিংয়ে কিনে নেয় সরকার। তখনকার হিসাবে এর মূল্য ছিল প্রায় ১৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
এর মধ্য দিয়ে পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র, কূপ ও উৎপাদন স্থাপনার পরিচালনা রাষ্ট্রের হাতে আসে। পরে কোম্পানিটির নাম হয় বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড।
গ্যাসকূপের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে পাওয়ার সেই সিদ্ধান্ত স্মরণে ২০১০ সাল থেকে ৯ অগাস্ট জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস পালিত হচ্ছে।
পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও সেই পাঁচ ক্ষেত্র দেশীয় গ্যাসের বড় উৎস হয়ে আছে এখনও। কিন্তু এর মধ্যে বদলে গেছে দেশের জ্বালানি ব্যবহারের মানচিত্র। জ্বালানি চাহিদার স্থানীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে যুক্ত হয়েছে আমদানি করা এলএনজি।
২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে তোলার ব্যবস্থা এখনও মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল।
জাহাজে এলএনজি এলেও এফএসআরইউ সচল না থাকলে সেটি গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে দেওয়া যায় না। ফলে এই দুটি টার্মিনালের কোনো একটিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খারাপ আবহাওয়া বা কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলেই তার প্রভাব সরাসরি জাতীয় সরবরাহে পড়ে।
গত কয়েক বছরেই এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় একটি ভাসমান পন্টুন সামিটের এফএসআরইউতে আঘাত করলে টার্মিনালের ব্যালাস্ট ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে কমে যায়।
স্বাভাবিক সময়ে দুই টার্মিনাল থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি পাওয়া গেলেও সেই সময় সরবরাহ ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমেছিল। টার্মিনালটি পুরোদমে চালু করতে লেগে যায় তিন মাসের বেশি।
চলতি বছরের ২১ এপ্রিল এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে মাত্র ছয় ঘণ্টার কারিগরি ত্রুটিতেই জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়। তাতে গ্যাসের চাপ কমে যায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে।
এরপর ৭ জুলাই বঙ্গোপসাগরে খারাপ আবহাওয়ার কারণে সামিটের টার্মিনালে একটি এলএনজি জাহাজ ভিড়তে না পারায় সরবরাহ আবার দৈনিক প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়।
এর দুই সপ্তাহ পর ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে আগুন ও কারিগরি ত্রুটির পর দৈনিক আরও প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। টার্মিনালটি সাধারণত দৈনিক ৫০০ থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেয়।
অর্থাৎ জুলাইয়ের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরের ঘটনা প্রবাহে উঠে এসেছে, আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেই গ্যাস গ্রহণের অবকাঠামোতে এখনো যথেষ্ট বিকল্প তৈরি হয়নি।
মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের একটিতে সমস্যা হলেই কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। আগে থেকেই ঘাটতিতে থাকা জাতীয় গ্রিডে তখন তার ধাক্কা লাগে, যার রেশ দ্রুতই পৌঁছে যায় রান্নাঘর, সিএনজি স্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায়।
গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ার আগে দুই টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল।
২০ জুলাই সকাল থেকে পরের ২৪ ঘণ্টায় সরবরাহ ছিল ৯৯৩ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট। পরের দিন তা নেমে আসে ৬২১ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ২৬ জুলাই সকাল থেকে পরের ২৪ ঘণ্টায় এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে ৫০০ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ টার্মিনাল বিকলের আগের তুলনায় আমদানি করা গ্যাসের প্রায় অর্ধেক সরবরাহ কমে যায়।
কুমিল্লার হেলালউদ্দিন ঢাকায় সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান। গত মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে মহাখালীর রয়েল ফিলিং স্টেশনের সামনে তার সঙ্গে যখন কথা হয়, ততক্ষণে সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে লাইনে ছিলেন তিনি। সামনে তখনও গাড়ির সারি। কখন গ্যাস পাবেন, সেটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছিল না।
কোথায় কী হয়েছে, কেন হঠাৎ গ্যাস মিলছে না, সেই হিসাবও হেলালউদ্দিনের জানা নেই। তার হিসাব আরও সহজ। গাড়ি যতক্ষণ লাইনে, ততক্ষণ আয় নেই। গ্যাস পেলেও আগের মতো নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না। চাপ কম থাকায় অনেক সময় পুরো ট্যাংক ভরছে না। অল্প গ্যাস নিয়ে কয়েকটি ট্রিপ দেওয়ার পর আবার ফিরতে হচ্ছে কোনো ফিলিং স্টেশনের লাইনে।
মগবাজারে সিএনজি নিতে আসা চালক সেলিম মিয়ার অভিজ্ঞতাও একই।
তার ভাষ্য, আগে একবারে প্রায় ৩০০ টাকার গ্যাস নেওয়া যেত। এখন অনেক সময় ১০০ থেকে ১২০ টাকার বেশি পাওয়া যায় না। সেই গ্যাসে দু-একবার যাত্রী বহন করলেই আবার লাইনে দাঁড়াতে হয়। দিনে দুই দফায় তিন ঘণ্টা করে অপেক্ষা হলে ছয় ঘণ্টা চলে যায় শুধু জ্বালানির পেছনে।
টার্মিনাল বিকল হওয়ায় ৪ অগাস্ট সকাল থেকে পরের ২৪ ঘণ্টায় দেশীয় ক্ষেত্র ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১৪০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট।
ওই দিন গ্যাসের চাহিদা ছিল ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ওই দিন চাহিদার প্রায় ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছিল। এলএনজি থেকে এসেছিল ৪৯০ দশমিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট।
এই ঘাটতির প্রভাব শুধু সিএনজি স্টেশনে ছিল না। অনেক বাসায় দিনের বেলায় চুলা জ্বলেনি। কোথাও ইন্ডাকশন চুলায় রান্না হয়েছে, কোথাও রান্নার সময় সরিয়ে নিতে হয়েছে গভীর রাতে। শিল্পকারখানাতেও গ্যাসের চাপ কমেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ধুঁকেছে জ্বালানির সংকটে, বেড়েছে লোডশেডিং।
দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর ৬ অগাস্ট ভোরে বিকল টার্মিনালের একটি অংশ আবার চালু হয়। শুরুতে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছিল।
বাড়ছে না দেশীয় উৎস
জুলাইয়ের সংকটের মধ্যেই আরেকটি হিসাবও সামনে আসে। পাঁচ দশকের বেশি সময় আগে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র এখনও দেশীয় উৎপাদনের বড় উৎস।
গত ৪ থেকে ৫ অগাস্টের পেট্রোবাংলার হিসাবে, তিতাস থেকে দৈনিক ৩৩৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এসেছে। হবিগঞ্জ থেকে ১০২ দশমিক ৩ মিলিয়ন, বাখরাবাদ থেকে ১৮ দশমিক ২ মিলিয়ন এবং রশিদপুর থেকে ৭০ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট।
কৈলাসটিলার দুটি স্থাপনা থেকে পাওয়া গেছে আরও ৪৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সব মিলিয়ে ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পাঁচটি ক্ষেত্র থেকে ওই দিন এসেছে ৫৬৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
দেশীয় ক্ষেত্রগুলোর মোট উৎপাদন ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ পাঁচটি ক্ষেত্র এখনও দেশীয় গ্যাসের প্রায় সাড়ে ৩৪ শতাংশ দিচ্ছে।
এই হিসাব পঞ্চাশ বছর আগের ওই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব পরিস্কার করে। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলে, এত বছরেও নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদন বাড়িয়ে পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর ওপর নির্ভরতা কেন কমানো গেল না।
আবার ঝুঁকিটা শুধু পুরোনো পাঁচ ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরতায় নয়। গত ৪ থেকে ৫ অগাস্ট বিবিয়ানা ক্ষেত্র একাই ৭৪৭ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়েছে। অর্থাৎ দেশীয় উৎপাদনের প্রায় ৪৫ শতাংশ এসেছে একটি ক্ষেত্র থেকে। তিতাস যোগ করলে এই দুই ক্ষেত্র থেকেই এসেছে দেশীয় গ্যাসের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ, দেশীয় উৎপাদন অল্প কয়েকটি বড় ক্ষেত্রের ওপর কেন্দ্রীভূত।
অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজি গ্রহণের দুটি ভাসমান টার্মিনালও মহেশখালীর একই এলাকায়। অর্থাৎ, আমদানির অবকাঠামোও একই এলাকায় কেন্দ্রীভূত। ফলে এসব সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো ত্রুটিতে তার চাপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায়।
দেশীয় উৎসে জোর, ফল পেতে সময়
এই নির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে দুটি নতুন খনন রিগ কেনা হচ্ছে। একটির ক্ষমতা ২ হাজার অশ্বশক্তি, অন্যটির দেড় হাজার অশ্বশক্তি।
তবে নতুন কূপ থেকে গ্যাস পেতে সময় লাগে বলে মনে করিয়ে দেন তিনি।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, সম্ভাব্যতা যাচাই, সরকারি সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক দরপত্র ও খননসহ পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় এক বছর লেগে যেতে পারে।
“সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”
পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমবে এবং নতুন কূপ থেকে গ্যাস পেতে যে সময় লাগবে, তা আগে থেকেই জানা ছিল। কিন্তু নতুন উৎস থেকে যে গ্যাস যোগ হয়েছে, তা পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমার ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তার আলোচনায় এখন শুধু কতটি কূপ খনন হবে, সেই লক্ষ্য নয়, কবে সেখান থেকে কত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে, সেই হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গ্যাসের সংকট রপ্তানি কারখানাতেও
রান্নাঘর ও সিএনজি স্টেশনের বাইরে গ্যাসের সংকটের ছাপ পড়েছে শিল্পাঞ্চলে।
ইভেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর হিসাবে, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া ও গাজীপুরের অনেক কারখানায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর সমস্যাটা শুধু উৎপাদন কমে যাওয়ায় থেমে নেই। গ্যাসের অভাবে সময়মতো পণ্য তৈরি ও পাঠানো যাচ্ছে না। এতে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
সময়মতো পণ্য দিতে না পারলে ক্রেতারা মূল্যছাড় চাইছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উড়োজাহাজে পণ্য পাঠানোর বাড়তি খরচও কারখানার ওপর চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে। সংকট দীর্ঘ হলে ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
আনোয়ার-উল আলম বলেন, “কাস্টমাররা যখন দেখে যে এই গ্যাসের জন্য ডেলিভারি মানে এনার্জির জন্য ডেলিভারি ডিলে হচ্ছে এবং এটা একটা আনসার্টেন তখন তাদের মধ্যে একটা পেনিক কাজ করে।”
তার মতে, তাৎক্ষণিক সংকটে কোন খাতে কত গ্যাস দেওয়া হবে, সেই ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে হবে।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও অন্য জ্বালানি বেশি ব্যবহারের কথা বলেন তিনি। সার কারখানায় গ্যাসের ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে প্রয়োজনীয় সার আমদানি এবং সিএনজি খাতে গ্যাস সরবরাহ ধীরে কমানোর পরামর্শও দেন।
পাশাপাশি পাইপলাইন ও ব্যবহারে অপচয় কমানোর ওপর জোর দেন তিনি। মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে নতুন এলএনজি টার্মিনাল, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং কূপ খনন বাড়ানোর কথাও বলেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়লে কমবে আমদানি ঝুঁকি
দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। সুলভে আমদানির সুযোগ পাওয়া গেলে তা অনেক সময় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়, যার ধকলে টান পড়ে দেশের রিজার্ভে। আবার টার্মিনালে সমস্যা হলে সরবরাহ কমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঝুঁকি কমানোর একটি পথ হতে পারে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো।
সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্য রয়েছে। তবে সেই লক্ষ্য থেকে এখনও অনেক দূরে বাংলাদেশ।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ছিল মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বে এই হার ছিল প্রায় ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৬৯০ দশমিক ৭ মেগাওয়াট। ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণে সক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার ৮৫১ মেগাওয়াটে নিতে হবে বলে হিসাব করেছে আইইইএফএ। এজন্য ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যোগ করতে হবে।
আইইইএফএর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বাড়লে দিনের বেলায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। সেই গ্যাস শিল্পসহ অন্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে শুধু সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে জ্বালানি সংকটের সমাধান হবে না বলে মনে করেন তিনি। রাতের বিদ্যুৎ চাহিদা, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতার জন্য গ্যাসের প্রয়োজন থাকবে। তাই নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনও বাড়াতে হবে।
তার মতে, দেশীয় গ্যাস, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ব্যাটারি স্টোরেজকে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। কোন সময়ে কোন উৎসের বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে, সেটিও আগেই ঠিক করতে হবে।
আইইইএফএর আরেক হিসাব বলছে, এক মেগাওয়াটের একটি রুফটপ সোলার প্রকল্প বছরে প্রায় ২ কোটি ২৪ লাখ টাকার জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করতে পারে। ফলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বাড়ানো শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়, আমদানি করা জ্বালানির দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা কমানোরও একটি উপায় হতে পারে বাংলাদেশের জন্য।
আরো পড়ুন
