Published : 29 Jul 2026, 11:43 PM
আগে থেকেই গ্যাসের সরবরাহ সংকটে হিসাব কষে চলা পোশাক কারখানাগুলো এক সপ্তাহ ধরে চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান দুই এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে কারখানাগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ ৪০ শতাংশের নিচে নামার কথা বলছেন কারখানার উদ্যোক্তারা। এতে উৎপাদন সক্ষমতাও ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে যাওয়ার কথা বলছেন তারা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ কারখানায় এখন সংকট দেখা দিয়েছে। এই খাতকে আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তার কথায়, “গ্যাসনির্ভর কোনো দেশেই এরকম বিপর্যয় হয় না। থাইল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ আর কোনো দেশেতো গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হয় না। আমরাওতো টাকা দিয়ে গ্যাস কিনি, আমাদের গ্যাস পেতে এত সমস্যা কেন হবে।
“আমাদের একেক সময়ে একেকটি হচ্ছে। কিন্তু সবশেষে আমরা ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এখন তো কারখানাকে সচল রেখে অন্যান্য খাতে বিদ্যুৎ দেওয়া উচিত ছিল।”
গ্যাস সংকটে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে খুব একটা সমস্যা না হলেও ইপিজেডের বাইরে থাকা কারখানাগুলো বেশি সমস্যায় পড়ার কথা বলছেন ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী ইপিজেড এলাকায় কারখানা থাকায় আগের মতই গ্যাস সরবরাহ থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “ইপিজেডের বাইরে থাকা কারখানা বিশেষ করে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে যাদের কারখানা আছে, তারাই সমস্যায় পড়ছে সবচেয়ে বেশি।”
এভিটেক্স অ্যাপারেলসের গাজীপুরের ভবানীপুর কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ কমে ৪০ শতাংশের নিচে নামার তথ্য দিয়েছেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গ্যাস সংকট তো আগে থেকেই ছিল। চাহিদার মত তো পাওয়া যায়নি। এখন তা আরো বেড়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে নেমেছে। তাই কারখানায় ওভারটাইম করাতে হচ্ছে প্রতিদিনই, এভাবে তো খরচ বাড়ছে।”
বিটিএমএ রাসেলের দাবি, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বস্ত্র খাত। নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলোর কোনো কোনোটি চাহিদার বিপরীতে ৩৫ শতাংশ গ্যাস পাচ্ছে পাইপলাইনে।
“কয়েকটির সক্ষমতা ৪০ শতাংশে নেমেছে। আমরাতো পোশাক কারখানায় সরবরাহ দেই। তাদের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। ওভারটাইম বিল দিতে হচ্ছে কর্মীদের। যে কাজ ৮ ঘণ্টায় হত, এখন তা ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা লাগছে করতে।”
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “গ্যাস সরবরাহ খুবই খারাপ অবস্থায় চলে গেছে। আমরাতো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছি না। এখন শিগগিরই সমস্যার সমাধান না হলে ‘লিড টাইম’ পিছিয়ে দিতে হবে। নইলে এয়ারলাইনসে পাঠাতে হবে। সেখানে তখন খরচ বেড়ে যাবে।”
প্রতিদিন গ্যাসের মোট সরবরাহের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে এলএনজি থেকে।
তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের মেরুদণ্ড। এর আগে বছরজুড়ে গ্যাসসহ নানা সংকটের মধ্যে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাতটি ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখেছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই নতুন করে গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ায় সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কার কথা বলছেন কারখানা মালিকরা। বিদ্যুতের পর সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহার হয় শিল্পকারখানায়।
তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ফয়সাল সামাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুর্ঘটনার আগ থেকেই গ্যাস সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম ছিল। এখনতো আরো কমে গেছে।”
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক গ্যাস চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। গত কয়েক বছর থেকে দিনে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিদুর্ঘটনায় এলএনজির একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল মেরামত করে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সপ্তাহখানেক লাগতে পারে বলে ধারণা দিয়েছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘‘অক্ষত বয়লারটি চালানোর চেষ্টা চলছে, পরে ক্ষতিগ্রস্তটি। শুরুতে সরবরাহ এখনকার চেয়ে কিছুটা বাড়বে। কিন্তু দুর্ঘটনার আগে যে পরিমাণ গ্যাস লাইনে যেত, সেরকম পেতে আরো সময় লাগবে।”