Published : 04 Oct 2025, 11:02 PM
বছর তিনেক ধরে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছিলেন না ভাষাসংগ্রামী ও গবেষক আহমদ রফিক। এ সময়টায় দৃষ্টি ও চলন শক্তি হারিয়ে ফেলা এই নবতিপর যাদের কাঁধে ভর করে চলতেন, তাদের অন্যতম ছিলেন আবুল কালাম।
দিন-রাত নির্বিশেষে ছায়ার মত আহমদ রফিককে সঙ্গ দিয়েছেন তিনি। কখনও কখনও গুনী এই লেখকের লেখালেখিতেও সহায়তা করেছেন যথাসাধ্য। কালামের কাছ থেকে কিছুটা জানা গেল জীবনের শেষ প্রান্তে একা হয়ে পড়া আহমদ রফিকের দিনগুলো কেমন ছিল।
দীর্ঘ তিন যুগ ধরে আহমদ রফিকের সঙ্গে থাকা কালাম বলেন, “শেষ সময়টাতে স্যার তো ভালো ছিল না। বছর তিনেক ধরে খুব অসুস্থ বোধ করতেন। চোখে দেখেন না, লিখতে পারতেন না। লিখতে না পারার কারণে তার খুব অসহ্য লাগত।
“আমারে দিয়া কিছু কিছু লেখাইতেন। উনি বলতেন আর আমি লিখতাম। শুনে শুনে লিখলে তো আর ওনার মতো ভালো হয় না। এজন্য ওনার পছন্দ হইত না। লিখতে পারতেছেন না, এটা তার কাছে খুব খারাপ লাগত।”

শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আহমদ রফিককে শ্রদ্ধা জানানোর এক ফাঁকে এভাবেই বলছিলেন আবুল কালাম। শোনাচ্ছিলেন জীবনের শেষ প্রান্তে কেমন ছিল– ‘নিঃসঙ্গ আহমদ রফিকের’ জীবন।
নানা আন্দোলন সংগ্রামে সোচ্চার থাকা ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিকদের একজন আহমদ রফিক ৯৬ বছর বয়সে গত বৃহস্পতিবার মারা যান। বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জীবনাবসান হয় তার।
শনিবার বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয় তার মরদেহ। এ সময় সর্বস্তরের মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
১৯ বছর আগে ২০০৬ সালে স্ত্রী হারিয়ে একা হয়ে পড়া নিঃসন্তান আহমদ রফিকের সঙ্গে অনেকটা ছায়ার মত ছিলেন তার এক সময়ের সহকর্মী ষাটের কাছাকাছি বয়সের আবুল কালাম।

শরিতপুরের ছেলে কালাম এক সময় ওরিয়ন গ্রুপের গাড়ি চালক ছিলেন। আহমদ রফিকও তখন ওই কোম্পানিতে বড় পদে কর্মরত ছিলেন।
সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে কালাম বলেন, “স্যারের সাথে আমি ৩৬ বছর ধরে আছি। আগে স্যারের গাড়ি চালাইতাম। গাড়ি বিক্রি কইরা দেওনের পরে ওনার সহকারী হিসেবেই ছিলাম।”
তিনি বলেন, “স্যার ওরিয়ন গ্রুপ ছেড়ে দিলেও আমারে ছাড়েননি। ওইখানেও (ওরিয়ন গ্রুপ) আমি স্যারের ডিউটিই করতাম। পরে স্যার যখন ওখান থেকে চলে আসেন। তখন আমারেও স্যার নিয়া আসেন।
“আমারে বলছিল, ‘কালাম আমার সাথেই থাকো। তোমার সংসারে যা লাগে, আমি দ্যাখমু।’ এরপর স্যারের সাথেই আছি। স্যারও আমারে ভালোবাসতেন। আমিও স্যারের মায়ায় আর তারে ছাড়তে পারি নাই। অনেক ভালো একজন মানুষ ছিলেন।”
দীর্ঘ প্রায় তিন যুগ গুনী এই মানুষের সঙ্গে থাকা কালাম বলেন, শেষ কয়েক বছর অল্প কিছু মানুষজনই শুধু বর্ষীয়ান এই ভাষাসংগ্রামীর নিয়মিত খোঁজ রাখতেন। এমনকি তার আত্মীয়-স্বজনদের আসা যাওয়া ছিল কম, খোঁজখবরও খুব একটা নিতেন না।
কারা দেখভাল করতেন আহমদ রফিককে?
ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী আহমদ রফিকের জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর গ্রামে। বর্ণাঢ্য এক জীবন কাটিয়ে শেষ দিকে এসে ‘নিঃসঙ্গ’ হয়ে পড়েন তিনি। তবে এই নিঃসঙ্গতা নিয়ে তার মনে কোনো দুঃখ ছিল না বলে জানালেন কালাম।
“স্যাররে কেউ দেখতে আসেন না। এটা নিয়ে স্যারের বেশি দুঃখ আছিল না। তবে লিখতে পারতেন না, এটা নিয়া দুঃখ করতেন।”

শেষের দিকে ‘নিঃসঙ্গ’ আহমদ রফিকের দেখভাল করতেন কারা, এমন প্রশ্নে কালাম বলেন, “উনার আত্মীয়-স্বজন কেউ তেমন একটা খবর নিত না। শেষের কয়েক বছর স্যারের খবর রাখতেন ইসমাইল সাদী, ইসরাত রহমান নাদিয়া, মো. রাসেলসহ কয়েকজন। এই কয়েকজনই একটা টিমের মতো করে দেখভাল করতাম। আর চন্দ্রবানু নামে একজন কাজের বুয়া রান্না করে দিতেন। স্যার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হইলো, আর এদিকে চন্দ্রবানুও পা ভাইঙ্গা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সেও এখন অসুস্থ।”
ফেব্রুয়ারি এলেই আহমদ রফিকের কাছে লোকজনের ভিড় বাড়ত মন্তব্য করে কালাম বলেন, “ভাষা আন্দোলন নিয়াতো স্যারের মতো কেউ জানত না। এজন্য ফেব্রুয়ারি মাসে অনেক অনুষ্ঠানে স্যাররে নিয়া যাইত। স্যাররে তখন গাড়ি দিয়াই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়া যাইত।”
২০২২ সালের পর থেকে আহমদ রফিকের লেখালেখির প্রচেষ্টা কমে যাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শরীরটা যখন বেশি খারাপ হইয়্যা গেলে, তখন উনার খুব অস্বস্তি লাগত, অসহ্য লাগত।
আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়ে ‘লিখতে না পারার কষ্ট’
জীবনের শেষ ভাগে এসে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়ে লিখতে চেয়েছিলেন আহমদ রফিক।
কালাম বলেন, “বছর খানেক আগে থেকে উনি প্রায়ই বলতেন, ‘কালাম আমি আলাউদ্দিন খাঁ’র ইতিহাসটা লিখে যাইতে চাইছিলাম- পারলাম না। এই লেখাটা শেষ করা খুব দরকারি ছিল।’ পরে তো উনার অসুস্থতা বাড়ল, আর দুই-আড়াই মাস ধইরা তো হাসপাতালে ভর্তিই থাকলেন।
“আলাউদ্দিন খাঁ নিয়া লেখাটা ১৮/১৯ পৃষ্ঠা লেখা অইছে। ওইটা নিয়া স্যার সন্তষ্ট ছিল না। স্যার যেভাবে চাইতেন, সেভাবে তো আর আমি লিখতে পারতাম না। এজন্য বেশি ভালো অইতো না। আলাউদ্দিন খাঁ ৫২টা বাজনা বাজাতে পারতেন, আরো অনেক অনেক কথা বলতেন। স্যার চাইতেন এটা নিয়ে একটা বই করবেন। সেটা তো আর হইলো না।”