Published : 16 Aug 2025, 02:07 PM
গীতাযজ্ঞ, নামসংকীর্তন, কৃষ্ণ পূজাসহ নানা আয়োজনে কল্যাণ ও মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে চলছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্মাষ্টমী উৎসব।
শনিবার সকালে চণ্ডীপাঠ ও গীতাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানমালার সূচনা হয়।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, প্রায় ৫ হাজার ২শ বছর আগে ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তার জন্মতিথিকেই জন্মাষ্টমী হিসেবে পালন করে থাকেন অনুসারীরা।
প্রেম, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা, দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালনেই শ্রীকৃষ্ণ অবতাররূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন বলে ভক্তদের বিশ্বাস।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড শংকর মঠ ও মিশনের পরিচালনায় রাজধানীতে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গীতাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যজ্ঞে আহুতি দিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করেন সমবেতরা।

এরপর দুপুর তিনটায় কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা ও রাতে শ্রীকৃষ্ণ পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শোভাযাত্রাটি ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বের হয়ে পলাশী বাজার, জগন্নাথ হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে দোয়েল চত্বর আসবে। এরপর হাই কোর্ট, বঙ্গবাজার, গুলিস্থান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায় সাহেব বাজার মোড় হয়ে বাহাদুর শাহ্ পার্ক এসে শোভাযাত্রাটি শেষ হবে।
পলাশীর মোড়ে জন্মাষ্টমী শোভাযাত্রার উদ্বোধন করবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. মঈন খান।
জন্মাষ্টমী উৎসব আয়োজন নিয়ে পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জন্মাষ্টমীর মাধ্যমে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হোক। শ্রী শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর শুভ সূচনা সুন্দরভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিকেলে বৃহৎ শোভাযাত্রা নিয়ে আমরা মন্দির থেকে বাহাদুর শাহ পার্কের দিকে যাত্রা করব। এরপর প্রতিবছরের ন্যায় রাতে শ্রীকৃষ্ণ পূজার বিশেষ অংশ থাকবে।”
সরকার পরিপূর্ণ নিরাপত্তার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাসুদেব ধর।
দুইদিন ব্যাপী আয়োজিত জন্মাষ্টমী উৎসবের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার বেলা ৩টায় হবে আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার জানিয়েছেন।
সনাতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস জন্মাষ্টমী ব্রত (উপবাস) পালনে সমস্ত পাপমোচন ও পূণ্যলাভ হয়। যারা নিয়মিত এ ব্রত পালন করেন, তাদের সৌভাগ্য, আরোগ্য ও সন্তান লাভ হয়। এছাড়া পরকালে স্বর্গপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়।

জন্মাষ্টমী উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এক বাণীতে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও।
হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ধর্মাবতার শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি ‘শুভ জন্মাষ্টমী’ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “সমাজে সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে শ্রীকৃষ্ণ আজীবন ন্যায়, মানবপ্রেম ও শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। শ্রীকৃষ্ণ যেখানেই অন্যায়-অবিচার দেখেছেন, সেখানেই অপশক্তির হাত থেকে শুভশক্তিকে রক্ষার জন্য আবির্ভূত হয়েছেন।
“সৃষ্টিকর্তার বন্দনা ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শ্রীকৃষ্ণের দর্শন ও মূল্যবোধ সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সকলকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।”
ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রীতির এই বন্ধনকে অটুট রাখতে বদ্ধপরিকর বলেও বাণীতে বলেন তিনি।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান ফেইসবুক পেইজে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি তাদের অব্যাহত কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনা করেন।
তারেক রহমান লিখেছেন, "ভগবান শ্রী কৃষ্ণ দ্বাপর যুগে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং দুষ্টদের বধ করে এই পৃথিবীকে পাপ থেকে মুক্ত করেছিলেন। আবহমানকাল ধরে এই ধর্মীয় উৎসবটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। উৎসব সার্বজনীন ও সম্প্রদায়গত বিভাজনকে সংযুক্ত করে মানুষকে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করে। মানব সমাজকে এক শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। তাদের মধ্যে সৃষ্টি করে এক অনন্য সংহতিবোধ। আনন্দরুপ বিনম্রতায় সমাজে সকলকে এক অভিন্ন আন্তরিকতায় আপ্লুত করে।

“সকল ধর্মের মর্মবাণী সম্প্রীতি, মানব কল্যাণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। যুগে যুগে ধর্ম প্রচারকগণ মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখিয়ে গিয়েছেন। ভগবান শ্রী কৃষ্ণ পাপিদের দুর করার জন্য অনেক মহৎ কাজ করেছেন, তাদের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি ইতিহাস বর্তমানে মানবসমাজের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে। তিনি অন্যায়, অনাচার ও দুঃশাসনকে দমন করে পৃথিবীতে ন্যায়, সত্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করে সমাজে সদাচারী ও নিরপরাধ মানুষদের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তি দান করেছিলেন। গণবিরোধী স্বৈরশক্তি দেশে দেশে মানুষের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ণের খড়গ নামিয়ে আনে। শ্রীকৃষ্ণের বাণী ও কৃতকর্ম অনুসরণে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শিক্ষা থেকে অসহায় ও মজলুম মানুষ প্রেরণা লাভ করবে।
ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বাংলাদেশের সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশীরা কখনোই ঔদার্য, পারস্পরিক শুভেচ্ছাবোধ ও অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা হারায়নি। এখানে সকল ধর্মের মানুষেরা যুগ যুগ ধরে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সেই বন্ধন অটুট রাখতে দৃঢ় অঙ্গিকারাবদ্ধ।"
এদিকে, জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা উপলক্ষে শনিবার ঢাকার বেশকিছু সড়ক বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ‘যথাসম্ভব’ এড়িয়ে চলাচল করতে অনুরোধ জানিয়েছে ডিএমপি।
শোভাযাত্রা চলাকালীন নগরবাসীকে বিকল্প সড়কে চলাচল করতে অনুরোধ জানিয়ে সকলের ‘সর্বাত্মক সহযোগিতা’ চেয়েছে পুলিশ।