Published : 22 Jun 2026, 08:06 PM
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দেশের ছয় জেলায় মোতায়েন করা সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়েছে সরকার।
এই ছয় জেলায় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বা তার চেয়ে বড় পদের কর্মকর্তারা এই ক্ষমতা পাবেন বলে সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে।
কোস্টগার্ড ও বিজিবিতে প্রেষণে থাকা সমপদমর্যাদার কর্মকর্তারাও এ ক্ষমতার প্রয়োগ করতে পারবেন।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর মহানগর এলাকা এবং নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সেনা কর্মকর্তারা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা পাবেন।
এর আগে রোববার সকালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে দেশের ছয় জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার বরাবর লেখা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, "কার্যক্রম নিষিদ্ধ বিভিন্ন সংগঠন দেশের বিভিন্ন স্থানে বেআইনি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পাশাপাশি জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
"এমতাবস্থায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা, গোপালগঞ্জ জেলা এবং ফরিদপুর জেলার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জনগণের জানমালের সুরক্ষার লক্ষ্যে ২২ জুন হতে ৩০ জুন পর্যন্ত 'ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার'-এর আওতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল।"
সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর এর কারণ ব্যাখ্যা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ।
সোমবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের 'অপতৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায়’ এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
"কোনো কোনো জায়গায় তাদের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ) অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, সে ব্যাপারে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।"
‘আরো কিছু বিষয়’ আছে জানিয়ে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, “সেগুলো ফাঁস করতে চাই না। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য কিছু মহল অপতৎপরতায় লিপ্ত আছে, সেজন্য আমরা অ্যালার্ট থাকার অংশ হিসাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৬৪, ৬৫, ৮৩, ৮৪, ৮৬, ৯৫(২), ১০০, ১০৫, ১০৭, ১০৯, ১১০, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১৩০, ১৩৩ ও ১৪২ ধারা অনুযায়ী সেনা কর্মকর্তারা ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
এসব ধারায় গ্রেপ্তার ও গ্রেপ্তারের আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা, তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অসদাচরণ ও ছোটোখাটো অপরাধের জন্য মুচলেকা আদায়, মুচলেকা থেকে অব্যাহতি, বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার ক্ষমতা পাবেন বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।
একই সঙ্গে স্থাবর সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বাধা অপসারণ এবং জনগণের ক্ষতির আশঙ্কা করলে সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারবেন তারা।
ফৌজদারি কার্যবিধির যে ১৭ নম্বর ধারায় সেনা কর্মকর্তাদেরকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের এ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেখানে এসব নির্বাহী হাকিমরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, অর্থাৎ জেলা প্রশাসকের অধীনে থাকার কথা বলা আছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ওই বছরের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সে সময় থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা হয়, পুলিশ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে মাঠেই রেখে দেয়। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাও দেয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের জন্য গত ২১ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।
সেই কমিটির সিদ্ধান্তে মে মাস থেকে ধাপে ধাপে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সেই কাজ শেষ হয় ১৫ জুন।
এখন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আরেক দফা ম্যাজেস্ট্রিসি ক্ষমতা দিয়ে ছয় জেলায় সেনা মোতায়েন করল সরকার।
২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে অরাজকতা হতে পারে– এমন আলোচনা কয়েকদিন ধরেই আছে।
এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি 'জরুরি বার্তা'ও পাঠানো হয় পাঠপর্যায়ে।
ওইদিন সারাদেশে পুলিশকে 'প্রয়োজনীয় সতর্কতার' পাশাপাশি 'নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা' নিতে নির্দেশনা দেয় সদর দপ্তর।
সেখানে বলা হয়, সেদিন দলটির কর্মীরা দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার নিয়ে প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারে। এর ফলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে এনসিপির নেতাকর্মী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সাথে 'সংঘর্ষ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে'।
“পাশাপাশি তাদের কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপর ক্ষুব্ধ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।”