Published : 21 Aug 2026, 12:14 AM
ফেনীর সোনাগাজীর আগুনে পুড়িয়ে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের রায় ঘোষণার দিন সোমবার ধার্য করেছে হাই কোর্ট।
শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাই কোর্ট বেঞ্চ রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করেন।
হত্যাকাণ্ডের সাত মাসের মাথায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয় শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য গত ১০ জুন হাই কোর্টের এই বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।
১৪ জুন বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু হয়। সাত বছর আগের এ হত্যা মামলার শুনানি শুরু হয় ২৮ জুলাই। টানা ১৭ কার্যদিবস শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়।
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও মুহাম্মদ শিশির মনির।
রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির এবং দুই সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আশরাফুল আলম ও মাহবুবা তাসনিম আখি। এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ইমাম হোসেন তারেক উপস্থিত ছিলেন।
আদালতের আদেশের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১৭ কার্যদিবসের শুনানিতে সরকার পক্ষ কোনো সময় নেয়নি বা মুলতবি চায়নি।“
রাষ্ট্রপক্ষ পেপারবুক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শুনানি শুরু করে তুলে ধরে সৈয়দ ইজাজ বলেন, এরপর ১৬ জন আসামির আইনজীবীরা তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বুধবার প্রথমার্ধে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে রাষ্ট্রপক্ষ চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়া শুরু করে, যা বৃহস্পতিবার শেষ হয়।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছে জানিয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “এখন ন্যায়বিচারের দায়ভার আদালতের ওপর। আসামিপক্ষ এ দেশের নাগরিক, ভিকটিমও এ দেশের নাগরিক। আমরা চাই না কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির সাজা হোক।”
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে তাকে সাজা দেওয়া ঠিক নয়।”
দণ্ডিত বা আপিলকারী ব্যক্তির আইনি প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা রয়েছে তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত যিনি দোষী, তিনি যেন শাস্তি পান। আর যদি কোনো ব্যক্তি যদি দোষী না হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি যেন নিরপরাধ হিসেবে ঘোষিত হন।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে বা তদন্তকারী সংস্থা তথ্য অনুসন্ধানের আগেই বিভিন্ন ধরনের বয়ান তৈরি হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তো এরকম মিডিয়া ট্রায়ালের যেন কেউ শিকার না হন। শুধুমাত্র আলোচিত ঘটনায় এরকম একটা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যেন কোনো কারণে কোনো ব্যক্তির বিচার না করা হয়, সেই বিষয়টাও আমি আদালতকে বলেছি।”
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মূল কাজ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। প্রকৃত দায়ীরা শাস্তির আওতায় আসবেন এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি আগে দণ্ডিত হয়ে থাকলে তিনিও আইনি প্রতিকার পাবেন বলে তিনি আশা করছেন।
নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ হাই কোর্টের অনুমোদন ছাড়া চূড়ান্ত হয় না তুলে ধরে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আইনি মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়ে প্রকৃত অপরাধীরাই শাস্তির আওতায় আসবে।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্র সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
পাঁচ দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান তিনি।
এর আগে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন নুসরাত।
ওই ঘটনায় নুসরাতের মা মামলা করার পর ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সিরাজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার মুক্তি দাবিতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ও মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী মানববন্ধনে নামে। মামলা তুলে নিতে ক্রমাগত হুমকি দেওয়া হয় নুসরাতের পরিবারকে।
মৃত্যুর আগে ৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকদের কাছে জবানবন্দিতেও অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যান এই তরুণী।
নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার দুদিন পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান আটজনের নাম দিয়ে ও অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর তা হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
প্রথমে সোনাগাজী থানার পরিদর্শক কামাল হোসেন মামলাটি তদন্ত করলেও পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ ওঠায় পরে তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ওই বছরের ২৯ মে পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন।
নিম্ন আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই ১৬ আসামি হলেন মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির তৎকালীন সহ-সভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল।
২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর ডেথ রেফারেন্সের জন্য মামলার নথিপত্র হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায়। চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেথ রেফারেন্সের জন্য পেপারবুক তৈরি করা হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন।
এদিকে শ্লীলতাহানির ঘটনায় নুসরাতকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও ধারণ করে তা প্রচারের ঘটনায় সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যারিস্টার ছায়েদুল হক সুমন আইসিটি আইনে একটি মামলা করেন।
এই মামলায় ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর আদালত ওসি মোয়াজ্জেমকে আট বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে।