Published : 02 Dec 2025, 12:56 AM
বছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে বিভিন্ন দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছেন মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের শিক্ষকরা। তাদের বিভিন্ন অংশের একের পর এক আন্দোলনের কর্মসূচিতে পড়ালেখায় ছেদ পড়ছিল মাঝেমধ্যেই; এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে বার্ষিক পরীক্ষা।
সবশেষে সাত শতাধিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দাবি আদায়ে সোমবার থেকে কর্মবিরতি শুরু করেছেন। ফলে এসব স্কুলের চলমান বার্ষিক পরীক্ষা মাঝপথে শিকেয় উঠেছে।
দাবি আদায়ের এ আন্দোলনে সরকারের তরফের হুঁশিয়ারিকেও আমলে নিচ্ছেন না তারা। কর্মবিরতির কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এতে করে সোমবার দেশজুড়ে ৬৫ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনেকগুলোতেই তা হয়নি। কারণ শিক্ষকরা কর্মবিরতির অংশ হিসেবে এ পরীক্ষা বর্জন করেছেন।
তাদের আগে থেকেই ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলনে ছিলেন। গত এক মাস ধরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন তারা।
এর আগে দশম গ্রেডে বেতনের দাবিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা টানা আন্দোলন চালিয়ে যেতে জড়ো হয়েছিলেন ঢাকায়। পরে একাদশ গ্রেডে উন্নীত করতে সরকারের আশ্বাসে মাসখানেক পর ফিরে যান শ্রেণিকক্ষে।
এমন প্রেক্ষাপটে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পরীক্ষা ব্যাহত হলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আর বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ করে শিক্ষকদের আন্দোলন উদ্বিগ্ন করছে অভিভাবকদের। তাদের পাশাপাশি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গবেষকরা পেশাদারত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, শিক্ষাবর্ষের শেষাংশে এসে তাদের এ অবস্থান সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।

সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত
শিক্ষাবর্ষের শেষ প্রান্তে এবার কোনো স্কুলে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আবার কিছু স্কুলে ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকে শুরুর সূচি ঠিক ছিল। বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতের পাশাপাশি সরকারিগুলোতেও সোমবার থেকে পরীক্ষা শুরুর কথা ছিল। শিক্ষার্থীদের অনেকেই তাদের স্কুলে হাজির হয়েছিলেন।
তবে ৭২১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চার দফা দাবিতে আগেই কর্মবিরতির ঘোষণা দেন। সোমবার থেকে বর্জন করেন পরীক্ষা। ফলে স্কুলগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়।
বৃহস্পতিবার ও রোববার রাজধানীর আব্দুল গণি রোডের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কার্যালয় ‘শিক্ষা ভবন’ চত্বরে ‘বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি-বাসমাশিসের’ ব্যানারে চার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালনের পর তারা এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চারটি দাবি হল-
>> সহকারী শিক্ষক পদ নবম গ্রেডে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত ও দ্রুত সময়ে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন করে গেজেট প্রকাশ।
>> বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত শিক্ষকদের বিভিন্ন শূন্যপদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন।
>> সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে বকেয়া টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশ তিন কর্মদিবসের মধ্যে দেওয়া।
>> ২০১৫ সালের পূর্বের মতো সহকারী শিক্ষকদের ২-৩টি ইনক্রিমেন্টসহ অগ্রিম বর্ধিত বেতন সুবিধা বহাল করে গেজেট প্রকাশ।
সোমবার থেকে রাজধানীর সবুজবাগ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন স্কুলটির সিনিয়র শিক্ষক ও বাসমাশিসের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আব্দুস সালাম।
তিনি বলেন, "চার দাবিতে মাউশি চত্বরে দুই দিন অবস্থান কর্মসূচি পালনের পরও আমাদের সঙ্গে সরকার বা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কেউ আলোচনা করেননি। তাই আমরা কর্মবিরতি শুরু করেছি। স্কুলগুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত আছে।"
শেরপুর সরকারি ভিক্টোরিয়া একাডেমিতে বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত আছে বলে জানান স্কুলটির সহকারী শিক্ষক আনিস রহমান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমাদের স্কুল কর্তৃপক্ষ গত রাতেই পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে নোটিস জারি করেছে।
"সহকারী শিক্ষকদের বছরের পর বছর বঞ্চিত করা হচ্ছে। আমাদের দাবিগুলো মেনে নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত ও দ্রুত সময়ে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন করতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।"
চট্টগ্রামের পটিয়ার আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্কুলটির সহকারী শিক্ষক মুহাম্মদ মাহফুজুল আলম।
এছাড়া ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল, রাজধানীর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, চট্টগ্রামের হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলসহ বেশ কিছু সরকারি স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার স্থগিত রেখে শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

কর্মবিরতিতে প্রাথমিকের শিক্ষকদের একাংশও
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের একাংশও সোমবার শুরু হতে যাওয়া বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত রেখে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেছেন।
‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের’ ব্যানারে কয়েক দিন আগে তারা দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দাবিতে আন্দোলন করেন। পরে ১১তম গ্রেডে বেতনের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করেন।
নোয়াখালী সদর উপজেলার ত্রিপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করে শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করছেন বলে তথ্য দিয়েছেন ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের’ আহ্বায়ক ও স্কুলটির শিক্ষক মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ।
তিনি বলেন, “অর্থ মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস অনুযায়ী তিন দফা দাবির মধ্যে ১১তম গ্রেডের প্রজ্ঞাপন জারি ও অন্যান্য দাবি বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় আমরা পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করছি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আপাতত ১১তম গ্রেডসহ তিন দফা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণদিবস কর্মবিরতি কর্মসূচি চলবে।
“সোমবার থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও আমরা সে কর্মবিরতিতে অটল আছি, বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত আছে।”
ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার চাঁনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও কর্মবিরতি পালন করেছেন বলে জানিয়েছেন স্কুলটির শিক্ষক ও পরিষদের আরেক আহ্বাবায়ক মো. আবুল কাসেম।
একইভাবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষকদের কর্মবিরতির কারণে পরীক্ষা না হওয়ার খবর এসেছে।
এদিকে গ্রেড ও পদোন্নতি নিয়ে জটিলতা নিরসনের তিন দাবি পূরণে আগের সপ্তাহের মঙ্গলবার থেকে ‘তিন দিনের পূর্ণদিবস কর্মবিরতি’ পালন শেষে গত রোববার থেকে ক্লাসে ফিরেছেন প্রাথমিকের শিক্ষকদের আরেক অংশ।
১২টি সংগঠনের মোর্চা ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ’ এর অনুসারী শিক্ষকরা বার্ষিক পরীক্ষা নিয়েছেন।
এ মোর্চাভুক্ত সংগঠন ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের’ সভাপতি শাহীনুর আল আমিন বলেন, “আমরা তিন দিন লাগাতার কর্মবিরতি পালন শেষে রোববার থেকে ক্লাসে ফিরেছি। সোমবার থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে, আমরা বাচ্চাদের জিম্মি করে কোন কর্মসূচি নেব না।”
ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাঘাসুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বার্ষিক পরীক্ষা নিয়েছেন বলেছেন স্কুলটির এই সহকারী শিক্ষক।
তিনি বলেন, “১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বার্ষিক পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ করে আমরা ১১ ডিসেম্বর থেকে অনশন কর্মসূচি শুরু করব।”

ননএমপিও শিক্ষকরাও টানা আন্দোলনে
স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে সোমবার ৩০তম দিনের মত রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষকরা।
‘ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঐক্য পরিষদ’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে এমপিওভুক্ত নয় এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা সরকারি বেতনভাতার তালিকাভুক্তি বা এমপিওভুক্তির দাবিতে এ কর্মসূচি চালাচ্ছেন।
গত ২ নভেম্বর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন ‘দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়া’ ননএমপিও শিক্ষকরা।
এর আগে গত রোজার সময় এসব শিক্ষক এমপিওভুক্তির দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ১৭ দিনের লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।
পরিষদের সাংগঠনিক সমন্বয়ক অধ্যক্ষ মুনিমুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তখন বলেছিলেন, “সেসময় মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষা সচিব মহোদয় শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সে আশ্বাস আলোর মুখ দেখেনি। এদিকে বেতন-ভাতা না পাওয়া ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক কর্মচারীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। বেতন না পেয়ে আমরা আর্থিক সংকটে, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছি।“
ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি সরকারের
শিক্ষকদের এমন আন্দোলনের মধ্যে দেশব্যাপী সরকারি ও বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক এবং স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বার্ষিক, নির্বাচনি ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা ২০২৫ নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর-মাউশি। পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষক বা কর্মকর্তার যেকোনো ধরনের শৈথিল্য বা অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে বিধান অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করা হয়েছে।
সোমবার অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ১৭ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বার্ষিক পরীক্ষা ২০ নভেম্বর থেকে ৭ ডিসেম্বরএবং নির্বাচনি পরীক্ষা ২৭ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে।
একই সঙ্গে মাউশির আগের নির্দেশনা অনুযায়ী জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা ২৮ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হবে।
আদেশে বলা হয়, পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষক বা কর্মকর্তার যেকোনো ধরনের শৈথিল্য বা অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে বিধান অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চিঠিটি সব জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ঠিকমত বার্ষিক পরীক্ষা না নিলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও।
সোমবার থেকে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় সাময়িক পরীক্ষা (বার্ষিক পরীক্ষা) শুরু হবে তুলে ধরে রোববার অধিদপ্তরের এক আদেশে বলা হয়েছে, এই পরীক্ষা গ্রহণে কোনো প্রকার ‘শৈথিল্য বা অনিয়ম’ পরিলক্ষিত হলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অভিভাবকদের উদ্বেগ
শিক্ষকদের দুই পক্ষ বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করায় উদ্বেগ জানিয়েছে অভিভাবকদের সংগঠন অভিভাবক ঐক্য ফোরাম।
ফোরামের সভাপতি জিয়াউল হক দুলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকরা মাঝপথে পরীক্ষা বর্জন করেছেন। এদিকে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের একটি অংশ বার্ষিক পরীক্ষা নেননি। শিক্ষকদের এ অবস্থানে আমরা উদ্বিগ্ন।
"এ দুইপক্ষই সরকারি কর্মচারী৷ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে তাদের এই অবস্থান কখনই কাম্য নয়। তারা সরকারের সঙ্গে তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে আলোচনা করতে পারে, তবে শিক্ষার্থীদের তারা জিম্মি করবেন সেটা অভিভাবকরা কখনোই চান না।"
সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে রাজবাড়ীর টাউন মক্তব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেড় ঘণ্টা পর পরীক্ষা হয়েছে। এর আগে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে তুমুল বাক-বিতণ্ডা হয়। পরে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হয়।
ওই স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক কামরুল ইসলাম বলেন, “একটার পর একটা আন্দোলন চলছে। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে, জনগণকে জিম্মি করে এভাবে আন্দোলন চলতে পারে না দেশে।
“শিক্ষকদেরকে সরকার সচিবের গ্রেড দিয়ে দিক, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু কোমলমতি শিশুদের কেন জিম্মি করে আন্দোলন করতে হবে? শিশুরা পরীক্ষা দিতে আসছে, কিন্তু তারা পরীক্ষা নেবেন না।”

দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান
পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে শিক্ষকদের আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা গবেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন এখন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হলে এটি তাদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। তাই শিক্ষকরা তাদের ন্যায় সংগত দাবি পূরণে সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু পরীক্ষা বন্ধ রেখে দাবি আদায়ের চেষ্টা হবে সেটা দেশ-জাতির কাছে কাম্য নয়। শিক্ষকরা পরীক্ষার মধ্যেও তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চালাতে পারেন।
"সামনে নির্বাচন আসছে, তখন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এমন বাস্তবতায় শিক্ষকরা পেশাদারিত্ব ধরে রেখে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষা ও পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন সেটাই সবার প্রত্যাশা।"
বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করে শিক্ষকদের এ কর্মসূচি সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ এর পরিচালক অধ্যাপক মো. আজম খান।
তিনি বলেন, "শিক্ষকদের ন্যায় সংগত লাভের সঙ্গে আমরাও একমত, আমরাও চাই শিক্ষকরা যথাযথ বেতনভাতা পাক। কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ করে তাদের এই আন্দোলন অভিভাবক-শিক্ষার্থী তথা পুরো সমাজেই তাদের বিষয়ে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।
"বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে তারা এ আন্দোলন চালাতে পারতেন, কিন্তু দেশের বর্তমান বাস্তবতায় হঠাৎ পরীক্ষা বন্ধ করে এ আন্দোলন অভিভাবকরা ভালো চোখে দেখবেন না। এর ফলে শিক্ষকদের ন্যায়সংগত দাবিগুলো জনসমর্থন হারাতে পারে। শিক্ষকরা বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্বশীল পেশাদার আচরণ করবেন বলে আমি আশা করছি।"