Published : 07 Mar 2026, 12:39 AM
দুদিন ধরেই ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে যানবাহনের লম্বা সারি। পেট্রোল আর অকটেন পেতে গভীর রাতেও কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলকে অপেক্ষমান দেখা গেছে। দিনের বেলাতে ভিড় আরও বেড়েছে। তেল নিতে গিয়ে হাতাহাতির মতো অপ্রীতিকর ঘটনারও খবর আসছে।
তবে ঢাকার পেট্রোল পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের সংকট নেই। তবে গত দুদিনে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ট্যাংক ভরে তেল নেওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারের তিনটি ডিপো বাড়তি চাহিদার যোগান দিতে পারছে না।
এ পরিস্থিতিতে যানবাহনে তেল নেওয়ার সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। দিনে ট্রিপ প্রতি মোটরসাইকেলে ২ লিটার, প্রাইভেট কারে ১০ লিটার, এসইউভি (জিপ) বা মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার এবং ডিজেল চালিত পিকআপ বা লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস-ট্রাক-কভার্ড ভ্যানে ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল নেওয়া যাবে।
বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব বলছেন, “আমি গাড়িতে সপ্তাহে একবার তেল কিনি। কিন্তু কাল দেখলাম সরকার থেকে বলেছে জ্বালানি তেলে সাশ্রয়ী হতে। ওই নিউজ ছড়িয়ে পড়ার পর অফিসের অনেকেই দেখলাম তেল কিনতে ছুটছে।

“রাতের বেলা আমিও গেলাম। বিরাট লাইন দেখে ফিরে এসেছি। সকাল বেলা অবশ্য অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই তেল কিনতে পেরেছি। তবে এর পরেই আবার ভিড় বেড়ে গেছে।”
ভিড়ের কারণে সংকট তৈরি হলেও এমনিতে দেশে পেট্রোল-অকটেনের সংকট নেই জানিয়ে পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বলছেন, “মানুষ প্যানিকড হয়ে ভিড় করে তেল কিনছে। আসলে কিন্তু পেট্রোল-অকটেনের সংকট আগামী একমাসের মধ্যে হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। যথেষ্ট তেল আছে। আর এটা লোকালি প্রডিউস হয়।
“পেট্রোল-অকটেনের মোটে ২০ শতাংশ আমদানি হয়। এটার তো সংকট হওয়ার কোনো কারণ নেই। ডিজেলটা যেহেতু আমদানি করতে হয়, ডিজেলে একটু সংকট হতে পারে। তবে ঈদের মৌসুমেও ডিজেলের সমস্যা হওয়ার কোনো কারণ নেই। ঈদ পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়ার মজুদ আছে।”
হাই কোর্টের উল্টো দিকে ঢাকার অন্যতম পুরনো ফিলিং স্টেশন রমনা পেট্রোল পাম্পের মালিক নাজমুল হক বলছেন, “আমার পাম্পে প্রতিদিন ১৫ হাজার লিটার তেল বিক্রি হয় শুধু মোটরসাইকেলে। আর ধরেন ১০ থেকে ১২ হাজার লিটার প্রাইভেট কারে বেচি।
“এই যে ১৫ হাজার লিটার বেচি এখানে ৫ শতাংশ মোটরাসাইকেলও ট্যাংক ফুল করে তেল নেয় না। আর এখন শতভাগ মোটরাসাইকেল ট্যাংক ফুল করে নিচ্ছে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) ৩৫ হাজার লিটার তেল চলে গেছে মোটরসাইকেলে। সব ট্যাংকি ফুল।

“গাড়ি ঢুকলেই ট্যাংকি ফুল। একেকটা গাড়ির ট্যাংক ফুল করতে ৫০ থেকে ৫২ লিটার তেল লাগে। আমি গতকাল ৫২ হাজার লিটার তেল তুলছি, শেষ হয়ে গেছে। এটা তো আমাদের বা সরকার কারও পক্ষেই সামাল দেওয়া সম্ভব না। এখানে সরকারের কী করার আছে!”
পাম্পের মজুত দ্রুত ফুরানোর কারণে তাদের তেল আনতে ছুটতে হচ্ছে সরকারি ডিপোতে। কিন্তু বাড়তি চাহিদার কারণে সেখানে ট্যাংক লরির লাইন পড়ে গেছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়।
নাজমুল হক বলছেন, “ঢাকার রাইড শেয়ারিং মোটর সাইকেল চালকরা সাধারণত দুইশ টাকার তেল কিনে রাইড শেষ করে আবার কেনেন। এখন তারা একেকজন ট্যাংক ভরে কিনছেন। আর সাধারণ বাইক ব্যবহারকারীরা যেখানে ৫০০ টাকার বেশি তেল নিতেন না, তারাও ট্যাংক ফুল করছেন।
“প্রাইভেট কার ওনার যারা- ১০ থেকে ১৫ লিটার করে তেল নিতেন, তারা এখন ট্যাংক ফুল করছেন। এটা আমাদের ১০ বছরের অভিজ্ঞতা। এখন তো আমরা তেল বেচে কোনো কুল পাচ্ছি না। এরকম চললে সরকার সামলাবে কী করে!”
বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে হাতাহাতি, মারামারি করছেন মোটরাসাইকেল চালকরা—এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
পেট্রোল পাম্প মালিকদের আরেকটি সংগঠন পেট্রোল পাম্প ডিলার্স অ্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মীর আহসানউদ্দীন পারভেজ বলছেন, “আসলে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে হতাশা ও উদ্বেগ থেকে মানুষ বেশি বেশি করে তেল কিনছে। পাম্পগুলোতে তেল বিক্রি বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।

“এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। সরকার তো আর এতো এতো তেল দিতে পারছে না।”
অনেক পাম্পে অপ্রীতিকর ঘটনা ও হাতাহাতিও ঘটছে জানিয়ে এ জ্বালানি ব্যবসায়ী বলছেন, “আমাদের কাছে সারা বাংলাদেশের খবর আসতেছে। লোকজনের ভিড় বেশি ঢাকা ও চট্টগ্রামে। এর বাইরে কুমিল্লা, ফেনী, যশোর, খুলনাতেও ভিড়ের কথা শোন যাচ্ছে। তবে বরিশালে এরকম ভিড় দেখা যাচ্ছে না।
“পাম্পগুলোতে বেশি ভিড় মোটরসাইকেল চালকদের। তারা বিশৃঙ্খলাও করছেন অনেক জায়গায়। হাতাহাতি, অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। পাম্পের স্টাফরা আর কতো সামাল দেবে! তারা তো তেল দিয়ে, ক্যাশ বুঝে নিয়েই কুল পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে আমরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করি।”
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, কবে শেষ হবে তাও এখনও নিশ্চিত নয়। এখন আমাদের সংকট নেই, কিন্তু দুদিন পরে সংকট হলে তখন আমরা কী করব? তাই আমরা চেষ্টা করছি আমাদের যেটুকু আছে তা নিয়ে বেশিদিন চালানোর।”
তিনি বলেন, “মানুষের দায়িত্ব এখন বেশি; সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে। সচেতন হলে আমরা সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব আশা করি।”