Published : 12 Aug 2026, 04:42 PM
শেরপুরে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার আসামি কারাগারে মারা যাওয়ার পরও তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে হাই কোর্ট যে রায় দিয়েছিল, অবশেষে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
একইসঙ্গে মামলাটি কার্যক্রমও সমাপ্ত ঘোষণা করেছে উচ্চ আদালত।
কান্তি মারাক নামে এ আসামি রায় ঘোষণার প্রায় পাঁচ বছর আগেই গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে মারা যান। তিনি ছিলেন মামলার একমাত্র আসামি।
তবে গেল ১ জুলাই বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাই কোর্ট বেঞ্চ আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর দুই দিন শুনানি শেষে বিচারিক আদালতে কান্তি মারাকের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখে রায় দিয়েছিল।
বুধবার হাই কোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ রায়টি প্রত্যাহার করে আসামির মৃত্যুর কারণে তার বিরুদ্ধে চলমান ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ইমাম হোসেন তারেক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক প্রমাণ (মৃত্যুসনদ) পাওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ স্বাক্ষর না হওয়া রায়টি প্রত্যাহার ও মামলার সমাপ্তি ঘোষণা চেয়ে এদিন হাই কোর্টে আবেদন করে।
তিনি বলেন, “কান্তি মারাকের মৃত্যুর বিষয়টি আদালতের জানা না থাকায় প্রথমে তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেওয়া হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর তথ্য আদালতের নজরে আনা হলে আগের রায়টি প্রত্যাহার ও মামলার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।”
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী থানার বাসিন্দা ওই শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে বলে অভিযোগ করা হয়। ওইদিন বিকাল থেকে নিখোঁজ ছিল মেয়েটি। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে প্রতিবেশীর কান্তি মারাকের ঘরের মেঝেতে রক্তের দাগ থাকা হাফ প্যান্ট পাওয়া যায়। পরে আসামির বসতবাড়ির পাশে পানি সেচের ড্রেন থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটির মৃতদেহ।
এ ঘটনায় নিহত শিশুর দাদা কান্তি মারাকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নালিতাবাড়ী থানায় মামলা করেন। গ্রেপ্তারের পর কান্তি মারাক আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছিলেন।
এ মামলায় বিচারিক আদালতে বিচার শেষে ২০১৯ সালে কান্তির মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। তা অনুমোদনের জন্য ওই বছরেই ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাই কোর্টে আসে।
কিন্তু এর মধ্যেই ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি কান্তি মারাকের মৃত্যু হয়েছে বলে কারা কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করে কাশিমপুর কারাগার কর্তৃপক্ষ।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ইমাম হোসেন তারেক বলেন, কান্তি মারাকের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীও শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। দুই পক্ষের শুনানি শেষে আদালত ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ করে তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে।
তিনি বলেন, রায় ঘোষণার পর কান্তি মারাকের মৃত্যুর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতের নজরে আনে।
ইমাম হোসেন বলেন, শুধু সংবাদে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আদালত আগের রায় প্রত্যাহার করতে পারেনি। কারণ এটি মৃত্যুদণ্ডের ডেথ রেফারেন্সের মামলা ও আসামির মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষ কাশিমপুর কারাগারের জেলারের কাছে চিঠি দিয়ে কান্তি মারাকের মৃত্যুর তারিখ, কারণ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চায়।
পরে কারা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক চিঠির সঙ্গে মৃত্যুসনদ পাঠিয়ে ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি কান্তি মারাকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে।
মৃত্যুসনদে যা আছে
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের এক চিঠিতে কান্তি মারাকের মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে।
গেল ২৮ জুলাই কারাগার থেকে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, “২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি সকালে কান্তি মারাক হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সকাল ৮টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”
ওই চিঠির সঙ্গে কান্তি মারাকের মৃত্যুসনদের অনুলিপিও সংযুক্ত করা হয়েছে। মৃত্যুসনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘ব্রট ডেড’ (হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে আনার আগে মৃত্যু) তুলে ধরা হয়েছে।
রায় প্রত্যাহার যেভাবে
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ইমাম হোসেন বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩১ ধারার আলোকে আসামির মৃত্যুর সঙ্গে তার বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি কার্যক্রমও শেষ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, কান্তি মারাক ২০২১ সালেই মারা যাওয়ায় ওই সময় থেকেই তার বিরুদ্ধে এই ফৌজদারি কার্যক্রম আর চলার সুযোগ ছিল না। কিন্তু আদালতের কাছে তখন তার মৃত্যুর তথ্য ছিল না।
হাই কোর্ট যে রায দিয়েছিল, তাতে তখনও বিচারকদের স্বাক্ষর হয়নি তুলে ধরে তিনি বলেন, ফলে সেটি আদালতের এখতিয়ারের মধ্যেই ছিল এবং আদালত সেটি প্রত্যাহার করতে পেরেছে।
আরও পড়ুন: