১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘নিখোঁজ’ ব্যক্তিদের ৬৮% বিএনপির, জামায়াতের ২২%: গুম কমিশনের প্রতিবেদন

গুমের ১৫৬৯ অভিযোগ তুলে ধরে কমিশন বলেছে, এসব ঘটনা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ, অনেকগুলোর ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে সরাসরি ‘নির্দেশদাতা’।

‘নিখোঁজ’ ব্যক্তিদের ৬৮% বিএনপির, জামায়াতের ২২%: গুম কমিশনের প্রতিবেদন
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্ত করেন গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সদস্যরা। ছবি: পিআইডি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 04 Jan 2026, 09:41 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:30 PM

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিদের্শে গুমের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলেছে এ সংক্রান্ত ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি’। 

কমিশনের দেওয়া প্রতিদেনের তথ্য অনুযায়ী, যারা এখনো নিখোঁজ তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

গুমের ১৫৬৯ অভিযোগ তুলে ধরে কমিশন বলেছে, এসব ঘটনা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ।

রোববার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিশন। 

বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশন প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে বরে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে। 

ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ‘গুম ও আয়নাঘরের’ বিষয়টি আবার সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে এসে এসব ঘটনা তদন্তে গত ২৭ অগাস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের গুম তদন্ত কমিশন গঠন করে।

কমিশন গত ১৪ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী একটি প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়। পরদিন ওই প্রতিবেদনের কিছু অংশ প্রকাশ করা হয়।

ওই প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ‘গুমের নির্দেশদাতা’ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হয়।

এরপর ৪ জুন দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেয় কমিশন। সেখানে ‘গুমের’ শিকার ব্যক্তি এবং প্রত্যক্ষদর্শী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বরাতে নির্যাতান ও স্বীকারোক্তি আদায়ের সচিত্র বর্ণনা দেওয়া হয়।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামল কমিশনের বিবেচনায় আনা হচ্ছে।

গেল ৮ অক্টোবর গুমের দুই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। এছাড়া সাবেক কয়েকজন সেনাকর্মকর্তাও বিচার প্রক্রিয়া চলছে।

কমিশন প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছে, মোট ১৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্ত কমিশনে জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ (নিখোঁজ ও মৃত) ক্যাটাগরিতে পড়েছে।

এখনো অনেকে অভিযোগ নিয়ে আসছেন তুলে ধরে কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার হতে পারে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেকের সাথে যোগাযোগ করলে তাদের মাধ্যমে আরও ‘ভিক্টিমের’ খোঁজ পাওয়া যায়, যারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেননি, আমাদের সম্পর্কে জানেন না কিংবা অন্য দেশে চলে গেছেন। এমন অনেকেই আছেন, যাদের সাথে আমরা নিজ থেকে যোগাযোগ করলেও তারা ‘অনরেকর্ড’ কথা বলতে রাজি হননি।’ 

বলপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে তুলে ধরেন কমিশন সদস্যরা। তারা বলেন, তারা যে ডেটা পেয়েছেন তা দিয়ে প্রমাণিত যে, এটি ‘পলিটিক্যালি মোটিভিটেড ক্রাইম’। 

প্রতিবেদনের বরাতে কমিশন বলেছে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরেছেন, তাদের ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। 

“হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।” 

এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, আহমদ বিন কাসেম, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। 

কমিশন সদস্যরা বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে অনেকগুলো গুমের ক্ষেত্রে সরাসরি ‘নির্দেশদাতা’। তাছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে ‘রেন্ডিশনের (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে হস্তান্তর)’ যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে করে এটি স্পষ্ট হয় যে সরকারের ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ের’ নির্দেশেই এগুলো হয়েছে। 

কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। জাতির পক্ষ থেকে আমি এই কমিশনের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা যে ঘটনা বর্ণনা করলেন, পৈশাচিক বলে যে শব্দ আছে বাংলায়, এক কথায় বললে এই ঘটনাগুলোকে সেই শব্দ দিয়েই বর্ণনা করা যায়। 

“এই নৃশংস ঘটনার মধ্য গিয়ে যারা গিয়েছেন, আপনারাও তাদের সঙ্গে কথা বলার মধ্য দিয়ে, তাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেই নৃশংস ঘটনাগুলো দেখেছেন। দৃঢ় মনোবল ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করা যেত না।”

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে, সেটার ডকুমেন্টেশন এই রিপোর্ট। মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে, কত বিভৎস হতে পারে- এইটা তার ডকুমেন্টেশন। 

“যারা এই ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে তারা আমাদের মতোই মানুষ। নৃশংসতম ঘটনা ঘটিয়ে তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। জাতি হিসেবে এই ধরনের নৃশংসতা থেকে আমাদের চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে। এই নৃশংসতা যেন আর ফিরতে না পারে সেই প্রতিকারের পথ খুঁজে বের করতে হবে।”

প্রতিবেদনগুলো সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এছাড়া কমিশনকে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা ও ভবিষ্যতের করণীয় পেশ করার বিষয়েও নির্দেশ দেন তিনি।

এছাড়া, আয়নাঘরের পাশাপাশি যেসব জায়গায় বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে, সে জায়গাগুলো ম্যাপিং করতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। 

কমিশন বলেছে, তদন্ত অনুযায়ী বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশের গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। 

এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুম করে ফেলার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে।

প্রধান উপদেষ্টাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যরা। তাদের মতে, প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থান ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন হতো না। 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুর্নগঠন করে এই কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে আহ্বান জানান এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের ব্যাপারে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন।

এসময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। 

উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া।

গুম: শেখ হাসিনা ‘নির্দেশদাতা’, প্রমাণ পাওয়ার দাবি কমিশনের

‘গুমের’ পেছনে ‘সরকার-সুবিধাভোগীরা’, কমিশনের প্রতিবেদনের পরতে পরতে চমকে দেওয়া তথ্য

গুমের দুই মামলায় ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল

গুমে জড়িতরা এখনো ক্ষমতার কেন্দ্রে, ভিকটিমদের দিচ্ছে হুমকি: গুম সংক্রান্ত কমিশন

গুম কমিশনের প্রতিবেদন: ‘জোর করে’ জবানবন্দি, ‘জড়িত’ ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেটরাও