Published : 31 Mar 2026, 06:14 PM
আওয়ামী লীগের দেড় দশকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় লক্ষাধিক ‘অমুক্তিযোদ্ধা’কে অন্তর্ভুক্ত করে ভাতাসহ নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
তিনি বলেছেন, “ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলে কিছু নেই, এরা অমুক্তিযোদ্ধা। তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় সন্নিবেশিত করে ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা দিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে টাঙ্গাইল-৭ আসনের সরকার দলীয় সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এদিন সংসদ অধিবেশন শুরু হয়।
মন্ত্রী আযম খান বলেন, “সারা বাংলাদেশে এই ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৭ বছরে এরকম অসংখ্য লক্ষাধিক অমুক্তিযোদ্ধা... তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় সন্নিবেশিত করে ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা দিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
এ ধরনের ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “পর্যায়ক্রমে যারা অমুক্তিযোদ্ধা— তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের যে তালিকা আছে, সেই তালিকা থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত আমরা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেছি এবং সে অনুযায়ী আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।”
আহমেদ আযম খান বলেন, ‘অমুক্তিযোদ্ধাদের’ সব সুবিধা থেকে দূরে রেখে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন করতে চায় সরকার।
তার ভাষায়, “আরো যারা দীর্ঘদিনে বঞ্চিত আছে, যে মুক্তিযোদ্ধারা বঞ্চিত...আমার কাছে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এসেছেন এবং তারা চোখের পানি ফেলে বলেছেন যে স্বাধীনতার পর থেকে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি, আমাদের এখনো মুক্তিযুদ্ধের কোনো সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।”
মন্ত্রী বলেন, সারা দেশে যারা হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাদের যথাযথভাবে তালিকাভুক্ত করে মুক্তিযুদ্ধকে মূল্যায়ন করতে চায় মন্ত্রণালয়।
‘অল্পদিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলা যাবে’
এর আগে সরকার দলীয় গাইবান্ধা-৪ আসনের সদস্য শামীম কায়সার সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার ‘যন্তরমন্তর’ ঘরের মতো ২০০৯ সালের পর থেকে রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার বানানোর চেষ্টা ছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, অনেক রাজাকার গ্রেপ্তার হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে বের হয়েছেন, আবার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাও বঞ্চিত হয়েছেন।
জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, “অমুক্তিযোদ্ধা যারা বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হয়েছে, এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি।”
তিনি বলেন, “অল্পদিনের মধ্যে এই বিষয়ে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে এর সংখ্যাও বলতে পারব এবং জাতির সামনে সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করতে পারব।”
প্রশ্নোত্তরের লিখিত উত্তরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে গাইবান্ধা জেলায় সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ হাজার ৩১৬ জন।
এর মধ্যে গাইবান্ধা সদরে ৪৩৮ জন, গোবিন্দগঞ্জে ২৭১, পলাশবাড়ীতে ১৭৬, ফুলছড়িতে ৩২৭, সাঘাটায় ৬৩৫, সাদুল্লাপুরে ২৯৪ এবং সুন্দরগঞ্জে ২৭৫ জন।
ভাতা বন্ধ, সনদ স্থগিতের অভিযোগ
নোয়াখালী-২ আসনের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আমলে’ অনেক মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সনদও স্থগিত করা হয়েছিল। উপজেলা পর্যায়ে নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা ভবনগুলোরও তদন্ত হওয়া দরকার।
জবাবে আহমেদ আযম খান বলেন, “অনেক মুক্তিযোদ্ধা—যাদের ওই ১৮ বছরের ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে তাদের ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের মুক্তিযুদ্ধের সনদ স্থগিত করা হয়েছিল।”
তিনি বলেন, “বিভিন্নভাবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। আর এর ভেতর দিয়ে অনেক অমুক্তিযোদ্ধাও মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় সন্নিবেশিত হয়ে তারা ভাতা এবং অন্যান্য অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করেছে।”
মন্ত্রী আযম খান বলেন, “এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি...যত দ্রুত সম্ভব করে আমরা জাতির সামনে এটাকেও উপস্থাপন করব।”
বাদ পড়া নাম ফেরত চাইলেন সাংসদ নজরুল
সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সাংসদ জি এম নজরুল ইসলাম সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, তিনি নবম সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে তার নাম কেটে দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
তিনি প্রশ্ন করেন, তার মতো যারা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, তাদের আবার অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না।
জবাবে মন্ত্রী আযম খান বলেন, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “অতীতে যারাই বিরোধীদল করতাম, তাদেরই মুক্তিযুদ্ধের সনদ নিয়ে যেভাবে হয়রানি করা হতো, তাদের সুনামও নষ্ট করা হতো। এই বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর নিয়ে প্রশ্ন
নোয়াখালী-৬ আসনের সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
তবে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ যুক্ত করে মন্ত্রণালয়ের নাম বড় করার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই বলে জানান তিনি।
পরে সম্পূরক প্রশ্নে আবদুল হান্নান মাসউদ অভিযোগ করেন, জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবাররা অধিদপ্তরে গিয়ে ঠিকমতো সেবা পাচ্ছেন না, খারাপ ব্যবহারের অভিযোগও আছে, বাজেট না থাকার কথাও বলা হয়।
জবাবে মন্ত্রী আযম বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের যে সমস্ত সমস্যাগুলো আছে, সেই সমস্যাগুলো সমাধানে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় বা এই অধিদপ্তর যথাযথ কাজ করবে।”
সুদহীন ঋণের প্রস্তাব
নড়াইল-২ আসনের সদস্য আতাউর রহমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সুদসহ ঋণ দেওয়া লজ্জাজনক; তাদের জন্য সুদবিহীন ঋণের পরিকল্পনা আছে কি না।
জবাবে আহমেদ আযম খান বলেন, এ ধরনের আবেদন আগে না আসায় এ বিষয়ে কাজ হয়নি। তবে এখন প্রস্তাব ওঠায় মন্ত্রণালয় বিষয়টি বিবেচনা করবে এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
কৃষি কার্ডে প্রণোদনা
কুষ্টিয়া-১ আসনের সদস্য রেজা আহমেদের প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে কেবল ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কৃষি কার্ডের মাধ্যমে জনপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সার, বীজ ও অন্যান্য উপকরণের প্রণোদনা দেওয়া হবে।

তিনি জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন ও প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণ সহায়তায় ৪০১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে।
এতে ২৫ লাখ ২২ হাজার কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে ভাষ্য মন্ত্রীর।
তিনি বলেন, সরকার কৃষকপ্রতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। এতে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং ১২ লাখ কৃষক উপকৃত হচ্ছেন।
‘কৃষকদের বিনামূল্যে সার দেওয়ার পরিকল্পনা নেই’
নোয়াখালী-১ আসনের সদস্য এ এম মাহবুবউদ্দিন খোকনের প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী বলেন, আপাতত সারা দেশে কৃষকদের বিনামূল্যে সার ও কৃষিপণ্য দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
তবে তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৬ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৯ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি, ১০ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি এবং ১৬ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে।
আমিন উর রশিদ বলেন, এ অর্থবছরে মার্চ পর্যন্ত কৃষি ভর্তুকি হিসেবে ১৬ হাজার ২৪০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
পেঁয়াজ সংরক্ষণে নতুন পদ্ধতি
মাদারীপুর-৩ আসনের সদস্য আনিছুর রহমানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী বলেন, পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কম বিদ্যুৎ লাগে—এমন একটি নতুন পদ্ধতি চালু হয়েছে, যেখানে প্রায় তিন মাস পেঁয়াজ রাখা যায়।
তিনি জানান, এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে ৬৮ জন কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে এর চাহিদা বেড়েছে।
বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন আপাতত নয়
চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, ঢাকার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে আগের মতো জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে আলাপ-আলোচনাক্রমে বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।”
এর আগে প্রশ্নে সরওয়ার জামাল নিজাম জানতে চান, ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আগের নামে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার পরিকল্পনা সরকারের আছে কি না।
ঢাকার এই বিমানবন্দরটি ১৯৮৩ সালে ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ নাম পায়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালে এর নাম পরিবর্তন করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাখে, যা এখনও বহাল আছে।