Published : 21 Oct 2025, 12:54 PM
মানবাধিকার সমুন্নত রাখার পাশাপাশি নতুন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা রোধে নির্বাচনের আগে যে অল্প সময় রয়েছে, তার মধ্যেই একগুচ্ছ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি দিয়েছে ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর বিস্তৃত পরিসরে যে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে, তা প্রত্যাহারের পাশাপাশি দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ সব মামলা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে সেখানে।
সেই সঙ্গে র্যাব বিলুপ্ত করা এবং সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের ক্ষমতা সীমিত করার মত সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে ছয় সংস্থার চিঠিতে।
সংস্থাগুলো হল– সিভিকাস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, ফোরটিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) ওয়েবসাইটে চিঠিটি প্রকাশ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, জুলাই ‘বিপ্লব’ এবং শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার মৌলিক স্বাধীনতা পুনর্বহাল, আইন সংস্কার, গুম ও অন্যান্য দমন-পীড়নের তদন্ত করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।
“২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে যে স্বল্প সময় রয়েছে, সেই সময়েই আমরা মানবাধিকার রক্ষার পরিসর বাড়াতে আপনার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা বিধান এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতির অবনতি রোধ করার মত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
চিঠিতে বলা হয়েছে, “আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কার এখনো হয়নি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জবাবদিহি ও সংস্কারপ্রচেষ্টায় সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা করছেন না।
“অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই বিগত সরকারের সময়ে সংঘটিত গুরুতর নিপীড়নের বিচার নিশ্চিত করতে আরও পদক্ষেপ নিতে হবে, সেইসঙ্গে চলমান নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সেসব মামলাও রয়েছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য তথ্য–প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হয়।”
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে এবং তার আগে ১৫ বছরে সংঘটিত গুরুতর নিপীড়নের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ‘গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা’ রয়েছে এসব অপরাধের মধ্যে।
“গুম ও নির্যাতনের জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাসহ সেনাবাহিনীর বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিষয়ে বেসামরিক আদালতের এখতিয়ারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনসহ জবাবদিহিতা নিশ্চিতের এই চেষ্টায় সেনাবাহিনীর পূর্ণ সহায়তা দেয়া উচিত।
“প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নির্বিশেষে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারিক প্রক্রিয়া যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে সম্পন্ন করতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য আইসিটিকে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো, সম্পদ ও স্বাধীনতা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”
আইসিটি আইনের মামলাগুলোসহ সব ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান স্থগিত রাখারও আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
প্রধান উপদেষ্টাকে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, “অতীতের ধারা ভেঙে ফেলতে এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তুলতে র্যাব বিলুপ্ত করা এবং ডিজিএফআই ক্ষমতা সীমিত করাসহ নিরাপত্তা খাত সংস্কার করুন। দায়মুক্তি নিয়ে র্যাবের গুরুতর অপরাধ সংঘটনের রেকর্ড এ বাহিনীকে সংস্কারের বাইরে নিয়ে গেছে এবং সামরিক বাহিনীর সব কর্মীকে বেসামরিক আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো থেকে সরানো উচিত।
“গুম ও অন্যান্য গুরুতর নিপীড়নে ডিজিএফআইয়ের সম্পৃক্ততার ঘটনা এ সংস্থার ক্ষমতা ও কার্যপরিধি কেবল সামরিক গোয়েন্দা কাজে সীমিত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাই তুলে ধরে। এর কার্যক্রমের স্পষ্ট আইনগত ম্যান্ডেট থাকাও আবশ্যক।”
গুমকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে এবং গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনকে তাদের দায়িত্ব সম্পূর্ণ করতে সহায়তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে চিঠিতে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকার করতে প্যারিস নীতির আলোকে এর সংস্কার করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে সেখানে।
‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার সীমিত করতে ব্যবহৃত’ নিবর্তনমূলক আইনগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাতিল বা সংশোধন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, “অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ বাতিল করলেও এর জায়গায় আনা সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ২০২৫ আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এতে বিভিন্ন অস্পষ্ট ধারা রয়েছে, যেগুলো রাষ্ট্রের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে।”
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংশোধন করার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের নির্বিচার গ্রেপ্তারের মত ঘটনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনগুলো।
‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা অন্যান্য মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি’ সব মামলা প্রত্যাহার বা খারিজ করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে চিঠিতে।
যেসব মামলায় আওয়ামী লীগের কর্মী- সমর্থকদের ‘গ্রহণযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই অভিযুক্ত বা আটক’ করা হয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নিতে বলছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
চিঠিতে বলা হয়েছে, “সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর বিস্তৃত পরিসরে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুন। এ আইনের আওতায় সভা, সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অতিমাত্রায় সীমিত করা হয়েছে এবং তা শান্তিপূর্ণ কার্যক্রমে যুক্ত আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থক হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
“২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফেরার পথ বাধাগ্রস্ত করবে এবং বাংলাদেশি ভোটারদের বড় অংশকে কার্যত বঞ্চিত করবে।”
এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর সংস্কার করার পাশাপাশি নাগরিক সংগঠনগুলোর তহবিল ও কার্যক্রমের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে চিঠিতে।
বলা হয়েছে, “অন্তর্বর্তী সরকারের জরুরি ভিত্তিতে এনজিও–বিষয়ক ব্যুরো এবং বিদেশি অনুদান (স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে) রেগুলেশন আইন পর্যালোচনা ও সংস্কার করা উচিত, যাতে বিধিনিষেধ ছাড়া আন্তর্জাতিক তহবিল প্রাপ্তি বা অন্য ধরনের অতিরিক্ত নজরদারির অধীনে না থেকে নাগরিক সমাজ স্বাধীনভাবে কার্যক্রম চালাতে পারে।”
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যাতে জোর করে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা না হয়, সেই আহ্বানও জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
সরকারের উদ্দেশ্যে চিঠিতে বলা হয়েছে, “তাদের চলাফেরা, জীবিকা ও শিক্ষার স্বাধীনতার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ কমিয়ে দিন। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত পালিয়ে আসা দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশে থাকা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার কারও জন্য রাখাইন রাজ্যসহ মিয়ানমারের কোনো অংশ বর্তমানে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ নয়।”
পাশাপাশি বাংলাদেশ/মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) চলমান তদন্তে সহযোগিতা করারও আহ্বান জানানো হয়েছে, যার মধ্যে আইসিসি চাইলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং ওই আদালতের কাছে হস্তান্তরের মত বিষয়ও রয়েছে।