১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

আবুল কালাম আযাদের আপিল চলবে কি না, শুনানি পিছিয়ে ৩১ অগাস্ট

আবুল কালাম আযাদ নির্ধারিত সময়ের ১৩ বছর পর আপিল করার সুযোগ পেয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Aug 2026, 01:15 PM

Updated : 16 Sep 2026, 12:57 PM

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আবুল কালাম আযাদের আপিল চলবে কি না, সে বিষয়ে শুনানির জন্য ৩১ অগাস্ট নতুন তারিখ রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুবকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ সোমবার এ আদেশ দেন।

আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ থাকে। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি রায় ঘোষণার সময় আবুল কালাম আযাদ বিদেশে পলাতক থাকায় নির্ধারিত সময়ে আপিল করতে পারেননি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় ছিল আবুল কালাম আযাদের মামলায়। ওই রায়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, আটক, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ আটটি অভিযোগের মধ্যে সাতটি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে ফেরেন আবুল কালাম আযাদ। এরপর তিনি সাজা স্থগিত চেয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।

ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তার দণ্ডাদেশ স্থগিত করে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে আদালতে আত্মসমর্পণ করে তাকে আপিল করতে হবে—এমন শর্ত দেওয়া হয়।

শর্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন আবুল কালাম আযাদ। পরে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন।

আপিল ‘ভুল ফোরামে’

সোমবার আপিল বিভাগের আদেশের পর ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সরকার আযাদের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেছিল এক বছরের জন্য। এর মধ্যে আপিলের শুনানি না হওয়ায় স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সোমবার আবেদন করেন তিনি।

প্রসিকিউশন ওই আবেদনের বিরোধিতা করে আপিলটি খারিজের আবেদন করেছে বলে জানান ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি।

তিনি বলেন, “আমরা বলেছি যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১-এর ৩ ধারা মতে ৩০ দিনের পরে কোনো আপিল দায়ের করা যায় না এবং সে আপিলটি আইনত বার্ড বাই লিমিটেশন। তারা এই আপিলটি ফাইল করেছে আর্টিকেল ১০৪-এর নীতিতে, কমপ্লিট জাস্টিসের প্রিন্সিপালে। যেখানে কোনো স্ট্যাটিউটরি প্রভিশন বিদ্যমান থাকে, সেই ক্ষেত্রে ১০৪ আর্টিকেল প্রযোজ্য হয় না।”

প্রসিকিউশনের আবেদনের পর আদালত স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর কোনো আদেশ না দিয়ে আপিলটি রক্ষণীয় বা ‘মেইনটেনেবল’ কি না, সে বিষয়ে শুনানির জন্য নতুন দিন রেখেছে বলে জানান আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “নির্বাহী আদেশ বলে যে আপিল ফাইল করেছে, এই আপিলটি মোটেই রক্ষণীয় নয় এবং নির্বাহী আদেশ আমাদের আইনের উপরে প্রাধান্য পেতে পারে না। আমাদের আইনে যেটা বলেছে, এইটি হচ্ছে ২১-এর ৩-এ যে তার ৩০ দিনের পরে আর কোনো আপিল দায়েরের কোনো আইনগত সুযোগ নাই।”

আপিলটি ‘ভুল ফোরামে’ করা হয়েছে দাবি করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “তারা আদালতের কোনো লিভ না নিয়ে বা লিভ টু আপিল ফাইল না করে সরাসরি আপিল ফাইল করেছে। সরাসরি আপিল ফাইল করার কোনো আইনগত সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।”

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ রুলস প্রযোজ্য হবে না। ওই আইনের নিজস্ব বিধান ও প্রক্রিয়াই প্রাধান্য পাবে।

আবুল কালাম আজাদের আইনজীবী নজিবুর রহমান মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, “এই ট্রাইব্যুনাল ফ্যাসিবাদের আমলে একটা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের জাজমেন্টের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের স্পেসিফিক যে অবজারভেশনটা আছে, সেখানে ট্রাভেস্টি অব জাস্টিস বলা হয়েছে, মিসক্যারেজ অব জাস্টিস বলা হয়েছে, বিচারের নামে প্রহসন করা হয়েছে।”

স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কায় তা বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছিল জানিয়ে নজিবুর রহমান বলেন, “আমাদের যে দরখাস্তটা আছে, এটার জবাবে অ্যাপিলেট ডিভিশন বললেন, আমরা এই ২২শে অক্টোবরের আগেই আপনাদের আপিলটা শুনে ফেলি না কেন? তখন চিফ প্রসিকিউটর দাঁড়ালেন, বললেন যে এ ব্যাপারে তাদের আপত্তি আছে। কেননা এটা একটা স্ট্রিক্ট ল। এখানে সুপ্রিম কোর্টের ১০৪ অ্যাপ্লিকেবল হয় না। সুতরাং এখানে এটা বার্ড বাই ল। তাদের এটার আপত্তি রয়েছে।”

দুই পক্ষের বক্তব্যের পর বেঞ্চ থেকে মৃত্যুদণ্ডের মামলায় আপিল গ্রহণের বিষয়ে বক্তব্য আসে বলে জানান নজিবুর। তিনি বলেন, “বেঞ্চ থেকে বলা হল যে যেহেতু এটা একটা মৃত্যুদণ্ড, ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট, এখানে তো আপিলটা অটোমেটিক্যালি অ্যাডমিটেড হবে।

“আসলে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নজির নেই, বিশ্বের ইতিহাসেও সেরকম কোনো নজির নেই যে সমস্ত জায়গায় কমন ল অ্যাপ্লিকেবল, যে কোনো আসামিকে এভাবে না শুনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।”

আগামী ৩১ অগাস্ট আপিলটি গ্রহণযোগ্য কি না এবং সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলোর শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।

আপিল গ্রহণ করা হলে এবং প্রসিকিউশনের আপত্তি খারিজ হলে ওই দিনই আপিলের শুনানি হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার চান জানিয়ে নজিবুর রহমান বলেন, “এখানে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার করা হোক, সেটাও আমরা চাই। আমাদের মাওলানা আবুল কালাম আযাদের কেইসের ক্ষেত্রে আমরা যেটা বলব, ওনার উপরে অন্যায় করা হয়েছিল সে সময় মৃত্যুদণ্ড দিয়ে, সেটার আমরা ন্যায়বিচার চাই এবং এই ন্যায়বিচার করার দায়িত্ব আমাদের সুপ্রিম কোর্টের।”