০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

বিবিসি রেডিওতে জর্জ অরওয়েলের ‘এনিমেল ফার্ম’

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

Published : 06 Oct 2026, 08:19 PM

Updated : 06 Oct 2026, 08:19 PM

১৯৪৭ সালের ১৪ জানুয়ারি সম্প্রচারিত হয় একটি ঐতিহাসিক বেতার নাটক। এর নেপথ্য কারিগর ও প্রযোজক ছিলেন রেনার হেপেনস্টল। তৎকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বিবিসির ‘থার্ড প্রোগ্রাম’-এর তরঙ্গে ভেসে আসা সেই কণ্ঠস্বরগুলো কেবল একটি উপন্যাসের পাঠ ছিল না, বরং তা ছিল শব্দ আর ধ্বনির মেলবন্ধনে তৈরি এক নতুন শিল্পমাধ্যম। মূলত ১৯৪৬ সালের শেষভাগে জর্জ অরওয়েল গভীর মমতায় ও নিপুণ দক্ষতায় তাঁর এই অমর সৃষ্টিকে মাইক্রোফোনের উপযোগী এক অনন্য পাণ্ডুলিপিতে রূপান্তর করার কাজটি সম্পন্ন করেন। উপন্যাসের পাতায় বন্দি থাকা খামারবাড়ির পশুপাখিদের সেই দ্রোহ, স্বপ্নভঙ্গ এবং ক্ষমতার লোভের রূপক কাহিনীকে তিনি যেভাবে বেতারের ধ্বনি-তরঙ্গে রূপ দিয়েছিলেন, তা এককথায় ছিল অনবদ্য। রাজনৈতিক রূপকধর্মী সাহিত্যের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকা এই উপন্যাসটি কীভাবে বেতারের শব্দশৈলীতে রূপান্তরিত হয়েছিল, তা আজও বিশ্বজুড়ে নাটক ও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।

বিবিসি রেডিওর ‘থার্ড প্রোগ্রাম’ অনুষ্ঠানে সম্প্রচারের জন্য জর্জ অরওয়েলের কালজয়ী রাজনৈতিক রূপক উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ সংকলিত ও নাট্যরূপান্তর করার পর বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে স্বৈরাচার ও ক্ষমতার লোভের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধারালো এই ব্যঙ্গাত্মক আখ্যানটি যখন ইথারের তরঙ্গে ভেসে আসে, তখন তা সমকালীন শ্রোতাদের ভাবনার জগতে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সেই উত্তাল ও জটিল রাজনৈতিক সময়ে, সোভিয়েত স্টালিনবাদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একনায়কতন্ত্রের নগ্ন চেহারাকে অরওয়েল যেভাবে পশুখামারের আদলে তুলে ধরেছিলেন, রেডিওর নাট্যরূপ তাকে আরও বেশি জীবন্ত ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর উপযোগী করে তোলে। বইয়ের পাতা থেকে বের হয়ে চরিত্রগুলোর কণ্ঠস্বর যখন রেডিওর মাধ্যমে লাউডস্পিকারে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন প্রতিটি সংলাপ যেন শোষিত ও শাসকের চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক লড়াইকে আরও তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলছিল। অরওয়েলের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে বা তাঁর সম্মতিতে করা এই বেতার সংকলনটি কেবল একটি উপন্যাসের প্রচার মাত্র ছিল না; বরং তা ছিল সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ঘোষণা, যা বেতারের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে আজো ভাস্বর হয়ে আছে।

‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর প্রথম বেতার রূপান্তরে ক্লোভার এবং বেঞ্জামিন -এর সংলাপ ও দৃষ্টিভঙ্গি শ্রোতাদের ওপর সবচেয়ে গভীর ও সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলে। মূল উপন্যাসে এই দুটি চরিত্র কিছুটা নেপথ্যে থাকলেও, জর্জ অরওয়েল স্বয়ং যখন রেডিওর জন্য এর নাট্যরূপ দেন, তখন তিনি এই চরিত্র দুটির সংলাপকে বিশেষভাবে বিস্তৃত ও প্রভাবশালী করে তোলেন। এই বেতার সংকলনে কতিপয় চরিত্রের সংলাপ সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করে। শোষিত ও প্রতারিত সাধারণ কর্মজীবী শ্রেণীর প্রতিনিধি বিশ্বস্ত মাদী ঘোড়া ক্লোভারের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরকে খুব জোরালো সংলাপে ফুটিয়ে তোলা হয়। বিপ্লবের স্বপ্ন কীভাবে ধীরে ধীরে একনায়কতন্ত্রের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, তা ক্লোভারের আবেগঘন ও বেদনার্ত সংলাপের মাধ্যমে শ্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। বিশেষ করে নাটকের শেষাংশে যখন সে শুকর ও মানুষের মধ্যকার বিভেদ মুছে যেতে দেখে, তার সেই মর্মস্পর্শী সংলাপ ক্ষমতার নির্মম সত্যকে উন্মোচিত করে।

রেডিওর এই সংস্করণে সংশয়বাদী গাধা বেঞ্জামিনের সংলাপ ও তার বুদ্ধিমত্তাকে উপন্যাসের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। খামারের একমাত্র প্রাণী হিসেবে সে-ই পড়তে পারত এবং সবকিছু বুঝেও নীরব থাকত। সেই বেঞ্জামিন যখন শেষ পর্যন্ত তার নীরবতা ভেঙে দেয়ালে লেখা পরিবর্তিত নীতিবাক্যগুলো পড়ে শোনায়, তার সেই গম্ভীর ও তীক্ষ্ণ সংলাপ শ্রোতাদের ভেতর এক চরম অসহায়ত্ব ও ভয়ের আবহ তৈরি করেছিল। নাটকের সমাপ্তিতে ক্লোভার ও বেঞ্জামিনের মধ্যকার সংলাপটি ছিল পুরো বেতার নাটকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও করুণ অংশ। নাটকের শুরুতে বৃদ্ধ শুকর ওল্ড মেজরের সেই বিখ্যাত বিপ্লবী ভাষণ এবং পশুদের প্রতি অধিকার সচেতন হওয়ার আহ্বান বেতারের গম্ভীর কণ্ঠস্বরে এক অন্যরকম উদ্দীপনা তৈরি করেছিল। বিশেষ করে মানুষের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার দেওয়া হুংকার—"মানুষই হলো আমাদের একমাত্র প্রকৃত শত্রু"—শ্রোতাদের শুরুতেই নাটকের মূল পটভূমিতে আচ্ছন্ন করে ফেলে। স্বৈরাচারী শুকর শাসক নেপোলিয়নের কঠোর ও আজ্ঞাবহ নির্দেশ এবং তার ধূর্ত প্রচারক স্কুইলারের চাতুর্যপূর্ণ সংলাপগুলো রেডিওর মাধ্যমে দারুণভাবে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। স্কুইলার যেভাবে প্রতিবার পশুদের বিভ্রান্ত করতে তার বাকপটুতা ব্যবহার করত এবং "সব পশুই সমান, তবে কিছু পশু অন্য পশুদের চেয়ে বেশি সমান"—জাতীয় পরিবর্তিত নীতিগুলো প্রচার করত, তা ক্ষমতার দম্ভ ও প্রচারণার নোংরা রূপকে বেতার শ্রোতাদের সামনে জীবন্ত করে তোলে।

এর পাশাপাশি, নাটকটিতে সমবেত কণ্ঠে গাওয়া ‘বিস্টস অব ইংল্যান্ড’ গানটির সুর ও সংলাপ ইথারের তরঙ্গে এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘস্থায়ী আবহ তৈরি করে, যা শ্রোতাদের মনে একাধারে বিপ্লবের প্রেরণা ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা জাগিয়ে তোলে। জর্জ অরওয়েল স্বয়ং যখন বিবিসির জন্য ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর রেডিও স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন, তখন তিনি মূল উপন্যাসের কেবল রূপান্তর করেননি, বরং রেডিও মাধ্যমের উপযোগী করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত ও চরিত্রগত পরিবর্তনও আনেন। অনেক সমালোচকের মতে, এই রেডিও সংস্করণটি মূল উপন্যাসের কিছু উপেক্ষিত বা নেপথ্য দিককে আরও চমৎকারভাবে শ্রোতাদের সামনে উন্মোচিত করেছিল।

আখ্যানের রাজনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে মানবিক রূপ তুলে ধরা হয় বেতার নাটকে। মূল উপন্যাসটি মূলত রুশ বিপ্লব এবং স্টালিনবাদের এক নিখুঁত রাজনৈতিক রূপক হিসেবে সমাদৃত হলেও রেডিও স্ক্রিপ্টে অরওয়েল কেবল সমকালীন সোভিয়েত রাজনীতির ব্যবচ্ছেদেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি ক্ষমতার লোভ, সাধারণ মানুষের অন্ধ আনুগত্য এবং যেকোনো সমাজেই স্বৈরাচারী মানসিকতা কীভাবে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে—তার মনস্তাত্ত্বিক ও সার্বজনীন মানবিক দিকটিকে সংলাপে বেশি ফুটিয়ে তোলেন।

উপন্যাসে ‘বিস্টস অব ইংল্যান্ড’ গানটি একপর্যায়ে শুকর শাসকেরা নিষিদ্ধ করে এবং এর ব্যবহার কমে যায়। কিন্তু রেডিও নাটকে এই গানটিকে পুরো কাহিনীর একটি সুরময় সুতো হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিবিসির বৈচিত্র্যময় গায়কদল-এর মাধ্যমে এই বিপ্লবী গানটির সুর পুরো নাটকে বারবার ফিরে এসেছে। এমনকি নাটকের একদম শেষাংশেও এই গানের করুণ সুর ব্যবহার করে স্বপ্নভঙ্গের তীব্র বেদনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর বিবিসি বেতার রূপান্তরে শব্দগ্রাহক কৌশল বা সাউন্ড ইফেক্টস অত্যন্ত চতুর, বাস্তবসম্মত এবং উদ্ভাবনী উপায়ে ব্যবহার করা হয়। তৎকালীন সময়ে রেডিওর সীমিত প্রযুক্তির মধ্যেই পশুখামারের এক জীবন্ত ও মনস্তাত্ত্বিক আবহ তৈরি করতে বিবিসি-র সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ফোলে আর্টিস্টরা আদিম ফোলে কৌশলে পশুর খুরের শব্দ তৈরি এবং দুর্দান্ত কতিপয় কৌশল অবলম্বন করেন। পশুখামারের শত শত প্রাণীর হাঁটাচলা এবং দৌড়ঝাঁপের আওয়াজ তৈরি করতে ফোলে আর্টিস্টরা নারকেলের খোসা ব্যবহার করেছিলেন। শুকর, ঘোড়া কিংবা গরুর খুরের শব্দের তফাত বোঝাতে নারকেলের খোসাগুলোকে বিভিন্ন তলে (যেমন- কাঠ, মাটি বা পাথরের ওপর) নির্দিষ্ট ছন্দে আঘাত করে নিখুঁতভাবে প্রাণীদের উপস্থিতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

খামারে প্রাণীদের শোওয়া, বসা কিংবা চলাচলের সময় খড়কুটোর যে স্বাভাবিক খসখসে শব্দ হয়, তা রেডিওতে ফুটিয়ে তুলতে পুরনো ক্যাসেট বা অডিও টেপ ব্যবহার করা হয়। ক্যাসেটের ফিতা কুঁচকে হাতের মুঠোয় চেপে বা পায়ের নিচে মাড়িয়ে খড়ের সেই চিরন্তন গ্রামীণ শব্দ আবহ নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়। নাটকে অভিনেতারা মানুষের মতো কথা বললেও তাঁদের সংলাপে পশুর স্বভাবসুলভ ডাক (যেমন- শুকরের ঘোঁতঘোঁতানি, ভেড়ার ভ্যাভ্যা বা ঘোড়ার ডাক) যুক্ত করা হয়েছিল। মানুষের সংলাপ ও পশুর কণ্ঠের এই মেলবন্ধন শ্রোতাদের মনে একদিকে যেমন রূপকের গভীরতা তৈরি করেছিল, অন্যদিকে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে শুকরদের কণ্ঠস্বর কীভাবে ধীরে ধীরে মানুষের মতো হয়ে উঠছে, সেই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরকেও সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল।

উপন্যাসের অন্যতম মূল অংশ উইন্ডমিল বা বায়ুকল ধ্বংসের দৃশ্য এবং মানুষের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রের মারামারিকে তীব্র করতে বজ্রধ্বনি, ঝড় ও ধাতব সংঘর্ষের ভারী শব্দ ইফেক্ট যুক্ত করা হয়। এর পাশাপাশি, খামারের বাইরে মানুষের সমাজের আবহ দিতে দূর থেকে ভেসে আসা চার্চের ঘণ্টার শব্দ ব্যবহার করা হয়, যা পুরো নাটকে এক ধরণের গাম্ভীর্য ও সমাজ কাঠামোর প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে।

মূল শব্দ কৌশলের সাথে সুরকার অ্যান্টনি হপকিন্সের আবহ সংগীত এবং বিবিসি ভ্যারাইটি কোরাসের ১৬ জন শিল্পীর সমবেত কণ্ঠকে এমনভাবে প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল, যা প্রতিটি শব্দের নাটকীয়তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে বিপ্লবের গান ‘বিস্টস অব ইংল্যান্ড’-এর সময় সমবেত পশুর ডাক ও সুরের মিশ্রণ শ্রোতাদের সরাসরি সেই খামারের আঙিনায় নিয়ে যেত।

উপন্যাসের বিখ্যাত শেষ দৃশ্যটি ছিল—জানালা দিয়ে মানুষেরা দেখছে ভেতরের শুকর আর মানুষ তাস খেলছে এবং কারোর মধ্যে কোনো তফাত করা যাচ্ছে না। রেডিও স্ক্রিপ্টে এই দৃশ্যটির পর একটি বড় সংযোজন করা হয়। সেখানে খামারের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লোভার ও বেঞ্জামিনের মধ্যে অত্যন্ত আবেগঘন ও দীর্ঘ এক সমাপনী সংলাপ জুড়ে দেন অরওয়েল। সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রেণীর হতাশা ও সংশয়বাদকে আরও প্রগাঢ় করতে তাঁদের এই কথোপকথনটি উপন্যাস অপেক্ষা ভিন্ন এক শৈল্পিক মাত্রা যোগ করে। উপন্যাসে কাহিনীটি তৃতীয় পুরুষের জবানবন্দিতে সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলে। কিন্তু বেতারের সীমিত সময়ে নাটকীয়তা ধরে রাখার জন্য অরওয়েল বর্ণনাকারীর ভূমিকা সংক্ষেপ করেন এবং প্রাণীদের নিজেদের মধ্যকার সংলাপের মাধ্যমে ঘটনাপ্রবাহকে গতিশীল করে তোলেন। এর ফলে উপন্যাসের চেয়ে রেডিও নাটকটি অনেক বেশি সংঘাতপূর্ণ এবং তাৎক্ষণিক মনে হয়েছিল। পরবর্তীকালে হলিউড বা অন্যান্য মাধ্যম যেমন ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর সমাপ্তি বদলে দিয়ে কৃত্রিম আশাবাদের চেষ্টা করলেও, অরওয়েলের নিজের করা এই বিবিসি স্ক্রিপ্টটি কিন্তু তেমন ছিল না। এটি মূল উপন্যাসের অন্ধকার ও সতর্কবার্তামূলক সুরকে অক্ষুণ্ণ রেখেও বেতারের শ্রোতাদের জন্য একে আরও সূক্ষ্ম ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে গভীর করে তোলে।