ব্রাউলিও পেরাল্তার অক্তাবিও পাস: “ভাবনা ও আবেগের সমাধানসহ এক বিশ্বজনীন ব্যক্তিত্ব”

আমার মনে হয় গাবোর(মার্কেস) মাথাভর্তি ছিল প্রচুর সমস্যা কিন্তু পাসের মাথায় ছিল সব সমস্যারই সুরাহা।

রাজু আলাউদ্দিনরাজু আলাউদ্দিন
Published : 26 Nov 2022, 06:04 AM
Updated : 26 Nov 2022, 06:04 AM

অবশেষে বহু বছর পর কার্লোস ফুয়েন্তেসের আউরা উপন্যাসে উল্লেখিত সত্যিকারের ‘দনসেলেস সড়ক’(Donceles Street)টি দেখার সুযোগ হয়। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম এটি লেখকের কল্পিত এক জায়গা, যেমনটা প্রায়শই ঘটে থাকে কথাসাহিত্যিকদের গল্পে উপন্যাসে। কিন্তু বন্ধু এবং টিভি-সাংবাদিক মার্কো ফাব্রিসিও জানালো মেহিকো সিটিতে সত্যি সত্যি নাকি ওই নামে একটি সড়ক আছে।

২০১৭ সাল। সপরিবারে বহু বছর পর মেহিকোতে যাই। সেই যাত্রাতেই মেহিকো সিটিতে মার্কোর সাথে সশরীরে পরিচয়। তাকে অনুরোধ জানিয়ে বললাম, ওই সড়কটি আমাকে সে সত্যি সত্যি চিনিয়ে দিতে পারে কিনা। সদাশয় মার্কো সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। সম্ভবত পরের দিনই আমাকে সে ওখানে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ একসাথে থাকার পর সে তার কাজে চলে যায় আর আমি এই সড়কের বিশাল বিশাল বইয়ের দোকানগুলোয় বিলি কাটতে শুরু করি। নানান বইয়ের মধ্যে হঠাৎ করে আমার চোখ পড়ে গিয়ে El Poeta en su Tierra: Diálogos con Octavio Paz নামক একটি বইয়ে। বইটির লেখক ব্রাউলিও পেরাল্তা। পাসের বহু বই-ই আমার পড়া হয়ে গেছে ততদিনে। কিন্তু এই বইটার কথা তখনও জানা ছিল না। হাতে নিয়ে দেখি এটি আসলে অক্তাবিও পাসের সাক্ষাৎকারের বই। সাক্ষাৎকারগ্রহিতা ব্রাউলিও। ব্রাউলিও’র কথা আমার আগে জানা ছিল না। কিন্তু একটু খোঁজ নিয়ে দেখলাম, ব্রাউলিও আমার কাছে তখনও পর্যন্ত অচেনা হলেও, মেহিকোতে তো বটেই, স্প্যানিশ সংবাপত্রের জগতে তিনি সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক হিসেবে খুবই পরিচিত একটি নাম। স্প্যানিশ সাহিত্য ও সংস্কৃতি-জগতের বহু বড় বড় ব্যক্তিত্বের  তিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেদারছে। পাসের এই সাক্ষাৎকারগ্রন্থটি ছাড়াও, ব্রাউলিও’র সম্পাদনায় আছে তাকে নিয়ে El Rostro de Octavio Paz নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন গ্রন্থও।

এসব ছাড়াও তার আরও বই আছে। ব্রাউলিওর আরও একটি পরিচয় যেটি আমার জানা ছিল না, তাহলো মেহিকোর খুব বড় কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার সম্পাদনা-পরিষদের একজন হিসেবে কাজ করেছেন এক সময়। বিস্ময়করভাবেই আমি পরে আবিষ্কার করলাম যে তাকে চেনার আগেই এইসব প্রকাশনা থেকে তার হাতে তৈরি কয়েকটি বই আমি অজান্তেই সংগ্রহ করেছিলাম, কিন্তু কখনো খেয়াল করে দেখিনি যে ওখানে তার নামটিও আছে। যেমন Borges y Mexico, Jorge Luis Borges: Una invitación a su lectura এবং Octavio Paz: Adonde yo soy tu somos nosotros বই তিনটির কথাই বলা যেতে পারে যেগুলো যথাক্রমে Plaza Y Janes এবং Raya en el Agua  থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

ব্রাউলিওর নেয়া অক্তাবিও পাসের এই সাক্ষাৎকারগুলো পড়ে আমি খুবই আলোড়িত হয়েছিলাম। পাস আমার প্রিয় লেখক এবং তিনি আমার আগ্রহের প্রায় কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন বহুদিন থেকে। ব্রাউলিওর বইটি আমাকে এতটাই চমৎকৃত করেছে যে এর অংশবিশেষ আমি অনুবাদ করার জন্য তখনই প্রলুব্ধ হয়ে উঠি। এবং অনুমতি নেয়ার জন্য তার সাথে সরাসরি সাক্ষাতের উপায় খুঁজতে থাকি। অবশেষে সাক্ষাতের সেই সুযোগ পাই পরের বছর যখন আনিসুজ জামান ও তাপস গায়েনের সাথে মেহিকো ভ্রমণে যাই। মেহিকো পৌঁছে যোগাযোগ হলো ব্রাউলিওর সাথে। ২০১৮ সালের ১১ অগাস্ট সকালবেলা তিনি সাক্ষাতের জন্য সময় দিলেন। তিনি বোধহয় নির্ধারিত সময়ের একটু আগেই চলে এসেছিলেন বলে মেহিকো শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি শিল্পকলা একাডেমির(Palacio de Bellas Artes) সামনে অপেক্ষা করছিলেন।

তার সাথে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতাটা ছিল সত্যিই খুব আনন্দের। সহজ সরল, নিষ্কূট, সদাশয় আর কোমল হৃদয়ের মানুষ। শিল্পকলা একাডেমি থেকে বেরিয়ে আমরা পরিচিত এক রেস্তোরাঁয় গেলাম, সেখানে বসেই কথা হলো তার সাথে। লেখক নয়, নিজেকে তিনি সাংবাদিক পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছ্ন্দ্য বোধ করেন। তবে আমি তাকে বললাম, “আপনি সাংবাদিকের চেয়েও অতিরিক্ত কিছু।”

চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ও সংস্কৃতির বাঘা বাঘা লোকদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যাদের মধ্যে রাফায়েল আলবের্তি, গার্সিয়া মার্কেস, অক্তাবিও পাস, কার্লোস ফুয়েন্তেস-এর মতো বিশ্ববরেণ্য লেখকরা আছেন। তিনি রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকে বামপন্থী হলেও, একচোখা নন।

ব্রাউলিওর সাথে আমার দীর্ঘ আলাপটি হয়েছিল মেহিকো শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত সানবোর্ন মাদেরো রেস্তোরাঁয়। সময়টা কথার আনন্দে উপচেপড়া এক অনুভূতি এনে দিয়েছিল আমার মধ্যে। যে-বইটির সূত্রে তার সাথে পরিচয় এবং এই আলাপচারিতা সেটি অক্তাবিও পাসকে বোঝার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সাক্ষাৎকারে তিনি পাস সম্পর্কে এমন আরও কিছু বলেছেন যা তার বই কিংবা অন্যদের বইয়ের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয়েছিল স্প্যানিশে। স্প্যানিশ সংস্করণটিরই বাংলা তর্জমা উপস্থাপিত হলো বিডিআর্টস-এর পাঠকদের জন্য।–রাজু আলাউদ্দিন

ব্রাউলিও পেরাল্তার পরিচিতি

ব্রাউলিও পেরাল্তার জন্ম ১৯৫৩ সালের ২৬ নভেম্বর মেহিকোর বেরাক্রস-এ। মেহিকোর  উনাম(UNAM)-এ পড়াশুনা করেছেন সাংবাদিকতা ও নাট্যসাহিত্য নিয়ে। স্পেনের মাদ্রিদে মুসেও দেল প্রাদোয় পড়াশুনা করেছেন শিল্পকলার ইতিহাস বিষয়ে। ৪০ বছর যাবৎ সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সাথে যুক্ত আছেন। ১৯৮৩ সালে তিনি লা হোরনাদা (La Jornada) নামের মেহিকোর জনপ্রিয় এক দৈনিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: De un mundo raro, El poeta en su tierra: Diálogos con Octavio Paz, El clóset de cristal, Otros nombres del arcoíris এবং El Rostro de Octavio Paz.

উল্লেখযোগ্য পুরস্কার:  El Gallo Pitagórico (১৯৮১ সালে), Homenaje Nacional de Periodismo Cultural Fernando Benítez (২০০৩ সালে), Premio de Periodismo del Pen Club Internacional (২০১১)

Milenio নামের একটি জনপ্রিয় পত্রিকায় রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে বর্তমানে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 

রাজু আলাউদ্দিন: আপনার বইটি আমার খুব ভালো লেগেছে। সাক্ষাৎকারগুলো সহজ ছিল না। আমার মনে হয়েছে আপনি বেশ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। অক্তাবিও পাসের সাথে কথা বলা খুবই দুরূহ, যেহেতু তিনি বহু বিষয়ে পণ্ডিত মানুষ। এ ব্যাপারে আপনার প্রস্তুতি এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন।

ব্রাউলিও পেরাল্তা: পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা সাংবাদিকরা নিজেদেরকে প্রস্তুত করে নেই। অক্তাবিস পাসের ব্যক্তিত্বে আমি অনেকটা অন্ধের মতোই প্রবেশ করেছি, কারণ তার সামগ্রিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমি খুব বেশি জানতাম না। অক্তাবিও পাসের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য যখন আমি প্রথমবারের মতো তার মুখোমুখি হই, আমার বয়স তখন খুবই কম। তার সম্পর্কে লেখা আর তার কবিতা, এবং সর হুয়ানা ইনেস দেলা ক্রুসকে নিয়ে লেখা তার জীবনীটা পড়েছিলাম। পাসের সাক্ষাৎকার নিতে হলে প্রথমে তাকে পড়তে হবে এবং তার কাজ সম্পর্কে অন্যদের লেখা পড়তে হবে। Los Rostros de Octavio Paz নামে আমার অন্য যে-বইটি রয়েছে সেটা বেরিয়েছিল El poeta en su tierra-এরও পঁচিশ বছর পর। সত্যি বলতে কি, তাকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো আমাকে সাহায্য করেছে কবি ও প্রাবন্ধিককে বহু প্রশ্ন করতে। আমি পাস-বিশেষজ্ঞ নই। আমি তেমন কেউ নই যে আপনাকে তার কবিতা অথবা তার প্রবন্ধ, কিংবা প্রবন্ধের শৈলী, ভাষা বা এর ঐতিহাসিক মূল্য সম্পর্কে বলতে পারবে। আমি ছিলাম, এবং এখনও পর্যন্ত একজন সাংবাদিক যে কিনা পাসকে চিনতো একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে। আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম। তাকে অপছন্দও করতাম। কখনো কখনো কোনো কোনো সাক্ষাৎকারে তিক্ততা এসেছিল। আমি কখনোই তার কাছে কোনো বই উপহার হিসেবে চাইনি। কিন্তু একদিন, আমরা যখন কথা বলছি, তিনি তখন Tiempo Nublado বইটি নিয়ে কথা বলছিলেন। এই বইটির বিষয় ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শ ও কর্মকাণ্ড। এই সূত্রেই তিনি আমেরিকার আধিপত্য আর সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ববাদ ব্যাখ্যা করছিলেন।

সবশেষে, তিনি আমাকে বললেন, “আমি কি আপনাকে একটা বই উপহার দিতে পারি?” আমি উত্তরে বললাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই দিতে পারেন ডন অক্তাবিও।” তিনি তাতে লিখলেন, “ ব্রাউলিও পেরাল্তা, ভিন্নমত মানে শত্রুতা নয়।” এই কথার মাধ্যমে আমাকে তিনি মহৎ এক শিক্ষা দিয়েছিলেন। আমি বুঝতে পারলাম যেসব কঠিন বিষয়ে প্রশ্ন করছি, ডন অক্তাবিও সেসব সহ্য করছিলেন, কারণ তিনি, ট্রটস্কির ভাষায়, ধারণার কারাগার(cárcel de conceptos )-এ বাস করতেন না। এটা ছিল আমার জন্য বিরাট এক শিক্ষা।

রাজু: পাসের কোন বিষয়টি আপনি অপছন্দ করতেন?

ব্রাউলিও: তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যা আমার সংস্কারকে প্রভাবিত করেছিল। একই রকম সংস্কার ছিল বোর্হেসের বেলায়ও। আমি অনেক বেশি নেরুদা, অনেক বেশি মার্কেসপন্থী ছিলাম; বোর্হেস ও পাসের প্রতি আমার পক্ষপাত কম ছিল। বুঝাতে পারলাম কি?

রাজু: হ্যাঁ, পেরেছেন।

ব্রাউলিও: তবে ছোট্টবেলা থেকেই, পাশাপাশি কবির প্রতি আমার মুগ্ধতাও ছিল তার Blanco বইটির কারণে, তা সহজ বা জটিল যে-কোনো ধরনের কবিতাই হোক না। তিনি শব্দ নিয়ে, প্রেমিকদের নিয়ে, মেহিকো নিয়ে কবিতা লিখেছেন। যেমন আপনি যখন ¿Águila o Sol?  অথবা El Laberinto de la Soledad পড়বেন, তখনই লক্ষ্য করবেন তার সন্দেহাতীত সাহিত্যিক বৈচিত্র। সুতরাং, তার প্রতি একটা আকর্ষণ যেমন আছে, আবার একটি প্রত্যাখ্যানও আছে যাকে আমার ক্ষমতার নিকটবর্তী মনে হয়েছিল, যাকে আমার PRI(রাজনৈতিক দল)-এর নিকটবর্তী মনে হয়েছিল। এখন অবশ্য আর তা মনে হয় না। তখন আমি তাকে এভাবেই দেখেছিলাম। আমি ভুল করেছিলাম।

রাজু: পাস কিন্তু একবার এক চিঠিতে হুলিও শেরের গার্সিয়াকে বলেছিলেন: “ক্ষমতার আগুনের কাছাকাছি যেও না, কেননা এটা এমন আগুন নয় যে তা বিশুদ্ধ করবে কোনো কিছুকে।” সুতরাং আপনি যা বললেন তার সাথে এর একটা বিরোধ আছে।

তিনি তাতে লিখলেন, “ ব্রাউলিও পেরাল্তা, ভিন্নমত মানে শত্রুতা নয়।” এই কথার মাধ্যমে আমাকে তিনি মহৎ এক শিক্ষা দিয়েছিলেন। আমি বুঝতে পারলাম যেসব কঠিন বিষয়ে প্রশ্ন করছি, ডন অক্তাবিও সেসব সহ্য করছিলেন, কারণ তিনি, ট্রটস্কির ভাষায়, ধারণার কারাগার(cárcel de conceptos )-এ বাস করতেন না। এটা ছিল আমার জন্য বিরাট এক শিক্ষা।

ব্রাউলিও: না, বিরোধ নেই। অক্তাবিও পাস, অথবা বোর্হেস কিংবা গার্সিয়া মার্কেস ক্ষমতার কাছাকাছি ছিলেন। গার্সিয়া মার্কেস ক্লিন্টনের বন্ধু ছিলেন, মার্কিন লেখক উইলিয়াম স্টাইরনেরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন যিনি কিনা গ্রেট ডিপ্রেশন নিয়ে Darkness Visible: A Memoir of Madness বইটি লিখেছিলেন। ইনিই মার্কেসকে ক্লিন্টনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, কার্লোস ফুয়েন্তেসও সেখানে ছিলেন।

আনিসুজ জামান: কিন্তু ক্লিন্টন তো আরও পরে এসেছিলেন, তাই না? তার আগে তিনি ফিদেল কাস্ত্রোর অনেক বেশি বন্ধু ছিলেন।

ব্রাউলিও: অবশ্যই, গার্সিয়া মার্কেস কাস্ত্রোর ঘনিষ্ঠ ছিলেন আর সেই কারণেই তো তারা মার্কিন এক দ্বীপে দেখা করলেন যেখানে উইলিয়াম স্টাইরন, কার্লোস ফুয়েন্তেস এবং গার্সিয়া মার্কেস ক্লিন্টনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন কুবার উপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিতে। তারাই ক্লিন্টনকে ব্যাপারটা বুঝিয়েছিলেন। সুতরাং, আপনাকে বুঝতে হবে যে কখনো কখনো ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাটাও প্রয়োজন আছে। তাত্ত্বিক অর্থেই বলা যায় যে এই সব ক্ষমতাবান মানুষদের, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো হুকুমদার দেশের ক্ষমতাবান মানুষদের, নৈকট্য কখনো কখনো প্রয়োজন হয়। ওই সাক্ষাৎকারটা দরকার ছিল। আমি আগে এটা বুঝতাম না, এখন বুঝি। আমি এটা অক্তাবিও পাসকে দিয়ে ‍বুঝেছি। আমার মনে হয় সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার প্রতিনিধিত্বকারী বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের একটা সংঘাত থাকতেই হয় ক্ষমতার সাথে। বুঝাতে পারলাম কি?

রাজু: হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।

ব্রাউলিও: আমার মনে হয় (বুদ্ধিজীবীদের সাথে) রাজনীতিবিদদের সংঘর্ষ দরকার; তবে ক্ষমতার সেবক হওয়া কিন্তু একেবারেই ভিন্ন জিনিস। 

রাজু: অক্তাবিও পাসের সাথে তো কার্লোস মনসিবাইস-এর ঝগড়া হয়েছিল।

ব্রাউলিও: হ্যাঁ, খুবই দুঃখজনক ছিল সেটা…ওই একই কারণে।

রাজু: এ ব্যাপারে একটু বিস্তারিত বলুন।

ব্রাউলিও: পাসের চেয়ে আমি বরং মনসিবাইসের নিকটবর্তী। মেহিকোর বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে কী ঘটছে তা জানার উদ্দেশ্যে পাসের সাক্ষাৎকার নেয়াটা ছিল প্রায় এক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো। আমার মতে, মনসিবাইস আমার দেশে সবচেয়ে প্রগতিশীল বামপন্থার প্রতিনিধিত্ব করে।

রাজু: জানেন, অদ্ভুত ব্যাপার হলো, Adonde Yo Soy Tú Somos Nosotros শিরোনামে পাসকে নিয়ে তার একটি বই আমার কাছে আছে।

ব্রাউলিও: ওই বইয়ের সম্পাদনার সাথে আমি জড়িত। ওই বইয়ের প্রকাশনীর পরিচালক কনসুয়েলো সাইসার-এর সঙ্গে সেই কলম্বিয়ার বোগোতা পর্যন্ত আমাকে দৌড়াতে হয়েছিল। মনসিবাইসের কোনো বই প্রকাশ করাটা ছিল একটা মাথাব্যাথা কারণ বই যখন ইতিমধ্যে মুদ্রণের জন্য প্রস্তুত, তখন তিনি সংশোধন, পরিমার্জন করেই যাচ্ছেন। বইটা প্রকাশের ব্যাপারে আমাদের একটা তাড়া ছিল, সেই কারণেই বোগোতা যাওয়া। আমি যখন তার হোটেলে পৌঁছালাম তখন তাকে বসিয়ে রেখে পাণ্ডুলিপি আমার হাঁটুর উপর রেখে একের পর এক সংশোধন করে যাচ্ছি আর প্রশ্ন করছি: এখানে কী যুক্ত করবো? এখানে কী বাদ দেবো? কোন সংশোধনীটা আপনার পছন্দ নয়? এইভাবে আমরা বইটা করেছি, বুঝলেন। এরপর উনি যখন মুদ্রণের অনুমতি দিলেন, আমি তখন প্রুফ নিয়ে মুদ্রণের জন্য মেহিকোতে ফিরে এলাম। উনি ওখান থেকে আমাকে আবার সংশোধনের নির্দেশ দিতে শুরু করলেন, আমরা দৌড়ে ছাপাখানায় গিয়ে পাজি মনসিবাইসের ওসব আবার সংশোধন করছি।পাজি (carbon) শব্দটার অর্থ বুঝলেন তো?

মনসিবাইস ভুল করেছিলেন, পাস ভুল করেননি। তবে শেষ পর্যন্ত, দুজনের (বিতর্কের) পরিসমাপ্তি ঘটেছে চমৎকার বন্ধুত্বে।

রাজু: হ্যাঁ, অবশ্যই জানি। তো পাসের সাথে মনসিবাইসের ঝগড়া হয়েছিল, গার্সিয়া মার্কেস এবং নেরুদার সাথেও হয়েছিল…

ব্রাউলিও: এটা হয়েছিল মূলত কোর্তাসার, গার্সিয়া মার্কেস, কার্লোস ফুয়েন্তেস সমর্থিত নিকারাগুয়ায় ফ্রেন্তে সানদিনিস্তা’(Frente Sandinista)র সশস্ত্র বিরোধের কারণে। ঘটনা হলো পাস ওই বামপন্থাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। এখন তো আমরা দেখতে পাচ্ছি নিকারাগুয়ায় আসলে কী ঘটছে। পাস সঠিক অবস্থানেই ছিলেন, এটা আমাদের স্বীকার করা উচিত। সম্ভবত আমরা যারা বামপন্থায় আছি, তারা মানুষের দুর্বলতাটা বুঝতে পারি না। বাম এবং ডান, উভয় পক্ষেরই একই রকম ত্রুটি আছে।

রাজু: একইভাবে, পাসের ভবিষ্যদ্বাণী, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমালোচনা যথাযথ ছিল, তাই নয় কি?

ব্রাউলিও: মনসিবাইস ভুল করেছিলেন, পাস ভুল করেননি। তবে শেষ পর্যন্ত, দুজনের (বিতর্কের) পরিসমাপ্তি ঘটেছে চমৎকার বন্ধুত্বে।

রাজু: আর গার্সিয়া মার্কেসের সাথে পরিণতি কী হয়েছিল?

ব্রাউলিও: তাদের মধ্যে পুনর্মিলন (reconciliation) হয়নি। তবে নেরুদার সাথে হয়েছিল; এই ব্যাপারটা আমার বইয়ের মধ্যে আছে।

রাজু: হ্যাঁ, নেরুদার স্ত্রী মাতিল্দের মাধ্যমে, তিনি পাসকে নেরুদার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন…

ব্রাউলিও: হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। মাতিল্দে বললেন, “অক্তাবিও, পাবলোকে একটু হ্যালো বলুন।”

রাজু: আপনার বইয়ের ওই অংশটা আমি অনুবাদ করতে চাই। অক্তাবিও পাসের সাথে আপনার সাক্ষাৎকারের যে-অংশটা আমি ইতিমধ্যে অনুবাদ করেছি সেটার মূল বিষয় ছিল ভারত। পাস এবং ভারত সম্পর্কে আপনি আর কি কিছু জানেন?

ব্রাউলিও: পাসের অনেক প্রবন্ধ এবং কবিতা আছে যা ভারত এবং তার স্ত্রী মারিয়ে-হোসের উদ্দেশ্যে রচিত। ভারত তার মনে দাগ কেটে গিয়েছে কারণ তাদের সাক্ষাৎ হয়েছে ওখানে। পাসের তখন অনেক কবি বন্ধু ছিল, যাদের কথা ওই সাক্ষাৎকারে আছে, তবে সবার নাম নেই। ভারতে অনেকের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। আমি ওইটুকুই জানি। আমি তো তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম না। আমি কেবল তাকে সাংবাদিক হিসেবেই চিনেছি এবং কেবল যে বিষয়টা বলতে পারি তাহলো তিনি নিম গাছের কথা খুব বলতেন এবং এ নিয়ে একটি কবিতাও লিখেছিলেন। মারিয়ে-হোসের সাথে তার প্রেম এবং কীভাবে বিয়ে করলেন, সেসব গল্পও করতেন খুব। যেমনটা আগেই বলেছি, এসব নিয়ে তার অনেক কবিতা আছে। তার প্রথম প্রেম ছিল এলেনা গাররোর সাথে, পাস তাকে নিয়েও অনেক কবিতা লিখেছেন, তার বিভিন্ন বইয়ে তাকে নিয়ে লিখেছেন। এরাই ছিলেন তার গুরুত্বপূর্ণ প্রেম।

আনিস: আপনি জানেন মেহিকোতে নিম গাছ আছে।

ব্রাউলিও: তাই নাকি?

আনিস: প্রচুর। হালিস্কোর এৎসাৎলানে আছে; আকাপুলকোতেও প্রচুর নিম গাছ আছে।

ব্রাউলিও: জানা ছিল না।

রাজু: কিছুক্ষণ আগেই আপনি মেহিকানোদের সম্পর্কে কথা বলছিলেন। El Laberinto de la Soledad বইটিতে পাস মেহিকো নিয়ে কথা বলেছেন। এই বইটির আগে একই বিষয়ে আরও বই ছিল, তাই না?

ব্রাউলিও: আমরা মেহিকানোরা কী রকম তা ওই বইটা দেখাতে চেয়েছে, পাস যেভাবে আমাদেরকে এঁকেছেন, আমরা সেরকম নই। তবে এর মানে এই নয় যে তিনি সঠিক নন। অনেক প্রাবন্ধিকই এই বইটির প্রতি সাড়া দিয়েছেন। তাদেরই একজন রোজার বার্ত্রা যিনি মেহিকানোদের বৈশিষ্ট্যের রূপক হিসেবে ajolote শব্দটা ব্যবহার করেছেন যা কিনা El Laberinto de la Soledad-এর দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ায়। তার বইটির নাম La Jaula de la Melancolía এবং এটা পাসের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লেখা হয়েছে। আমার সম্পাদিত Los Rostros de Octavio Paz বইটিতে পাসকে নিয়ে এবং পাস সম্পর্কে তিনি কী ভাবেন সে নিয়ে বার্ত্রার একটা প্রবন্ধ আছে। এই নৃবিজ্ঞানীর একটা সাক্ষাৎকারও আছে ওই বইটিতে। আমি আপনার প্রশ্নের উত্তরে যা বলতে পারি তা ওই বইটিতে আছ। Los Rostros de Octavio Paz-এ অন্তর্ভুক্ত রোজার বার্ত্রা, হোর্হে আগিলার মোরা এবং পাসের ফরাসি অনুবাদক, এদের সবার প্রবন্ধগুলো পাসের সাক্ষাৎকার নেয়ার ক্ষেত্রে খুব উপকারে এসেছে। পাণ্ডিত্যের ভান করতে চাই না, তবে এটুকু বলতে পারি Los Rostros de Octavio Paz বইটিতে অক্তাবিও পাসের পক্ষে বিপক্ষে দশটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটা আমার কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। Letras Libres(মেহিকোর সুপরিচিত একটি সাহিত্য পত্রিকা)-এর লোকরা, এনরিকে ক্রাউসের অনুসারীরা এ ধরনের বই পছন্দ করবে না, কারণ তারা হচ্ছে পাসের অনুগত সংস্করণ (official version), আমি কারোরই অনুগত সংস্করণ নই। আমি পাস-প্রেমিক তার কবিতার জন্য, তবে কিছু বিষয়ে আমি তার সমালোচকও। পাসের প্রতি আমার সাড়া দেয়াটা ছিল সবসময়ই অনেকটা  সমালোচক-সাংবাদিকের মতো। El Laberinto de la Soledad বইটির আগে মেহিকানোদের নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ বই ছিল: একটি হচ্ছে  Fenomenología del Relajo নামে হোর্হে পোর্তিইয়্যার বইটি আর অন্যটি হচ্ছে হোর্হে কুয়েস্তার একটি বই যেখানে শিক্ষা ও রাজনীতি নিয়ে …

রাজু: আপনার উল্লেখিত বার্ত্রার বইটি আমি অল্প কিছু পড়েছি।

ব্রাউলিও: বার্ত্রা যা বলেছেন আর পাস যা বলেছেন--এই দুয়ের মধ্যে ভাবনার একটা পরস্পর বিরোধিতা আছে। La Jaula de la Melancolía খুব ভালো একটি বই। কিন্তু আপনি যদি আমাকে কোনো একটি বেছে নিতে বলেন, তাহলে আমি দুটো বইয়ের কথাই বলবো কারণ দুটো বইয়েই এমন কিছু আছে যা আমাদের মেহিকানোদের ক্ষেত্রে সত্য।

মাদ্রিদে আমি কার্লোস ফুয়েন্তেসের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেখানে আমি সাংবাদিক হিসেবে বছর সাতেক ছিলাম। তাকে ক্রাউসের প্রবন্ধটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন: “না, ওই বিষয়ে কথা বলবো না।” তবে শেষে তিনি বলেছিলেন যে “পাস এবং আমার মাঝখানে একটা তেলাপোকা ঢুকে গেছে।”

রাজু: এটাও কি সত্য নয় যে প্রত্যেক লেখক, প্রত্যেক শিল্পী তার জাতির বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করেন?

ব্রাউলিও: আপনার এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া আমার পক্ষে কঠিন, কারণ মেহিকোতে ক্রেয়ল আছে, মেস্তিসো আছে, অন্যান্য নৃগোষ্ঠী আছে যারা অভিন্ন একটি ভাষায় কথা বলছে না; মেহিকোতে ৬৫ বা ৭২টা নৃগোষ্ঠী আছে এবং তাদের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা ভাষা রয়েছে। তারা ১৫ মিলিয়নেরও বেশি, আর গোটা মেহিকানোর সংখ্যা ১০০ মিলিয়নেরও বেশি। মেহিকোতে আমরা নৃগোষ্ঠীদেরকে মেরে ফেলিনি, আর্হেন্তিনাতে যেমনটা করা হয়েছে। তারা বেঁচে গেছে। তবে এর মানে এই নয় যে আমরা মেস্তিসোরা ওদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। পাস যা-কিছুই লিখেছেন তা অনেকগুলো জাতিসত্তার প্রতিফলন। আমরা কখনো কখনো ধ্রুপদী(classists), কখনো কখনো অভিজাত, কখনো বা জাতিবিদ্বেষী, কখনো কখনো ধনী, নব্য ধন--এসবই আমাদের ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক আচরণকে তুলে ধরে। আমি একজন ভালো মেহিকানো, একজন বিশ্বজনীন সত্তা হওয়ার চেষ্টা করি যে-কিনা বৈচিত্রকে সম্মান করবে, সম্মান জানাবে লৈঙ্গিক বৈচিত্র যা মানবাধিকারকে সমর্থন জানাবে। বলছি আমি চেষ্টা করছি। কারণ, দুর্ভাগ্যজনকভাবে মেহিকোতে এমনটা খুব কমই দেখা যায়।… ঠিক এই কারণে এই বইগুলো জরুরী এক পাঠ, কিন্তু বেশির ভাগ মেহিকানোই El Laberinto de la Soledad অথবা La Jaula de la Melancolía, কিংবা Fenomenología del Relajo বইটি পড়েনি। শেষের এই বইটি মেহিকানোদের নিজেদের সম্পর্কে রসবোধের বিষয়ে প্রথম কোনো গ্রন্থ। এই বইটি থেকে পাস বেশ কিছু দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। হায় খোদা! আপনি তো আমাকে অনেক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন।

রাজু: আরেকটা প্রশ্ন: কার্লোস ফুয়েন্তেসের সাথে কি পাসের কোনো বিবাদ হয়েছিল?

ব্রাউলিও: হ্যাঁ, হয়েছিল। অক্তাবিও পাস কর্তৃক সম্পাদিত Vuelta পত্রিকায় এনরিকে ক্রাউসের “La Comedia Mexicana de Carlos Fuentes” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল, যেটি এর আগেই আমেরিকাতে এক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পাস এটি প্রকাশ করায় কার্লোস ফুয়েন্তেস খুব আহত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের কথা ভেবেই তিনি দুঃখ পেয়েছিলেন।

রাজু: হ্যাঁ, পড়েছিলাম প্রবন্ধটি।

ব্রাউলিও: মাদ্রিদে আমি কার্লোস ফুয়েন্তেসের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেখানে আমি সাংবাদিক হিসেবে বছর সাতেক ছিলাম। তাকে ক্রাউসের প্রবন্ধটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন: “না, ওই বিষয়ে কথা বলবো না।” তবে শেষে তিনি বলেছিলেন যে “পাস এবং আমার মাঝখানে একটা তেলাপোকা ঢুকে গেছে।” এই ছিল তার উত্তর। ব্যাপারটা কি আসলেই তা নয়?

রাজু: পাস এবং ফুয়েন্তেসের মধ্যে পরে কি বনিবনা হয়েছিল?

ব্রাউলিও: ১৯৯০ সালের দিকে হয়েছিল, পাস যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন। কথাবার্তা বা পরস্পরকে চিঠিপত্র লেখা বন্ধ হওয়ার বহু বছর পর ওই প্রথম অভিনন্দন-বার্তা পাঠিয়েছিলেন ফুয়েন্তেস। পরস্পরের মধ্যে চিঠি চালাচালি এবং কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অনেক বছর পরের ঘটনা এটি। বন্ধুত্বের সময়কালে তারা পরস্পরকে অনেক চিঠি লিখেছেন। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত চিঠিপত্রগুলো দেখতে পারেন কৌতূহল মেটাবার জন্য। আমার মনে হয় বন্ধুত্বের গুরুত্ব অনেক বেশি, তাই?

রাজু: হ্যাঁ, তা তো বটেই।

ব্রাউলিও: আমি আসলে সেন্সরশিপের পক্ষে নই। ঘটনা হলো প্রবন্ধটা তো ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েই ছিল। এইভাবে বন্ধুত্বকে কলঙ্কিত করার কী দরকার ছিল? এই প্রশ্নটা আমি দন( সম্মানিত অর্থে) অক্তাবিওকে জিজ্ঞেসও করেছিলাম, কিন্তু তিনি এর কোন উত্তরই দেননি।

রাজু: বুদ্ধিজীবীদের প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন করতে চাই। আজকের দিনে মেহিকোতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাটা কেমন?

ব্রাউলিও: মেহিকোর বুদ্ধিজীবীরা গরিবদের কথা ভুলে গেছে। এটা বলতে আমার খুব দুঃখ হচ্ছে, কিন্তু এটাই হচ্ছে আমার পর্যবেক্ষণ। পাসের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন ছিল না, আদর্শগতভাবে তিনি যাই বলে থাকুন না কেন। পাস নৃগোষ্ঠীর অধিকারে জোর দিয়েছিলেন, যদিও সুবকমান্দান্তে মার্কোসের সাথে তার মতের ভিন্নতা ছিল, তারপরও নৃগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় তার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। মেহিকোর সংবিধানে আদিবাসীদের যে অধিকারের কথা বলা হয়েছিল তা ফিরিয়ে আনার গুরুত্বে  তিনি বিশ্বাস করতেন। মেহিকোতে এটাকে পাত্তাই দেয়া হয়নি। এর কারণ সম্ভবত আমরা এমন কোনো শিক্ষিত রাষ্ট্রপতি পাইনি যিনি বৈচিত্রপূর্ণ দেশটিকে বুঝতে সক্ষম। জানি না কীভাবে এর ব্যাখ্যা দেবো…মেহিকোর টেলিভিশনে, টেলিনাটকগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন, এদের মধ্যে আপনি বাদামি রংয়ের লোক খুঁজে পাবেন না, বরং দেখতে পাবেন সবুজ বা নীল চোখের সাদাদেরকে। হলিউডেও তাই, সেখানে আপনি মোটা লোক দেখতে পাবেন না, অথচ আমেরিকা হচ্ছে মোটাদের দেশ।

মেহিকোর বুদ্ধিজীবীরা গরিবদের কথা ভুলে গেছে। এটা বলতে আমার খুব দুঃখ হচ্ছে, কিন্তু এটাই হচ্ছে আমার পর্যবেক্ষণ। পাসের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন ছিল না, আদর্শগতভাবে তিনি যাই বলে থাকুন না কেন।

রাজু: সাংস্কৃতিক বর্ণবাদটি বুঝবার জন্য একটা প্রশ্ন…

ব্রাউলিও: ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করে আমরা মেহিকানোরা সব চোর, সে দেয়াল তুলতে চায়, কিন্তু অস্ত্র বেচা বন্ধ করতে চায় না।

 রাজু: কার্লোস ফুয়েন্তেস কি কখনো El Laberinto de la Soledad নিয়ে লিখেছিলেন?

ব্রাউলিও: না, ফুয়েন্তেস সবসময়ইএকমত ছিলেন; তবে তিনি মেহিকানোদের আধুনিক অনুভূতিকে আমলে নিয়েছেন। কারণ El Laberinto de la Soledad বইটি তো লেখা হয়েছিল ১৯৫০ সালে। বিশ শতকের একটি বই। এখন আমরা আছি একুশ শতকে। এরই মধ্যে অনেক কিছু বদলে গেছে, যেমন ধরা যাক, মার্কিনিদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে chilango ভাবমূর্তির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ওটা আর নেই। এল চিকানো (El Chicano) যা কিনা অন্য এক ধরন, তারা কিন্তু মেহিকানো নয়, তারা মার্কিনিও (gringos) নয়, তারা চিকানোই। যে-পশ্চিমা সমাজে সব কিছুকেই সমজাতীয় হতে হয়, সেই রকম কোনো ভবিষ্যৎ তাদের হবে না, তাই না? লেখিকা সান্দ্রা সিসনেরোসের নাম শুনেছেন? ইনি একজন চিকানো লেখিকা, চিকানোর মতো লেখেন, কিন্তু মেহিকোতে তার কোনো সাফল্য নেই, কারণ সম্ভব না, যেহেতু আমরা ওই ভাষা বুঝি না।

রাজু: কত বছর ধরে আপনি অক্তাবিও পাসের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন?

ব্রাউলিও: মোটামুটি বছর বিশেক।

রাজু: তবে ধারাবাহিকভাবে নয়, তাই তো?

ব্রাউলিও: যে-কোনো সাংবাদিক অক্তাবিও পাসকে পছন্দ করে, তারা জানতে চায় El Laberinto বইটি নিয়ে তিনি কী ভাবেন। সাংবাদিকরা জানেন যে কার্লোস সালিনাস দে গোর্তারির মাধ্যমে অক্তাবিও পাস ক্ষমতার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন। মাদ্রিদে তাকে সালিনাস সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম। আমার মনে হয় El poeta en su Tierra আসলে বুদ্ধিজীবীর নয়, বরং সাংবাদিকের এক বই, বইটিকে অসম্পূর্ণ বলে মনে হয়, অনেক বিষয়ই এর মধ্যে নেই। অক্তাবিও পাস আসলে বিস্ময়কর এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তবে শেষ সাক্ষাৎকারটি নেয়ার সময়, যখন কিনা তিনি ৮০ বছর পূর্ণ করেছেন, তার সম্পর্কে আমার ধারণা ততদিনে অনেক গভীর হয়ে গেছে। ওই সাক্ষাৎকারটা আমার বেশি পছন্দ। এই বইয়ের কেবল দুই তিনটা সাক্ষাৎকারকে আমার কাছে সফল মনে হয়।

গার্সিয়া মার্কেসের একটা সাক্ষাৎকার পাওয়ার জন্য আমাকে আক্রমণাত্মক কথা বলতে হয়েছিল। তাকে বলেছিলাম: “আপনি কি ইতিমধ্যে ভুলে গেছেন যে একসময় সাংবাদিক ছিলেন, এই আমি যেমন আপনার মতো একজন বিখ্যাত লোকের সাক্ষাতকার নেয়ার জন্য পিছে পিছে ঘুরছি?” তিনি আমার দিকে ঘুরে তাকালেন, এর পরের দিনই আমাকে তিনি সাক্ষাৎকার দিলেন।

রাজু: পাস সম্পর্কে কোনো মিষ্টি অভিজ্ঞতা থাকলে আমাদেরকে জানাবেন কি?

ব্রাউলিও: অক্তাবিও পাস ছিলেন উষ্ণ ধরনের ব্যক্তিত্ব। অক্তাবিও পাসকে আপনি পেছন থেকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ছুঁয়ে দেখতে পারতেন এবং ঘুরে দাঁড়িয়ে শুভেচ্ছার জবাব দেবেন, এমনই অমায়িক তিনি। গার্সিয়া মার্কেসের সাথে সেটা সম্ভব ছিল না, কারণ সবসময়ই তার সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর মতো থাকতো বন্ধুবান্ধব। কিংবা কার্লোস ফুয়েন্তেসের মধ্যে পাবেন প্রতিরক্ষামূলক এক আভা, যদিও আমার প্রতি তিনি খুবই সদয় ছিলেন। কার্লোস ফুয়েন্তেস এবং গার্সিয়া মার্কেসের সামনাসামনি হওয়া ছিল খুব কঠিন। গার্সিয়া মার্কেসের একটা সাক্ষাৎকার পাওয়ার জন্য আমাকে আক্রমণাত্মক কথা বলতে হয়েছিল। তাকে বলেছিলাম: “আপনি কি ইতিমধ্যে ভুলে গেছেন যে একসময় সাংবাদিক ছিলেন, এই আমি যেমন আপনার মতো একজন বিখ্যাত লোকের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য পিছে পিছে ঘুরছি?” তিনি আমার দিকে ঘুরে তাকালেন, এর পরের দিনই আমাকে তিনি সাক্ষাৎকার দিলেন। কিন্তু ঘটনা হলো আমাকে আক্ষরিক অর্থেই আক্রমণাত্মক হতে হয়েছিল। তিন বছর ধরে আমি তার সাক্ষাৎকার চাইছিলাম আর সবসময়ই তিনি বলতেন, পরে হবে, পরে হবে। আপনাকে একটা ভয়ংকর কথা বলি। আমার মনে হয় গাবোর মাথাভর্তি ছিল প্রচুর সমস্যা কিন্তু পাসের মাথায় ছিল সব সমস্যারই সুরাহা। এটা অনেকটা এমন যে যখন কেউ গ্রিকদের পড়ে থাকেন, যদি রোমানদের বুঝে থাকেন, যদি তিনি জার্মান সংস্কৃতি জেনে থাকেন, তাদের দার্শনিক ভাবনাগুলো বুঝে থাকেন তাহলে নিজের মনস্তত্ত্ব দিয়ে সেসব বিশুদ্ধ করে নিয়েছেন। পাস ছিলেন ভাবনা ও আবেগের সমাধানসহ এক বিশ্বব্যক্তিত্ব। তাকে আমার অসাধারণ এক মানুষ মনে হয়েছে। অন্যদের সম্পর্কে এমনটা আমি বলতে পারবো না। অক্তাবিও পাস আমার বন্ধু ছিলেন না, তবে চমৎকার আস্থা অর্জন করেছিলাম। El Poeta en Su Tierra  বইটির কাজ যখন শুরু করি, তখন প্রথমেই যে ভাবনাটা মাথায় এলো তাহলো এটা তো আমার বই নয়, আমি যদিও সাক্ষাৎকার নিয়েছি, কিন্তু কথাগুলো তো পাসের। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই তার অনুমোদন চাইতে হয়েছে আমাকে। আমি তার সাথে কথা বললাম। এ ব্যাপারে তার মহত্ত্ব ছিল বিস্ময়কর কারণ, তিনি পাণ্ডুলিপি ঘষামাজা করলেন, কেবল ঘষামাজাই নয়, সাক্ষাৎকারগুলোয় তিনি নতুন নতুন ধারণা যুক্ত করলেন। আমার কাছে এখনও তার পাণ্ডুলিপিটা আছে। সাক্ষাৎকারগুলো তিনি কেবল পরিমার্জনাই করেননি। তিনি ওগুলোয় যুক্ত করলেন নতুন নতুন শব্দ আর আমার প্রশ্নগুলোর বিপক্ষে তার বক্তব্যকে আরও শক্তিশালী করে তুললেন। এই কারণে বইটি খুব ভালো হয়েছে। কারণ ২০ বছরব্যাপী নেয়া সাক্ষাতকারগুলো হাতের কাছেই ছিল।

রাজু: তার স্ত্রীও আপনাকে সহযোগিতা করেছেন, তাই না?

ব্রাউলিও: হ্যাঁ, তার স্ত্রী সহযোগিতা করেছেন কারণ বইয়ে ব্যবহৃত ছবিগুলো তার কাছে ছিল। এই বইয়ের প্রত্যেকটা ছবি তার সংগ্রহ থেকে পাওয়া। আর অন্য যে-ছবিগুলো, সেগুলো সৌখিন আলোকচিত্রী হিসেবে তারই তোলা, তবে প্রচ্ছদের ছবিটা সত্যিই খুব সুন্দর হয়েছে। গত সপ্তাহেই তিনি মারা গেলেন। আমি খুব বেশি সৎ হয়ে যাচ্ছি, এ্যা।

রাজু: ব্রাউলিও, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেয়ার জন্য।

ব্রাউলিও: না, রাজু, আসলে আপনাকে ধন্যবাদ দেবো। আপনার সাথে পরিচিত হয়ে আনন্দিত হয়েছি। আমি বলবো, আপনি আমাকে অনুসরণ করছিলেন, আমাকে যারপরনাই খুঁজে ফিরছিলেন। ভাবছিলাম, কে ইনি? কী চান উনি? যাক, শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচয় হলো। আপনার মাধ্যমে আমার ভারতের সাথে পুনরায় সাক্ষাৎ হলো। ভারতে আবার যাওয়ার ব্যাপারে আপনি আমার জন্য এক প্ররোচনা হয়ে উঠলেন। অতএব, দ্বিতীয়বারের মতো আমি আবার যাবো।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক