২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

আবদুল মান্নান সৈয়দ ও তাঁর আনাগোনা

ভাবছি আর মনে মনে অনাসৃষ্টির জন্য নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছি; বিপর্যস্তুও হচ্ছি, আমি মিথ্যা বললাম যে আমার বন্ধুর এখানে এসেছি!

আবদুল মান্নান সৈয়দ ও তাঁর আনাগোনা

আলোকচিত্র:

ফেরদৌস সাজেদীন ফেরদৌস সাজেদীন

Published : 03 Aug 2023, 08:28 PM

Updated : 03 Aug 2023, 08:30 PM

উনসত্তরের একবারে শেষের দিকে, ঢাকার বাতাস তখনও গরম, শামসুর রাহমানের ‘আসাদের সার্ট’ শরীরের রক্তে লেখা হয়েছে বছরের গোড়াতেই। তারপর সারা বছরজুড়ে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে গণআন্দোলন ধীরে ধীরে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। আইয়ুব খান ক্ষমতা তুলে দেয় ইয়াহিয়া খানের হাতে। ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারি করে। আমরা বেশ কিছুদিন লাগাতার কার্ফু-বন্দি থেকেছি। পূর্ববাংলার নিত্যদিনের জীবন-কলরোলে টহল দিচ্ছে অভূতপুর্ব এক আত্ম-বিকাশের শক্তি। এই বিকাশ-শক্তি অচিন ও অপ্রতিরোধ্য, দুর্বার ও  আরাধ্য, একরৈখিক ও মুক্তিস্পর্শী। এরমধ্যেই ঢাকা কলেজ-চত্বরের বাইরে এসে বাতাসে অজস্র ডমরুর শব্দ শুনি।  টের পাই, এই আপন ও অভাবনীয় জনতা ও সময়ের আয়োজনকে আমরা সবাই একস্বরে অভিবাদন জানাচ্ছি।  

জাতির এই ধুপধাপ আকাঙ্ক্ষা ও অঙ্গীকারের মধ্যেও কলোচ্ছলিত হয় শিল্পকলার সকল শাখা। নতুন কবির দল কবিতা লিখছেন সেইসময়ের রূপরসগন্ধকে তুলে ধরতে। প্রকাশে ও আশ্বাসে আমাদের উঠতি সাহিত্য- সাধকরাও অভ্যুদয়ের মুখোমুখি। শামসুর রাহমানের ‘বিধস্ত নীলিমা’, ‘নিরালোকে দিব্যরথ’ বেরিয়ে গেছে, ‘আসাদের সার্ট’ ও এইসময়ের অন্যান্য  কবিতা নিয়ে ‘নিজ বাসভূমে’ প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে; শহীদ কাদরী’র ‘উত্তরাধিকার’ এসে গেছে, সৈয়দ শামসুল হকের ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’র পর ‘বিরতিহীন উৎসব’ বেরুবে। আল মাহমুদ ‘সোনালী কাবিন’-এর দিকে তাকিয়ে আছেন, নির্মলেন্দু গুণের ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ প্রসব কাতরতায় অস্থির, আবুল হাসানের ‘রাজা যায় রাজা আসে’র কবিতাগুচ্ছ উৎপন্ন হচ্ছে তখন থেকেই; ‘প্রসন্ন পাষাণের’ পর রশীদ করীম লিখছেন ‘আমার যত গ্লানি’, মাহমুদুল হকের গল্প আসছে, তিনি ‘যেখানে খঞ্জনা পাখি’(অনুর পাঠশালা), ‘জীবন আমার বোনে’র জন্য তৈরি হচ্ছেন, আরও আরও। সেই উদ্ভিন্ন ও  উষ্ণ সময়ের কথা বলি সেই পরিসর এখানে নেই!   

‘সমকাল’, ‘স্বাক্ষর, ‘সাম্প্রতিক’-এর পথে আগেই যোগ হয়েছে ‘কণ্ঠস্বর’। তখন বছর পাঁচেকের অভিজ্ঞতা  নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘কণ্ঠস্বর’এর প্রতিটি সংখ্যা জাগরী হয়ে প্রবলভাবে সমাদৃত। সেই সময়, শুধু সময়ের অনুষঙ্গ হয় ‘সুন্দরম’ নামের আরেকটি লিটল ম্যাগাজিন, তখন কেবল নামটি ধারণ করা হয়েছে, সঙ্গে একটি লেখক-তালিকাও; প্রকাশ-তাড়ণা অনুরক্ত হয়ে আছে। আমার তখন কলেজপক্ষ শেষ, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে প্রবেশ-অপেক্ষা। লেখকের তালিকায় ছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদে’র নাম। এই সিদ্ধান্তের পথ ধরে এক সন্ধ্যায় যাই সায়ীদ স্যারের কলাবাগানের বাসায়। আমি স্যারের ছাত্র, ঢাকা কলেজের। এর আগেও স্যারের নৈকট্য ছাত্র-শিক্ষকের বাইরেও পেয়েছি। কিন্তু সেসব বারান্তরের কথা।

সেদিন স্যার নিজের লেখার আশ্বাস দিলেন। আর আবদুল মান্নান সৈয়দের বাড়ির সন্ধান দিলেন। বললেন, মান্নান আমার পড়শি, রাস্তার ওপাশেই, ‘উপশম’-এর পেছনে। আমি সেদিন স্যারের বাসায় শুধু তাঁর লেখার আশ্বাস পাইনি, সন্ধ্যার চায়ের সঙ্গে চানাচুর-বিস্কুট ছিল, মনে পড়ে।

আবদুল মান্নান সৈয়দ তখন বেশ আলোচনার মধ্যে আছেন। ‘মাতৃহননের নান্দীপাঠে’র লেখক ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ তো বটেই, তাঁর ‘সত্যের মতো বদমাশ’ নিয়েও বেশ আলোচিত। শুধু আলোচিত-ই নন, তার এই গল্পের বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তেজক, রোমাঞ্চকর ও হুলস্থুলে ব্যাপার। উভয় বাংলায় তাঁর চর্চা হচ্ছে। বাংলা সাহিত্য ষাটের দশকে হঠাৎ অন্যরকম এক সেবক পেল, যিনি ভাঙ্গেন, মুহুর্মুহু; প্রথম গল্প, প্রথম কবিতা থেকেই। আর তাঁর ভাষা, অবস্কিউর্‌ড্‌ এর আদল, আবার সুস্বাদু; পাঠকের চেটেপুটে খেতে বাসনা হয়। কিন্তু এখানেই থামতে হচ্ছে, কারণ এক-ই, পরিসর নেই।

আবদুল মান্নান সৈয়দকে সেই সন্ধ্যায় পাইনি। পেলাম পরের দিন। তিনি খোলা দরোজার দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিলেন বিছানায়। আমাকে তিনি তাঁর দিকে আসতে দেখেন এবং উঠে বসতে বসতে ইশারা করলেন ঘরে আসতে। আমি তাঁর কাছে গিয়ে আমার পরিচয় দেই। পরিচয়ের কিছু ছিল না, শুধু নামটুকু বলা ছাড়া। একটু যোগ করি, বলি, ‘সুন্দরম’ নামের একটা লিটল ম্যাগাজিন বের করার পরিকল্পনা হচ্ছে। আপনার একটা লেখা চাই। আমার জন্য লেখা-চাওয়াটা ছিল একটি নতুন অভিজ্ঞতা। আগে স্কুলে থাকতে লেখা চেয়েছি সতীর্থ বা পরিচিতদের কাছে, সেখানে আড়ষ্টতার স্থান ছিল না। কিন্তু এরা বিখ্যাত, আমি নামগোত্রহীন, কী বলে চাইব বা চাইতে হয়! আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন, আরে, বাহ এত খুশির খবর! বসুন বসুন! 

তিনি যেখানে শুয়ে ছিলেন, একটি হাতাওয়ালা শাদাগেঞ্জি পরণে, তার আশপাশে বেশ কিছু বইপত্র, খাতাকলম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিছুটা উদ্ভ্রান্ত তাঁর চেহারা, অগোছালো বসবাস, বিকেলে ঘরে বন্দি, এইসব দেখে আমি যারা-সাহিত্য-করে এইরকম মানুষের একটা চিত্র পাই। সেদিন বেশিক্ষণ কথা হয়নি। চা পেয়েছি, সঙ্গে উষ্ণতা। চলে আসার সময় তিনি বললেন, ‘পেয়ে যাবেন সুনিশ্চিত’! এই ‘পেয়ে যাবেন সুনিশ্চিত’ বাক্যটি , পরবর্তিতে যখনই তাঁর কাছে লেখা চেয়েছি, তখনই শুনেছি। পেয়েওছি, মনে পড়ে। তারপরের ঠিকানা ছিল শরিফ মিয়ার ক্যান্টিন। আমার আশা, তৎকালীন ঢাকার উদীয়মান কবি ও গল্পকারের লেখা মিলবে সেখানে। প্রবন্ধের জন্য আহমদ শরীফের কাছে যাব ঠিক করা আছে। শামসুর রাহমান, রাহাত খান তালিকায় জ্বল জ্বল করে আছেন। আর আমাকে এসবের ঠিকানা দিচ্ছেন আবুল কাসেম ফজলুল হক, তখন-ই তিনি প্রতিষ্ঠিত প্রাবন্ধিক। কিন্তু সেসব বয়ানের পরিসর এখানে নেই, আমি বলছি কেবল তাঁর কথা! 

তারপর খুব তাড়াতাড়ি কয়েকমাস ফুরিয়ে গেল। আমি ফজলুল হক হলে স্থানাতরিত হয়েছি। ‘সুন্দরম’এর লেখা পেয়েছি, মোটামুটি সবার। পুরাণ ঢাকায়,‘স্টার’ সিনেমা হলের পাশেই একটি ছোট্ট প্রায় ঘুপ্টিমারা-প্রায়ান্ধকার প্রেসে কাজ চলছে। সকালে গিয়ে রাতে ফিরি। কম্পোজিটরের পাশে বসে বসে ‘লেড-অক্ষর’ সাজানোর কাজ দেখি, প্রুফ দেখি, সঙ্গে চা। সম্পাদকের অনেক দায়িত্ব, চা পানে তার সাক্ষর রাখি। একদিন সন্ধ্যা তখন উতরে গেছে, আজ যা কম্পোজ হল তার ‘ছাপা-প্রিন্ট’ ও মূল লেখাটি পাঞ্জাবীর পকেটে ঢুকিয়ে  রিকশায় উঠি। একটু পরে কী কারণে পাঞ্জাবীর পকেটে হাত ঢুকাই, মনে হল, কিছু একটা নেই; নেই মানে! আমার শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা! মান্নান ভাইয়ের লেখা নেই! আমি রিকশাওয়ালাকে থামতে বলি। না আশপাশে নেই। রিকশাওয়ালাকে আবার এগিয়ে আসা পথ থেকে পেছন পথে ফিরতে বলি, একেবারে প্রেস পর্যন্ত। রাস্তা তখন প্রায় ফাঁকা। চোখের চিরুনী চালিয়েও সে লেখা পাইনি। সে রাত অনিদ্রিত থেকেছি।

পরেরদিন সকাল সকাল গ্রীণরোডের মান্নান ভাইয়ের বাসায় যাই। শুনি, তিনি সিলেটে। সম্প্রতি তিনি এম. সি কলেজে বদলি হয়েছেন। বাসায় তাঁর লেখা-জোকা কোথায় আছে, কেউ জানেন না। সত্তরের শুরু, তখন ট্রাঙ্ককল-ও দিল্লি-দূর-অস্ত, তাঁর টেলিফোন আছে কী নেই কে জানে!

আমি ভীষণ মন মরা হই। একটা নিষ্পিষ্ট দিনের শেষে আমি অনিবার্য্য টান পাই। আমি কমলাপুর স্টেশন থেকে গায়ে চাদর ছড়িয়ে সেদিনেই শীতরাতের সিলেট মেল-ট্রেনের যাত্রী হই। আমার প্রথম সিলেট যাওয়া। 

বেশ সকালে  সিলেট স্টেশনে নামি, রিকশা নিয়ে একে ওকে বলে তাঁর বাসায় গিয়ে কড়া নাড়ি। বেশ সুন্দর চারদিক, রোদ ফুটেছে পাহাড়-পাহাড় আঙিনায়। তাঁর বাড়ির সামনে সুন্দর ঘাসের টুকরো জমি। মান্নান ভাই আমাকে দেখে অবাক। বললেন, ‘কী কান্ড আপনি, আপনি কোত্থেকে’? আমি ফস করে বলি, ‘এইত এক বন্ধুর বাসায় এসেছিলাম, ফিরে যাবার পথে ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই’। মান্নান ভাই আমাকে দেখে ভীষণ খুশি হয়েছেন, বুঝতে পারি, বললেন, ‘আসুন আসুন, বসুন’। আমি কয়েক মুহূর্ত পরে তাঁকে জিগ্যেস করি লেখাটার কোন কপি আছে কীনা। আমার প্রশ্ন শুনে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘তাই বলুন’! আমি তখনও নিজের অনাশ্রয়ের মধ্যে আছি, বুঝতে পারছি না কী বলি! আমি একসময় পুরো ঘটনা খুলে বলি। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, ওটা আর পাওয়া যাবে না। আমার কাছে এখানে নেই। ঢাকায় আছে কিনা জানি না। থাকার কথা না। কিন্তু আমার কাছে একটা শ্রুতি নাটকের কিছুটা আছে, মাত্র শুরু করেছি। এটাই দিয়ে দিন’? আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাই। ভাবছি আর মনে মনে অনাসৃষ্টির জন্য নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছি; বিপর্যস্তুও হচ্ছি, আমি মিথ্যা বললাম যে আমার বন্ধুর এখানে এসেছি! মান্নান ভাই এক কথায় সব অনাবিল করে দিলেন, বললেন, ‘আমি নাস্তার কথা বলছি, বাইরে শীত-রোদে বসে নাস্তা করব আর আমি বলব, আপনি লিখবেন’। কথামত লেখা টুকে নেই। সে এক অভাবিত ও আনন্দিত অভিজ্ঞতা! আমি সেদিন-ই  দুপুরের ট্রেনে ঢাকায় ফিরি।

আমি যে সেদিন সরাসরি তাঁর কাছেই গিয়েছি মান্নান ভাই বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর ‘স্মৃতির নোটবুক’এ তার উল্লেখ পাই।

কতো কতোবার মান্নান ভাই আমার সেই উত্তাপ-ঠাসা, অনবসিত, উত্তাল দিনগুলোতে আমার ভাবনার মহাদেশকে ঝাড়পোছ দিতে সাহায্য করেছেন তাঁর কথায়, লেখায় আর সান্নিধ্যে তার হিসেব নেই। আমি আজ ‘করতলে মহাদেশ’ নিয়ে অসহায়, তিনি নেই!  

 লং আইল্যান্ড, নিউ ইয়র্ক

অগাস্ট ২, ২০২৩