Published : 04 Aug 2023, 12:13 PM
আমি কবি আবদুল মান্নান সৈয়দকে প্রথম দেখি বাংলা একাডেমীতে কবিতা পাঠের আসরে দূর থেকে, সত্তর দশকের গোড়ায়। কিন্তু তাঁর কবিতা পাঠ করি আমার কলেজ জীবনের শুরু থেকেই। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরই ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার সঙ্গে আমার পরিচয়। সেটা কিছুটা সমকালীন সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ, কিছুটা আমার সরাসরি শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই পত্রিকার সম্পাদক সেজন্য। এছাড়া আমার কলেজিয়েট স্কুলের সিনিয়র আইয়ুব ভাই, যিনি আমার স্কুল ও কলেজ হোস্টেলের কক্ষসঙ্গী এবং ঢাকা কলেজে প্রায় মেনটরের ভূমিকায় ছিলেন, তিনিই আমাকে শওকত ওসমান স্যার ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার সম্পর্কে বিস্তারিত বলেন। কেন তাঁদের ক্লাস কোনভাবেই মিস করা ঠিক হবে না, কেন সায়ীদ স্যার সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকাটি একটু ভাল করে পড়তে হবে, বিশেষ করে তাঁর লেখা ও সম্পাদকীয়। এর ফলে তাঁর শিল্পী-মনটা বুঝতে সুবিধা হবে। আমি আইয়ুব ভাইয়ের পরামর্শ প্রায় সব ব্যাপারেই আক্ষরিকভাবে মেনে চলতাম।
সেভাবেই আমি ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকায় আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতা প্রথম পড়ি। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই প্রথম যে-কবিতাটি পড়েছিলাম সেখানে আমি পরাবাস্তব কিছু ছবির ইঙ্গিত দেখেছিলাম। হোস্টেলের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ‘৭০ সালের অক্টোবরে সেই কবিতা এক বিকেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি পাশের বিছানায় শুয়ে থাকা আইয়ুব ভাইকে তাঁর দেয়া সদ্য শেষ করা একটি বইয়ের কবিতার কথা বললাম। ইউরোপীয় চিত্রকলায় সাররিয়ালিজম যেভাবে আন্দোলন হিশেবে এসেছে, তার কিছু ইঙ্গিত এবং আধুনিক ইউরোপীয় কিছু কবিতায় ব্যবহার করা ইমেজারির সঙ্গে এই কবির কবিতার সাদৃশ্য সম্পর্কে বললে আইয়ুব ভাই আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের কবিতায় এই তরুণ কবিই প্রথম পরাবাস্তব কিছু ইমেজারি ব্যবহার করেছেন’। কেন জানি না সেই প্রথম ধারণাটা, তাঁর কবিতা সম্পর্কে আমার কোনদিন মুছে যায়নি মন থেকে। বিশেষ করে ইউরোপীয় আধুনিক চিত্রকলার বিভিন্ন অনুষঙ্গ তিনি তাঁর তরুণ বয়সের কবিতায় বার বার ব্যবহার করেছেন। এটা আমার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের শুরু পর্যন্ত তাঁর কবিতায় মত্ত থাকার সময়ে মনে হয়েছে। আমার যে-বন্ধুরা কবিতা-পাগল ছিলেন কলেজে তাঁদের কাছেই প্রথম ষাট দশকের কবিদের মধ্যে কেন আবদুল মান্নান সৈয়দ আলাদা কণ্ঠস্বর তা শুনতে পাই, আমাদের ঢাকা কলেজ ক্যান্টিনে সিঙ্গারা পুরি ও চা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বারেক বা কামরুল আহসান, আমার দুই কলেজিয়েট স্কুলের সহপাঠী, সে-সময়ের বিভিন্ন কবিতা বেশ নিবিড়-ব্যবচ্ছেদই করত। বারেক সাহিত্যের যে কোন বিষয়ই একেবারে ভিন্ন চোখে দেখতে অভ্যস্ত ছিল। ওদের বক্তব্য পরে আমি কলেজ হোস্টেলে আইয়ুব ভাইকে জানালে তিনি আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন এবং বলতেন, ‘বারেকের কবিতা বোঝার মন একেবারে আলাদা।’
এভাবেই একেবারে পনের বছর বয়স থেকে আমার মান্নান ভাইয়ের কবিতা পাঠ শুরু। কিন্তু মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয় হয় এর প্রায় পাঁচ বছর পরে, ‘৭৫ সালের শেষদিকে। আমি আজ এ লেখায় তাঁর কবিতা বা সাহিত্য বিষয়ে মূল্যায়ন করব না, শুধু আমি মানুষ আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পর্কে দুয়েকটি কথা বলব। তাঁর সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা ও প্রবন্ধ বিষয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরে পাঠ করে লেখার চেষ্টা করছি, সেই লেখা শেষ হলে সেটিই হবে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন। আমি তাঁকে লেখক হিশেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, তিনি যে বিভিন্ন কারণে আমাদের সাহিত্যে সঠিকভাবে তাঁর প্রাপ্য মূল্য পাননি, তা যেমন বলার রয়েছে, তেমনি আমাদের সাহিত্য-রাজনীতির কী কী কারণে তিনি আন্ডাররেটেড রয়ে গেছেন তাও কিছুটা উল্লেখ করার চেষ্টা করব সেই লেখায়। আমার এই লেখা শুধু ঋজু ব্যক্তিত্বের অধিকারী আমাদের সাহিত্যের সামান্য কয়েকজন লেখকের একজন তিনি, সেটাই কিছুটা বলার চেষ্টা। তাঁর মরাল শক্তি যে অনেকের চেয়ে বেশি সে বিষয়ে সামান্য বলা।
কবি আবদুল মান্নান সৈয়দকে ‘৭৫ সালে একদিন রফিক ভাইয়ের অফিসে দেখার আগে অনেকবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখেছি, কিন্তু আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। তিনি ততদিনে ঢাকার একটি কলেজ থেকে বদলি হয়ে সিলেটে চলে গেছেন। হঠাৎ একদিন টেলিভিশনে তাঁকে কবিতা বিষয়ে বক্তব্য রাখতে দেখি। পরদিন বাংলা একাডেমীতে রফিক আজাদ ভাইয়ের দপ্তরে আড্ডা দিতে গেলে দেখি মান্নান ভাই সেখানে রয়েছেন। রফিক ভাই তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আবেদীন সারাক্ষণ আপনার কবিতার কথা বলে, আপনার কবিতার অনুরাগী পাঠক সে।’ তখন মান্নান ভাইকে আমি আগের দিন রাতে টেলিভিশনে দেয়া তাঁর বক্তব্য সম্পর্কে বলি এবং প্রায় সারাটা বক্তৃতার কথাই বলে দিই, কেন আমি তাঁর বক্তব্য খুব পছন্দ করি তাও জানালাম। কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলেন তিনি। ল্যাটিন আমেরিকার কবিতা, বিশেষ করে নেরুদার কবিতা নিয়ে তাঁর বক্তব্য সে সময়ে কেউ খুব বেশি পছন্দ করতেন তা নয়, কারণ আমাদের ষাটের কবিরা নেরুদাকে যেভাবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতেন সেভাবে একেবারেই দেখতেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমি তাঁর সেই আলাদা দেখাকেই গুরুত্ব দেই এবং আজও নেরুদাকে রাজনীতির বাইরে গিয়ে কবিতার সৌন্দর্য মূল্যায়ন করেই পছন্দ করি। আমার সেদিন মনে হয়েছিল মান্নান ভাই কবিতা বিশ্লেষণ করেন তাঁর সমকালীন লেখকদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখ দিয়ে। আমার এভাবে তাঁর বক্তৃতার সব কথাকে স্মরণ করে বলায় তিনি একটু অবাক হয়েছিলেন মনে হয়। রফিক ভাই জানান তিনি টেলিভিশন অনুষ্ঠানটি দেখেন নি। মান্নান ভাই জিজ্ঞেস করেন আমি কোথায় পড়ি। সেই থেকে বিভিন্ন জায়গায় দেখা হলে কথাবার্তা হয়, এটুকুই।
এর কিছুদিন পর তিনি ঢাকায় বদলি হয়ে চলে আসেন, আমার সঙ্গে মাঝে মাঝেই ব্রিটিশ কাউন্সিলে দেখা হয়। তিনি কলেজ থেকে ফেরার পথে ব্রিটিশ কাউন্সিলে যেতেন। আমি যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব কম যেতাম, তাই লাইব্রেরিগুলোতেই ঘোরাঘুরি করে সময় কাটাতাম দিনের অধিকাংশ সময়। এভাবে ‘৭৭ সালে একদিন তিনি জানান তাঁর বাসা গ্রীন রোডে, এক সময় এলে আড্ডা দেয়া যায় বন্ধের দিনে। সেই ‘৭৭ সালের শেষদিক থেকে আমি মাঝে মাঝেই নিউ মার্কেটে ও তাঁর বাসার কাছে ‘নিমন্ত্রণ’ রেস্তোরাঁয় তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। তিনিই কথা বলতেন, আমি শুধু শ্রোতা। আমি মাঝে মাঝে বই ঘাটতে নিউ মার্কেটে গেলে তাঁকে দেখতাম ‘নলেজ হম’ -এ খান মজলিশ সাহেবের সঙ্গে কথা বলছেন। সেখানে কিছুটা আড্ডা হত, তিনি তাঁর বাসায় যেতে বলতেন বন্ধের দিনে। আমি মাঝে মাঝে বাসায় যেতাম, তিনি দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় একটু অপেক্ষা করতে বলতেন, কিছুক্ষণের মধ্যে নেমেই নিয়ে যেতেন সামান্য দূরে গ্রীন রোডের ‘নিমন্ত্রণ’ রেস্তোরাঁয়। খুব মিষ্টি খেতে ভালবাসতেন। বালুসা ও অন্য কোন মিষ্টি আর চায়ের জন্য বেয়ারাকে বলতেন। মান্নান ভাই ছিলেন আমার দেখা সামান্য কয়েকজন লেখকের একজন যিনি তরুণ লেখকদের কাউকে চা বা অন্য কোন খাবারের বিল দিতে দিতেন না। নিজে দিতেন। অধিকাংশ কবি সাহিত্যিকদের দেখেছি শুধুই তরুণ লেখকদের পয়সায় চা সিঙ্গারা খেতেন। কোথায় যেন তাঁর আচরণ ও কথাবার্তায় একটা বনেদী পরিবারের ছোঁয়া দেখা যেত। এছাড়া ঢাকার সাহিত্য- রাজনীতি বিষয়ে তিনি ভীষণ ঋজু ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিতেন, যেসব দলাদলি অবিরাম চলত, বিশেষ করে স্বাধীনতার পর থেকে, তিনি সেগুলোকে অপছন্দই শুধু করতেন না, বরং নিচু মানসিকতার পরিচয় বলেই মনে করতেন। সাহিত্য আদর্শের বিষয়ে আড্ডায় যা বলতেন, বা তাঁর রচিত অধিকাংশ প্রবন্ধ পড়ে যা বোঝা যেত তাতে তাঁকে ‘কলাকৈবল্যবাদী’ বলে ভুল হতে পারে, কিন্তু নেরুদা বা লোরকা বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার বিশ্লেষণ পড়লে তাঁর সাহিত্য আদর্শ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। শিল্পের সৌন্দর্যের সঙ্গে সাহিত্যের সামাজিক দায়কে তিনি মোটেই অস্বীকার করতেন না, কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন লেখকদের রাজনীতির ধ্বজাধারীতাকে তিনি লেখকের জন্য ক্ষতিকর বা চরিত্রহীনতাই মনে করতেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমার তাই মনে হয়েছে।
‘৭৭ সালে একদিন ‘নিমন্ত্রণ’-এ বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম, শুনছিলাম জীবনানন্দের কবিতা বিষয়ে কয়েক বছর কী মগ্ন ছিলেন তিনি, এবং কী গভীর পরিশ্রমের ফসল তাঁর ‘শুদ্ধতম কবি’! তিনি বলেন যে তিনি ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে কলকাতা যাচ্ছেন গবেষণা করতে। এর কিছুদিন পর তিনি চলেও যান। একদিন ‘৭৮ সালের শেষদিকে, যতদূর মনে পড়ে, সাপ্তাহিক ‘রোববার’ পত্রিকার দপ্তরে গিয়ে দেখি মান্নান ভাই বসা। রফিক ভাই আমাকে বেশ কিছু প্রুফ দেখতে দেন। মান্নান ভাই শেষ প্রুফ দেখছেন, তার আগের কিছু গ্যালি আমি কয়েক ঘণ্টা ধরে দেখে দিলাম। সেটি ছিল মান্নান ভাইয়ের উপন্যাস ‘পার্কস্ট্রীট’- এর প্রুফ। কলকাতার পটভূমিতে লেখা উপন্যাস। আমার খুব ভাল লেগেছিল, ভাষা একজন কবির সন্দেহ নেই, কিন্তু কাহিনীও ছিল বেশ সাহসী। মান্নান ভাই ছুটিতে কলকাতা থেকে এসেছেন, আবার শিগগির চলে যাবেন।
রফিক ভাই আর মান্নান ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল ব্যক্তিগতভাবে খুব শ্রদ্ধাপূর্ণ, কিন্তু রাজনীতি ও মানসিকভাবে তাঁরা বিপরীত ধারার মানুষ। আড্ডায়, বা কোথাও দেখা হলে তাঁরা সত্যিই খুব আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাপূর্ণ ছিলেন আচরণে। দুজন দুজনকে শ্রদ্ধা করতেন, কিন্তু তাঁরা যে বিপরীত ধারার লেখক ও ব্যক্তিমানুষ, তা তাঁরা জানতেন। দুজনকেই আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করি, কিন্তু আমাদের সাহিত্যে মরাল শক্তির দিক থেকে ষাটের দশকের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষ আবদুল মান্নান সৈয়দ ও সিকদার আমিনুল হককেই মনে করি। এই দুই কবির আত্মমর্যাদাবোধ, সততা ও রুচিবোধ সত্যিই খুব উঁচু মানের।
একাডেমিক শৃঙ্খলা আসলে এক ভিন্ন বস্তু, মান্নান ভাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে বছর তিনেক গবেষণা করে প্রয়োজনীয় গবেষণা উপাত্ত নিয়ে, অন্যান্য নানা বিষয়ে পড়াশুনা করে কলকাতা থেকে ঢাকা ফিরে আসেন, কিন্তু অভিসন্দর্ভ লেখা বা জমা দিয়ে ডিগ্রী নেয়া সম্ভবত তাঁর ধাতে সয়নি, কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা নিয়ে নিজের মত করে লিখেছেনও তিনি। কলকাতা থেকে ফিরে আসার পর তাঁর সঙ্গে মাঝে মাঝেই আড্ডা হত, বলা যায় আমি শুধু শ্রোতা, তিনিই কলকাতার সাহিত্য জগতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বলতেন। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে কবি আবিদ আজাদের ‘শিল্পতরু’ প্রকাশনীতে আবার আমাদের আড্ডা শুরু হয় রেগুলার। আমি জানতাম কাঁঠালবাগানের ঢালে ‘শিল্পতরু’র দপ্তর ও প্রেস। খুব বেশি যাওয়া হয়নি, মান্নান ভাইই একদিন সেখানে যেতে বললেন, গিয়ে দেখি আমার সহপাঠী কবি মাহবুব হাসান ও আরও অনেক তরুণ লেখক রয়েছেন। আমার অফিসের, অর্থাৎ টেলিভিশনের পরিচালক বিখ্যাত প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক ফখরুজ্জামান চৌধুরীও সেখানে মাঝে মাঝে যেতেন। তিনি মান্নান ভাইকে খুব স্নেহ করতেন। দুজনের সম্পর্ক খুব শ্রদ্ধাপূর্ণ। ফখরুজ্জামান চৌধুরী একদিন আমাকে বললেন, ‘আপনি শিল্পতরুর আড্ডায় গেছেন আর সেদিনই আমি অনুপস্থিত। আসেন ওখানকার আড্ডায়, বাড়ির কাছে, হেঁটেই আসতে পারেন।’ ‘শিল্পতরু’র আড্ডাটা সন্ধ্যায়, আমার আবার সে-সময়ে টেলিভিশনে কাজ। আমি দুপুরের দিকে আর ছুটির দিনে সন্ধ্যায় যেতাম। সেখানেই পরবর্তী কয়েকটি বছর আমি মানুষ আবদুল মান্নান সৈয়দকে ভিন্নভাবে চিনতে পারি। দারিদ্র কোন কারণ কিনা জানি না, আমাদের সাহিত্য জগতের অধিকাংশ মানুষ যে ব্যক্তিত্বহীন, দ্বিচারিতাপূর্ণ, কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতাহীন, আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন একেবারে তার বিপরীত ধাতুতে গড়া মানুষ। সত্তর দশকের শেষ দিক থেকে আমাদের এই সাহিত্য জগৎটা একেবারে দুই বিপরীত মেরুতে বিভক্ত হয়ে যায়, এর পেছনে আদর্শ যতটা কাজ করেছে, জাগতিক স্বার্থ তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেছে। কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্য এদের একটি গোষ্ঠীর আসরে কখনও হয়ত কবিতা পড়েছেন, কিন্তু এই সংগঠনের মোড়লদের জাগতিক স্বার্থ বা ধান্ধার সঙ্গে নিজেকে কখনও জড়ান নি। পারিবারিকভাবে তিনি যেমন স্বচ্ছল ছিলেন, তেমনি তাঁর ব্যক্তিত্বও ছিল ঋজু। সম্ভবত তাঁর যে সঠিক মূল্যায়ন হয় নি সেটার জন্য তাঁর ব্যক্তিত্বের এই ঋজুতা অনেকখানি কাজ করেছে। তিনি কোন দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেন নি কখনও। তাঁর কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল সাহিত্য ও শিল্পের সৌন্দর্যমূল্য!
সাহিত্যকে আমি কখনও খুব সিরিয়াসলি নেইনি, কিন্তু যে সামান্য প্রবন্ধ লিখতাম তাও তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়তেন, মাঝে মাঝে সে-সব আড্ডায় বলতেন। আশি সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমীতে একুশের অনুষ্ঠানে তিনি সমকালীন প্রবন্ধ নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন, সেখানে আমার তখনকার লেখা নিয়ে কিছু মন্তব্য করেন যা আমি শুনেছি, কিন্তু তিনি আমাকে আগে কিছুই বলেন নি। ‘শিল্পতরু’ আমার টেড হিউজের কবিতার অনুবাদ বের করে, আড্ডা দিতে দিতে মান্নান ভাই খুব যত্ন করে সেই পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখে দিয়েছিলেন। সেটি আমার জন্য ভীষণ সম্মানের। আমি মনে মনে খুব কৃতজ্ঞ ছিলাম সেজন্য।
‘৯৩ সালের আগস্টের ২ তারিখে আমার নিউ ইয়র্ক চলে আসার ফ্লাইট, বিকেলে বাড়ি থেকে রওয়ানা দেয়ার ঘণ্টাখানেক আগে তাঁকে একটি জিনিস দিতে যাই, সেটা পেয়ে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। আমরা থাকতাম রাস্তার এপার ওপার। আমার বিদেশে চলে আসাকে তিনি পছন্দ করেন নি, কিন্তু তাও বলেছেন, ‘অনেক বইপত্র পড়তে পারবেন, অনেক দেশের লেখকদের জানবেন, এটা খুব প্রয়োজন।’ আমি তাঁকে বিদায়ের আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বই ছাড়া কী পাঠাব আপনার জন্য!’ তিনি বলেছিলেন পুরনো বা ভাল সাহিত্যপত্রিকা পারলে পাঠাবেন। আমি তাঁর পছন্দের লেখকদের জানতাম, সেরকম বই ও কিছু পত্রিকা পাঠিয়েছিলাম।
আমাদের সাহিত্য জগতে সত্যিকার শ্রদ্ধা করার মত মানুষের সংখ্যা কম, কিন্তু আবদুল মান্নান সৈয়দ শুধু একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখকই নন, তিনি ভীষণ বড় হৃদয়ের শ্রদ্ধেয় মানুষও!