গালিসিয়: পর্তুগালের মাতৃভাষা

জি এইচ হাবীবের অনুবাদে গাস্তঁ দোরেনের প্রবন্ধ

জি এইচ হাবীবজি এইচ হাবীব
Published : 19 Nov 2022, 01:31 PM
Updated : 19 Nov 2022, 01:31 PM

গাস্তঁ দোরেন একজন ভাষাতাত্ত্বিক, সাংবাদিক এবং বহুভাষাবিদ। তিনি ওলন্দাজ, লিম্বার্গিশ, ইংরেজি, জর্মন, ফরাসি, এবং হিস্পানি ভাষায় কথা বলতে পারেন, পড়তে পারেন আফ্রিকানস, ফ্রিসিয়, পর্তুগিজ, ইতালিয়, কাতালান, ডেনিশ, নরওয়েজিয়, সুইডিশ এবং লুক্সেমবুর্গিশ। ওলন্দাজ ভাষায় তিনি দুটো গ্রন্থ রচনা করেছেন -- অভিবাসীদের ভাষা নিয়ে রচিত Nieuwe tongen (New Tongues), এবং Taaltoerisme (Language Tourism), যে-বইয়ের ওপর ভিত্তি ক’রে Lingo: A Language Spotter’s Guide to Europe ইংরেজিতে রচিত হয়েছে, এবং তৈরি হয়েছে Language Lover’s Guide to Europe নামের একটি অ্যাপ (বক্ষ্যমাণ রচনাটি Lingo বইটির-ই একটি নাতিদীর্ঘ অধ্যায়ের অনুবাদ)। অবসরে গাস্তঁ দোরেন গান গাইতে পছন্দ করেন, এবং অবশ্যই তা বহু ভাষায়। নেদারল্যান্ডের আমার্সফুর্ট-এ তিনি সস্ত্রীক বাস করেন।

এই বইয়ের বেশিরভাগ যেখানে লেখা হয়েছে সেখানে আপনাদের স্বাগত জানাই। আর স্থানটি হচ্ছে আমার পড়াশোনার ঘর। জানালার পর্দাগুলো (ব্লাইন্ডস) না থাকলে ঘরটার ছবি এই বইয়ে দিতাম না। কিন্তু ব্যাপারটা হলো এই যে, এই পর্দাগুলো আইবেরিয় উপদ্বীপের ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাস নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে, বিশেষ ক’রে সেটার উত্তর পশ্চিমের প্রান্তবিন্দু গালিসিয়ার, যে অঞ্চলটি সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার জন্য সবচাইতে বেশি বিখ্যাত (স্পেনের যে শহরে সন্ত মহাত্মা জেমসের বেদী আছে ); অথবা, আপনার কাছে যদি গির্জা বা ধর্মের চাইতে ফুটবলের আবেদন বেশি হয়ে থাকে তাহলে সেটা দেপোর্তিবো দে লা করুনঞা (স্পেনের বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব)।

গালিসিয় ভাষার সঙ্গে পর্তুজিজের বেজায় মিল। এতোটাই যে, গালিসিয়া পর্তুগালে অবস্থিত হলে ভাষা দুটো একই নামে পরিচিত হতো। কিন্তু বাস্তবে, তাদের আনুষ্ঠানিক বা দাপ্তরিক বানান আলাদা; এবং সব গালিসিয়ই যেহেতু স্প্যানিশ ভাষা জানে তাই ভাষাটি বেশি ক’রে স্প্যানিশের মতো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরেও, সাদৃশ্যটি খুবই বেশি। গালিসিয় এবং পর্তুগিজ লোকজন তেমন বড়সড় কোনো অসুবিধা ছাড়াই পরস্পরের সঙ্গে আলাপ করতে পারে। গালিসিয়ভাষীর সংখ্যা তিরিশ লাখ, যা একটি আঞ্চলিক ভাষার জন্য নেহাত মন্দ নয়। তবে, ২০ কোটির বেশি পর্তুগিজভাষীর তুলনায় সেটাকে একটা ছোটোখাটো ক্লাব-ই বলা যেতে পারে। এই ২০ কোটির মধ্যে ১০ কোটির বাস পর্তুগালে, আর বাকি ১০ কোটির নিবাস ব্রাজিল ও আফ্রিকা। কাজেই আপনি হয়ত গালিসিয়কে পর্তুগিজের সন্তান হিসেবে ভেবে নিচ্ছেন। কিন্তু গালিসিয় আসলে সন্তান নয়, মা।

ব্যাপরটা বুঝতে হলে আমাদেরকে রোমকদের কাছে ফিরে যেতে হবে। তারা ২২০ থেকে ১৯ খৃষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে গোটা আইবেরিয় উপদ্বীপ জয় করে নেয়, এবং সেটার নাম দেয় হিস্পানিয়া। বাস্ক ছাড়া বাদবাকি আর সব পুরাতন ভাষার স্থানই লাতিন ধীরে ধীরে দখল ক’রে নেয়। এবার ফাস্ট ফরোয়ার্ড ক’রে ৭১১ খৃষ্টাব্দে চলে আসা যাক। সেই বছর মুর বা স্পেন বিজয়ী আরব মুসলমানেরা  হিস্পানিয়া আক্রমণ করে। এই মুরদের সেনাবাহিনীতে ছিল অসংখ্য উত্তর আফ্রিকী বেরবার ও কিছু আরব, তাদের সবাই মুসলিম। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তারা প্রায় গোটা উপদ্বীপ তাদের কব্জায় এনে ফেলে, সেটার দক্ষিণ প্রান্তবিন্দু থেকে উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল অব্দি। হিস্পনিয়ার নতুন নাম হয় আল-আন্দালুস। কিন্তু আরবি নতুন দাপ্তরিক ভাষা হলেও, সেখানের বেশির ভাগ অধিবাসীর ভাষা লাতিনই থেকে যায়। অন্তত, তারা সেটাকে লাতিনই বলতো। কিন্তু সত্যি বলতে, সেখানে যে-লাতিন ভাষায় লোকে কথা বলতো তার সঙ্গে মূল লাতিনের মিল এতই সামান্য ছিল যে সেটাকে একটা নতুন নাম দেয়া খুব দরকার হয়ে পরেছিল। বেশ পরে, পণ্ডিতেরা সেটার নাম ‘মোযারাবিক’ রাখার সিদ্ধান্ত নেন, যদিও নামটা বিভ্রান্তিকর। কারণ, বেশিরভাগ লোকই  সেটার ‘আরবি’ অংশের ওপর জোর দেয়ার প্রবণতা দেখায়, অথচ ‘মোযারাবিক’ আরবি ভাষার কোনো রূপ বা ধরন নয় – সেটা ছিল আরবি প্রভাববিশিষ্ট একটি রোমান্স ভাষা।

অবশ্য, আইবেরিয় উপদ্বীপের সমস্তটাই যে মুর-রা দখল করে নিয়েছিল তা কিন্তু নয়। উত্তর পুবে, ফ্র্যাংকিশ সম্রাট শার্লামেন এবং তাঁর উত্তরসূরীরা পিরেনিযের ঠিক দক্ষিণে এক ফালি অংশ ধরে রেখেছিলেন। তার চাইতে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, উত্তর উপকূলে একটি পার্বত্য আউটপোস্টে একটি ছোট্ট খৃষ্টান রাজ্য রয়ে গিয়েছিল। সেটার নাম আস্তুরিয়াস। খৃষ্টান শাসকরা আল-আন্দালুসিয়া পুনরুদ্ধার করার জন্য যে প্রতিরোধ প্রচেষ্টা চালিয়েছিল সেই রেকনকিস্তা (Reconquista) নামের প্রতিরোধের উর্বর ক্ষেত্র ছিল এই আস্তুরিয়াস। ধীর একটা প্রক্রিয়া ছিল সেটা: ৯০০ খৃষ্টাব্দের দিকে, উত্তরাঞ্চলে, পুব-পশ্চিম বরাবর একটি করিডর – আয়তনে যা কিনা হিস্পানিয়ার চারভাগেরও কম -- খৃষ্টানদের হাতে আসে। এই সংকীর্ণ করিডরটি এরপর ছোট ছোট নানান ক্ষুদে রাজ্য বা প্রিন্সিপালিটিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে, আর এসব ক্ষুদে রাজ্যের প্রতিটিতেই ছিল একটি রোমান্স ভাষা।

আর এভাবেই অবশেষে আমরা এসে পড়ি আমার কামরার জানালাগুলোর কাছে। দশম শতকের গোড়ার দিকে স্প্যানিশ পেনিনসুলায় যে অবস্থা ছিল সেটার অনেকটাই আমরা এখানে দেখতে পাবো। ডান দিকের পর্দাটাকে আমরা ফ্র্যাংকদের কাছ থেকে নিজেদের মুক্ত ক’রে-নেয়া কাতালোনিয়ার প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ধরে নিতে পারি। এখানে লোকজন কাতালান ভাষায় কথা বলত। বাম পাশের পর্দাটা হলো গালিসিয়া, এখন যেটা আস্তুরিয়াস থেকে স্বাধীন, এবং যেখানে গালিসিয় ভাষা ব্যবহৃত হয়। আর মাঝখানের পর্দাটা একটা বড় এলাকার প্রতিনিধিত্বকারী, যেটা কাস্তিল আর আস্তুরিয়াস সহ বেশ কিছু আলাদা রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এই কাস্তিল-ই ছিল স্প্যানিশ বা কাস্তিয়্যে-এর ভাষার সূতিকাগার। কেন্দ্রীয় অন্যান্য রাজ্য ছিল সেসব ভাষার নিবাস যেগুলোকে এখন কাস্তিল আর বাস্ক ভাষার উপভাষা হিসেবে গণ্য করা হয়। জানালাগুলোর যে অংশটা খোলা বা দৃশ্যমান সেটা হলো আল-আন্দালুস, সেটার আরবি রচনাবলি আর মোযারাবিক ভার্নাকুলারসহ।

খৃষ্টানরা আল-আন্দালুস পুনরুদ্ধার বা পুনর্বিজয় সম্পন্ন করে ১৪৯২ সালে। হিস্পানিয়া এবার ফের খৃষ্টান শাসকদের হাতে আসার পর ‘মোযারাবিক’ অবলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু সে-ভাষার রেখে যাওয়া অজস্র আরবি শব্দ মোযারাবিক-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়া ভাষাগুলো আপন ক’রে নেয়। উপদ্বীপটার গোটা পুব অঞ্চল এখন কাতালানভাষী। মাঝখানের বড় অংশটা স্প্যানিশভাষী ছিল; ব্যতিক্রম ছিল কেবল একগুঁয়ে বাস্ক দেশটা। আর গোটা পশ্চিম চিলতে অংশে লোকে গালিসিয় ভাষায় কথা বলত। এই চিলতে অংশের উত্তরাঞ্চলীয় এক চতুর্থাংশে গালিসিয়কে এখনো গালিসিয়-ই (galego) বলে। কিন্তু পশ্চিমের ওই এক ফালি অংশের দক্ষিণের তিন চতুর্থাংশ এখন একটি আলাদা দেশে পরিণত হয়েছে – পর্তুগাল। আর এখানে যে-গালিসিয় বলা হতো তার নতুন নাম দেয়া হয়েছে ‘পর্তুগীজ’ (português)। কালের পরিক্রমায় পর্তুগাল একটি শক্তিশালী সমুদ্রবিহারী দেশে পরিণত হওয়ায় সেটা তার সেই ভাষা মানবজাতি তখন যেসব মহাদেশের সঙ্গে পরিচিত ছিল সেসব স্থানে ছড়িয়ে দিয়েছিল: আমেরিকা (ব্রাজিল), আফ্রিকা (অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক এবং অন্যত্র), এবং এশিয়া (ম্যাকাও, পূর্ব তিমুর)।

তার মানে গালিসিয় জগতের দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল, যদিও এক পর্তুগিজ ছদ্মনামে।

পাদটীকা:

# এখন ইংরেজিতে অঙ্গীভূত হয়ে যাওয়া স্প্যানিশ শব্দ costa মনে হয় গালিসিয় উৎসজাত, তবে তা কাতালান-ও হতে পারে।

# Curman আর curmá যথাক্রমে পুরুষ এবং নারী cousin । ইংরেজিতে না হলেও, অনেক ভাষাতেই এই দুটো শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে প্রভেদটি বোঝানোর জন্য।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক