জগৎ কুটির: চিন্তকের নির্মাণ ও তাঁর চিন্তার উৎস
“আমার দুয়ারে নিখিল জগৎ শত কোটি কর হানিছে!”
অমর্ত্য সেনের জগৎ কুটির পড়তে শুরু করলেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ বই নিছক আত্মজীবনী নয়। এখানে একজন মানুষ তাঁর ফেলে আসা জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই ফিরে তাকানোর মধ্যে আত্মস্মৃতির চেয়ে বেশি আছে আত্মঅনুসন্ধান। কোথায় তাঁর চিন্তার শুরু, কোন মানুষটি প্রথম তাঁর মনে প্রশ্ন জাগিয়েছিলেন, কোন শহর তাঁকে বৈচিত্র্য চিনিয়েছে, কোন ঐতিহাসিক ঘটনা মানুষের অসহায়তা বুঝিয়েছে কিংবা কোন অসুখ তাঁকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে এসবের মধ্য দিয়ে তিনি যেন নিজের বৌদ্ধিক জীবনের উৎস খুঁজে চলেছেন।
বইয়ের ব্যাক কাভারে অমর্ত্য সেনের বৌদ্ধিক গুরুত্বের কথা বলতে গিয়ে নাদিন গর্ডিমার তাঁর অসামান্য গদ্য, গভীর পাণ্ডিত্য এবং সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ-এর কথা বলেছেন। নিকোলাস স্টার্নের চোখে তিনি বিংশ এবং একবিংশ দুই শতাব্দীর বিরাট চিন্তাশক্তির অধিকারীদের অন্যতম। কোফি আনান বিশেষভাবে দেখেছেন বিশ্বের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের কথা যথাযথভাবে এবং অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে তুলে ধরার তাঁর বিরল ক্ষমতা। আর উইলিয়াম ডালরিম্পল সেনের লেখায় খুঁজে পেয়েছেন সুগভীর বক্তব্যের পাশাপাশি মাঝে মাঝেই দেখা যাওয়া সত্যের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। এই মূল্যায়নগুলো মিলিয়ে অমর্ত্য সেনের যে-ছবিটি তৈরি হয়, তা কেবল একজন অর্থনীতিবিদের নয় একজন বহুমাত্রিক চিন্তাবিদের।
জগৎ কুটির -এ পরিণত বয়সের অমর্ত্য সেন শৈশবের দিকে ফিরে তাকিয়ে কেবল কী ঘটেছিল তা স্মরণ করেন না বোঝার চেষ্টা করেন, সেই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর দেখার ও ভাবার ধরনকে কীভাবে গড়ে তুলেছিল। যে-ঘটনা একসময় ছিল বিস্ময় বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বহু বছর পরে সেটিই অর্থনীতি, দর্শন কিংবা ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নতুন অর্থ পায়। একটি বাড়ি, একটি শহর, দাদুর সঙ্গে কথোপকথন, স্কুলের শিক্ষক, বন্ধুর সঙ্গে তর্ক, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আহত একজন মানুষ কিংবা একটি ভুল রোগনির্ণয় সবই তখন বৃহত্তর প্রশ্নের অংশ হয়ে ওঠে। মানুষ কে? তার পরিচয় কী? দারিদ্র্য কি শুধু অর্থের অভাব? স্বাধীনতা কতটা বাস্তব? অর্থনীতি যদি মানুষের অধিকার, সুযোগ ও বেঁচে থাকার বাস্তবতার কথা না-বলে, তবে তার অর্থই বা কী? অমর্ত্য সেনের পরবর্তী বৌদ্ধিক জগতের অনেক প্রশ্নের বীজ এভাবেই ছড়িয়ে আছে তাঁর আত্মস্মৃতির মধ্যে।
তাঁর জীবনের প্রথম বড় ভূগোল ঢাকা। তাঁদের বাড়ির নাম ছিল ‘জগৎ কুটির’। নামটি আজ প্রায় প্রতীকী বলে মনে হয়, একটি কুটির অথচ তার নামের মধ্যে গোটা জগৎ। তাঁর বাবা আশুতোষ সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন। পুরোনো ঢাকা, ওয়ারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং নানা শ্রেণি ও ধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর শৈশবের পৃথিবীটি একরঙা ছিল না। বাবার কর্মসূত্রে কয়েক বছর কাটে বার্মার মান্দালয়েও। ঢাকা, মান্দালয়, শান্তিনিকেতন একের পর এক ভিন্ন পরিবেশ খুব অল্প বয়সেই তাঁকে শিখিয়েছিল, পৃথিবীকে একটি মাত্র জানালা দিয়ে দেখা যায় না। ভিন্ন সমাজ ও জীবনযাপনের সংস্পর্শ নিজের পরিচিত পৃথিবীকেও নতুন চোখে দেখতে শেখায়। অমর্ত্য সেনের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা সম্ভবত বহুত্বকে শুধু সহাবস্থানের আদর্শ হিসেবে নয়, পৃথিবীকে বোঝার একটি পদ্ধতি হিসেবেও দেখতে সাহায্য করেছিল।
ঢাকার সেই সময়টি ছিল ইতিহাসেরও এক অস্থির সন্ধিক্ষণ। ঔপনিবেশিক শাসনের শেষকাল, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মধ্যে একদিকে তিনি দেখেছেন বহুধর্মীয় সমাজে মানুষের স্বাভাবিক সহাবস্থান, অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে ভয়ংকর বিভাজন। এই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী পরিচয়-ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যায়। একজন মানুষ কেবল হিন্দু বা মুসলমান নয়, কেবল বাঙালি বা ভারতীয়ও নয়। ভাষা, পেশা, শিক্ষা, রুচি, বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, নাগরিকতা ও মানবিক সম্পর্ক—একই মানুষের মধ্যে বহু পরিচয় পাশাপাশি থাকে। তার যেকোনো একটিকে সম্পূর্ণ মানুষটির একমাত্র পরিচয় করে তুললেই মানুষকে সংকুচিত করা হয়। ইতিহাস তাঁকে খুব অল্প বয়সেই দেখিয়েছিল, এই সংকোচন কখনো কখনো শুধু বৌদ্ধিক ভুলে থেমে থাকে না তা সহিংসতারও ভিত্তি হতে পারে।
এই বহুমাত্রিক মানস গঠনের আরেকটি বড় উৎস তাঁর পরিবার, বিশেষ করে মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেন। সংস্কৃতজ্ঞ, ভারতীয় ধর্ম ও মধ্যযুগীয় সাধনধারার পণ্ডিত এবং রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ক্ষিতিমোহন নাতির প্রশ্নকে কখনো শিশুর প্রশ্ন বলে হালকা করে দেখতেন না। সংশোধন করার আগে তার যুক্তি শুনতেন। এই আচরণের মধ্যেই ছিল বড় একটি শিক্ষা: প্রশ্ন করা অপরাধ নয়, এবং বয়স বা কর্তৃত্ব কোনো বক্তব্যকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না।
কৈশোরেই অমর্ত্যের মনে ঈশ্বর ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। দাদু তাঁকে বিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেননি বরং নিজের চিন্তার ক্ষমতা তৈরি হওয়ার আগে কোনো বিশ্বাস গ্রহণের বাধ্যবাধকতা নেই এই স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। বয়স বাড়ার পরও ধর্মবিশ্বাস না এলে ক্ষিতিমোহন তাঁকে ভারতীয় চিন্তার লোকায়ত বা চার্বাক ধারার কথা বলেন। এর তাৎপর্য ছিল গভীর। সংশয়, নাস্তিকতা কিংবা বস্তুবাদকে তখন আর পশ্চিম থেকে আমদানি করা ধারণা বলে ভাবতে হয় না, ভারতীয় দর্শনের মধ্যেই যুক্তিনির্ভর ও অবিশ্বাসী চিন্তার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। অর্থাৎ ঐতিহ্যের অংশ হওয়ার জন্য তার সবকিছু বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া জরুরি নয়। বরং প্রশ্ন করার অধিকারও ঐতিহ্যেরই অংশ হতে পারে।
এই পারিবারিক বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ‘কবীর’। ক্ষিতিমোহন সেন কবীরের কবিতা ও সাধনধারা নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেছিলেন। হিন্দু ও ইসলামী ভাবধারা, ভক্তি ও সুফি ঐতিহ্যের সংযোগে কবীর এমন এক মানবিক পরিসর তৈরি করেছিলেন, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের কঠিন সীমারেখা সহজেই ভেঙে যায়। ফলে ধর্মীয় বিভাজনের নির্মম বাস্তবতা দেখার আগেই কিংবা তার পাশাপাশি অমর্ত্যের সামনে এমন একটি ভারতীয় ঐতিহ্যও ছিল, যেখানে বিনিময়, সংলাপ ও মানুষের বৃহত্তর পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অমর্ত্য সেনের চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর জন্ম শান্তিনিকেতনে, ‘অমর্ত্য’ নামটিও রবীন্দ্রনাথের দেওয়া। কিন্তু সম্পর্কটি নামকরণের চেয়ে অনেক গভীর ছিল। বস্তুত, শান্তিনিকেতন তাঁর কাছে শুধু স্কুল ছিল না, ছিল পৃথিবীকে দেখার একটি পদ্ধতি। সেখানে পরীক্ষার ফলের চেয়ে কৌতূহল, প্রতিযোগিতার চেয়ে জানার আনন্দ বড় ছিল।
রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববোধও তাঁর মানস গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল। সংকীর্ণ জাতীয় ও ধর্মীয় পরিচয়ের বিরুদ্ধে আপত্তি, পূর্ব ও পশ্চিমকে পরস্পরবিরোধী দুটি সভ্যতা হিসেবে না দেখে সংলাপের মধ্যে দেখার প্রবণতা এবং মানুষের পরিচয়কে বৃহত্তর মানবিক পরিসরে স্থাপন এসবের সঙ্গে অমর্ত্য সেনের পরবর্তী চিন্তার গভীর আত্মীয়তা রয়েছে। তাঁর কৈশোরের আরেক বৌদ্ধিক আকর্ষণ ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ আর্যভট। ফলে তাঁর কাছে ভারতীয় ঐতিহ্য কখনো শুধু ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস হয়ে ওঠেনি এর মধ্যে যুক্তি, গণিত, সংশয় এবং অনুসন্ধানের ধারাও সমানভাবে উপস্থিত ছিল।
অমর্ত্য সেনের শিক্ষাজীবনের দিকে তাকালে তাই একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয় জ্ঞানকে আলাদা আলাদা ঘরে বন্দী করে দেখার প্রবণতা তাঁর মধ্যে কম। সাহিত্য, দর্শন, গণিত, ইতিহাস ও অর্থনীতি তাঁর বৌদ্ধিক জগতে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। শান্তিনিকেতনে সম্ভবত এর প্রথম অনুশীলন ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির প্রশ্নকে নৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক চিন্তা ও সামাজিক পছন্দের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করার যে স্বাচ্ছন্দ্য তাঁর কাজে দেখা যায়, তার সঙ্গে এই বহুশাস্ত্রিক শিক্ষার একটি ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। অর্থনীতি তখন শুধু বাজার, মূল্য, উৎপাদন কিংবা আয়ের হিসাব থাকে না অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিণতিতে মানুষের জীবনে কী ঘটছে, সেই প্রশ্নও তার অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ তাঁর কৈশোরে গভীর ছাপ ফেলেছিল। চারদিকে মানুষ অনাহারে মরছে, অথচ তাঁর পরিচিত সামাজিক পরিসরে খাদ্যের তেমন দৃশ্যমান সংকট নেই। একই দুর্ভিক্ষ একই ভূখণ্ডের সবাইকে সমানভাবে আঘাত করছে না এই বৈপরীত্য তাঁর মনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যায় খাদ্য যদি থাকে, তবে মানুষ না খেয়ে মরছে কেন?
বহু বছর পরে দুর্ভিক্ষ নিয়ে গবেষণায় এই প্রশ্নই অর্থনৈতিক ভাষা পায়। অমর্ত্য সেন দেখান, দুর্ভিক্ষকে শুধু মোট খাদ্য সরবরাহের ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ অধরা থেকে যায়। বাজারে চাল থাকতে পারে, কিন্তু একজন শ্রমিকের মজুরি দিয়ে তা কেনা সম্ভব না হলে সেই খাদ্য তার জন্য কার্যত নাগালের বাইরের জিনিস রয়ে যায়। একজন মানুষের পেশা, মজুরি, সম্পদ বা বিনিময়ের সুযোগ ভেঙে পড়লে খাদ্যের অস্তিত্ব তাকে অনাহার থেকে রক্ষা করে না। এখান থেকেই তাঁর অধিকারভিত্তিক দুর্ভিক্ষ-বিশ্লেষণ বা Entitlement Approach-এর কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি উঠে আসে, খাদ্য কত আছে শুধু তা নয় কার সেই খাদ্য অর্জনের বাস্তব সামর্থ্য আছে?
দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি ঢাকার আরেকটি ঘটনা তাঁর শিশুমনে আরও গভীরভাবে গেঁথে ছিল, সেটি কাদের মিয়ার মৃত্যু। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মধ্যে একদিন অমর্ত্য তাঁদের বাড়ির বাগানে খেলছিলেন। হঠাৎ রক্তাক্ত অবস্থায় একজন মানুষ গেট দিয়ে ঢুকে পড়েন। তাঁর নাম কাদের মিয়া, একজন মুসলমান দিনমজুর। হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকায় সামান্য মজুরির কাজ করতে এসে সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছিলেন তিনি। অমর্ত্যের বাবা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু কাদের মিয়া বাঁচেননি।
ঘটনাটির ভয়াবহতা শুধু সাম্প্রদায়িক হত্যায় ছিল না। কাদের মিয়া জানতেন ওই এলাকায় যাওয়া বিপজ্জনক, তাঁর স্ত্রীও তাঁকে নিষেধ করেছিলেন। তবু তাঁকে বের হতে হয়েছিল, কারণ সেদিন কাজ না করলে পরিবারের খাবার জুটত না। এই একটি ঘটনায় অমর্ত্য সেনের সামনে দুটি ভিন্ন বাস্তবতা এক জায়গায় এসে মিলেছিল। হত্যাকারীর চোখে কাদের মিয়ার অন্য সব পরিচয় মুছে গিয়ে তিনি শুধু একজন মুসলমান হয়ে উঠেছিলেন। আর দারিদ্র্য তাঁকে এমন একটি ঝুঁকি নিতে বাধ্য করেছিল, যা এড়িয়ে চলার বাস্তব সামর্থ্য তাঁর ছিল না।
এখানেই স্বাধীনতার একটি জটিল অর্থ সামনে আসে। বাইরে থেকে কাদের মিয়া স্বাধীন মানুষ, কেউ তাঁকে বন্দুকের মুখে কাজে পাঠায়নি। কিন্তু তাঁর সামনে যে দুটি বিকল্প ছিল, তার একটি পরিবারের অনাহার, অন্যটি নিজের জীবনের ঝুঁকি। এই দুইয়ের মধ্যে নির্বাচন করার সুযোগকে কতটা স্বাধীনতা বলা যায়? চরম দারিদ্র্য শুধু মানুষের অর্থ কেড়ে নেয় না তার গ্রহণযোগ্য যে-বিকল্প, তার পরিসরও ছোট করে দেয়। কাদের মিয়ার জীবন নিয়েছিল সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, কিন্তু সেই সহিংসতা থেকে দূরে থাকার সুযোগটুকু সংকুচিত করেছিল তাঁর অর্থনৈতিক অসহায়তা।
এই জায়গাতেই দুর্ভিক্ষ ও কাদের মিয়ার স্মৃতি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রশ্নে মিলিত হয়। খাদ্য থাকা মানেই খাদ্যে প্রবেশাধিকার থাকা নয়, একইভাবে আইনগতভাবে স্বাধীন হওয়া মানেই বাস্তবে অর্থপূর্ণ বিকল্প থাকা নয়। এই পার্থক্যই পরে অমর্ত্য সেনের সক্ষমতা-ভাবনায় আরও বিস্তৃত রূপ পায়। একজন মানুষের আয় বা সম্পদের পরিমাণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সম্পদ এবং তার চারপাশের সামাজিক সুযোগ ব্যবহার করে সে আসলে কী করতে ও কী হতে পারছে প্রশ্নটি আরও গভীর। সে কী খেতে পারছে, চিকিৎসা নিতে পারছে, শিক্ষা পাচ্ছে, সমাজে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পারছে, নিজের পছন্দ অনুযায়ী জীবন গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে? উন্নয়ন তখন শুধু সম্পদ বৃদ্ধির প্রশ্ন থাকে না হয়ে ওঠে মানুষের বাস্তব সম্ভাবনার পরিসর বাড়ানোর প্রশ্ন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে এসে তাঁর জীবনে আরেকটি পর্ব শুরু হয়। অর্থনীতি ও গণিতের পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আলোচনা, কফি হাউস ও বইয়ের দোকান সব মিলিয়ে তাঁর বৌদ্ধিক জীবন আরও ঘন হয়ে ওঠে। শৈশব ও কৈশোরের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা প্রশ্নগুলো এখানে ক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চার বিষয় হতে থাকে। দারিদ্র্য, বৈষম্য, দুর্ভিক্ষ কিংবা সামাজিক সিদ্ধান্ত আর চারপাশে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এগুলো অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেরও বিষয়।
এই সময়েই তরুণ অমর্ত্য মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। শরীরের অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখে চিকিৎসকের প্রাথমিক ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে নিজেই পড়াশোনা ও প্রশ্ন করতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত ক্যান্সারের সম্ভাবনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনেন। ঘটনাটি তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট করে, কর্তৃত্বকে সম্মান করা এবং কর্তৃত্বের কথা বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া এক বিষয় নয়। যে সংশয় ও অনুসন্ধিৎসা এতদিন তাঁর বৌদ্ধিক জীবনের অংশ ছিল, ব্যক্তিগত সংকটের মুহূর্তেও তার কার্যকর উপস্থিতি দেখা যায়। খুব অল্প বয়সে মৃত্যুর সম্ভাবনার মুখোমুখি হওয়া জীবনের অনিশ্চয়তাকেও তাঁর কাছে আর বিমূর্ত রাখেনি।
এরপর কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ। সেখানে অর্থনীতি, দর্শন, রাজনীতি ও গণিতের সীমানা অনায়াসে একে অন্যের মধ্যে প্রবেশ করে, মতবিরোধ জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক পদ্ধতি। সামাজিক পছন্দ, নৈতিক দর্শন, ন্যায়বিচার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামষ্টিক সিদ্ধান্তের সমস্যা তাঁর চিন্তায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে কেনেথ অ্যারো ও জন রলসের কাজও তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর বৌদ্ধিক পরিসর আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে, বিশ্লেষণের পদ্ধতি আরও শাণিত হয়।
তবে কেমব্রিজে এসে তাঁর চিন্তার শুরু হয়নি। বরং আগে থেকে বহন করে আনা প্রশ্নগুলো সেখানে নতুন ভাষা ও বিশ্লেষণের পদ্ধতি পেয়েছিল। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। অমর্ত্য সেনের চিন্তাকে কেবল পশ্চিমা একাডেমিক অর্থনীতির উৎপাদন হিসেবে দেখলে তাঁর বৌদ্ধিক ইতিহাসের একটি বড় অংশ অদৃশ্য হয়ে যায়। তাঁর সঙ্গে কেমব্রিজে পৌঁছেছিল ঢাকা ও শান্তিনিকেতনের অভিজ্ঞতা, ভারতীয় সংশয়বাদী ও যুক্তিবাদী ঐতিহ্যের পরিচয়, রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববোধ এবং কলকাতার তর্কমুখর বৌদ্ধিক পরিবেশ। পশ্চিমা অর্থনীতি ও দর্শন এই পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রতিস্থাপন করেনি বরং তাদের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করেছে।
কেমব্রিজে বিভিন্ন অর্থনৈতিক মতের বিতর্কের মধ্যেই অমর্ত্য সেনের আগ্রহ ক্রমে কল্যাণ অর্থনীতির দিকে যায়। তাঁর মূল প্রশ্ন ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের জীবনকে আসলে কতটা ভালো করছে? শুধু আয় বা প্রবৃদ্ধি নয়, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক সুযোগ এবং কল্যাণকে কীভাবে বিচার করা যায়, সেই প্রশ্নই তাঁকে বেশি ভাবিয়েছে। এই অনুসন্ধানই পরে তাঁর কল্যাণ অর্থনীতি ও সামাজিক চয়ন-সংক্রান্ত কাজের ভিত্তি তৈরি করে।
অমর্ত্য সেনের ছাত্রজীবনে মার্কস-এর ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ এবং বৌদ্ধিক উপস্থিতি। প্রেসিডেন্সি কলেজের সময় থেকেই মার্কসবাদ নিয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হলেও তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক শিবিরের অনুগত হয়ে মার্কসকে গ্রহণ করেননি। শ্রম, মূল্য, শোষণ, উৎপাদন ও স্বাধীনতার প্রশ্নে মার্কসের বিশ্লেষণ তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল, আবার তার সীমাবদ্ধতাও তিনি দেখেছেন। বিশেষ করে শ্রম-মূল্য তত্ত্বকে তিনি যথেষ্ট মনে করেননি উৎপাদনে শ্রমের পাশাপাশি পুঁজি ও অন্যান্য উপকরণের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের আচরণকেও কেবল শ্রেণি বা অর্থনৈতিক স্বার্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তারপরও শ্রমিকের অবস্থান, শোষণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় বিভিন্ন শ্রেণির পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে মার্কসের গুরুত্ব তিনি স্বীকার করেছেন।
মার্কসের যে দিকটি সেনকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল, তা হলো মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির ধারণা। কিন্তু স্বাধীনতার নামে কোনো দল বা গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়াকেও তিনি বিপজ্জনক মনে করেছেন। তাঁর কাছে তাই মার্কস কোনো অপরিবর্তনীয় মতবাদের প্রবর্তক নন বরং এমন একজন চিন্তাবিদ, যাঁর ধারণাকে সময় ও বাস্তবতার আলোয় পরীক্ষা করতে হয়।
তাঁর বৌদ্ধিক জগতে ‘প্রাচ্য’ ও ‘পাশ্চাত্য’ দুটি বন্ধ ঘর নয়। কবীর, লোকায়ত, আর্যভট ও রবীন্দ্রনাথ যেমন সেখানে উপস্থিত, তেমনি অ্যারো ও রলসও। একটি ঐতিহ্যকে গ্রহণ করার জন্য অন্যটিকে অস্বীকার করতে হয় না। বরং ভিন্ন চিন্তার ধারাকে পাশাপাশি রেখে তাদের মধ্যে প্রশ্ন ও কথোপকথন তৈরি করাই তাঁর চিন্তার স্বাভাবিক পদ্ধতি। এই কারণেই তাঁর বিশ্বজনীনতা নিজের সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নাম নয় বরং স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও বিশ্বজোড়া জ্ঞানচর্চার মধ্যে একটি চলমান আদান-প্রদান।
এই জায়গা থেকেই জগৎ কুটির নামটিরও অন্য একটি অর্থ খুলে যায়। ‘কুটির’ একটি সীমিত পরিসর, ‘জগৎ’ তার ঠিক বিপরীত—অসীম বিস্তার। অমর্ত্য সেনের বৌদ্ধিক যাত্রার মধ্যেও এই দুই পরিসরের অদ্ভুত সহাবস্থান রয়েছে। তাঁর চিন্তা পৃথিবীর বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়, তত্ত্ব ও বিতর্কের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে, কিন্তু তার প্রথম প্রশ্নগুলোর জন্ম হয়েছিল অনেক কাছের একটি জগতে। বিশ্বজনীন হয়ে ওঠা তাই তাঁর ক্ষেত্রে শিকড় হারানোর প্রক্রিয়া নয় বরং কাছের অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর পৃথিবীর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষমতা।
এখানেই জগৎ কুটির প্রচলিত আত্মজীবনীর সীমা ছাড়িয়ে যায়। বইটি শুধু বলে না একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদের জীবনে কী কী ঘটেছিল বরং দেখায়, একজন মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে চিন্তক হয়ে ওঠেন। সেই হয়ে ওঠা সরল বা পূর্বনির্ধারিত নয়। জীবনের কোনো একটি ঘটনা থেকে সরাসরি কোনো তত্ত্ব জন্ম নেয় না। অভিজ্ঞতা প্রথমে প্রশ্ন তৈরি করে সেই প্রশ্ন পড়াশোনা, সংশয়, তর্ক ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে বদলায়, অন্য প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং কখনো বহু বছর পরে একটি সুসংহত চিন্তার রূপ নেয়। ব্যক্তিগত ও বৌদ্ধিক জীবনের সম্পর্কটি এখানে তাই কার্যকারণের সরল রেখা নয়, বরং দীর্ঘ কথোপকথনের।
অমর্ত্য সেনের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ কথোপকথনের কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত মানুষই থেকে যায়। অর্থনীতির সংখ্যা, দর্শনের বিমূর্ত প্রশ্ন কিংবা সামাজিক সিদ্ধান্তের জটিলতা সব কিছুর বিচার তিনি মানুষের জীবনের বাস্তবতার কাছে নিয়ে আসেন। মানুষ কী পেয়েছে শুধু তা নয়, কী করতে পারছে, কী হতে পারছে এবং নিজের জীবন বেছে নেওয়ার কতটা বাস্তব সুযোগ তার আছে এই প্রশ্নই তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তাকে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
জগৎ কুটির-এর গভীরতা সম্ভবত এখানেই। বইটি পরিণত চিন্তকের তত্ত্বের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেয়ে আমাদের নিয়ে যায় তার আগের স্তরে যেখানে চিন্তা জন্ম নেয় প্রশ্ন হিসেবে, কখনো কথোপকথনে, কখনো কোনো দৃশ্যের অভিঘাতে, কখনো সংশয়ে, কখনো ব্যক্তিগত বিপর্যয়ে। বহু বছর পরে ফিরে তাকিয়েই বোঝা যায়, সেই ছোট ছোট প্রশ্নের কোনো কোনোটি কত দূর পর্যন্ত গিয়েছিল।
শেষে এই দীর্ঘ বৌদ্ধিক যাত্রা দেখায়, একজন চিন্তকের জীবন শুধু পড়াশোনা ও তত্ত্বে নির্মিত হয় না, দেখা, শোনা, সংশয়, তর্ক এবং আকস্মিক অভিজ্ঞতাও তার অংশ। কাছের জগৎ থেকে উঠে আসা প্রশ্ন কীভাবে বৃহত্তর পৃথিবীর চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয় জগৎ কুটির শেষ পর্যন্ত সেই চিন্তক হয়ে ওঠারই স্মৃতিকথা।
