ফুটবল, কাম্যু এবং একটি অ্যাবসার্ড মৃত্যু

ফুটবল মাঠ ছিলো তাঁর কাছে 'আসল' বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো।

তানভীর ইসলামতানভীর ইসলাম
Published : 15 Jan 2023, 04:33 PM
Updated : 15 Jan 2023, 04:33 PM

১৯৫৭ সালের ১৬ই অক্টোবর ফ্রেঞ্চ-আলজেরিয়ান কথাসাহিত্যিক আলবেয়ার কাম্যু যখন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন, তার এক সপ্তাহ পর প্যারিসের পার্ক ডি প্রিন্সেস স্টেডিয়ামে মনাকো বনাম রেসিং ক্লাব ডি প্যারিসের মধ্যকার ফুটবল খেলা দেখতে দেখতে ফ্রেঞ্চ টেলিভিশনকে তাঁর নোবেল পুরস্কার বিজয় নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন (https://www.youtube.com/watch?v=ptwFwf6EmBs)। ইতিহাসে আর কোন নোবেলজয়ী সম্ভবত স্টেডিয়ামে বসে নোবেল বিজয় নিয়ে টিভিতে সাক্ষাৎকার দেন নি! গোলকিপার হিসেবে একসময় আলজিয়ার্স রেসিং ইউনিভার্সিটি (the RUA) দলে খেলা কাম্যুকে যখন রেসিংয়ের গোলির ভুল সম্পর্কে প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, একজন খাঁটি ফুটবলপ্রেমীর মতোই কাম্যু বললেন তাকে দোষ না দিতে।

আলজেরিয়ার বস্তিতে ১৯১৩ সালের ৭ই নভেম্বর যুদ্ধে এতিম হওয়া যে শিশুর জন্ম হয়েছিলো, সিসিফাস বা অ্যাবসার্ডিজম নিয়ে কিছু লেখার আগেই তিনি দারিদ্র্য আর ফুটবলকে ভালোবেসেছিলে। একা, অশিক্ষিত মায়ের হাতে বেড়ে ওঠা কাম্যু অন্য সব দরিদ্র ঘরের সন্তানের মতোই জুতা পায়ে খেললে এত দাম দিয়ে কেনা স্কুলে যাওয়ার জুতা নষ্ট হয়ে যাবে, এই ভয়ে দাদী তাকে ফুটবল খেলতে দিতেন না। কিন্তু তা কাম্যুর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি, ছেঁড়া ত্যানা পেঁচিয়ে বল বানিয়ে খেলতেন। স্কুলে থাকতে দুর্দান্ত ফরওয়ার্ড এবং গোলরক্ষক দুই পজিশনেই খেলেছিলেন। পরে আলজিয়ার্স রেসিং ইউনিভার্সিটি (the RUA) দলে গোলরক্ষক হয়ে খেলেছেন। ১৯৩০ সালে রেসিং দলের বুলেটিনে ১৬ বছরের কাম্যুর নৈপুণ্যের প্রশংসা করা হয়েছিলো। কিন্তু বিধি বাম। এই বুলেটিন প্রকাশের দুই মাসের মধ্যেই তিনি যক্ষায় আক্রান্ত হলেন। আত্মীয়-স্বজনরা বললেন, ফুটবল খেলার পর ঠাণ্ডায় মাঠে দাঁড়িয়ে থাকার জন্যে এই যক্ষা হয়েছে। কাম্যুর পেশাদার ফুটবলার হবার স্বপ্নের সেখানেই ইতি। এই যক্ষা অবশ্য কাম্যুকে দুইবার ফ্রাঙ্কো আর নাৎসিদের পক্ষে যুদ্ধ করার হাত থেকেও বাঁচিয়ে দিয়েছিলো।

যক্ষায় পড়ে ফুটবল খেলা ছেড়ে দিলেও ফুটবলের প্রতি কাম্যুর ভালোবাসা কখনো কমেনি। আলজেরিয়ায় থাকতে স্থানীয় দলগুলোর খেলা নিয়মিত দেখতেন। প্যারিসে যখন সাংবাদিকতা শুরু করলেন, প্রতি রবিবার রাতে কাম্যু তার প্রিয় দল RUA- এর স্কোর জানার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন বিজয়ের আশায়। পরে সেখানে আবার ফিরে গিয়ে কিছুদিন স্কুল টিমের কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন। প্যারিসের রেসিং ক্লাবের খেলাও নিয়মিত দেখতেন RUA-এর সাথে তাদের জার্সিতে মিল থাকায়। কাম্যুর বন্ধুরা বলতেন, রাস্তায় কোনো ক্যান পড়ে থাকতে দেখলে কাম্যু সেটায় লাথি মারার কোন সুযোগ মিস করতেন না। কাম্যুর লেখা 'দ্য প্লেগ' (১৯৪৭) এ গনজালেজও ঠিক এই কাজ করতো।

কাম্যু পরে এক ইন্টারভিউয়ারকে বলেছিলেন, ফুটবল মাঠ ছিলো তাঁর কাছে 'আসল' বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো। হয়তো এখান থেকেই তিনি অ্যাবসার্ডিজমের ধারণা পেয়েছিলেন। বাইশ জন খেলোয়াড় একটা বল নিয়ে মাঠে কাড়াকাড়ি করছে- এর চেয়ে অ্যাবসার্ড বিষয় আর কী হতে পারে! আর ভক্ত হিসেবে সবাই যে সিসিফাস, সেটা এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফুটবল টিমের সমর্থকদের চেয়ে বেশি আর কে বুঝেছে? ছত্রিশ বছর পরে একটা বিশ্বকাপের দেখা পাওয়া গেলো, আরেকটা বিশ্বকাপ পেতে হয়তো আরও ছত্রিশ বছর বা তারও বেশি অপেক্ষা করতে হবে। এ যেন সিসিফাসের মতো- পাথর নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আবার পাথর গড়িয়ে পড়া, সেটা আবার তিলতিল করে বয়ে নিয়ে শিখরে উঠার চেষ্টা।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অ্যাবসার্ডিজম এর জনকের মৃত্যু হয়েছিলো তাঁর নিজের ভাষাতেই অ্য্যাবসার্ডভাবে। বন্ধুদের একবার ঠাট্টা করে বলেছিলেন, নির্মম রসিকতা হিসেবে গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর চেয়ে অ্যাবসার্ড কিছু আর হতে পারে না। ১৯৬০ সালে বছরের প্রথম দিনগুলিতে নববর্ষের ছুটি কাটাচ্ছিলেন কাম্যু দক্ষিণ ফ্রান্সে নিজগৃহে। জানুয়ারির ২ তারিখ কাম্যুর স্ত্রী ও বাচ্চারা ট্রেনে চড়ে প্যারিস যান। কাম্যুরও ট্রেনের টিকেট ছিলো। কিন্তু দীর্ঘদিনের বন্ধু ও প্রকাশক মিশেল গালিমার্দ তার গাড়িতে রাইডের অফার দিলে কাম্যু বন্ধুর সঙ্গে প্যারিস যাওয়া মনস্থ করেন। গালিমার্দের গাড়ি ঠিক করার সময় এক মেকানিক নাকি বলেছিলো এটা 'একটা চাকার উপরে কফিন' (A coffin on wheels)। জানুয়ারির ৪ তারিখ রাস্তা থেকে ছিটকে একটা গাছের সাথে গাড়ি আঘাত করলে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে কাম্যুর তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটে।

ফুটবল ছাড়াও কাম্যু ভালোবাসতেন সমুদ্র, সেখানে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটা ছিলো তাঁর ভীষণ প্রিয়। ঠাণ্ডা পাহাড়ে, নামগোত্রহীন, নিজ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যু হলেও যেন সমুদ্র এসে তাঁর সব ঘৃণা ধুয়েমুছে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়--সেই কামনা করেছিলেন।

 "If I were to die, in the midst of cold mountains, unknown to the world, cast off by my own people, my strength at last exhausted, the sea would at the final moment flood into my cell, come to raise me above myself and help me die without hatred."

- The Sea Close By, Albert Camus

 মৃত্যুর সময় সমুদ্রের দেখা পাননি কাম্যু। গাড়ির ধ্বংসস্তুপে পাওয়া গিয়েছিলো কাম্যুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজৈবনিক উপন্যাস 'The First Man'. জ্যাক নামে এক বালকের ফুটবলকে ভালোবাসার গল্প, যার কাছে ফুটবল ছিলো একটা 'রাজ্য' এবং যৌবন পর্যন্ত যেখানে সে আচ্ছন্ন ছিলো। এই জ্যাক সেই ছোটবেলার কাম্যু। যুদ্ধবিধ্বস্ত আলজেরিয়ার পথেপ্রান্তরে ছেঁড়া ত্যানায় বানানো বল দিয়ে ফুটবল খেলে যিনি আজীবন ফুটবলকে ভালোবেসেছিলেন। গাড়িতে রাখা ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার সেই পাণ্ডুলিপি যেন তাঁর এই অ্যাবসার্ড মৃত্যুতেও সিসিফাসের মতো দেবতাদের মধ্যাঙ্গুলি দেখিয়ে পাথর শিখরে নিয়ে যায় ("negates the gods and raises rocks.")। জানুয়ারি চার তারিখ ছিলো ফুটবলার, সাহিত্যিক, দার্শনিক আলবেয়ার কাম্যুর ৬৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। One must imagine Camus happy.

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক