২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮ কার্তিক ১৪৩৩

পাঠকের ডায়েরি: হাসান, লীলা ও টেরি

সাহিত্যকে কেবল কাল্পনিক এবং বাস্তবিক বিষয় হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না, বরং এটা ভাষা নিয়ে উদ্ভটভাবে কাজ করতে পারে।

পাঠকের ডায়েরি: হাসান, লীলা ও টেরি

বই হাতে রমণী:

লীনা দিলরুবা লীনা দিলরুবা

Published : 04 Apr 2023, 08:17 PM

Updated : 04 Apr 2023, 08:42 PM

‘নিখুঁত সম্পূর্ণতা মনুষ্যের জন্য নহে। কারণ, সম্পূর্ণতার মধ্যে একটা সমাপ্তি আছে।’ কথাটি রবীন্দ্রনাথের। মানুষের জীবনে পূর্ণতার প্রয়োজনীয়তা অমূলক বিবেচনায় তাঁর কাণ্ডজ্ঞানকে শিরোধার্য মনে করা যেতেই পারে। তবে তিনি তো রবীন্দ্রনাথ! তাঁর কাছে সম্পূর্ণতা কিংবা সমাপ্তির যে-সংজ্ঞা আমার মতো অপোগণ্ডের কাছে তা হয়ত আরম্ভও নয়।

ঘটনার শুরু কর্মব্যস্ত প্রাত্যহিকের ফাঁকে-ফাঁকে অনিয়মিতভাবে গ্রন্থপাঠের একটা বাজে সময় পার করতে করতে। কিছুই পড়া হল না, কিচ্ছু হচ্ছে না--এসব ভাবতে ভাবতে পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই অজানিতে রুটিন লেখাপড়ার এক সোনালি বৃত্তে ঢুকে পড়েছিলাম। সেটা এ-বছরের ফেব্রুয়ারির দুই তারিখের কথা। এরপর থেকে, ‘রোজ পড়তেই হবে, না-হলে হবে না’ গোছের জেদকে সঙ্গী করে দৈনিক রুটিনের যে-লড়াই শুরু হয়েছিল এর শেষ কবে হবে জানি না। হয়ত এভাবেই চলবে, অথবা হঠাৎ করেই হারিয়ে ফেলতে পারি ঘোরের মত চলতে থাকা রোজকার রুটিনের এই ছন্দোবদ্ধ জীবন।

রুটিন অনুযায়ী রোজ দুটো প্রবন্ধ, একটি কালজয়ী গল্প, রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দের একটি করে কবিতা পড়বার কথা, পড়ছিও। পাশাপশি, গ্রন্থপাঠের তালিকায় রয়েছে নির্দিষ্ট একটি বইপাঠ এবং সামান্য হলেও লেখালেখি।

লেখাপড়া নিয়ে যা করি। রুটিনের পড়া আগের রাতেই ঠিক করে রাখি, আর রোজকার পড়া শেষ না-করে কোনোভাবেই নিদ্রাদেবীর কাছে আত্মসমর্পণ নয়, এই হল ব্রত। সকালে কর্মক্ষেত্রে দৌড়াতে হয় এজন্য কোনো-কোনোদিন পড়ায় ঘাটতি রেখে ঘুমিয়ে যেতে বাধ্য হলেও মধ্যরাতে উঠে বাকি পড়া শেষ করে আবার ঘুমাতে গেছি। কিন্তু গেল দুইমাসে একদিনের জন্যও রুটিন এদিক-সেদিক করিনি।

ফেব্রুয়ারিতে রবীন্দ্রনাথের প্রায় পঁচিশটি গল্প একটানা পড়া হয়েছিল। মার্চে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিয়ভূষণ মজুমদার এবং হাসান আজিজুল হকের গল্পেই সময়টা কেটে গেল।

কয়েকটি গল্পপাঠে পুনরাবৃত্তি ছিল। তবে এবারের সবচেয়ে নাছোড় পদক্ষেপ হাসান আজিজুল হকের গল্পের ভুবনে প্রবেশের উদ্যোগটি।

পরিণত বয়সের পাঠকজীবনের গোড়াকার সূচনায় তেমন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই হাসানের গল্প এড়িয়ে যেতাম। আসলে তাঁর ভাষাটার সঙ্গে কুস্তি করতে ইচ্ছে করত না। এবার দেখলাম তাঁর গল্প পড়তে বেশ ভালো লাগছে। শুধু ভালো লাগা নয়-- হাসান আজিজুল হকের গল্পের বিষয়বৈচিত্র্য, শিল্পকৌশল, এমনকি যে-ভাষাটা নিয়ে এতদিন আপত্তি ছিল সেটিও কোনো প্রতিরোধ তৈরি করছে না।

‘মাটি-পাষাণের বৃত্তান্ত’ গল্পটির কথাই বলি। এই গল্পে হাসান কাকে প্রধান চরিত্র বানিয়ে তুলেছেন বিষয়টা স্বচ্ছ নয়, সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন অথবা কৃষক একামতউল্লাকে প্রধান চরিত্র ভাবা যেতে পারে। অথবা পাঠকের ভাবনার চৌহদ্দি দখল করে নিতে পারে সেই রক্তচোষা জোতদার, যারা মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করবার মূর্তিরূপে কালে-কালে দেশে-দেশে বিরাজমান।

মোনাজাতউদ্দিনের কারণে একামতউল্লা একদিন জানতে পারে সে আসলে ভাতুয়া কিংবা মাহিন্দার নয়, জোতদারের জমির যে-অংশটি পরিবারকে অভুক্ত রেখে সে কেবল নিজের পেটভাতের চুক্তিতে চাষ করে গেছে সেই জমি সরকারের বরাদ্দের বদৌলতে তার নিজেরই। জোতদার সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের কাছে একদিন এই গোপন কথাটা কবুল করে ফেলে, দায়ে পড়ে। মোনাজাতউদ্দিন অবশ্য দেরি করেনি, খোঁজখবর নিয়ে নিশ্চিত হয়ে একামতউল্লার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে--জমিটা একামতের। সত্যটা প্রকাশ না-করে জোতদার এতদিন তাকে ভাতুয়া বা মাহিন্দার বানিয়ে রেখেছে।

গোপন খবর জেনে আর যায় কোথায়! একামতউল্লা জোতদারের কানের কাছে বাজনার মত একটাই কথা বাজাতে থাকে--যে জমি একামত চাষ করছে সেটি তার কীনা, যদি তাই হয় তবে গমচাষের সেই জমি যেন তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

কথা শুনে জোতদার পারলে মূর্ছা যায়। শিমুলতলার ঢালু খাসজমি, যে-জমির ওপর সারাক্ষণ ধুলোমাখা শিমুল ফুল পড়ে থাকতে দেখা যায়, সেই সোনার টুকরা জমিটা একামতউল্লাকে ফিরিয়ে দিতে হবে? পাগল নাকী! জোতদার খায়, ঘুমায়, আনন্দ-ফুর্তির জীবন তার।

এদিকে একামত যখন থেকে জমির দাবি নিয়ে সোচ্চার তখন থেকে যেন জোতদারের স্বপ্ন-বিভ্রম ঘটতে থাকে।

একামতের মত আরো অসংখ্য কৃষকের জমি সে গিলে খেয়েছে, এসবও তো সত্য। কিন্তু কী মুশকিল! অন্যায়ভাবে জমি দখলের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিতে একামত সময়-নেই, অসময়-নেই সারাক্ষণ জোতদারের চোখের সামনে হাজির হতে থাকে। হাসানও গল্পের এ-অংশে এসে লেখায় ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে থাকেন। জোতদারের দুঃস্বপ্নের পর দুঃস্বপ্ন, ফ্যান্টাসির পর ফ্যান্টাসির বিবরণ দিতে গিয়ে জগতের নির্যাতিত মানুষদের সম্পদ লুণ্ঠনকারীর প্রতিনিধি রূপে জোতদারকে আর শোষিত-বঞ্চিতদের প্রতিনিধি হিসাবে একামতকে হাসান আজিজুল হক যেন রূপক বানিয়ে তোলেন।

এদিকে নতুন রোগও হাজির হয়েছে, জোতদার খায় ঠিকই কিন্তু তার উদর খালি হয় না। সে মাঠে- ঘাটে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু বিধি বাম। পাহাড়ের মত তার উদরটা বাড়তে থাকে, সেটি আর কোনোভাবেই খালি করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। দুঃস্বপ্নের দিন গুনে চলে ধনী জোতদার। গল্পের শেষে হাসান আজিজুল হক লেখেন--

‘দশ দিনের মাথায় নিজের পঞ্চাশ একর জমির ঠিক মাঝখানে বস্ত্রহীন উদোম জোতদারটি দুহাত মাটিতে পেতে প্রকাণ্ড এক হাতির মতো হাঁটু দুমড়ে আবার যেমন বসতে গেছে, তখুনি দেখছে একামত, তাকিবুল, নছর, ফিরু, এই রকম নিরীহ নির্বিকার গাঁয়ের মানুষদের, যারা কোনো কথা বলে নি, এতটুকু জুলুম করে নি, শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকেছে শেষ রাতের চাঁদের আলোয়। তখন রক্ত হিম করা পৈচাশিক একটি চিৎকার করে উপুড় হয়ে পঞ্চাশ একর জমি ঢেকে যে পড়েছিল তাকে জোতদার বলে নিঃসন্দেহে চেনা গেলেও পরে দেখা যায় তা আসলেই এক খণ্ড বিশাল ন্যাড়া পাথর ছাড়া আর কিছুই নয়।’

হাসান আজিজুল হক স্পষ্টতই এই গল্পে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার আর তার পরিণতিকে উঠিয়ে আনতে চাইলেন। গল্পটির মূলে আছে এর ফ্যান্টাসি নির্মাণে লেখকের অসামান্য নৈপুণ্য, বাস্তবতা-অবাস্তবতা মিলিয়ে যা লেখা হয়েছে। বস্তুত স্বপ্ন-কল্পনামাখা অবাস্তব দৃশ্যগুলো গল্পের প্রাণরসকে অক্ষুণ্ণ রেখেই উপস্থাপন করা হয়েছে। হাসান আজিজুল হক বাংলা কথাসাহিত্যে কেন বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন একাধিক ব্যাঞ্জনায় সমৃদ্ধ এই গল্প তার পরিচয় বহন করে।

মার্চ মাসে প্রতিদিন দুটি করে প্রবন্ধ পড়বার লেখক তালিকায় ছিলেন-- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, কেতকী কুশারী ডাইসন, খান সরওয়ার মুরশিদ, সালাহউদ্দিন আহমদ, যতীন সরকার, আকবর আলি খান, শিবনারায়ণ রায়, গোলাম মুরশিদ প্রমুখ।

রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ নিয়ে রবিশঙ্কর মৈত্রী বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধে আমাদের চিন্তাধারার গতানুগতিক পথকে নতুন পথে চালিত করেছেন। তিনি আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছেন। তাঁর প্রবন্ধ সংখ্যায় আর বৈচিত্র্যে অন্তহীন।’

এর বৈচিত্র্যের ব্যাপ্তি যে কতখানি সেটি প্রবন্ধগুলো পড়তে গিয়ে বার বার টের পেয়েছি। তিনি নিজের সম্পূর্ণ জীবনকেই যেন নিযুক্ত করেছিলেন শিল্পের সাধনায়। রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ মনন-সাহিত্যে যুগান্তর সৃষ্টি করেছিল।

চলমান গ্রন্থপাঠের তালিকায় চারশ’র ও বেশি পৃষ্ঠার শতবর্ষী লীলা মজুমদারের (১৯০৮-২০০৭) আত্মজীবনী ‘পাকদণ্ডী’ পুরো মাসটাই গড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এই আত্মজৈবনিক রচনাটি ভারতের ‘অমৃত’ পত্রিকায় ১৯৭৮ সালে ধারাবাহিভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে।

শিশু সাহিত্যিক লীলা মজুমদার স্বনামধন্য রায় পরিবারের সদস্য। তিনি ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ভাতিজি, সুকুমার রায়ের কাকাতো বোন আর সত্যজিৎ রায়ের পিসি। তাঁদের আদি নিবাস বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার মসুয়া গ্রামে। ১৮৮৭ সালে লীলার মাতামহীর মৃত্যু হলে তাঁর মাতামহ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন, উপেন্দ্রকিশোর-বিধুমুখী দম্পতি তখন লীলার মা সুরমাকে কন্যাস্নেহে লালনপালন করেছিলেন। ঘটনাক্রমে উপেন্দ্রকিশোরের অনুজ প্রমদারঞ্জনের সঙ্গে লীলার মায়ের বিয়ে হয়।

প্রমদারঞ্জন ও সুরমা দেবীর আট সন্তানের একজন লীলা মজুমদারের ছোটবেলা কেটেছিল শিলঙের পাহাড়, সৌন্দর্যে ঘেরা পরিবেশে। স্কুলের পড়াশোনা করেছেন লরেটো কনভেন্টে। শৈশবের আশ্চর্য শ্যামলিমা ভরা দিনগুলো নিরুদ্বিগ্ন ছিল। সহজ-সরল নিস্তরঙ্গ সেই পরিবেশে বেড়ে উঠবার কারণে হয়ত তাঁর অনুভূতিগুলি ছিল সূক্ষ্ণ এবং সংবেদনশীল। বইতে শৈশবের দিনগুলোর বর্ণনায় শিলং-কে তিনি তুলে ধরেছেন দূরকে কাছে টানার মত করে। এখানেই তিনি প্রথম রবীন্দ্রনাথকে দেখেন। জীবনের এগার বছর শিলঙে কাটিয়ে পরিবারের সঙ্গে লীলা কলকাতায় এসে উপেন্দ্রকিশোরের গড়পাড়ের বাসায় ওঠেন।

পারিবারিক ‘সন্দেশ’ পত্রিকাতেই লীলার লেখালেখির হাতেখড়ি। এরপর নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত ‘সন্দেশ’-এর সঙ্গে তিনি সারাজীবন নানাভাবে জড়িয়ে ছিলেন।

আত্মজীবনী রচনায় জীবনের কোনো দার্শনিক ব্যাখ্যা হাজির করার দিকে তাঁর মনোযোগ ছিল না, ইংরেজি সাহিত্যের দুর্ধর্ষ ছাত্রীটি জীবনকে দেখেছেন নিতান্ত সহজভাবে। লীলার চারিত্রিক দৃঢ়তা সেইসঙ্গে পারিবারিক শিক্ষা চোখে পড়ার মত।

‘পাকদণ্ডী’ পড়তে গেলে রায় পরিবারের মার্জিত, পরিশীলিত, স্নিগ্ধ রুচিশীলতার যেমন পরিচয় মেলে, তেমনি ক্রমে ক্ষয়ে যাওয়া যৌথ পরিবারটির ভেতর কথা, যখন একে একে অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষগুলো অকাল মৃত্যুর শিকার হচ্ছিলেন এই ঘটনাগুলোও মনকে আর্দ্র করে দেয়।

বইতে রায় পরিবারের সদস্যদের এক-একজনের শূন্যতাও লীলা দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে সুকুমার রায়ের মৃত্যুর পর ছাপাখানা এবং ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বাড়ি নিলামে ওঠার সঙ্কটময় দিনগুলো সামনে এলে সবার হাহাকার আর বিষণ্ণতাকে তিনি যেভাবে নির্মোহভাবে সামলেছেন সেটি দুঃখ-বরণের তাৎপর্য সম্পর্কে নতুন একটি দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়।

তিনি মিশে গিয়েছিলেন কলকাতার সারস্বত সমাজের সঙ্গেও। সেসময়ের কলকাতার শিক্ষিত, বিদগ্ধ, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের কাছে লীলা মজুমদার অনেকটাই আদৃত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনে পড়াতে গিয়ে নিজের পিতার অমতে ব্যক্তিগতভাবে সাহস দেখাবার বিষয়টিও তখনকার বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শান্তিনিকেতনে লীলা মজুমদার নয় মাস অধ্যাপনার কাজ করেন। বি এ ক্লাসের ছাত্রদের তিনি ইংরেজি পড়াতেন, স্কুলে অঙ্কের ক্লাসও নিতেন। তখন স্বল্পকালের আবাস হলেও পরে এখানেই তিনি স্থায়ী হয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনের রতনপল্লিতে বাড়ি নির্মাণ করে চিরজীবনের জন্য এর মায়ায় জড়িয়ে যান।

প্রায় দেড়শ’র মত গ্রন্থের রচয়িতা লীলা মজুমদার ছোটদের জন্যেই লিখতেন, তিনি বলেছিলেন, ‘ছোটরা বই পড়ে বেঁচে থাকার জন্য, আনন্দের জন্য।’

‘পাকদণ্ডী’র পর বইপড়ার ধারাবাহিকতায় কোন বইয়ের দারস্থ হব এমন ভাবনায় সলতে পাকাতে একজন বন্ধুর উপদেশ গ্রহণ না-করবার কোনো কারণ ছিল না। বিশ্বসাহিত্যের নিমগ্ন পাঠক আমার এই বন্ধুর পরামর্শ ছিল সব ক্লাসিকগুলো পড়ে ফেলার। এক্ষেত্রে মহাভারত, ইলিয়াড, অডিসি, ডিভাইন কমেডি, গিলগামেশ আর গ্রিক ট্র্যাজেডিগুলো পড়ে ফেলতে বললেন তিনি। আর পড়তে বললেন তাত্ত্বিক বইগুলো। তত্ত্বের জন্য হাতের কাছে রাখতে বললেন টেরি ইগলটনের ‘লিটেরারি থিয়োরি’।

ইগলটনের বইটা নেট থেকে নামিয়েছি।

‘লিটারারি থিয়োরি’ নামক তাত্ত্বিক এই বইটির প্রথম নিবন্ধে সাহিত্য বলতে এককথায় কী বোঝাচ্ছে তার কয়েকছত্র বর্ণনা করে লেখাটা শেষ করব।

ইগলটন বলেছেন--

সাহিত্যের তত্ত্ব বলে যদি কিছু থাকে তবে এটাও খুব স্পষ্ট যে সাহিত্য বলেও কিছু একটা আছে, যার তত্ত্বের কথা বলা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে এ প্রশ্ন দিয়েই আলোচনা শুরু করা যায়: সাহিত্য জিনিসটা তবে কী?

বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। এর এক ধরনের ব্যাখ্যা হচ্ছে সাহিত্য ‘কাল্পনিক’ বিষয়। এছাড়া মোটাদাগে সাহিত্যকে মানুষ কীভাবে দেখে সেই ব্যাখ্যা এখানে আছে। তবে খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় এই সংজ্ঞা যথেষ্ট নয়। ইংরেজি সাহিত্য বলতে আমরা বুঝি শেক্সপিয়ার, ওয়েবস্টার--এদের সাহিত্যকে। কিন্তু তার পাশাপাশি বেকনের লেখাকেও সাহিত্য বলা যায়।

প্রথমে উল্লেখিত লেখকরা কল্পনার আশ্রয় নিয়ে সাহিত্যচর্চা করেছেন, দ্বিতীয় সারির উল্লেখিত লেখকরা তথ্যভিত্তিক বিষয়ের ওপর সাহিত্যিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। দুটো ঘরানাকে একই ছাতার নিচে আনলে মোটামুটিভাবে যা দাঁড়ায় তাকেই সাহিত্য বলা যেতে পারে।

তবে বাস্তব এবং কল্পনার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেই সাহিত্যকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ সাহিত্যের চৌহদ্দির মধ্যে এ-দুটোই আছে। তারা একে অন্যের সঙ্গে মিলে মিশে আছে, তাই এ-দুটোর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা উচিত না।

মূলত ষোড়শ শতাব্দীর শেষ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে উপন্যাস শব্দটিকে একইসঙ্গে সত্য এবং কল্পনা দুটো ধরনেই ব্যবহার করা হত। এমনকি খবরের কাগজের সংবাদ আসল খবর কিনা এ নিয়েও দ্বিধায় থাকত কেউ কেউ। উপন্যাস এবং খবর দুটোর কোনোটিই পরিষ্কারভাবে বাস্তবিক এবং কাল্পনিক ছিল না। মূলত এই দুটো বিষয়কে এখনকার সময়ে যেভাবে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে সেসময় এই ধরনের কাজ হত না। যেমন, জেনেসিস এর লেখকরা এই বইটিকে ঐতিহাসিক সত্য হিসাবে লিখেছিল, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কেউ কেউ এটাকে বাস্তব হিসাবে দেখছে, কেউ দেখছে কল্পনা হিসাবে। নিউম্যান ভাবতেন তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক ধ্যান সত্য ছিল কিন্তু অনেক পাঠকের কাছে এটা কেবলই সাহিত্য। সাধারণত সাহিত্য অনেক বাস্তবিক লেখাকে সন্নিবেশিত করলেও এটি কাল্পনিক অনেক লেখাকেই বাদ দেয়। যেমন সুপার ম্যানের কমিকস। এগুলো কাল্পনিক কিন্তু এদেরকে কোনোভাবে সাহিত্য বলা যাবে না। সাহিত্যকে যদি আমরা কেবল সৃজনশীল এবং কল্পনার বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করি তবে ইতিহাস, সামাজিক বিজ্ঞান এবং দর্শন কি সৃজনশীল এবং কাল্পনিক বিষয় নয়?

সাহিত্যকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য আমরা আরেকটি করণকৌশলের আশ্রয় নিতে পারি।

হয়ত সাহিত্যকে কেবল কাল্পনিক এবং বাস্তবিক বিষয় হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না, বরং এটা ভাষা নিয়ে উদ্ভটভাবে কাজ করতে পারে। এই তত্ত্ব ধরে রুশ সমালোচক রোমান জ্যাকবসন বলেছেন, সাহিত্য একধরনের লেখালেখি যেটি মানুষের সাধারণ কথাকে কবিত্বপূর্ণ ভাষায় প্রকাশ করে। সাহিত্য একইসঙ্গে সাধারণ ভাষাকে বিবর্তন এবং পরিবর্তন করে। এটি মানুষের প্রতিদিনের কথাবার্তাকে নিয়মতান্ত্রিকভভাবে বিচ্যুতও করে।

এই তত্ত্বগুলো নিয়ে রোমান জ্যাকবসন, ওসিপ ব্রিক উনিশশ সতেরোর আগে থেকে এবং বিশ-এর পর পর্যন্ত আলোচনা করেছেন। এরপর স্টালিনবাদ আসার পর এরা নিশ্চুপ হয়ে যান। আগে সাহিত্যকে প্রতীকীভাবে বিবেচনা করা হত। সাহিত্যকে দেখা হত রহস্যময়ভাবে এবং প্রতীক হিসাবে। আলোচ্য লেখকরা এই চিন্তাকে বাতিল করে বাস্তবের চোখে একে কল্পনা করেছেন।

সমালোচনা শিল্পকেও ভাববাদের আদলে না দেখে বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত।

সাহিত্যকে অনেকে অপ্রথাগত ধর্ম বলে বিবেচনা করত, কিন্তু সাহিত্য আদতে এটা নয়। সাহিত্য প্রকারান্তরে মনস্তত্ত্বও নয় বা সামাজিক তত্ত্বও নয়। এটা সুনির্দিষ্টভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভাষা নিয়ে কাজ করে।

সাহিত্যের নিজস্ব আইন, কাঠামো এবং অনুষঙ্গ আছে। এই আইন, কাঠামো এবং অনুষঙ্গকে আলাদাভাবে জানা উচিত এবং কোনোভাবে এগুলোকে অস্তিত্বহীন করে ফেলা উচিত হবে না।

সাহিত্য কখনো কেবল উদ্দেশ্যর বাহন নয়, এটা সামাজিক বাস্তবতার নির্যাস কিংবা খোদার বাণীও নয়। সাহিত্য বস্তুগত সত্য। সাহিত্যকে বাস্তবিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব, যেভাবে আমরা একটি যন্ত্রকে পরখ করি।

সাহিত্য শব্দ দিয়ে তৈরি, এটা কোন অনুভূতি বা বস্তু দিয়ে তৈরি নয়। আমরা যদি মনে করি সাহিত্য সৃষ্টি কেবল একজন সাহিত্যিকের মনের ভাবপ্রকাশ, তাহলে ভুল করব। ওসিপ ব্রিক বলেছেন, পুশকিন যদি ধরাতলে নাও আসত তাহলেও Eugene Onegin লেখা হত।

সাহিত্য কী, শিরোনামের প্রবন্ধটা দীর্ঘ। এই ছোট্ট পরিসরে সম্পূর্ণটা তুলে আনা সম্ভব হল না। তবে এ-কথা বলতেই হবে, সাহিত্যপ্রেমী লেখক-পাঠকদের জন্য ‘লিটারারি থিয়োরি’ বইটি অবশ্যপাঠ্য তো বটেই, ভীষণ দরকারিও।