দুঃখ-উত্তীর্ণ জীবনে আনন্দের সত্যসন্ধান

অনেক উদাহরণ দেওয়ার শেষে কবিতার অন্তিমে সেই অমোঘ লাইনটি তিনি লিখেছেন--''সুখ যে দুখেরই ফুল!''

পাভেল আখতারপাভেল আখতার
Published : 8 Dec 2023, 02:00 PM
Updated : 8 Dec 2023, 02:00 PM

কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত 'দুঃখবাদী কবি' নামে খ্যাত, যিনি জগৎ-সংসারে 'দুঃখ' ছাড়া আর কিছু দেখতে পাননি! 'সুখ' তাঁর কাছে একটি 'বিমূর্ত বস্তু' হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল। 'দুঃখবাদিতা'র এই একরৈখিকতার সমালোচনা করে মোহিতলাল মজুমদার লিখেছিলেন--'দুঃখের কবি'; যে কবিতার প্রথম লাইনটি হ'ল: ''দুঃখের কবি! শুনে হাসি পায়, সোনার পাথরবাটি!'' যে পাখিটি কাঁটার উপরে বসে গান গায়, ভুলে যায় তার দেহের রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা, তার 'আনন্দ' কিংবা 'সুখ' মোটেই ফাঁকি নয়, বরং খাঁটি--এই হচ্ছে মোহিতলালের মূল্যায়ন। অনেক উদাহরণ দেওয়ার শেষে কবিতার অন্তিমে সেই অমোঘ লাইনটি তিনি লিখেছেন--''সুখ যে দুখেরই ফুল!''

একথা ঠিক যে, মানুষের জীবনে আছে নানা দুঃখ, বিষাদ, যন্ত্রণা, হতাশা, ব্যর্থতা, ধ্বংসের আখ্যান। কিন্তু, এগুলির কাছে পরাজিত না হয়ে, বরং এসবকে অতিক্রম করে আলোক-উদ্ভাসিত ও আনন্দময় জীবনের সন্ধানে নিরন্তর ছুটে চলার মধ্যেই আছে জীবনের সার্থকতা। ''কি পাইনি তারই হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি!'' রবীন্দ্রনাথের এই অতুল গীতিমূর্ছনাও নির্দেশ করে যে, বেদনাবোধে আচ্ছন্ন না হয়ে সামনের দিকে ( "সমুখে শান্তি পারাবার" ) তাকানোই পরম আনন্দময় জীবনের উৎস। ''আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে'' যে আছে তাকে উপলব্ধি করতে হলে ''হৃদয়-পানে'' চাইতে হয় ; আর তার দেখা পেলে অনিত্য জীবনের সব অন্ধকার দূর হয়ে যায়। প্রতিদিনের ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়াগুলি থেকে যে দুঃখের জন্ম, তখন তা শূন্যে মিলিয়েও যায়। অনিঃশেষ 'দুঃখবাদে' আস্থা রেখে জীবনকে নিশ্চল বা স্থবির করে না-দিয়ে বরং তাকে নদীর চলিষ্ণু ধারায় প্রাণবন্ত রাখার জন্য 'পেয়েছি'র জীবনদর্শনে প্রত্যয়ই যথার্থ।

তবে, 'দুঃখ'-কে সম্যকরূপে না-বুঝলে জীবনকে দুঃখ-উত্তীর্ণ পারাবারের কিনারে পৌঁছে দেওয়াও সম্ভব নয়। এজন্য জীবনকেও বুঝতে হয়। এবং, সেটা মৃত্যুচেতনার যথার্থ আলোয়। বুদ্ধের কাছে আগত মৃত্যুশোকবিপন্ন সেই নারী প্রত্যেকটি বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লেন, তাঁর প্রজ্ঞাময় নির্দেশ মতো। কিন্তু, একটি বাড়ি থেকেও ক্ষুদ্র একটি শস্যকণা সেই শোকজর্জর নারী তার করতলগত করতে পারলেন না। কারণ, দেখা গেল, 'মৃত্যু' নামক রোদনদীর্ণ, দুঃখতাপদগ্ধ পৃথিবীর চরমতম অথচ শান্ত সত্যটি সমস্ত বাড়িকেই ছুঁয়ে গেছে। আসলে রিক্ত হৃদয়তটে মৃত্যুর মধ্যেকার দ্বিত্ববাচকতা--'চরম ও শান্ত', কোনওটাই আমাদের স্পর্শ করেনি। মৃত্যুর অভিঘাতে যে বাহ্য শোকঘূর্ণির উদ্দামতা তার মধ্যে তথাগতের শরণাগত নারীর বুকের পাঁজর ভেঙে যাওয়ার মর্মরধ্বনি আসলেই থাকে না; থাকলে সেই 'চরম'-এর সঙ্গে বিকেলের মরমী আলোর পুণ্যময়তা মিশে থাকা 'শান্ত সত্যটি'ও হৃদয়গত হ'ত। যথার্থ 'ভেঙে পড়া' গড়নের, নির্মাণের তীরে নিয়ে যায়। চরাচর ভাসানো জ্যোৎস্নানিশীথে 'কোথাও কিছু কম পড়েনি' এই সত্য অনুভবে রবীন্দ্রনাথ যে জারিত হলেন, তার নেপথ্যে তাঁর তুমুল 'ভেঙে পড়া'টিকে আমরা দেখি না। কন্যা মাধুরীলতা, পুত্র শমীর মৃত্যু কবিকে শূন্য, নিঃস্ব করে গেছে। কিন্তু, ''কোন ভাঙনের পথে'' কবি আবার উঠে দাঁড়ালেন, বুদ্ধকথিত মহাসত্যের দীপ্তিতে উদ্ভাসিত সেই নারীর মতো, সে খেয়ালও তো রাখতে হবে। নইলে যে 'অনন্তের বোধ' বিমূর্ত ও অধরাই থেকে যায়! 

বিলীয়মান মৃত্যুতে হোক, অথবা গাঢ়, বিশাল-হাঁমুখ অন্ধকারে, যা সমাজ ও সংসারের সবকিছু গ্রাস করে নিতে উদ্যত, আমরা যে ভেঙে পড়িনি তা আমাদের সেই 'শান্ত সত্যের' কাছে অথবা 'অনন্তের কিনারে' কীভাবে পৌঁছে দেবে? আমরা তো আসলে 'নিবিড় বন্ধু'র মতো 'মৃত্যু ও অন্ধকার'-এর সঙ্গেই আছি! তাহলে যার সঙ্গে আছি তার বাঁধন ছিন্ন করব কেমন করে! মৃত্যু ও অন্ধকার-উত্তীর্ণতাও তাই ক্রমশ যেন দিগন্তে হারিয়ে যাচ্ছে!

"কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে

মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;

অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে

ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।

ফেলে যাচ্ছি খড়কুটো, পরিধেয়, আহার, মৈথুন--

নিরুপায় কিছু নাম, কিছু স্মৃতি কিংবা কিছু নয় ;

অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন

কার হাত ভাঙে চুড়ি? কে ফোঁপায়? পৃথিবী নিশ্চয়।

স্মৃতির মেঘলাভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক

অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায়?

কেন দোলে হৃৎপিণ্ড, আমার কি ভয়ের অসুখ?

নাকি সেই শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায়!

আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার

যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার।"

 ( 'স্মৃতির মেঘলাভোরে', আল মাহমুদ )

বস্তুত, জীবনকে যাঁরা গভীরভাবে দেখতে ও চিনতে পারেন, সৃজনশীল সেইসব মানুষেরা কেউই 'মৃত্যুচিন্তা' থেকে দূরে থাকতে পারেননি। সেই চিন্তা বহু-বর্ণিল, নানা মাত্রার। জীবন ও মৃত্যু যে একই সুতোর দুটি প্রান্ত--এই শাশ্বত ও মরমী বোধটিকে তাই আমরা দেখতে পাই মেধা ও মননের বিচিত্র সব আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে। 'বিন্দু থেকে বিন্দুতে' বইতে সংকলিত 'দুঃখদীপের রবীন্দ্রনাথ' প্রবন্ধে প্রখ্যাত চিন্তক ও মনস্বী গদ্যশিল্পী চিন্ময় গুহ এক জায়গায় লিখছেন: ''জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দুঃখ আর মৃত্যুতমসাকে এমন প্রণয়স্পর্শে, এমন অশ্রুমঞ্জরি দিয়ে আনন্দমদিরায় ছুঁতে আর কে কবে পেরেছে তাঁর মতো?'' অসামান্য সব শব্দপুষ্পের মালায় গেঁথে তিনি দেখিয়েছেন যে, একের পর এক প্রিয়জনের মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ মনুষ্যস্বভাববশত 'বিচলিত' হলেও তা ছিল ক্ষণিকের। দুঃখের তরণী বেয়েই কবির উত্তরণ হয়েছে অনন্ত আনন্দময় জীবনের ঘাটে। চিন্ময় গুহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের উজ্জ্বল উপলব্ধির কথা: ''...কিন্তু তারপরে সেই প্রচণ্ড বেদনা থেকেই আমার জীবন মুক্তির ক্ষেত্রে প্রবেশলাভ করলে! আমি ক্রমে বুঝতে পারলুম জীবনকে মৃত্যুর জানলার ভিতর থেকে না দেখলে তাকে সত্যরূপে দেখা যায় না।'' মৃত্যুর শক্তি কেবল ভয়াল ভ্রুকুটিতে, তার মধ্যে আর কিছু নেই, যা অবলীলায় অতিক্রমযোগ্য। জীবনকে গভীরভাবে চেনা, জানা ও অনুভবের সংশ্লেষ প্রয়োজন, তখন এই উচ্চারণ খুব সহজ হয়ে ওঠে--''...যত বড়ো হও, তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড়ো নও/ আমি মৃত্যু-চেয়ে বড়ো, এই শেষ কথা বলে/ যাব আমি চলে।' ( 'মৃত্যুঞ্জয়', রবীন্দ্রনাথ )। রবীন্দ্রনাথের চিঠি, কবিতা ও গানের ঊর্মিমালায় তিনি তাঁর অসামান্য প্রবন্ধটি শেষ করছেন অমোঘ, সুবাসিত এই কথামঞ্জরি দিয়ে : ''এমন গীতসুধারসে মিশিয়ে, দীপ্ত কথা সাজিয়ে দুঃখের ঘনান্ধকার রাত্রিতে আর কে পারতেন প্রাণসখার মতো করে আমাদের আত্মোপলব্ধিকে জাগ্রত করতে?'' 

ঠিকই, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ হয়তো তা পারতেন না। তাঁর বহু গানের মণিমঞ্জুষায় 'দুঃখ'ই যেন হয়ে উঠেছে দুঃখাতীত জীবনকে দেখার অভিজ্ঞান! ''দুঃখ যদি না পাবে তো দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে!'' খুব জরুরি একটি 'বার্তা' দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ এই গানে। 'দুঃখ' পেতে আমরা চাই না। সেটা স্বাভাবিকও। কিন্তু, তবুও জীবনে 'দুঃখ' আসে। আমাদের করণীয় কাজটা শুরু হয় সেখান থেকেই এবং কবিও আসলে সেই দীক্ষাই দিতে চাইছেন। 'দুঃখ পেয়েই দুঃখের অবসান হবে'--যেন নেপথ্যে অনুরণিত তাঁর এই কথাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কবির কাছে 'দুঃখ' খুব হেলাফেলার জিনিস নয়; বরং মহার্ঘ। আকাঙ্ক্ষিত নয়, কিন্তু নানা কারণে আমরা যে 'দুঃখ' পাই তা-ও যে কোন 'হিরণ্ময় গন্তব্যে' আমাদের নিয়ে যেতে পারে, যদি সেই গভীরতর অনুশীলন থাকে, সেকথা বলাই কবির উদ্দেশ্য। মূলত হারিয়ে ফেলার অনুভূতি থেকেই আমাদের সমূহ 'দুঃখবোধ'-এর জন্ম। কিন্তু, জগতে সবই কি হারিয়ে যায়? 'যোগ-বিয়োগ'-এর ক্রীড়া তো চলছেই। ''দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল-আলোক'' তাহলে কবি তাকে স্বাগত জানাতে চান। কিন্তু, কী এমন কবি পেয়ে যাচ্ছেন যে, তাঁর 'দ্বিধা' আর থাকছে না? সেটাই বোঝা দরকার। ''দুঃখের কথা তোমায় বলিব না''--কবি এই কথা যে 'দুঃখ' পেয়েই বলছেন সেটা তো সত্যই; কিন্তু অবিস্মরণীয় এক উত্তরণ তাঁকে জীবনের সমস্ত 'দুঃখ' ভুলিয়ে দিচ্ছে তা যদি আমরা বুঝতাম!

মানুষ তার নিভৃত সত্তার গহনে উঁকি মেরে দেখলে দেখতে পাবে যে, সে আসলে জীবনের জন্য প্রবলভাবে যা যা চায় সেসব নিতান্তই গৌণ। এবং, মুখ্য চাওয়াটা সম্পর্কেই সে হয় অনবহিত, নয়তো উদাসীন; তার নাম--'আনন্দ'। তাই যদি না হবে, তাহলে প্রাপ্তির কলস পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কেন মানুষের মন অতৃপ্ত হয়ে থাকে? কিসের জন্যে তবে হাহাকার অন্তর্লোক বিপন্ন করে তোলে? আকাঙ্ক্ষিত সুখ ও শান্তির সংজ্ঞা দিতে বললে মানুষ হয়তো ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু 'আনন্দ' সম্পর্কে বলতে বললে তার অপারগ না-হওয়ারই কথা। রবীন্দ্রনাথের একটি গান স্মরণ করি--''অমল কমল সহজে জলের কোলে আনন্দে রহে ফুটিয়া।'' অতএব, 'আনন্দই' সব। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের বহু গানে এই 'আনন্দের' কলতান শোনা যায়---সদা থাকো আনন্দে, বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা, আজি এ আনন্দসন্ধ্যা, আনন্দধারা বহিছে ভুবনে, তাই তোমার আনন্দ আমার 'পর, জগতের আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ, রহি রহি আনন্দ-তরঙ্গ বাজে ইত্যাদি।

তবে, যতই আকাঙ্ক্ষিত হোক, নানা সংকটে জীর্ণ আমাদের জীবনে 'আনন্দ' দুর্লভ হয়ে ওঠে। নাকি, শেষপর্যন্ত তা আমাদের মুদ্রাদোষেই 'অধরা মাধুরী' হয়ে রয়ে যায়? রবীন্দ্রনাথ তাঁর ব্যক্তিজীবনে সংঘটিত বহু বিপর্যয়ে বিপুল মর্মযাতনা ভোগ করেন। সেই তিনিই তো আবার লিখলেন: ''ভাল মন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে!'' রবীন্দ্রনাথ আরও লিখছেন--''আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে, তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে!''

প্রকৃতপক্ষে এই পরিশ্রুত রাবীন্দ্রিক জীবন-অনুভবের উচ্চতার কেন্দ্রে আছেন--'তিনি'। হ্যাঁ, 'তিনি'ই একমাত্র সেই আশ্রয়, যাঁকে রবীন্দ্রনাথ একটি গানে এইভাবে বর্ণনা করেছেন--''ও অকূলের কূল, ও অগতির গতি, ও অনাথের নাথ, ও পতিতের পতি!'' আর কার কাছেই-বা এমন অসঙ্কোচে-অকপটে হৃদয়ের সমস্ত ভার সমর্পণ করা যায়, 'তিনি' ছাড়া! সমস্ত স্তব্ধতা, আর্তি, ক্রন্দন শান্ত হয়ে আসে যে একমাত্র 'তাঁর কাছেই' এসে! এই শাশ্বত, পরম 'আশ্রয়স্থলটিকে' রবীন্দ্রনাথ আমাদের যে চিনিয়েছেন কী অপরূপ মমতায় তা বর্ণনাতীত! ব্যক্তিগত জীবনের বহু বিপর্যয়, বহু বেদনার ধূসর সঞ্চয় থেকেই তাঁর এই আত্মনিবেদিত হৃদয়টি বিশুদ্ধ হয়ে গড়ে উঠেছিল! জীবন যে শত-সহস্র কাঠিন্য থেকে মুক্তি চায়, তা যখন দৃশ্যমান পৃথিবীতে দুর্লভ হয়ে ওঠে, তখনই তো অদৃশ্য সেই 'পরম'-এর সান্নিধ্যসুধার তৃষ্ণা গভীর সান্ত্বনার মতো বাজে প্রাণের নিভৃতে! তখন জীবনের দুঃখ-যাতনাগুলিকে 'পরানসখা'র কাছে নিবেদন করেই ভারমুক্তি ও প্রশান্তি লাভ করা যায়! চাওয়া-পাওয়ার জটিল হিসেবের ধুম্রজালে আচ্ছন্ন বিশ্বচরাচরের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সেই 'পরানসখা'-ই শুধু তখন নিষ্কলুষভাবে 'আপন' হয়ে ওঠে! এছাড়া 'অকূল', 'অগতি', 'অনাথ', 'পতিত'-এর ভাবনা ও অনুভূতির বুনিয়াদ আর কীভাবে গড়ে উঠতে পারে? দেখা যাক, রবীন্দ্রনাথ আমাদের যেভাবে চিনিয়েছেন সেই 'পরম আশ্রয়'টিকে---চিরবন্ধু চিরনির্ভর চিরশান্তি তুমি হে প্রভু, চিরসখা হে ছেড়ো না মোরে, তোমারই ঝরনাতলার নির্জনে, তুমি বন্ধু তুমি নাথ, জীবন যখন শুকায়ে যায়, কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না শুকনো ধুলো যত, জানি তোমার অজানা নাহি গো, আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি, প্রতিদিন আমি হে জীবনস্বামী দাঁড়াব তোমারই সম্মুখে, সুন্দর হৃদিরঞ্জন তুমি নন্দন ফুলহার, মম দুঃখের সাধন যবে করিনু নিবেদন, কাল রাতের বেলা গান এল মোর প্রাণে, অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে, জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ায়ে বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে, প্রভু তোমা লাগি আঁখি জাগে, ওহে সুন্দর মম গৃহে আজি পরমোৎসব রাতি, তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে, সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর, আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে, অনেক দিয়েছ নাথ, প্রভু আজি তোমার দক্ষিণ হাত, যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু, তব সিংহাসনের আসন হতে ইত্যাদি অগণিত গান, যা রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিল আনন্দময় জীবনের সুধাসাগরের সন্ধান! এবং, তিনি অর্জন করেছিলেন 'আত্মশক্তি'! বিশুদ্ধ চেষ্টায় আমরাও তা অর্জন করতে পারি!