Published : 10 May 2026, 03:35 PM
[উপন্যাসের ভাষা জিনিসটার যে সত্যিই অস্তিত্ব আছে, তা কোনো সার্থক উপন্যাসের সাথে সাক্ষাৎ হলে বোঝা যায়। কিন্তু তার কোনো নির্ধারিত আকার নাই। অবয়ব নাই। সূত্র নাই। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘প্রেসক্রাইবড ফর্ম’, যার খোঁজে গৌণ লেখকরা এবং সাহিত্যের সমালোচক-তাত্ত্বিকরা হন্যে হয়ে থাকেন, সেই জিনিসটা ‘ইসমে আজম’-এর মতো গুপ্ত। বড় লেখকরা লেখার সময় তার খোঁজ পান, কিন্তু তাকে ব্যাখ্যা করতে পারেন না। চিনিয়েও দিতে পারেন না।
তো এই যখন অবস্থা, তখন সেই বিষয় নিয়ে লেখালেখি করার কোনো কারণ কি অবশিষ্ট থাকে? যা আপনি আমাদের জানাতে পারবেন না, তা নিয়ে কচকচানির দরকারটা কী? উত্তরে যদি বলা হয় যে আমি নিজেকে কথাগুলো মনে করিয়ে দেবার জন্যই এই লেখাটি লিখছি, তাহলে হয়তো সেটা ছাপার, সামান্যতম হলেও, যৌক্তিকতা লাভ করে বোধহয়।]
উপন্যাস বলতে আমাদের ভাষিক অঞ্চলে যে শিল্পরূপটিকে বোঝানো হয়ে থাকে, তা ইউরোপ থেকে আসা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ইংরেজদের কাছ থেকে আসা। আমাদের এই ভারতবর্ষের মহাভারত, পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ, পাঁচালী, কথকতার মধ্যে যতই আমাদের উপন্যাস বা কথাসাহিত্যের মূল খোঁজা হোক না কেন, এখনো উপন্যাসের নামে যা চর্চিত হয় আমাদের ভাষায়, তা হয় সরাসরি এসেছে ইংরেজি থেকে, অথবা ইংরেজির মাধ্যমে অনূদিত হয়ে অন্য ভাষা থেকে। কিন্তু যে উৎস থেকেই আসুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাকে বাঙালি হয়ে উঠতে হয়েছে। বাঙালির বাস্তবতা এবং মনোবাস্তবতাকে ধারণ করেই তার এই বাঙালি হয়ে ওঠা। আর বাংলাভাষাকে গ্রহণ করার ব্যাপারটা তো আছেই। কিন্তু কোন বাংলা? এই প্রশ্ন থেকেই আসলে উঠে আসে উপন্যাসের জন্য বাংলা হলেও, অন্যরকম একটি বাংলা লিখতে হয়েছে লেখকদের। আলালী বাংলা বা হুতোমী বাংলা আদর্শ হয়নি আমাদের উপন্যাসের। এগুলি পথিকৃৎ হিসাবে মর্যাদা পায়, কিন্তু সফল উপন্যাস হিসাবে নয়। উপন্যাসের ভাষা হিসাবে জায়গা পেল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষা। বাংলা উপন্যাসের প্রথম স্থপতি হিসাবেও নাম প্রতিষ্ঠিত হলো বঙ্কিমের। কারণ হিসাবে নানা রকম সোজা এবং বাঁকা ব্যাখ্যা আমাদের সামনে উপস্থিত। কিন্তু মূল কারণটি হচ্ছে উপন্যাস শিল্পের জন্য সেই ভাষাটিই ছিল সবচেয়ে প্রযোজ্য এবং লাগসই ভাষা। যে ভাষায় বাক্যালাপ করা হয়, খিস্তিখেউড় করা হয়, যে ভাষায় চিঠি লেখা হয়, দলিল-দস্তাবেজ লেখা হয়, যে ভাষায় গল্প-নকশা-নাটকও লেখা হয়, সেই ভাষা উপন্যাসের জন্য সঠিক ভাষা নাও হতে পারে। মনে রাখা দরকার সেই সময় আদর্শ ঔপন্যাসিক হিসাবে বাঙালি লেখকরা গ্রহণ করেছিলেন ওয়াল্টার স্কটকে। তাঁর উপন্যাসগুলিতে সামন্ততান্ত্রিক ব্রিটিশের বিভিন্ন ঘটনার নাটকীয় উপস্থাপনা চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল বাঙালি লেখকদের। তারাও স্কটের অনুকরণে ইতিহাসের বিভিন্ন কালখণ্ডের নাটকীয় উপস্থাপনায় ব্রতী হলেন।
কিন্তু কয়েক দশক পরেই উপন্যাসের আরও বিভিন্ন রূপ বাঙালি পাঠক-লেখকের সামনে উপস্থিত হলো অনুবাদের মাধ্যমে। ডন কুইক্সোট, আনা কারেনিনা, ওয়ার এন্ড পিস, ব্রাদার্স কারমাজোভ প্রতিষ্ঠিত হলো উপন্যাসের অন্য ধরনের আইকন হিসাবে। এই উপন্যাসগুলি বাঙালিকে বুঝতে শিখিয়েছে যে ঘটনার নাটকীয় উপস্থাপন নয়, উপন্যাসের কারণ-কার্য-লক্ষ্য অন্য কিছু। সেই ‘অন্য কিছু’ বিভিন্ন জনের দ্বারা ব্যাখ্যাত হয়েছে। সেগুলির সারাৎসার পাওয়া যাবে দেবেশ রায়ের উক্তি থেকে- ‘উপন্যাসের অন্বিষ্ট সমাজ নয়, সময় নয়, ইতিহাসও নয়। উপন্যাসের অন্বিষ্ট ব্যক্তিমানুষ। এই সমাজ, সময় আর ইতিহাস ব্যক্তিমানুষের চরিত্র ও মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক জটিল করে দেয়। ফলে মানুষের সংজ্ঞা বারবারই নতুন করে খুঁজতে হয়। তাই মানুষকে খুঁজতে গিয়ে এই সমাজ, সময় আর ইতিহাসকেও খুঁজতে হয়। সমাজ, সময় আর ইতিহাসধৃত ব্যক্তিমানুষই হচ্ছে উপন্যাসের অন্বিষ্ট।’
এই যে বারবার সংজ্ঞা-পাল্টানো মানুষ, সেই ব্যক্তিমানুষকে ধরবার জন্যই উপন্যাসকে বার বার বদল করতে হয় নিজেকেও। আর সেইসাথে উপন্যাসের ভাষাকেও।
আমাদের দেশে যে উপন্যাস ব্যক্তিকে ধরার চেয়ে সমাজকে ধরতেই বেশি আগ্রহী, তার কারণ অন্যত্র। এখানে ব্যক্তি এখন অব্দি ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। সমাজের বিকৃত বিকাশ ব্যক্তি তৈরি হতে দেয়নি। তবে সেই বিতর্ক এখানে নয়। উপন্যাসের ভাষা আলাদা আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণ খোঁজাটাই মুখ্য।
সমাজবাদীরা ভাষার মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই অনেক বছর ধরে ধন্ধে ছিলেন। ভাষা সমাজের কাঠামোর মধ্যে পড়ে নাকি উপরিকাঠামোর মধ্যে পড়ে, তা নিয়ে বিতর্ক চলেছে অনেক বছর। অবশেষে একমত হওয়া গেছে যে ভাষা কোনো নির্দিষ্ট সমাজের ভিতরকার নতুন বা পুরাতন কোনো কাঠামোর ফল নয়, বরং সমাজের ইতিহাসের সমগ্র গতিপথের ও বহু শতাব্দীর ভিত্তিসমূহের ইতিহাসের ফসল। ভাষা কোনো একটি বিশেষ শ্রেণীর দ্বারা সৃষ্টি হয়নি, বরং ভাষা হচ্ছে সমগ্র জাতির সৃষ্টি, শত শত বংশ পরম্পরার প্রচেষ্টার ফল। আর সেইসাথে ভাষা মানুষের সকল উৎপাদনমূলক ক্রিয়াকর্মের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। ভাবের আদান-প্রদান মানুষের অস্তিত্ব এবং বিকাশের সমার্থক। ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল ভাবের আদান-প্রদানের জন্যই। একে বাদ দিলে বৈরি প্রাকৃতিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অসম্ভব। এককথায় মানুষের অস্তিত্ব বজায় রাখাই অসম্ভব। লিখিত ভাষার আগে মুখের ভাষা ছিল, তার আগে ছিল সাংকেতিক শরীরের ভাষা। চিরকালই ভাষা মানুষের অস্তিত্ব এবং বিকাশের অপরিহার্য উপাদান হয়েই থেকেছে, এবং থাকবে। কাজেই ভাষাকে কেবলমাত্র উপরিকাঠামোর একটি উপাদান বলে ভাবলে সেটা হবে মারাত্মক ভুল।
ভাষার এই জাতীয়ভিত্তিক চরিত্র মেনে নেবার পরেও একটি কথা থেকে যায়। তা হচ্ছে, একটি ভাষিক জাতির সকল শ্রেণীর মানুষ ভাষাকে একই ভাবে ব্যবহার করতে পারে না। করেও না। ভাষার বিভিন্ন দিক বিভিন্ন শ্রেণীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, ভাষার বিভিন্ন ধরনের প্রয়োগ ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। শ্রেণীসংগ্রামের বিষয়টি এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। শৈল্পিক প্রয়োগের কথা বলতে গেলেও বলা যায় যে লেখক যে ধরনের মানসিকতা ধারণ করেন, ভাষা তার হাতে সেইভাবে ব্যবহৃত হয়। সেক্ষেত্রে ভাষা সর্বজনীন হওয়া সত্ত্বেও হয়ে ওঠে লেখকের ব্যক্তিগত। সেই ব্যক্তিগত আবার পরবর্তীতে সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারে যখন তা হয় সফল শিল্পকর্ম, সফল উপন্যাস।
ভাষাকে একসময় ভাবা হতো কাহিনী বর্ণনা করার চিহ্ন বা প্রতীক হিসাবে। কিন্তু ক্রমে একসময় এই উপলব্ধি জায়গা করে নিয়েছে যে ভাষা নিজেই একটি সক্রিয়তা। তার কাজ শুধু আখ্যানকে বয়ে নিয়ে চলা নয়, বরং আখ্যানকে প্রাণ এবং গতিপথ দান করাও। স্তাঁদাল কিংবা তলস্তয় যে ভাষাকে ব্যবহার করেন, দস্তয়ভস্কির ক্ষেত্রে তা আলাদা হয়ে যায়। জীবনের বিশালতা তুলে ধরার জন্য যে ভাষা তলস্তয় খুঁজে বের করেন, তা দস্তয়ভস্কির কোনো চরিত্রকেই ফোটাতে পারবে না। কারণ পাঠক দস্তয়ভস্কির প্রায় সকল উপন্যাসে মাঝপথে এই আর্ত কামনা অস্ফুটে ব্যক্ত করতে থাকেন যে এই চরিত্রটা এখনো আত্মহত্যা করছে না কেন! তলস্তয়ের সৃষ্ট চরিত্রের তিক্ততা আর দস্তয়ভস্কির চরিত্রের তিক্ততার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। সেই জন্য একই রুশ ভাষা ব্যবহার করলেও দুই জনের উপন্যাসের ভাষা আলাদা। নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে স্তাঁদাল ইতালি গেছেন, রাশিয়া গেছেন, রাশিয়া থেকে ফিরেছেন, কিন্তু তিনি ‘ওয়ার এন্ড পিস’ লেখেননি। লিখেছিলেন আক্রান্ত জাতির লেখক তলস্তয়। তার পেছনে অনেক কারণ বিদ্যমান থাকতে পারে। কিন্তু মূল না হলেও অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে আগ্রাসীর ভাষায় ‘ওয়ার এন্ড পিস’ লেখা যায় না। এই উপন্যাসের ভাষা তলস্তয় পেয়েছেন নতুন এক জগতের সাথে সংযোগের আকাঙ্ক্ষা থেকে। আবার আন্তন চেখভের ভাষার পাঠ আমাদের সামনে তুলে ধরে এমন এক স্রষ্টার প্রতিকৃতি যিনি জীবনের দিকে তাকিয়ে আছেন স্নেহার্দ্র ও করুণাঘন দৃষ্টি নিয়ে।
উপন্যাসের ভাষা যে কতটা আলাদা হতে পারে, কখনো কখনো হওয়া প্রয়োজন হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে সামনে-থাকা দৃষ্টান্ত বোধকরি কমলকুমার মজুমদার হতে পারেন। আমাদের মনে হতে পারে যে কমলকুমার মজুমদার তাঁর সবগুলি ক্ষুদ্র আয়তনের উপন্যাস একই ভাষাভঙ্গিতে লিখেছেন। কিন্তু দেখা যাবে ‘সুহাসিনীর পমেটম’ থেকে সর্বশেষ উপন্যাস ‘খেলার প্রতিভা’য় কিছু-না-কিছু ভাষাগত বিবর্তনের ছাপ রয়েই গেছে, যদিও তা কমলকুমারের ট্রেডমার্ক থেকে আলাদা কিছু নয়। এমন এক ভাষার আশ্রয় কেন নিতে হয় কমলকুমারকে? সে কি শুধু বিশিষ্ট হবার তাড়না? নাকি যে আখ্যানটি তিনি শোনাতে চান, সেই আখ্যানকে প্রাণ দেবার জন্য অন্য কোনো বিকল্প ভাষা ব্যবহারের সুযোগ নেই বলেই এই নিঃসঙ্গযাত্রা? ‘খেলার প্রতিভা’ আমাদের এই আখ্যানটি জানায়, তাকে শোনানোর চেষ্টা করে দেখা গেছে, কমলকুমারের ভাষা অন্তত মাঝে মাঝে হুবহু ধার না করলে সেই কাহিনী ব্যক্ত করাই সম্ভব না। যে আকাল থেকে বাঁচার আশায় মকর-সংক্রান্তির ঠিক আগে এক দল গ্রামবাসী দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার লাট-মহলের ভেড়ি-পথ দিয়ে খাদ্যের সন্ধানে চলেছে। ভেড়িপথের ‘দক্ষিণে মাতলা-বিদ্যাধরী- উত্তরে কয়েক হাজার বিঘার লাট জলমগ্ন’। দিনরাত অবিশ্রান্ত তাদের পথচলা। ‘তাহারা এই মাটির প্রতিটি কণা শুঁকিতে শুঁকিতে আসিতে আছিল।’ কারণ তখনো তাদের কাছে গ্রামের জীবন খুবই টাটকা, তখনো তারা পুরোপুরি ভিখিরি হয়ে ওঠেনি, ‘কাস্তে লাঙল ইত্যাদি আমরা ভুলি নাই, গৃহাভিমুখী পথ আমাদের মনে আছে; আমরা হেলেগরুর লক্ষণসমূহ ভালভাবেই জানি।’
এই দলটি যাতে ভেড়িপথ থেকে নেমে গ্রামের ভেতরে ঢুকতে না পারে, গ্রামে তখনো সামান্য যে ভিক্ষা পাওয়া যাচ্ছে সেই ভিক্ষায় যাতে ভাগ বসাতে না পারে, সেজন্য ভেড়ির নিচের গ্রামগুলির লোকজন লাঠি-ডাণ্ডা হাতে পাহারা দিচ্ছে। এই একই আকালে আক্রান্ত দুই দল পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
ততদিনে এই আকাল থেকে পলায়নকারী দলের ‘মেয়েছেলের দল সবেমাত্র দিকে দিকে মৃত দেখিয়াছে... এখন আর নাকে কাপড় দিবার মতি নাই- । নীচে কোটালের বানে ভাসমান লাট, ভেড়ির ওপরে এই দল নিশাযাপন করে। সেখানে খবর আসে, পত্তনিদার বাবুর মেয়ের বিবাহ। বাবুর ইচ্ছা সবাই আসুক। ভেড়ি পথ দিয়া যাহারা যায়। খাইবে ছড়াইবে।’ অবশেষে, এই দলের মধ্য থেকে একজন মাত্র নারী বহু সংগ্রামের পর সেই অন্নকূট উৎসবে গিয়ে পৌঁছাতে পারে। সেই নারীর এই প্রথম ভিক্ষার অন্ন গ্রহণ। আর যেন কী উপায়ে রাস্তার এক পা কাটা মৃত ভিখারির লাঠিটা এখানে এসে পড়ে। খোলা উনুনে কাঠের প্রয়োজনে ‘এখন সেই বিচিত্র ঠ্যাঙা সেই উনুনে সত্বর ঢুকাইয়া দেওয়া হইল।’
মৃত ভিখারির কাটা পায়ের বিকল্প ‘ঠ্যাঙায়’ রাঁধা সেই ‘ভাত এখন পরিবেশন করা হইতেছিল; সেই আহার্য্য হইতে ধোঁয়া নির্গত হইতে আছে, কেহ হাত দিয়া তাহা অনুভব করিতেছে যখন, ... ধ্বনিয়া উঠিল, কে। এবং ঐ ঠ্যাঙার দিকে নেত্র পাতিল- যাহার অগ্রভাগে জ্বলিতেছে- যেদিকে বগল দাবাতে থাকে...
ঝটিতি এখন যে মেয়েছেলের ট্যাঁকে আয়নার টুকরা সে এবং আরও দুইজন উচ্চারিল, কে।
যে যেভাবে বসিয়াছিল ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল, এক ভিখারি একটি পা নাই। যাহা অতীব স্পষ্টই ঐ ছায়া বড় মায়ার এক পারে বড় টলিতেছে! বড় দুঃখের! কহিতেছে, আমারে দিবে না!...’
কমলকুমারের সাহায্য না নিয়ে যে উপন্যাসের আখ্যান গল্পাকারে বলাই সম্ভব নয়, সেই উপন্যাস যে অন্য কোনো ভাষাতে লেখা সম্ভবই নয়, তা বলতে যাওয়াই বিরক্তিকর।
কিন্তু সমাজ-অন্বিত ব্যক্তিকে বাদ দিয়েও, শুধু ব্যক্তিকে নিয়েও তো উপন্যাস হয়। ব্যক্তির পুরোটা ছাড়াই, তার যেটুকু প্রয়োজন, শরীর ও মনের ছেঁড়া অংশটুকু টেনে নিয়েও তো উপন্যাস হতে আমরা দেখেছি। আলবেয়ার কামুর হাতে, সার্ত্রের হাতে, সিমন দ্য বুভোয়ার হাতে, কাফকার হাতে। এমনও নয় যে অস্তিত্ববাদের উদ্ভবের সাথে এই ধরনের উপন্যাসের সরাসরি সংযোগ আছে। বিচ্ছিন্নতা বা আউটসাইডার তো কামু-কাফকার অনেক আগেই আমাদের বাংলা উপন্যাসে এসে গেছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র শশী ডাক্তারের মাধ্যমে। অথচ সেটি ধরা পড়েনি আমাদের পাঠকের চোখে, কারণ বাঙালি পাঠক ততদিনও উপন্যাস বলতে যা বোঝেন, তার বাইরে অন্য ব্যাখ্যা খুঁজতে চাননি। আর একটি কারণ, শশী ডাক্তারকে পুরোপুরি সমাজের আউটসাইডার দেখানোর মানসিকতাই হয়তো মানিকের ছিল না। সেই কারণে শশী ডাক্তারের প্রসঙ্গ-অনুসঙ্গে তিনি উপন্যাসের ভাষাকে পরিবর্তিত করে নেননি। মানিক যে চাইলেই সেটা পারতেন, তার প্রমাণ মানিকের অসংখ্য রচনাতে ছড়িয়ে আছে। আলাদা আলাদা উপন্যাসের জন্য আলাদা আলাদা ভাষা তৈরি করে নিয়েছেন তিনি। কিন্তু তা করার জন্য কোনো ঘোষণা দিতে দেখি না তাঁকে। আমাদের ভাষাতে তাই মানিকের মতো ভাষাশিল্পী একজনও নাই। কারণ উপন্যাসের ভাষা নির্মাণের জন্য তাঁকে অন্তত জয়েসের মতো করে বন্ধুর কাছে চিঠি লিখতে হয়নি যে- তার (জয়েস-এর) লেখা খুব ভালো এগুচ্ছে। গত সাতদিনে তিনি চার লাইনের শব্দগুলিকে বার বার বিভিন্ন ভাবে সাজাতে পেরেছেন।
বাংলাদেশের বাংলাভাষার উপন্যাসের ভাষার সাথে ইংরেজি ভাষায় লেখা বিলেতের উপন্যাসের ভাষার ব্যবধান কেবলমাত্র বাংলা বা ইংরেজি নয়, বরং পুরো সমাজের-জাতির চিন্তার ব্যবধান। এই সত্যটিকে কবুল করে বলা যায়- উপন্যাসের ভাষার সঙ্গে লেখকের মনোজগৎ এবং সমাজের মনোজগৎ একাকার হতে পারলে একমাত্র তখনই উপন্যাসটি সার্থক হয়ে ওঠার ধাপগুলি অতিক্রমণের প্রস্তুতি নিতে পারে।