Published : 24 Aug 2025, 12:51 AM
জেমস জয়েস নিয়ে বোর্হেস একাধিক লেখা লিখেছেন। বিশেষ করে ইউলিসিস এবং ফিনেগানস ওয়েক নিয়ে। এমনকি তিনি ইউলিসিস-এর একটি অধ্যায় স্প্যানিশে অনুবাদও করেছিলেন। এই লেখাটি তিনি লিখেছিলেন ১৯২৫ সালে যখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ। লেখাটি স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে এন্ড্রু হার্লি প্রথম অনুবাদ করেন ১৯৯৯ সালে। অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক আলম খোরশেদ বোর্হেসের জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিডি আর্টস-এর পাঠকদের জন্য এই প্রথম এটি ইংরেজি থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন।–বি.স
ইউলিসিস-এর উপকূলে পা-রাখা আমিই প্রথম হিস্পানি পর্যটক, যে-আরণ্যক নিবিড় নিসর্গ ইতঃপূর্বে পর্যটন করেছেন ভালেরি লার্বো, যিনি একজন মানচিত্র-নির্মাতার নির্ভুল সূক্ষ্মতায় এর ঘনগম্ভীর ভূ-প্রকৃতিকে পরখ করেছেন (নুভেল রেভ্যু ফ্রঁসেজ ১৮), যার বর্ণনা আমিও দেব, যদিও এর আভ্যন্তর প্রদেশে আমার ভ্রমণ ছিল নিতান্ত ক্ষণস্থায়ী ও অমনোযোগী। আমি এর সম্পর্কে বলব, তার প্রতি আমার মুগ্ধতা আমাকে যেটুকু স্বাধীনতা দিয়েছে তারই সুবাদে, সেইসব প্রাচীন পর্যটকের সন্দিগ্ধ তীব্রতায়, যাঁরা তাদের যাযাবরীয় মুগ্ধতার চোখে নতুন ভূমিসমূহের বর্ণনা দিয়েছেন, এবং আমাজন ও সেজারের নগরী-বিষয়ে যাঁদের গল্পগুলো সত্য ও কল্পনায় মিশ্রিত ছিল।
আমি স্বীকার করছি যে, আমি এর সাতশ পৃষ্ঠার পুরো পথটুকু পাড়ি দিইনি, এবং এর বিচ্ছিন্ন কিছু অংশকেই কেবল পরখ করে দেখেছি, তারপরও আমি জানি এটা কী বস্তু, যেরকম সাহস ও বৈধ নিশ্চয়তার সঙ্গে আমরা একটি নগর-বিষয়ে আমাদের জ্ঞানকে প্রকাশ করি, তাতে অন্তর্ভুক্ত সবগুলো সড়ক সম্পর্কে অন্তরঙ্গ ধারণার পুরস্কার না পাওয়া সত্ত্বেও, সেভাবেই।
জেমস জয়েস একজন আইরিশ। এবং আইরিশরা সবসময়ই ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের মূর্তিভাঙা মানুষ হিসেবে কুখ্যাত ছিল। বাচিক ভব্যতা বিষয়ে তাদের প্রভুদের চেয়ে কম স্পর্শকাতর, পূর্ণিমার চাঁদের দিকে চেয়ে চোখ উগড়ে দেওয়া কিংবা দীর্ঘ মুক্তছন্দে নদীর অস্থায়ীত্ব বিষয়ে বিলাপ করায় অনাগ্রহী, তারা ব্রিটিশ জ্ঞানরাজ্যের গভীরে অনুপ্রবেশ করেছিল, তার যাবতীয় বাচনিক উল্লাসকে ছেঁটে দিয়ে, তাদের রাখঢাকহীন অভব্যতার মাধ্যমে। জনাথন সুইফট মানবিক আশা ও উল্লাসের সঙ্গে ধারালো অম্লের মতো আচরণ করেছিলেন, এবং ভলত্যেরের Micromegas ও Candide তাঁর তীব্র নৈরাশ্যবাদের সস্তা সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়। লরেন্স স্টার্ন পাঠকদের প্রত্যাশার সঙ্গে মশকরা করে উপন্যাসের ভিত ধসিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেইসব তির্যক বিচ্যুতিসমূহই আজ তাঁর বহুমুখী সুখ্যাতির কারণ; বার্নার্ড শ আজকের দিনের সবচেয়ে আনন্দদায়ী বাস্তববাদী; তবে জয়েস সম্পর্কে আমি বলব যে, তিনি তাঁর আইরিশ দুঃসাহসকে সবচেয়ে আত্মমর্যাদার সঙ্গে প্রয়োগ করেন।
তাঁর জীবনের জন্য, স্থান কালের পরিমাপে অল্প কয়েকটি বাক্যই যথেষ্ট, যা আমার অজ্ঞতার কারণে আরও খানিকটা খর্ব হয়ে যাবে। ১৮৮২ সালে ডাবলিনে তাঁর জন্ম হয়, একটি বিখ্যাত, ধার্মিক ক্যাথলিক পরিবারে। তিনি জেসুইটদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি ধ্রুপদি সংস্কৃতির একজন ধারক, তিনি বিদ্যাচর্চার সঙ্গে অপরিচিত নন, তাঁর লাতিন বাক্যসমূহে কোনো ব্যাকরণিক ভ্রান্তি নেই; এবং তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিচরণ করেছেন; এবং তাঁর সন্তানেরা ইতালিতে জন্মেছে। তিনি গীতিকবিতা, গল্প, ও গির্জাতুল্য রাজসিক একটি উপন্যাস রচনা করেছেন, যা এই রচনাটির মূল উপজীব্য।
ইউলিসিস নানাভাবেই ব্যতিক্রমী। এর জীবন মনে হয় একটি তলেই অবস্থিত, সেইসব পদক্ষেপবিহীন, যা আমাদেরকে মানসিকভাবে প্রতিটি ভাবের জগৎ থেকে বস্তুগত মঞ্চে নিয়ে যায়, একজন মানুষের দিবানিদ্রার খেয়ালি অবচেতন স্বপ্নসমূহ থেকে সম্মিলিত মনের বহুলদৃষ্ট স্বপ্নের পৃথিবীতে। অনুমান, সন্দেহ, দ্রুত ধাবমান ভাবনা, স্মৃতি, অলস চিন্তা থেকে সচেতনভাবে নির্মিত ভাবনা একই মর্যাদা উপভোগ করে এই গ্রন্থে; একটি একক দৃষ্টিকোণ দৃশ্যমানভাবেই অনুপস্থিত। এই বাস্তব ও স্বপ্নের মিশ্রণই হয়তো কান্ট ও শোপেনহাওয়ারের সম্মতি উৎপাদনে ভূমিকা রেখেছে। পূর্বোক্তজন স্বপ্ন ও বাস্তবের পার্থক্য নিয়ে কাজ করেননি, প্রাত্যহিক জীবনের কার্যকারণিক সম্পর্কের ধ্রুব বৈধতাটুকু ছাড়া, যা এক স্বপ্ন থেকে অপর স্বপ্নের মধ্যে অনুপস্থিত। অন্যজনের মতে স্বপ্ন ও বাস্তবকে আলাদা করার কোনো মানদণ্ড নেই, জাগ্রত জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্যসমূহ ছাড়া; তিনি অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যাসহ যোগ করেন যে, স্বপ্ন ও বাস্তব একই গ্রন্থের পৃষ্ঠা ছাড়া কিছু নয়, এবং প্রথা বাস্তব জীবনকে নিয়মতান্ত্রিক পাঠ বলে অভিহিত করে এবং স্বপ্নকে, আমরা যা-কিছু অলস ঔদাস্যের মতো পৃষ্ঠা ওল্টাই, সেরূপ অভিধা দেয়। আমি তাই গুস্তাভ স্পিলার কর্তৃক তাঁর The Mind of Man গ্রন্থে বর্ণিত সমস্যাটিকে স্মরণ করতে ইচ্ছা করি; যেখানে একটি ঘরকে নির্মোহভাবে দেখার আপেক্ষিক বাস্তবতার পাশাপাশি কল্পনা এবং অবশেষে তাকে আয়নায় প্রতিফলিত হতে দেখে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে তিনটিই বাস্তব, এবং দৃশ্যগতভাবে তিনটিই একই স্থান দখল করে।
যেমনটি আমরা দেখি, মিনার্ভার জলপাই গাছ লরেলের চেয়ে কোমলতর ছায়া ফেলে জয়েসের মূল্যবান ইউলিসিসে। আমি এর কোনো সাহিত্যিক পূর্বসূরিকে খুঁজে পাই না, Crime and Punishment-এর পরের পর্বের দস্তয়েফ্স্কি ছাড়া, এবং সেটাও কতটা সঙ্গত কে জানে। তাই চলুন আমরা এই শর্তাধীন অলৌকিকেরই প্রশস্তি গাই।
চৈতন্যের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিশদ তথ্যের প্রতি জয়েসের অন্তহীন অনুসন্ধানে তিনি সময়ের গতিকে স্তব্ধ করে দেন এবং তার চলাচলকে স্থগিত করেন ইংরেজি নাটকের অসহিষ্ণু প্ররোচনার বিপরীতে একধরনের শান্তিপূর্ণ ভঙ্গি দ্বারা, যা তার নায়কদের জীবনকে বন্দি করে ফেলে জনতার মধ্যে সঙ্কীর্ণ, স্পন্দিত কয়েকটি ঘণ্টার জন্য মাত্র। যদি শেকসপিয়ার--তার উপমা প্রয়োগ করেই বলি--বালুঘড়ির ঘূর্ণনে বহু বৎসরের ফসলকে বিনিয়োগ করতে পারেন, জয়েস সেই প্রক্রিয়াকে উল্টো করে দেন এবং তাঁর নায়কের একটি দিনকে অনেক ক’টি দিনে মেলে ধরেন পাঠকের সামনে। (আমি এখানে দিবানিদ্রার কথা বলিনি।)
ইউলিসিসের পৃষ্ঠাসমূহে এক পরিপূর্ণ বাস্তবতা জ্বলজ্বল করে, সেই মধ্যবিত্ত বাস্তবতা নয় যারা পৃথিবীতে তাদের মনের বিমূর্ততায় তাকে পর্যবেক্ষণ করে, এবং সেটি করে মৃত্যুকে অতিক্রম করতে না পারার উচ্চাকাঙ্ক্ষাজনিত ভীতির মধ্যে, এমনকি সেই অপর বাস্তবতাও নয়, যা আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহের মধ্যে প্রবেশ করে, আমাদের শরীর ও সড়ক, চাঁদ ও কুয়োকে পরস্পরের বিপরীতে রেখে। অস্তিত্বের দ্বৈততা এই গ্রন্থে বিরাজমান, আস্তিত্বিক উদ্বেগ যা নিছক অস্তিত্ব দ্বারাই স্পৃষ্ট হয় না, বিশেষ করে এমন এক পৃথিবীতে অস্তিত্বমান হওয়ার দ্বারাও, যেখানে প্রবেশপথ ও শব্দেরা রয়েছে, রয়েছে তাস খেলা ও রাতের উজ্জ্বলতার মধ্যে বৈদ্যুতিক লেখালেখি। অন্য কোনো বইয়ে আমি (একমাত্র সম্ভবত গোমেস দে লা সেরনা ছাড়া) বস্তুর উপস্থিতির এমন বিশ্বাসযোগ্য দৃঢ়তা দেখি না। সব জিনিসই সুপ্ত, যে কোনো স্বরের গঠনই তাদেরকে জাগাতে সক্ষম এবং পাঠকককে সেইসব সড়ক ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ডি কুইন্সি বলেন, উড়ন্ত ব্যানারের উজ্জ্বল দৃশ্য ও সামরিক জৌলুসের অবতারণার জন্য তাঁর স্বপ্নের সেই রোমান কন্সালের নাম করাটুকুই যথেষ্ট। তাঁর গ্রন্থের পনেরোতম অধ্যায়ে জয়েস একটি বেশ্যালয়ের ঘোরলাগা দৃশ্যের বর্ণনা করেন, যেখানে রয়েছে শত শত অদ্ভুত সব চরিত্র ও ঘটনাবলি থেকে উদ্ভূত শিথিল বাক্য কিংবা ভাবনার সম্ভাবনা--- এই সংখ্যাটি অতিরঞ্জন নয়, বরং নির্ভুল।
জয়েস আধুনিক জীবনের একটি দিনের বর্ণনা দেন, এবং তার সময়প্রবাহে সংগ্রহ করেন বিচিত্র সব অধ্যায়, যা চেতনার দিক থেকে আমাদেরকে ওডিসির কথা মনে করিয়ে দেয়।
তিনি শব্দ ও শৈলীর একজন কোটিপতি অধিপতি। ইংরেজি বাক্যকে গঠন-করা স্বরের বহুবিধ তহবিলের মালিকানা বাদেও, তাঁর বাণিজ্য ছড়িয়ে যায় যেখানে আইরিশ লবঙ্গের চাষ হয়, কাস্তিলিয়ান ডাবরুন ও জুডাসের শেকেলস থেকে রোমান ডেনারি ও অন্যবিধ শব্দবন্ধের পৃথিবীতে। তাঁর বহুপ্রজ কলম সবরকম আলঙ্কারিক বাগধারারই চর্চা করে। প্রতিটি অধ্যায় অপর এক কাব্যিক কৌশলের উদযাপনে উল্লসিত হয়, জন্ম দেয় আরেক ব্যক্তিগত ভাষাভঙ্গির। একটি যদি লেখা হয় যুক্তিশাস্ত্রের ভাষায়, তাহলে অন্যটি প্রশ্নোত্তরের আঙ্গিকে, আবার অপরটি আখ্যানের পরম্পরায়। দুটোর মধ্যে একধরনের নীরব স্বগতোক্তি বিদ্যমান, তদবধি অপ্রকাশিত যে আঙ্গিক- (ফরাসি ভদ্রলোক এদুয়ার দুজারদাঁর কাছ থেকে নেওয়া, যেমনটা জয়েস বলেছেন লার্বোকে), যার ভেতর দিয়ে আমরা তাঁর চরিত্রদের বিশদে চিন্তা করতে শুনি। তাঁর এই অসমঞ্জস রসবোধ এবং গদ্য-পদ্যের মিশ্রণ ও বেশ্যালয়ের খিস্তিখেউড়ের মধ্য দিয়ে মিশরীয়রা মুসার সঙ্গে যে সংলাপ করে তার মতো এক লাতিন দৃঢ়তার আমদানি করেন তিনি। জয়েস একটি জাহাজের অগ্রভাগের মতো সাহসী এবং একটি নাবিকের কম্পাসের মতো বৈশ্বিক। আজ থেকে দশ বছর পরে আমার চেয়ে অনেক বেশি নিবেদিত ও সহিষ্ণু সমালোচকের দ্বারা তিনি ব্যাখ্যাত হবেন--আমরা তখনও তাকে উপভোগ করব। আর এর মধ্যে, আমার যেহেতু বইটিকে নেউকয়েনে নিয়ে যাওয়ার ও নিরিবিলিতে অধ্যয়নের ইচ্ছে নেই, আমি বরং লোপে দে বেগার গংগোরা বিষয়ক সশ্রদ্ধ কথাটিকেই আমার করে নিই: এটা যা-ই হোক, আমি সবসময়ই এই ভদ্রলোকের স্বর্গীয় প্রতিভাকে শ্রদ্ধা ও পূজা করব, তার যেটুকু বুঝি তাকে বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং যা আমি বুঝতে অক্ষম, তাকে সশ্রদ্ধ প্রশংসার মাধ্যমে।