Published : 05 Jun 2025, 11:45 PM
বড় ভাই বেশ ধনী, কথা তার একটাই—অন্যায় পথে চলা ভালো; জীবনের মোক্ষ কেবল ও পথেই মিলতে পারে। কিন্তু গরীব ছোট ভাই ভারী একরোখা, যত কষ্টই হোক, ন্যায়ের পথেই থাকবে সে। অনেক আগে ইউক্রেনের এরকম এক লোকগল্প আমাদের জন্যে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন সাহিত্যিক, অনুবাদক ননী ভৌমিক। তা লোককথা তো লোককথাই, কত গোঁজামিলই না থাকে তাতে; কিন্তু তার পরও একটা শেষ লক্ষ্য থাকে, শ্রোতাকে হিতোপদেশ দেবে। ইউক্রেনের ওই লোককথার উপসংহারেও একটা হিতোপদেশ ছিল—যত প্রতিবন্ধকতাই আসুক না কেন, শেষমেষ ন্যায়েরই জয় ঘটে। তা সেই উপসংহার মেনে দেখতে গেলে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যে যুদ্ধ লেগে আছে গত তিন বছর ধরে, তাতেও নিশ্চয়ই শেষমেষ ন্যায়েরই জয় ঘটবে। আবার এমন উপসংহারের আকাঙ্ক্ষায় বড়সড় ফাঁকিও থাকতে পারে; কারণ এ কথাও কম-বেশি জানা আছে আমাদের, সত্য হলো যুদ্ধের প্রথম শহীদ, সত্য হলো যুদ্ধের প্রথম বলী। রাশিয়া আর ইউক্রেনের যুদ্ধেও সত্যের মৃত্যু ঘটেছে, মিথ্যার বিস্তারে সত্য ঢেকে গেছে; ন্যায় প্রতিষ্ঠার যুদ্ধের রক্তস্রোতে সত্যকে বর্তমানে খুঁজে পাওয়া কঠিনই বটে।
তবে বদরুল আলম খান চেষ্টা করেছেন রক্তস্রোতে হারিয়ে যাওয়া সেই সত্যকে খুঁজে বের করতে, আমাদের সামনে তা তুলে ধরতে। আর এই প্রয়াসেরই ফসল হলো রাশিয়া আর ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে গত বছরের শেষের দিকে প্রকাশিত তাঁর লেখা বিশ্লেষণাত্মক গ্রন্থ ‘রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ : সত্য-মিথ্যার লড়াই।’ দুই দেশের এই রক্তক্ষয়ী, জীবননাশী যুদ্ধ ও সংঘাত নিয়ে বাংলাদেশে এটিই বোধ করি প্রথম প্রকাশিত বই। লেখাই বাহুল্য, কি জাতীয়, কি আন্তর্জাতিক—ঘটমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কিংবা রাষ্ট্রনৈতিক ঘটনায় সমাজ ও ইতিহাসভিত্তিক বিশ্লেষণাত্মক বিস্তৃত নন-ফিকশন লেখার প্রবণতা বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। সেদিক থেকে বলতে গেলে এ বইয়ের প্রকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও। আলোচিত প্রসঙ্গটি আন্তর্জাতিক, কিন্তু বদরুল আলম খান মনে করছেন, এই যুদ্ধটি কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বিষয় নয়, ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের বিষয় নয়; আরও একটি দিক এই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত, তা হলো যুদ্ধকেই রাষ্ট্রনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে রাষ্ট্রের একটি বিশেষ শ্রেণীর বিশেষ আগ্রহ—যারা কি না সমরশিল্পের সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিশেষ কারণ দেশটির সমরশিল্পের স্বার্থ রক্ষা করা। তিনি এ কারণটিকে বিশ্বাসযোগ্যও মনে করেন। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের সমরশিল্পের সঙ্গে দেশটির রাষ্ট্রপতি, প্রশাসনিক অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পেন্টাগনের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদেরও যোগ রয়েছে। বদরুল আলম খান জানাচ্ছেন, সমরাস্ত্র উৎপাদনের বিশাল এই শিল্পক্ষেত্রে যারা যুক্ত আছেন, তারা বরাবরই চান যুদ্ধকে রাষ্ট্রনীতি করে তুলতে, রাষ্ট্রনীতি হিসেবে কার্যকর করতে। তাঁর দেয়া তথ্যমতে, পেন্টাগন প্রশাসনের ৩০ শতাংশ কর্মচারীই সমরাস্ত্র নির্মাণশিল্পের অনুদান পেয়ে থাকেন। বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের দুটি দিক বা কারণ রয়েছে—একটি ভূকৌশলগত কারণ, আরেকটি এই সমরশিল্পের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণ।
‘আমেরিকার শত্রু হওয়া বিপজ্জনক, কিন্তু বন্ধু হওয়া মৃত্যুর সমান।’—বইটিতে ভূমিকার আগেই এক পৃষ্ঠায় আমাদের চোখ আটকে যায় লেখক কর্তৃক উদ্ধৃত আমেরিকার বহুল আলোচিত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের বিখ্যাত এই উক্তিটিতে। বাস্তবতও দেখা যায়, রাশিয়া এবং ইউক্রেন দুই রাষ্ট্রের জন্যেই এই উক্তি পুরোপুরি লাগসই। রাশিয়া অনেক আগে থেকেই শত্রু আমেরিকার। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছত্রখান হয়ে পড়ার দিনগুলোতে এ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যে নৈকট্য দেখা দিয়েছিল, তা দৃশ্যত যত গভীরই মনে হোক না কেন, কার্যত ফাটলেই ভরা ছিল। ইউক্রেন, ক্রিমিয়া, জর্জিয়া ইস্যুকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে রাশিয়া আবারও আমেরিকার পূর্ণমাত্রার শত্রু হয়ে উঠেছে এবং এই শত্রুতা যত বিপজ্জনকই হোক না কেন, রাশিয়ার হাতে এর কোনও বিকল্প নেই। গত ২০ মে দীর্ঘ দুই ঘন্টার ফোনালাপের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ দুটি দেশ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করবে এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করার লক্ষ্যে আলোচনাও শুরু করবে। কিন্তু ৩০ দিনের নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির যে দাবি কিংবা প্রস্তাব মার্কিন ও ইউরোপিয় ইউনিয়ন জানিয়ে আসছে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে এখনও সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছুই বলা হয়নি। আবার ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর এবং তার সঙ্গে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যেকার আলোচনা থেকে পরিষ্কার, যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু হওয়া কার্যত ইউক্রেনের জন্যে মৃত্যু সমান। বিরল খনিজ দেয়ার মার্কিনি প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে জেলেনেস্কি আপাতত রক্ষা পেয়েছেন বটে—কিন্তু ইউক্রেনের ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত স্টারলিংক বিগড়ে যাওয়া বা না যাওয়ার ওপরেই এখন নির্ভর করছে দেশটির প্রতিদিনকার চলাফেরা।
দুই.
বদরুল আলম খানের বইটির প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘বিভক্ত ইউক্রেন’। যেটিতে তিনি প্রসঙ্গত ইউক্রেনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও তুলে ধরেছেন। পশ্চিমা ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, স্লাভিক দেশ হিসেবে ইউক্রেন একাদশ শতাব্দী থেকে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিবৈশিষ্ট্য নিয়ে বিকশিত হতে থাকে। তবে ১২৪০ সালে তাতারদের আক্রমণের ফলে এই জনপদ বিভক্ত হয়ে পড়ে, তার পর জারের শাসনামল এই বিভক্তিকে আরও গভীর করে তোলে। এমন প্রেক্ষাপটে এর ইউরোপ মহাদেশভুক্ত পশ্চিম অংশটি আদর্শিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ইউরোপীয় হয়ে ওঠে, অন্যদিকে পূর্বাংশে বিকাশ ঘটে রুশ সংস্কৃতির। এ কারণে এর আত্মপরিচয়ে দেখা দেয় দ্বিধাবিভক্তি। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর এর ১৫টি প্রজাতন্ত্র স্বাধীন হয়ে নতুন রাষ্ট্র গঠন করে। কিন্তু আত্মপরিচয়গত ওই সংকটের কারণে ইউক্রেনের দুই অংশ সেভাবে ঐক্যবদ্ধ ও বিকশিত হতে পারেনি—যেমনটি দেখা গেছে বার্লিনের প্রাচীর ভেঙে পড়ার পর জার্মানির পূর্ব ও পশ্চিমাংশের ক্ষেত্রে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর ইউক্রেনের আত্মপরিচয়ের সংকট বরং আরও বেড়েছে। দেশটির ফ্যাসিবাদি ও নাৎসীপন্থী ধারার রাজনীতিকরা সেখানকার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের স্রোতধারাগুলোকে সম্মিলিত ও সামগ্রিক মিথস্ক্রিয়ার ধারা করে তোলার বদলে ইউরোপমুখী আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বদরুল আলম খান পাঠকদের সামনে একটি প্রশ্নও ছুঁড়ে দিয়েছেন, ইউক্রেন কি আসলেই একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়ার দাবি রাখে? এই প্রশ্নকে অনেকের কাছে আপত্তিজনক মনে হতে পারে। কিন্তু এ-ও সত্য যে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যেকার সংকটের ক্ষেত্রে কার অবস্থান কেমন হবে, তার উত্তর নির্ভর করছে এই প্রশ্নের মীমাংসার ওপর। ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মনরো ডকট্রিন অনুযায়ী নিজের চারপাশে প্রভাববলয় সৃষ্টির কাজে সক্রিয় আমেরিকা এই প্রশ্নের যে উত্তর দেবে, তা নিঃসন্দেহে রাশিয়ার মতো হবে না। কেননা মনরো ডকট্রিনের উদ্দেশ্যই হলো, একদিকে দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনের পুরানো উপনিবেশগুলোতে ইউরোপীয় শক্তির আগমণ ও প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা এবং/এবং প্রভাব বিস্তারের উদ্যোগ প্রতিহত করা। অন্যদিকে আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্প্রসারণের মুখে শক্ত প্রতিরোধ তৈরি করা। এককথায় বলতে গেলে, সমস্যাটি নতুন নয়।
তবে ইউক্রেন প্রশ্নে রাশিয়ার অবস্থান আর বদরুল আলম খানের দৃষ্টিভঙ্গি শেষ পর্যন্ত মোটামুটি অভিন্ন—অন্তত তিনি যেভাবে ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় আলাদা সত্তার বিষয়টিকে প্রশ্নবোধক করে তোলেন এবং বিষয়টিকে ওই প্রশ্নের নিরিখেই বোঝার চেষ্টা করেন, তা থেকে তাই মনে হয়। বেশির ভাগ রুশ বিশ্লেষক মনে করেন, অন্তত দুটি কারণে ইউক্রেনকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দেখা সম্ভব নয়। যার একটি হলো দেশটির ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশধারা। তারা মনে করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের উৎস অভিন্ন, জন্মসূত্র এক, তাদের জনগণ বছরের পর বছর শাসিত হয়েছে একই শাসকের পতাকার নিচে। অভিন্ন শাসনক্রম তাদের একই বলয়ভুক্ত করে তুলেছে। ইউক্রেনের স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ওঠার দ্বিতীয় অন্তরায়টি হলো, ইউক্রেনের বিভক্ত আত্মপরিচয়—যাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া এই সুযোগটাকে এখন আবার আন্তর্জাতিক দুই পরাশক্তি—রাশিয়া ও আমেরিকা—ব্যবহার করে আসছে। বদরুল আলম খান বলছেন, আত্মপরিচয়ের এই সংকটের কিংবা বিভক্ত আত্মপরিচয়ের কারণ কেবল ভৌগলিক নয়। কেননা বর্তমান যুগে সীমান্ত এখন আর কেবল সীমান্তে থাকে না, সীমান্তরেখার নানা পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সেটি নাগরিকদের বা অধিবাসীদের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও রুচিতে নানা বিভক্তিরেখার জন্ম দিয়ে থাকে। ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। বিশ্বের বেশ কিছু দেশেই এমন বিভক্তিরেখা রয়েছে, রয়েছে আত্মপরিচয়ের সংকট। কিন্তু তার পরও সেসব রাষ্ট্র পরাশক্তিসমূহের দ্বন্দ্বক্ষেত্র না হওয়ার ফলে ব্যর্থ হয়নি। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটতে চলেছে, কেননা এখানকার সংকটকে ঘিরে ক্রিয়াশীল রয়েছে রাশিয়া ও আমেরিকা।
এক ইউক্রেনের মধ্যেই পরস্পরবিরোধী দুই ইউক্রেনের এই অস্তিত্বের ধারণা সর্বপ্রথম তুলে ধরেন সেখানকারই লেখক ও প্রকাশক মিকোলা রিয়াবচুক। তাঁর মতে, ঐতিহাসিকভাবে দুই পর্বে এই বিভক্তি সম্পন্ন হয়। প্রথম পর্বের বিভক্তি দেখা দেয় ভাইকিংদের গড়ে তোলা রাষ্ট্র কিয়েভান রুশ তাতার-মঙ্গোলদের আক্রমণে বিধ্বস্ত হওয়ার পর। এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে কিয়েভান রুশ শক্তিশালী নগররাষ্ট্র মস্কোর নিয়ন্ত্রণে আসে। দ্বিতীয় পর্বের বিভক্তি ঘটে সোভিয়েত আমলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে এই বিভক্তির সুস্পষ্ট মেরুকরণ ঘটে। ‘যুদ্ধের পটভূমি’, ‘স্বাধীন ইউক্রেন’ এবং ‘দুই জাতীয়তাবাদের সংঘাত’—বইয়ের এই তিনটি অধ্যায়ে এই মেরুকরণ ও তার ফলাফল সম্পর্কে যে কোনও পাঠকই সুস্পষ্ট ধারণা পেতে পারেন।
তিন.
বদরুল আলম খানের এই গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো ফ্যাসিবাদী ক্যু ও মার্কিন ষড়যন্ত্র অধ্যায়টি। লেখার অপেক্ষা রাখে না, এই অধ্যায়টি বাংলাদেশসহ বিশ্বের একাধিক দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন একনায়কতান্ত্রিক অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী দেশগুলোয় নাভিশ্বাস উঠে পড়া অনন্যোপায় জনগণকে রাস্তায় নেমে আসতে দেখা গেছে। জনগণের এই ক্ষোভ এবং গণতান্ত্রিক ও দুর্নীতি-সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা কোনও কোনও দেশে শেষ পর্যন্ত অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, সরকার পরিবর্তিত হয়েছে। অথচ কয়েক মাস যেতে না যেতেই দেখা গেছে, সাধারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষা আর পূরণ হয়নি বা হওয়ার কোনও সম্ভাবনাও নেই, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং নতুন এক শোষক-শাসক গোষ্ঠী ঘাড়ের ওপর চেপে বসেছে আরও পোক্তভাবে, দুর্নীতি-সন্ত্রাস বন্ধ হয়নি বরং দুর্নীতি-সন্ত্রাসের নয়া বন্দোবস্ত হয়েছে; অন্য কথায় বলতে গেলে, জনগণের ইনোসেন্ট আবেগ ও প্রতিবাদী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন এক অগণতান্ত্রিক, দুর্নীতিপরায়ণ ও পশ্চাৎপদ চিন্তাসম্পন্ন শক্তিই তাদের কাঁধে চেপে বসেছে। অবশ্য, এই ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভ্যুত্থানের ইতিহাস একেবারে নতুন নয়। নিকট অতীতে চিলিতেও দেখা গেছে এ ধরণের অভ্যুত্থান সংগঠিত হতে—যেখানে সালভাদর আলেন্দেকে উচ্ছেদ করা হয়, তাকে হত্যা করা হয়। এই হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্যে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এগিয়েছিল এবং নিজেকে গোপন রেখেছিল, তার শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণণা পাওয়া যায় গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ-এর ‘আলেন্দের মৃত্যুতে’ বা ‘দ্য ডেথ অব আলেন্দে’ শিরোনামের লেখাটিতে।
বদরুল আলম খান জানাচ্ছেন, ২০১১ সালে লিবিয়ার রাষ্ট্রপতি গাদ্দাফিকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে যে পদ্ধতিতে উৎখ্যাত করা হয়, অনেকটা সেইরকম ভাবেই ২০১৪ সালে ইউক্রেনের রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আনা হয়। প্রতিষ্ঠিত করা হয় এমন একটি সরকার, যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুকুলে থাকবে। ন্যাটোর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এই জোটের কার্যকারিতা পশ্চিম ইউরোপেই সীমিত থাকার কথা। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় কার্যত এটি সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর রাষ্ট্রপতি মিখাইল গর্বাচেভ জার্মানির সংযুক্তিকরণ-সংক্রান্ত সোভিয়েত-মার্কিন আলোচনার সময় আমেরিকার পররাষ্ট্রবিষয়ক সেক্রেটারি জেমস বেকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন ন্যাটোতে রাশিয়াকে যুক্ত করার। জেমস বেকার তাঁর সেই প্রস্তাবকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘দিবাস্বপ্ন’ হিসেবে। ১৯৯১ সালে রুশ রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলেৎসিনও একই প্রস্তাব দেন এবং যুক্তরাষ্ট্র তা আবারও প্রত্যাখ্যান করে। একই সময় থেকে ইউক্রেনও ইউরোপের দিকে ঝুঁকতে থাকে। ১৯৯৭ সালের ৯ জুলাই ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি লিওনিদ কুজমা মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিয়ে জোটটিকে সহযোগিতা করার ঘোষণা দেন। গঠিত হয় আন্তসম্পর্কীয় ফোরাম ন্যাটো-ইউক্রেন কমিশন। একই বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সংখ্যা ফরেন অ্যাফেয়ার্স পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আ জিওস্ট্র্যাটেজি ফর ইউরোএশিয়া’ শিরোনামের নিবন্ধে কূটনীতিক-বিশ্লেষক জিগ্নিউ ব্রেজেনস্কি (Zbigniew Brzezinski) উল্লেখ করেন, ২০০৫ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হয়ে উঠবে। ১৯৯৯ সালে ন্যাটো তার উসকানিমূলক সম্প্রসারণ নীতি বাস্তবায়ন শুরু করার পর ক্রমশই স্পষ্ট হতে থাকে, এর উদ্দেশ্য কেবল আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ করাই নয়, পাশাপাশি রাশিয়াকে ঘিরে ফেলে ন্যাটোর সামরিক শক্তির অধীনস্থ করা এবং মধ্য এশিয়া ও ককেশীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যুক্ত করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সিভিল সোসাইটি সম্প্রসারণের কাজে হাত দেয়। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের আরও অনেক দেশের মতো ইউক্রেনের সিভিল সোসাইটিকেও দেখা যায় রাজনৈতিক দায়-দায়িত্ব মুক্ত রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতে, রাষ্ট্র পরিচালনামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী হতে চাইতে, বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিভিল সোসাইটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা এত বিস্তৃত ছিল যে ২০০৯ সালের মধ্যে ইউক্রেনের বিশেষত পশ্চিমাঞ্চলে তিন হাজারের বেশি এনজিও গড়ে ওঠে। ‘ইউক্রেন রাশিয়া নয়—ইউরোপ’—এই উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান নিয়ে সংঘবদ্ধ হতে থাকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণ। আর এই সংঘবদ্ধতার পালে হাওয়া দিতে থাকে দেশটির রাষ্ট্রপতির একনায়কতান্ত্রিক শাসন, রাজনীতিকদের দুর্নীতি, নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যাপক অনিয়ম, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে ব্যর্থতা ও রাশিয়ার ওপর অতিনির্ভরতা। ইউক্রেনে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের দাপট বাড়তে থাকে, তেমনি রাশিয়াতেও পুতিনের নেতৃত্বে দেখা দেয় অতি-জাতীয়তাবাদের জোয়ার। এরই মধ্যে ২০০৮ সালের ৩ এপ্রিল রুমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে ন্যাটোর ২২ তম শীর্ষ সম্মেলনে ক্রোয়েশিয়া, জর্জিয়া ও ইউক্রেনকে সদস্য করার বিষয়ে আলোচনা হলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় জার্মান ও ফ্রান্স এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে এবং আপাতত এ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত না নেয়ার পক্ষে মত দেয়। ২০১০ সালে ইউক্রেনের নির্বাচনে রুশপন্থী রাজনীতিক ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ খুব স্বল্প ভোটের ব্যবধানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু তিনিও দেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হন, উপরন্তু দেশকে দুই পরাশক্তির টানাপড়েনের মধ্যে ঠেলে দেন। তার সময়েই ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অভ্যুত্থান ঘটে এবং ইয়ানুকোভিচ বাধ্য হন ক্ষমতা থেকে সরে যেতে।
এই অভ্যুত্থানের সূত্রপাত ঘটে রাষ্ট্রপতি ইয়ানুকোভিচের একটি ঘোষণা থেকে হঠাৎ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে না—রাষ্ট্রপতির এই ঘোষণার পরপর কিয়েভে জনগণের একটি অংশ বিক্ষোভ শুরু করে। উল্লেখ্য, ভূতপূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে পুতিন একটি জোট করার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, ইয়ানুকোভিচ তা থেকেও দূরে ছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত রিপাবলিকগুলোকে নিয়ে কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেনডেন্ট স্টেটস গড়ে তোলার রুশ উদ্যোগেও ইউক্রেন সাড়া দেয়নি। ২০১৩ সালের ২৯ নভেম্বর ইউক্রেনের পুলিশ ও বিক্ষোভকারীরা প্রথম সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় তারা স্লোগান দিতে থাকে, ‘ইউক্রেন ইউরোপ’, ‘ভালুক ইয়ানুকোভিচকে ক্রিসমাস গাছে বেঁধে রাখো’ ইত্যাদি। লেখাই বাহুল্য, শুধুমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে এত বড় বিক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়—হয়ওনি। আসলে ইউক্রেনের জনগণ স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসন ও লাগামহীন দুর্নীতির কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল; বিক্ষোভের সময় সেই ক্ষুব্ধ জনতাও বিক্ষোভকারীদের আহ্বানে মাঠে নেমে পড়ে। এ বিক্ষোভে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় উগ্র জাতীয়তাবাদী ভিটালি ক্লিচকোর নেতৃত্বাধীন উডার পার্টি এবং জুলিয়া তিমোশেঙ্কো ও আরসেনি ইয়াতসেনুকের নেতৃত্বাধীন বাতকিভচিনা বা ফাদারল্যান্ড পার্টি। বিক্ষোভকে সশস্ত্র রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে আলেগ তিয়ানিবকের নেতৃত্বাধীন নব্য নাজিবাদী দল সভাবোদা পার্টি। এ ছাড়াও বিক্ষোভে অংশ নেয় ইউক্রেনীয় ফ্রিডম পার্টির নেতা ইউসচেঙ্কো, চরম ডানপন্থী দল ইউক্রেনিয়ান কনজারভেটিভ রিপাবলিকান পার্টির নেতা স্টিভেন খোমারা। ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি ইউক্রেনের পার্লামেন্ট বিক্ষোভবিরোধী নয়টি আইন পাশ করলে বিক্ষোভ আবারও দানা বেঁধে ওঠে।
‘রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ’ থেকে জানতে পারি, ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এই বিক্ষোভকারীরা ১৯৩০ সালে হিটলারের পার্টির ফ্যাসিবাদী স্লোগানগুলো পুনরুজ্জীবিত করে, আকাশে উড়িয়ে দেয় আমেরিকান কনফেডারেশন ফ্ল্যাগ—যেটি আসলে আমেরিকার গৃহযুদ্ধে দক্ষিণের দাসপ্রথার সমর্থক বাহিনীর পতাকা, বর্ণবাদী ঐতিহ্যের প্রতীক। এই বিক্ষোভ দমনে সরকার যে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তাতে প্রায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু ঘটে। এর পরই ফ্যাসিবাদী গ্রুপগুলো ইয়ানুকোভিচের পদত্যাগ দাবি করে সর্বাত্মক বিক্ষোভে নেমে পড়ে। এ সময় বিক্ষোভ পরিচালনাকারীরা পুলিশের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। বইটিতে উল্লেখিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, নিহত পুলিশ অফিসার ও নিহত বিক্ষোভকারীদের কয়েকজনের শরীরে একই মাপের ও একই ধরনের বুলেট পাওয়া গিয়েছিল—যার ভিত্তিতে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ফ্যাসিবাদী গ্রুপগুলো বিক্ষোভকে উস্কে দিতে বিক্ষোভ সমর্থকদের ওপর গুলি চালিয়েছিল। কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইভান কাটচানোভস্কি দীর্ঘ গবেষণার ভিত্তিতে অভিমত দিয়েছেন যে, সরকারি রায়ট পুলিশের গুলিতে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু ঘটেনি। বিস্ময়কর ঘটনা হলো, কানাডার মন্ট্রিল শহরে ‘কাউন্সিল ফর সেন্ট্রাল অ্যান্ড ইস্ট ইউরোপিয়ান স্টাডিজ’ আয়োজিত এক কনফারেন্সে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও পশ্চিমা মিডিয়ায় এর সংবাদ প্রকাশ করা হয়নি। বদরুল আলম খানের এ গ্রন্থে বিষয়টির বিস্তৃত পাঠ থেকে বোঝা যায়, প্রত্যাশার মুলো ঝুলিয়ে জনগণের ক্ষোভকে কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক ও ধনীক শ্রেণী তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার উৎখাতের কাজে ব্যবহার করে থাকে।
চার.
তবে গ্রন্থটিতে একটি প্রসঙ্গ একেবারেই আলোচিত হয়নি—যদিও তা আলোচনার দাবি রাখে। সেটি হলো, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে স্পেসএক্স পরিচালিত স্টারলিংক স্যাটেলাইট পরিষেবার ভূমিকা এবং বিশ্বরাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব। উল্লেখ্য, স্টারলিংক সাধারণ যোগাযোগ অবকাঠামো কাজ করে না এমন সব এলাকায়ও ইন্টারনেট সরবরাহ করতে পারে। তবে অনেকেরই জানা নেই, স্টারলিংকের মাধ্যমে পাঠানো ডেটা যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন—যার ফলে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২২ সালে ইউক্রেনের যোগাযোগ অবকাঠামো ধ্বসে পড়ে। এ সময় ধনকুবের ইলন মাস্ক সেখানে স্টারলিংকের হাজারো টার্মিনাল স্থাপন করে যোগাযোগ অবকাঠামো পুনঃস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে ইউক্রেনের স্টারলিংক পরিষেবা নির্ভরতা দেশটির জন্যে নতুন বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চলেছে। উদাহরণত বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এই স্টারলিংক পরিষেবা বন্ধের হুমকি দেয়ার মধ্যে দিয়ে কিয়েভকে বিরল খনিজসেবা দিতে বাধ্য করেছেন। এ ঘটনার আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে ইউক্রেন অভিযোগ করে, যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনারা স্টারলিংকের টার্মিনাল ব্যবহার করছে। রাশিয়া এবং স্টারলিংক উভয়েই অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কিন্তু এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে নতুন যে আভাস মিলছে, তা হলো, প্রতিদ্বন্দ্বী দুই রাষ্ট্রের যুদ্ধের ক্ষেত্রে স্টারলিংক নিজেই একটি পরাশক্তির মতো আবির্ভূত হতে চলেছে। শুধু তাই নয়, যেসব দেশে স্টারলিংক পরিষেবা চালু রয়েছে বা চালু হতে চলেছে, সেসব দেশেও এটি আন্তর্জাতিক চাপশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম এবং তথ্যের অপব্যবহার করতে সক্ষম। অতি সম্প্রতি ইলন মাস্ক বলেই দিয়েছেন, স্টারলিংক বন্ধ করে দেয়া হলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বসে পড়বে, সামরিক যোগাযোগও হুমকিতে পড়বে। তিনি দাবি করেছেন, ‘স্টারলিংক হলো ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর মেরুদণ্ড।’
বদরুল আলম খান হয়তো পারতেন আরও একটি অধ্যায় যুক্ত করে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক ক্ষেত্রে কর্পোরেশন পরিচালিত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের চালচিত্র তুলে ধরতে; পারতেন কর্পোরেট তথ্যপ্রযুক্তির রাজনৈতিক ব্যবহারের দিক সম্পর্কে জানাতে। কিন্তু তিনি সেদিকে এগোননি। এমন অসম্পূর্ণতা কিংবা সীমাবদ্ধতা হয়তো এ গ্রন্থে আরও রয়েছে—রয়েছে সম্পাদনাগত দুর্বলতাও; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, এমন একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী তাৎপর্যপূর্ণ সাম্প্রতিক বিষয়ে বাংলা ভাষায় একটি বিশদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সত্য-মিথ্যার গতিপথ খুঁজতে, সাম্প্রতিক ও ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বইটি ভূমিকা রাখবে।
রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ : সত্য-মিথ্যার লড়াই
বদরুল আলম খান
প্রকাশক : বাতিঘর, ঢাকা। প্রকাশকাল : অগ্রহায়ণ ১৪৩১, নভেম্বর ২০২৪
প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা। মূল্য : ৪৫০ টাকা।