Published : 09 Oct 2025, 08:40 PM
হাঙ্গেরির বিখ্যাত, বিশ্বনন্দিত কথাসাহিত্যিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই (জন্ম: ৫ জানুয়ারি ১৯৫৪) এবছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় আলেক্স মার্শাল ৯ অক্টোবর তাঁকে নিয়ে যে নিবন্ধটি লিখেছেন, তারই তর্জমা এখানে উপস্থাপিত হলো। লেখাটি তর্জমা করেছেন প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক আলম খোরশেদ। বি.স.
হাঙ্গেরীয় এই লেখকের কাজকে "শিল্পের শক্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠা" বলে উল্লেখ করেছে পুরস্কার কমিটি।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই, হাঙ্গেরির একজন ঔপন্যাসিক, যাঁর লেখায় দীর্ঘ দীর্ঘ বাক্য ও অপ্রাকৃত বিষয়বস্তু থাকে, বৃহস্পতিবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন।
পুরস্কার প্রদানকারী সুইডিশ একাডেমি এক সংবাদ সম্মেলনে জানায় যে ক্রাসনাহোরকাই এই সম্মাননা পেয়েছেন "তাঁর আবেগপূর্ণ ও দূরদর্শী সাহিত্যকর্মের জন্য, যা মহাপ্রলয়ের সন্ত্রাসের মাঝেও শিল্পের শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।"
সাহিত্যের নোবেল পুরস্কারকে এই বিষয়ের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সম্মান হিসেবে ধরা হয়, যা সাধারণত কোনো লেখকের দীর্ঘ সাধনার চূড়ান্ত স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। অতীতের বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন সল বেলো, টনি মরিসন, নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টার এবং বব ডিলান প্রমুখ।
৭১ বছর বয়সি ক্রাসনাহোরকাই দীর্ঘ বাক্য ও ব্যতিক্রমী বিষয়বস্তুর জন্য পরিচিত। সমালোচক সুসান সন্টাগ একবার তাঁকে বলেছিলেন "অ্যাপোক্যালিপসের মাস্টার"। হাঙ্গেরিয়ান চলচ্চিত্র পরিচালক বেলা তার( Bela Tarr) তাঁর একাধিক উপন্যাসকে সিনেমায় রূপ দিয়েছেন।
বেলা পরিচালিত "The Melancholy of Resistance" উপন্যাসের চিত্ররূপ “Werckmeister Harmonies” ২০০০ সালে মুক্তি পায়। যদিও উপন্যাসটি ১৯৮৯ সালে হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল, ইংরেজি অনুবাদ আসে ১৯৯৮ সালে। প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি একটি মাত্র বাক্যে লেখা, যার কাহিনি একটি ছোট হাঙ্গেরিয়ান শহরে এক বিশাল তিমি-সহ একটি সার্কাস আগমনের পরবর্তী ঘটনাবলিকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
ইংরেজিতে তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত কাজ হলো “Herscht 07769”, যা গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি এক গ্রাফিতি পরিষ্কারককে নিয়ে, যে তৎকালীন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেলকে চিঠি লিখে সতর্ক করে যে বিশ্ব ধ্বংসের পথে। ৪০০ পৃষ্ঠার এই বইটিতে মাত্র একটি পূর্ণযতি ব্যবহৃত হয়েছে।
২০১৪ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ ক্রাসনাহোরকাই বলেছিলেন, তিনি “একটি একেবারে মৌলিক” শৈলী গড়ে তুলতে চেয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি আমার সাহিত্যিক পূর্বসূরিদের থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলাম, যেন আমি কাফকা, দস্তয়েভস্কি বা ফকনারের কোনো নতুন সংস্করণ তৈরি না করি।”
নোবেল ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে পুরস্কার কমিটির সদস্য স্টিভ সেম-স্যান্ডবার্গ বলেন, ক্রাসনাহোরকাইয়ের “শক্তিশালী, সঙ্গীতপ্রধান মহাকাব্যিক শৈলী” তাঁকে আলাদা করে তোলে।
তিনি আরও বলেন, “সমাজের ভঙ্গুরতাকে যেভাবে ক্রাসনাহোরকাই নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে দেখেন এবং একই সঙ্গে শিল্পের শক্তিতে তাঁর অটল বিশ্বাস রাখেন, সেটাই একাডেমিকে তাঁকে পুরস্কৃত করতে অনুপ্রাণিত করেছে।”
ক্রাসনাহোরকাই ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির একটি ইহুদি পরিবারে বুদাপেস্ট থেকে প্রায় ১২০ মাইল দূরে গিউলা নামক ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন আইনজীবী এবং মা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মী।
স্কুলের পরে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, অবাধ্যতার জন্য শাস্তি পাওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যান। এরপর তিনি বিভিন্ন ছোটখাটো কাজ করেন — যেমন একটি জ্যাজ ব্যান্ডে পিয়ানো বাজানো — এবং বুদাপেস্টে হাঙ্গেরিয়ান সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন।
তাঁর সাহিত্যিক সফলতা আসে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস “Satantango" দিয়ে, যেখানে একটি দরিদ্র গ্রামের জীবনচিত্র ফুটে ওঠে। এই উপন্যাস হাঙ্গেরিতে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। (পরবর্তীকালে বিশ্বখ্যাত হাঙ্গেরীয় চিত্রপরিচালক বেলা তার উপন্যাসটির চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যার দৈর্ঘ্য সাত ঘণ্টারও বেশি।)
গত কয়েক দশকে ক্রাসনাহোরকাই নিজের দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বহু সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১৫ সালে তিনি ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ লাভ করেন, যা পুরো সাহিত্যজীবনের জন্য প্রদান করা হয়, কোনো নির্দিষ্ট বইয়ের জন্য নয়।
সেই বছরের বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি মারিনা ওয়ার্নার বলেছিলেন, ক্রাসনাহোরকাই হলেন “একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লেখক, যার লেখায় আছে অসাধারণ আবেগ এবং কণ্ঠের বৈচিত্র্য। তিনি আমাদের সময়ের অস্তিত্বের গঠনকে এমনভাবে চিত্রিত করেন যা ভয়ঙ্কর, অদ্ভুত, বেদনাদায়করকম হাস্যকর এবং প্রায়শই মর্মস্পর্শীভাবে সুন্দর।”
সুইডিশ একাডেমি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাহিত্যে নোবেলজয়ীদের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বৃদ্ধির চেষ্টা করেছে, কেননা অতীতের অনেক বিজয়ীই ছিলেন উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের পুরুষ লেখক।
গত বছরের বিজয়ী ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ান লেখিকা হান কাং, যিনি তাঁর উপন্যাস “The Vegetarian”-এর জন্য পরিচিত — যেখানে এক নারী খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে সূর্যালোকে বাঁচার চেষ্টা করে।
সাম্প্রতিক বিজয়ীদের মধ্যে আছেন তানজানিয়ান লেখক, আবদুলরাজাক গুরনাহ, যিনি অভিবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা ও ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার বিশ্লেষণ করেছেন, এবং ফরাসিনী আনি এরনো, যিনি তাঁর আত্মজীবনের বিভিন্ন মুহূর্তকে — সাধারণ হোক বা বেদনাদায়ক — অসাধারণ স্পষ্টতায় তুলে ধরেন।
ক্রাসনাহোরকাই দীর্ঘদিন ধরে জুয়াড়িদের কাছে প্রিয় ছিলেন সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার দৌড়ে। তিনি দ্বিতীয় হাঙ্গেরীয় লেখক যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন; এর আগে ২০০২ সালে এই সম্মান পেয়েছিলেন হলোকস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া ঔপন্যাসিক ইমরে কের্তেস।