সাতটি আলো, সাতটি দিন
সব মিলিয়ে সপ্তাহের সাতটি দিন একাধিক সভ্যতার বিশ্বাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পুরাণের এক অনন্য মিলনস্থল। রোমানরা সূর্যকে বলেছে সোল, আমরা বলি রবি। তারা বলেছে লুনা, আমরা বলি সোম। তারা ভেনাসকে ঘিরে কাহিনি গড়েছে, আমরা শুক্রকে ঘিরে। ভাষা ভিন্ন, দেবতার নাম ভিন্ন, কিন্তু আকাশকে বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের চেষ্টা বিস্ময়করভাবে একই।
সূর্য, চাঁদ আর পাঁচটি গ্রহ। খালি চোখে দেখা এই সাতটি জ্যোতিষ্ক থেকেই জন্ম নিয়েছে আমাদের সাত দিনের সপ্তাহ। প্রাচীন রোমে শুরু হওয়া সেই গল্প পরে পৌঁছেছে নর্স পুরাণে, তারপর ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান ও নবগ্রহ ধারণায়। আজ আমরা যে রবিবার, সোমবার বা শনিবার বলি, প্রতিটি নামের পেছনেই লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, পুরাণ আর মানুষের আকাশের দিকে তাকিয়ে সময়কে বোঝার এক বিস্ময়কর প্রচেষ্টা।
রোমের আকাশে সাতটি আলো
প্রাচীন রোমের এক নক্ষত্রভরা রাত। মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে এক রাখাল মাথা তুলে তাকাল আকাশের দিকে। তার চোখে ভেসে উঠল সাতটি উজ্জ্বল আলো।
সূর্য, চাঁদ আর পাঁচটি গ্রহ। টেলিস্কোপ আবিষ্কারের বহু আগের কথা, তবু এই সাতটি জ্যোতিষ্ক খালি চোখেই দেখা যেত। সে হয়তো জানত না, সেই আকাশের দিকে তাকিয়েই মানুষ সময়কে নতুনভাবে ভাগ করার এক ধারণার জন্ম দিচ্ছে, যা হাজার বছর পরেও পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের জীবনের অংশ হয়ে থাকবে।
রোমানদের বিশ্বাস ছিল, প্রতিটি দিনের ওপর একেকটি গ্রহ-দেবতার বিশেষ প্রভাব রয়েছে। ভালো ফসল, নিরাপদ ভ্রমণ, যুদ্ধে বিজয় কিংবা শান্তিপূর্ণ জীবনের জন্য তারা দেবতাদের আশীর্বাদ কামনা করত। সেই বিশ্বাস থেকেই গড়ে ওঠে সাত দিনের সপ্তাহ।
সপ্তাহ শুরু হতো সূর্যের দিনে ডিয়েস সোলিস। রোমানদের চোখে সূর্যদেব সোল ছিলেন আলো, জীবনীশক্তি ও শক্তির প্রতীক। ঋতু আর দিন-রাতের চক্র নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনিই। পরবর্তীকালে খ্রিস্টান রোমান সাম্রাজ্যে এই দিনটি ‘লর্ডস ডে’ বা ‘প্রভুর দিন’-এর মর্যাদাও পায়।
দ্বিতীয় দিনটি ছিল চাঁদের ডিয়েস লুনায়ে। চন্দ্রদেবী লুনা ছিলেন রাত, রহস্য ও পরিবর্তনের প্রতীক। চাঁদের ক্ষয়-বৃদ্ধিই ছিল রোমানদের সময় মাপার অন্যতম প্রধান উপায়।
তারপর এলেন যুদ্ধের দেবতা মার্স। সাহস, শক্তি ও যুদ্ধক্ষেত্রের রক্ষাকর্তা তিনি। রোমান রাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রতীক হিসেবে তাঁকে দেওয়া হতো অগাধ সম্মান। এমনকি মার্চ মাসের নামও এসেছে তাঁর নাম থেকেই।
মার্কারি ছিলেন দেবতাদের বার্তাবাহক, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও ভ্রমণের দেবতা। দ্রুতগতির প্রতীক হিসেবে তিনি দেবতাদের বার্তা বহন করতেন। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের শুভদিন হিসেবে খ্যাত হলো তাঁর দিন।
দেবরাজ জুপিটার ছিলেন আকাশ ও বজ্র-বিদ্যুতের অধিপতি, সব দেবতার রাজা গ্রিক দেবতা জিউসের রোমান রূপ। ন্যায়বিচার, শাসন ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের প্রতীক ছিলেন তিনি। প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী ভেনাসকে ঘিরে রোমান সংস্কৃতিতে হতো নানা উৎসব ও পূজা-অর্চনা। শুক্রগ্রহকে ধরা হতো তাঁরই জ্যোতিষ্ক হিসেবে। আর সপ্তাহের শেষ দিনটি এলো স্যাটার্নের নামে। কৃষি, ফসল, সমৃদ্ধি ও কালের দেবতা হিসেবে তিনি পূজিত ছিলেন। তাঁর সম্মানে পালিত হতো স্যাটার্নালিয়া রোমানদের সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসবগুলোর একটি। আনন্দ, উপহার বিনিময় ও সামাজিক নিয়ম কিছুটা শিথিল করার মধ্য দিয়ে উৎসবটি উদ্যাপিত হতো।
এভাবেই জন্ম নিল সাত দিনের সপ্তাহ।
উত্তরের দেবতারা এলেন নতুন নামে
রোমান সেনাবাহিনী যেদিকে অভিযান চালিয়েছে, সেদিকেই ছড়িয়ে পড়েছে এই দিনপঞ্জি। কালের প্রবাহে তা পৌঁছে যায় উত্তর ইউরোপের জার্মানিক ও অ্যাংলো-স্যাক্সন জনগোষ্ঠীর কাছে। কিন্তু তারা তো রোমান দেবতাদের চিনত না। তাদের পরিচিত জগৎ ছিল নর্স পুরাণের ওডেন, থর, টিউ ও ফ্রেয়াকে ঘিরে। তাই চরিত্রের মিল খুঁজে রোমান দেবতাদের জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হলো নিজেদের দেবতাদের নাম। যুদ্ধের দেবতা মার্সের জায়গায় এলেন নর্স যুদ্ধদেবতা টিউ। তৈরি হলো Tuesday। বার্তাবাহক মার্কারির পরিবর্তে এলেন দেবরাজ ওডেন। জন্ম নিল Wednesday। বজ্র-বিদ্যুতের দেবতা জুপিটারের স্থানে এলেন হাতুড়িধারী থর। হলো Thursday। আর প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী ভেনাসের জায়গায় এলেন ফ্রিগ বা ফ্রেয়া। গড়ে উঠল Friday। তবে ছয়টি নাম বদলে গেলেও স্যাটার্ন রয়ে গেলেন আগের মতোই। ইতিহাসবিদদের ধারণা, নর্স পুরাণে স্যাটার্নের সমতুল্য কোনো সুস্পষ্ট দেবতা ছিল না। তাই Saturday নামটি আর পরিবর্তিত হয়নি। আজও এটি প্রাচীন রোমান ঐতিহ্যের এক নীরব স্মারক, যেন হাজার বছরের ইতিহাস বহন করে চলেছে।
বাংলা সপ্তাহের জন্মকথা
এ গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায়টি আমাদের উপমহাদেশের। পৃথিবীর আরেক প্রান্তে, সংস্কৃত জ্যোতিষশাস্ত্র ও নবগ্রহ ধারণার ভিত্তিতে একই সাতটি জ্যোতিষ্ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল আরেকটি সপ্তাহ। রোমানরা যেমন আকাশের দিকে তাকিয়ে সময়কে ভাগ করেছিল, ভারতীয় ঋষিরাও তেমনি করেছিলেন। পার্থক্য ছিল শুধু ভাষা ও নামের।
রবি সূর্যের আরেক নাম। বৈদিক যুগে সূর্য ছিলেন অন্যতম প্রধান দেবতা। ঋগ্বেদে তাঁকে অন্ধকার দূর করে বিশ্বকে সচল রাখা দেবতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাই সপ্তাহের প্রথম দিন হলো রবিবার।
সোম চন্দ্রের সমার্থক নাম। মন, আবেগ, কল্পনা ও সৌন্দর্যের প্রতীক চন্দ্রদেবের নামেই হলো সোমবার। রোমানদের লুনার দিন, ইংরেজদের Monday বাংলায় এসে হয়ে গেল সোমবার। মঙ্গল গ্রহের নাম থেকেই মঙ্গলবার। পুরাণে মঙ্গলকে বলা হয় পৃথিবীদেবী ভূমির পুত্র। তিনি শক্তি, সাহস, যুদ্ধ ও উদ্যমের প্রতীক, যা অনেকটাই মিলে যায় মার্স বা টিউ এর চরিত্রের সঙ্গে।
বুধবার এসেছে বুধের নাম থেকে। পুরাণে তিনি চন্দ্র ও তারার পুত্র; জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, ভাষা ও বাণিজ্যের প্রতীক। মজার বিষয় হলো, রোমানরা যে দিনটির নাম রেখেছিল মার্কারির নামে, ইউরোপীয়রা রেখেছিল ওডেনের নামে, সেই দিনটিই ভারতীয় উপমহাদেশে পরিচিত হলো বুধবার হিসেবে।
বৃহস্পতিবার এসেছে বৃহস্পতির নাম থেকে। সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতি, আর হিন্দু পুরাণে বৃহস্পতি দেবতাদের গুরু।
ভেনাস বা ফ্রিগের দিনের সমান্তরালে আমাদের শুক্রবার। এখানে শুক্রাচার্য অসুরদের গুরু হলেও, শুক্র গ্রহকে সৌন্দর্য, প্রেম ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। আর শনিবার? শনি সূর্যের পুত্র, কর্মফল ও ন্যায়বিচারের দেবতা। লোকবিশ্বাস ছিল, মানুষ যেমন কর্ম করবে, শনিও তেমন ফল দেবেন। তাঁর নামেই এসেছে শনিবার। সাত দিন আর বারো রাশি, একই আকাশের হিসাব সপ্তাহের সাত দিনের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও গভীর এক আকাশি হিসাব রাশিচক্রের। যে সাতটি জ্যোতিষ্কের নামে সপ্তাহের সাত দিনের নাম, জ্যোতিষশাস্ত্রের মূল সাত গ্রহও তারাই। পাশ্চাত্য জ্যোতিষ হোক বা ভারতীয় নবগ্রহ ধারণা রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনি এই সাত গ্রহই মূল ভিত্তি। রাহু ও কেতু পরে যুক্ত হয়েছে ছায়াগ্রহ হিসেবে।
বারোটি রাশিও ভাগ হয়ে আছে এই সাত গ্রহের অধীনে। সূর্যের ঘর সিংহ, চাঁদের কর্কট, মঙ্গলের মেষ ও বৃশ্চিক, বুধের মিথুন ও কন্যা, বৃহস্পতির ধনু ও মীন, শুক্রের বৃষ ও তুলা, আর শনির মকর ও কুম্ভ। অর্থাৎ সপ্তাহের প্রতিটি দিনের অধিপতি গ্রহই এক বা একাধিক রাশিরও অধিপতি। রবিবার মানেই সূর্য ও সিংহ, সোমবার মানেই চাঁদ ও কর্কট। দিন আর রাশি যেন একই পরিবারের দুই সদস্য; নাম আলাদা, অথচ উৎস এক। আরও মজার বিষয় হলো, সাত দিনের সপ্তাহটিও এক প্রাচীন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবের ফল। প্রাচীন জ্যোতির্বিদরা দৃশ্যমান গ্রহগুলোকে তাদের গতির ক্রমে সাজিয়েছিলেন শনি, বৃহস্পতি, মঙ্গল, সূর্য, শুক্র, বুধ ও চন্দ্র। এই ক্রম ধরে দিনের প্রতিটি ঘণ্টার অধিপতি নির্ধারণ করা হতো। যে গ্রহ দিনের প্রথম ঘণ্টার অধিপতি হতো, সেই গ্রহের নামেই হতো দিনের নাম। সেই হিসাব থেকেই গড়ে ওঠে আজকের শনিবার, রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ সপ্তাহের বিন্যাসটিও ছিল সুপরিকল্পিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনার ফল। এই ধারণা আজও আমাদের জীবনে বেঁচে আছে। পঞ্জিকার পঞ্চাঙ্গের প্রথম উপাদানই হলো বার; তারপর তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণ। শুভ কাজের দিন বেছে নিতে অনেকেই এখনো বারের হিসাব দেখেন। জন্মপত্রিকাও আঁকা হয় এই সাত গ্রহের অবস্থানকে কেন্দ্র করে। সাত দিনের সপ্তাহ আর বারো রাশির চক্র দুটিই যেন একই আকাশের দুই ভাষা।
জন্ম থেকে মৃত্যু, বারের হিসাব
বাংলার মানুষের জীবনে বার-বিচার শুধু পঞ্জিকার পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; তা মিশে আছে দৈনন্দিন জীবনেও। সন্তানের নামকরণ, অন্নপ্রাশন, নতুন বাড়িতে ওঠা অনেক শুভ কাজেই পঞ্জিকা মিলিয়ে বার নির্বাচন করা হয়। চাকরিতে যোগদান, ব্যবসার সূচনা কিংবা পরীক্ষার দিন নিয়েও অনেকের বিশ্বাস ও হিসাব রয়েছে। লোকবিশ্বাসে মৃত্যুর দিনও মঙ্গল অমঙ্গলের বিচার থেকে আলাদা নয়; কোনো বারকে শুভ, কোনো বারকে অশুভ বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞান যতই এগিয়ে যাক, বিয়ের দিন থেকে শ্রাদ্ধের তিথি পর্যন্ত জীবনের নানা মুহূর্তে সেই প্রাচীন সাত গ্রহের প্রভাবের বিশ্বাস আজও টিকে আছে।
এক আকাশ, এক সময়
সব মিলিয়ে সপ্তাহের সাতটি দিন একাধিক সভ্যতার বিশ্বাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পুরাণের এক অনন্য মিলনস্থল। রোমানরা সূর্যকে বলেছে সোল, আমরা বলি রবি। তারা বলেছে লুনা, আমরা বলি সোম। তারা ভেনাসকে ঘিরে কাহিনি গড়েছে, আমরা শুক্রকে ঘিরে। ভাষা ভিন্ন, দেবতার নাম ভিন্ন, কিন্তু আকাশকে বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের চেষ্টা বিস্ময়করভাবে একই। ভৌগোলিক দূরত্ব যতই থাকুক, মাথার ওপরের আকাশ তো একটাই। সেই একই আকাশে জ্বলে থাকা সাতটি আলো কখনো সপ্তাহের সাত দিনের নাম হয়ে উঠেছে, কখনো রাশিচক্রের অধিপতি, কখনো জন্মপত্রিকার গণনা, আবার কখনো মানুষের শুভ-অশুভ বিশ্বাসের অংশ। তাই আজ যখন আমরা বলি রবিবার, সোমবার কিংবা শনিবার, তখন অজান্তেই উচ্চারণ করি হাজার বছরের ইতিহাস, পুরাণ, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মানুষের আকাশপাঠের এক দীর্ঘ উত্তরাধিকার।
তথ্যসূত্র:
১. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, Week — britannica.com/topic/week
২. উইকিপিডিয়া, Week — en.wikipedia.org/wiki/Week
৩. উইকিপিডিয়া, Names of the days of the week — en.wikipedia.org/wiki/Names_of_the_days_of_the_week
৪. উইকিপিডিয়া, Planetary hours — en.wikipedia.org/wiki/Planetary_hours
৫. বাংলাপিডিয়া, পঞ্জিকা — bn
