২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

একাকিত্বের রাজকুমারীরা

একাকিত্বের মাঝে আপনার চেয়ে আপন যে-জন সেই তুমিতেই আমিটা থাকে! মানুষ বাঁচে, অভ্যস্ত হয়, কষ্ট গিলে ফেলে, তারপর নিজের ভেতর এক শক্ত দেয়াল তৈরি করে নেয়। শেষে এসে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে এক নিস্তব্ধ শূন্যতার সামনে।

নাজমিন মর্তুজা নাজমিন মর্তুজা

Published : 16 May 2026, 12:49 AM

Updated : 11 Sep 2026, 02:27 PM

La soledad es el fondo de todo ser humano”(একাকিত্বই প্রতিটি মানুষের গভীরতম সত্য)--অক্তাভিও পাস। শুনেছিলাম আত্মগোপনের অভ্যাস মানুষকে ধীরে ধীরে দূরত্বপ্রিয় করে তোলে।

রুপালি পর্দার আড়ালে নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নেয়া পৃথিবীর সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাগুলো কখনো কখনো সবচেয়ে গভীর অন্ধকারে ডুবে থাকে। এমন অনেক  কিংবদন্তি অভিনেত্রী আছেন যারা লক্ষ মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, অথচ নিজেরা বেছে নিয়েছিলেন নিঃসঙ্গ, স্বেচ্ছাবন্দী এক জীবন। নিঃসঙ্গতা অনেক সময় ভিড়ের মাঝেও জন্মায়। যেমন বলেছিলেন বিখ্যাত কবি বিষ্ণু দে তাঁর এক কবিতায়: “ভিড়েও নিঃসঙ্গ আমি।”  হাসি, কাজ, সম্পর্ক সব ঠিকঠাক চলতে থাকে, তবু মনে হয় কোথাও যেন নিজের জন্য একটা ঘর খালি পড়ে আছে। পৃথিবীতে সব কিছু থাকার পরেও মানুষ একা অনুভব করতে পারে।

কারণ একাকিত্বের মানে শুধু পাশে মানুষ না থাকা নয়,বরং এমন কাউকে না পাওয়া যার কাছে নিজের ভেতরের কথাগুলো নির্ভয়ে রাখা যায়। এমন একাকিত্বকে সঙ্গী করে চলা গ্রেটা গার্বো , ইতিহাস যার একাকিত্বকে নিয়ে অনেক কথার জাল বুনে গেছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর একাকিত্ব হয়তো তখনই এসেছিল তার জীবনে যখন সবকিছু থাকার পরেও দিনের পর দিন গার্বো নিজের ভেতর নিজেকেই নিঃস্ব অনুভব করেছিলেন।  বাইরে জীবনে চলতে থাকে স্বাভাবিকতা কিন্তু ভেতরে যেন ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। কোনো অভাব চোখে পড়ে না, তবু মনে হয় কিছু একটা নেই, খুব জরুরি কিছু। এই নিঃস্বতা অর্থের নয়, এই নিঃস্বতা হৃদয়ের। 

গ্রেটা গার্বো ( ১৯০৫–১৯৯০)  

যাকে হলিউডের “ডিভাইন” বলে আখ‍্যায়িত করা। সুইডিশ বংশোদ্ভূত গার্বো ছিলেন হলিউডের সবচেয়ে রহস্যময় মুখ। তিনি  মাত্র ৩৬ বছর বয়সে টগবগে যৌবন ও লাস‍্যতাকে উপেক্ষা করে চলচ্চিত্র থেকে সম্পূর্ণ অবসর নিয়ে নিউ ইয়র্কে একাকী জীবন কাটান প্রায় পঞ্চাশ বছর।

তাঁর কারণগুলো সম্পর্কে অনুমান করা যায় হয়ত তিনি -ক্যামেরার সামনে তীব্র উদ্বেগ ও মানসিক চাপ অনুভব করতেন। খ্যাতির যন্ত্রণাতাড়িত জীবন থেকে রক্ষা পেতেই হয়ত,তাঁর বিখ্যাত উক্তি “I want to be alone”। এ ছিল আসলে তার এক গভীর সত্যের প্রকাশ।

মনভাঙ্গার মাশুলও হতে পারে, একাধিক প্রেমসম্পর্কে মোহভঙ্গ, আত্মপরিচয় বিশিষ্টতা , নিজের পরিচয়  খ‍্যাতি হারিয়ে ফেলার ভয়, এছাড়াও সম্ভবত গভীর বিষণ্ণতা ও উদ্বেগজাত ডিসঅর্ডার ছিল তাঁর মধ্যে।  এই পথের আর এক সহযাত্রী আমাদের সুচিত্রা সেন।

সুচিত্রা সেন (১৯৩১–২০১৪)

বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা ১৯৭৮ সালের পর সম্পূর্ণরূপে জনজীবন থেকে সরে যান। দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে প্রায় ৩৬ বছর কাটান বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। কারণসমূহ যদি মনে করি তাহলে হতে পারে বার্ধক্যজনিত শারীরিক পরিবর্তন মেনে নিতে না পারা,দর্শকের মনে তাঁর যৌবনের সৌন্দর্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে চেয়েছিলেন, দীর্ঘদিনের প্রেমসম্পর্ক ও ব্যক্তিগত বেদনা, আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতি ক্রমবর্ধমান ঝোঁকও হতে পারে ।

আরও ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ার ভয়, চলচ্চিত্র জগতের পরিবর্তন মেনে নিতে অস্বীকার, মেয়ে মুনমুন সেন ছাড়া কার্যত সকলের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে গেছেন তিনি।  আরেক  রহস্যময়ী নারী মধুবালা। 

মধুবালা (১৯৩৩–১৯৬৯)

 যাকে বলিউডের “ভেনাস” বলে ডাকা হতো।  মধুবালার একাকিত্ব ছিল আংশিক চাপানো, আংশিক স্বেচ্ছাকৃত। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর শেষ নয় বছর তিনি গৃহবন্দী হয়ে পড়েন। কারণগুলো খতিয়ে দেখলে যা মনে হয়, জন্মগত হৃদযন্ত্রের ছিদ্র, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, দিলীপ কুমারের সঙ্গে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার গভীর ক্ষত,এ বং কিশোর কুমারের সঙ্গে বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি, পিতার কঠোর নিয়ন্ত্রণ সারা জীবন তাঁকে মানসিকভাবে পঙ্গু করেছিল, মৃত্যু অনিবার্য জেনে সমাজ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়া-- হয়ত এটাই ছিল তার নিয়তি।  আরেক তারকা পারভিন ববি।

পারভিন ববি (১৯৪৯–২০০৫)

বলিউডের প্রথম আধুনিক নারী, ৮০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে সম্পূর্ণ একাকী জীবন শুরু। ২০০৫ সালে মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাটে তাঁকে একা মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

কারণগুলো হতে পারে তীব্র প্যারানয়া ও সিজোফ্রেনিয়া। তিনি বিশ্বাস করতেন CIA ও গুণ্ডারা তাঁকে হত্যা করতে চাইছে--এমন সব আতংকে তিনি সব সময় শংকিত থাকতেন। মাহমুদ আলী খান ও অন্যান্যদের সঙ্গে সম্পর্কে গিয়ে গভীর আঘাত পান।  চিকিৎসার অভাব ও সঠিক সাপোর্ট সিস্টেমের অনুপস্থিতি তাঁর মানসিক রোগকে সেই সময়ের সমাজ কলঙ্ক মনে করত বলে হয়ত মনোবিদের সাথে দুরত্ব রেখে লুকিয়েছেন নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের করুণ অবস্থা। এই একাকিত্বের পেছনে কিছু সাধারণ সূত্র ধরে এগুলে  এই সব কিংবদন্তির জীবন পর্যালোচনা করলে কিছু মিলের জায়গা স্পষ্ট হয়:

১. সৌন্দর্য ও যৌবনের ক্ষণস্থায়িত্বের ভয়। পর্দায় দেবীর আসনে বসা এই নারীরা বার্ধক্যকে মেনে নিতে পারেন নি। দর্শকের স্মৃতিতে চিরযুবতী থাকতে চেয়েছিলেন।

২. প্রেম ও বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষত। প্রায় প্রত্যেকেই গভীর প্রেমে পড়েছিলেন এবং গভীরভাবে আঘাত পেয়েছিলেন।

৩. খ্যাতির বিচ্ছিন্নতা। এত মানুষ ভালোবাসে, অথচ কেউ সত্যিকার অর্থে চেনে না এই বিচ্ছিন্নতাবোধ তাদের আরও একাকী করে দিয়েছিল।

৪. নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা। শিল্পের জগতে, সম্পর্কে, পরিবারে বারবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অবশেষে নিজের চার দেয়ালকে একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় মনে হয়েছিল।

৫. অচেনা মানসিক যন্ত্রণা। সেই যুগে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা ছিল না। বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা অন্য মানসিক সমস্যা চিহ্নিত না হয়ে একাকিত্বে পরিণত হয়েছিল।

এই নারীরা প্রমাণ করে গেছেন উজ্জ্বলতম আলোর পেছনেও থাকতে পারে গভীরতম ছায়া। তাঁদের একাকিত্ব দুর্বলতা নয়, বরং এক অদ্ভুত শক্তির প্রকাশ নিজের শর্তে বাঁচার সিদ্ধান্ত। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে যে নারীটির কথা পৃথিবীর ইতিহাসে একাকিত্বের  বা সেচ্ছাগৃহী সনদ হিসেবে থেকে গেছে  তিনি হলেন নির্জনতার রানি গ্রেটা গার্বো।  এই স্বনামধন্য নারী অভিনেত্রীর “আমি একা থাকতে চাই।”--এই একটি বাক্যই হয়তো গ্রেটা গার্বোর পুরো জীবনের সারসংক্ষেপ হয়ে ইতিহাসের পাতায় আশ্রয় করে নিয়েছে । 

১৯০৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। সুইডেনের স্টকহোমের এক দরিদ্র শ্রমিক পরিবারে জন্ম নিল এক মেয়ে নাম গ্রেটা লোভিসা গুস্তাফসন। বাবা ছিলেন সাধারণ মজুর, সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। সেই শোক তাঁকে চিরকালের মতো ভেতরে ভেতরে একা করে দিয়েছিল।

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন অভিনেত্রী হওয়ার। স্থানীয় দোকানে কাজ করতেন, আর মনে মনে ভাবতেন  একদিন আলোর মঞ্চে দাঁড়াবেন। হলিউডের পথেসুইডিশ চলচ্চিত্র পরিচালক মরিৎজ স্টিলার তাঁর মধ্যে দেখেছিলেন এক অসাধারণ সম্ভাবনা। গুস্তাফসন তাঁকে দিলেন  নতুন নাম গ্রেটা গার্বো। ১৯২৫ সালে স্টিলারের হাত ধরে হলিউডে পা রাখলেন গার্বো। MGM স্টুডিও তাঁকে দেখেই বুঝল এ মেয়ে সাধারণ নয়। সেই রহস্যময় চোখ, সেই ঠোঁটের কোণের বিষাদ, সেই নিষ্পাপ অথচ টেনে ধরা উপস্থিতি—সব মিলে দর্শক পাগল হয়ে গেল। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগেই তিনি হয়ে উঠলেন হলিউডের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা।

 তাঁর অমর সেরা ছবিগুলোর কথা না বললে তাঁর গল্প অসম্পূর্ণ  থেকে যাবে। Anna Karenina (১৯৩৫) তলস্তয়ের বিখ্যাত উপন্যাসের এই নায়িকা যেন গার্বোর জন্যই লেখা ছিল। প্রেম, যন্ত্রণা, আত্মধ্বংস সবকিছু তিনি পর্দায় এনেছিলেন অবিশ্বাস্য দক্ষতায়। Queen Christina (১৯৩৩) সুইডেনের রানির ভূমিকায় গার্বো এতটাই জীবন্ত ছিলেন যে দর্শক ভুলেই গিয়েছিলেন এটি অভিনয়। এই ছবির শেষ দৃশ্যটি চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম অমর মুহূর্ত। Camille (১৯৩৬) এই ছবির জন্য অস্কার মনোনয়ন পান তিনি। এক রহস্যময় নারীর প্রেম ও মৃত্যুর গল্প গার্বোর চোখে ছিল হাজার কথা। Ninotchka (১৯৩৯) এই ছবির পোস্টারে লেখা হয়েছিল “Garbo Laughs!” কারণ সিরিয়াস গার্বোকে কমেডিতে দেখা ছিল এক বিশাল চমক।

রহস্যময় প্রেম

গার্বোর প্রেমজীবন ছিল যতটা আলোচিত, ততটাই অস্পষ্ট। জন গিলবার্টের সঙ্গে ছিল দুর্বার প্রেম, পর্দায় ও বাস্তবে দুজনে একে অপরকে ভালোবাসতেন। গিলবার্ট বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু গার্বো রহস্যজনকভাবে পিছিয়ে গেলেন। কেন গেলেন? এতো প্রেম তবু বিয়েতে দ্বিধা কিসের? অনেকে বলেন, তাঁর জীবনে নারীর প্রতিও আকর্ষণ ছিল। হতে পারে উনি সমকামী ছিলেন। মার্লেন ডিট্রিশের সঙ্গে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। কিন্তু গার্বো কখনো কিছু স্বীকার করেননি, কিছু অস্বীকারও করেননি; চিরকাল রহস্য রেখে গেছেন।

গ্রেটা গার্বো যে কারণে আলোচিত ছিলেন তাহলো, হলিউডের সোনালি যুগে যখন সব তারকা ক্যামেরার সামনে হাসি বিক্রি করতেন, গার্বো তখন মুখ লুকিয়ে চলতেন। এই রহস্যই তাঁকে করে তুলেছিল অধরা এক কিংবদন্তি। মানুষ তাঁকে যত কম পেত, তত বেশি চাইত। অভিনয়ের অলৌকিক ক্ষমতা নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগ--দুই যুগেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর চোখের অভিনয় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে সংলাপ ছাড়াও দর্শক সব বুঝে নিত। পরিচালক সেসিল বি. ডেমিল বলেছিলেন গার্বোর মুখের দিকে ক্যামেরা ধরলে বাকিটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

গার্বো-গিলবার্ট প্রেমের গল্প যেভাবে শুরু 

১৯২৬ সাল। MGM স্টুডিওতে তখন জন গিলবার্ট ছিলেন হলিউডের সবচেয়ে বড় পুরুষ তারকা “The Great Lover” নামে পরিচিত। আর গার্বো তখন সবে হলিউডে পা রেখেছেন, তবে তাঁর রহস্যময় সৌন্দর্য ইতিমধ্যে সবার নজর কেড়েছে। ছবির নাম Flesh and the Devil। পরিচালক তাঁদের একসাথে কাস্ট করলেন। ক্যামেরার সামনে দুজনের রসায়নময় প্রেমের দৃশ্য ছিল, কিন্তু সেট থেকে বের হয়েও প্রেমটা থেমে রইল না। দর্শকরা পর্দায় দেখল এমন এক রসায়ন যা আগে কখনো দেখেনি। চুম্বনের দৃশ্যগুলো এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে সবাই বুঝে গেল এটা শুধু অভিনয় নয়। তুমুল প্রেম। গিলবার্ট সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেলেন গার্বোর জন্য। তাঁর বাড়ির পাশেই গার্বোর জন্য আলাদা বাড়ি কিনলেন। দুজনে একসাথে থাকতেন, ঘুরতেন। হলিউড তখন এই জুটির দিকে তাকিয়ে। গিলবার্ট প্রকাশ্যে বলে বেড়াতেন “গ্রেটা আমার জীবনের সব কিছু। ওকে ছাড়া আমি কিছুই না।” গার্বো নীরব থাকতেন। হাসতেন। 

বিয়ের প্রস্তাব ও সেই ভয়ংকর দিন

গিলবার্ট একাধিকবার বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। গার্বো প্রতিবারই এড়িয়ে গেলেন। তারপর এলো সেই দিন গিলবার্ট সবকিছু ঠিক করে ফেললেন। বিয়ের অনুষ্ঠান প্রস্তুত, অতিথিরা এসে গেছেন। শুধু গার্বোর অপেক্ষা। গার্বো এলেন না। কোনো চিঠি নেই, কোনো ফোন নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। গিলবার্ট অতিথিদের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন একা, অপমানিত, ভেঙে পড়া। এই ঘটনা গিলবার্টকে ভেতর থেকে চুরমার করে দিয়েছিল। 

গিলবার্টের পতন

সবাক চলচ্চিত্রের যুগ এলো। গিলবার্টের কণ্ঠস্বর দর্শকের পছন্দ হলো না। ক্যারিয়ার ধসে পড়তে শুরু করল। আর গার্বো তখন আরও উজ্জ্বল  আরো নাম ছড়িয়ে হয়ে উঠছেন তারকা! 

গিলবার্ট মদের নেশায় ডুবে গেলেন। বারবার বিয়ে করলেন, চারবার,  কিন্তু গার্বোকে ভুলতে পারলেন না। বলতেন আমি অনেক নারীকে বিয়ে করেছি, কিন্তু ভালোবেসেছি শুধু একজনকে। ১৯৩৩ সালে গার্বো নিজেই গিলবার্টকে তাঁর ছবি Queen Christina-তে নেওয়ার জন্য জোর দিলেন। স্টুডিও রাজি ছিল না, কিন্তু গার্বো নাছোড়বান্দা।

অনেকে বলেন, এটা ছিল তাঁর অনুশোচনার প্রকাশ  হয়তো শেষবারের মতো গিলবার্টের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। ছবিতে দুজনে আবার একসাথে। কিন্তু সেই আগের উত্তাপ নেই। গিলবার্ট তখন শুধু এক ভাঙা  ইমারত! 

গিলবার্টের মৃত্যু

১৯৩৬ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন জন গিলবার্ট। মদ আর একাকিত্ব তাঁকে শেষ করে দিয়েছিল। গার্বো সেদিন কী করেছিলেন, কোথায় ছিলেন কেউ জানে না। তিনি কখনো প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। শুধু কাছের বন্ধুরা বলেছিলেন সেদিন তাঁকে অনেকক্ষণ একা বসে থাকতে দেখা গিয়েছিল। চোখে জল ছিল কিনা সেটাও রহস্যই রয়ে গেছে।

প্রেমের আসল রহস্য

গার্বো কেন গিলবার্টকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন  এই প্রশ্নের উত্তর আজও কেউ জানে না। কেউ বলেন তিনি আসলে পুরুষের প্রেমে বিশ্বাসী ছিলেন না। কেউ বলেন স্বাধীনতা হারানোর ভয় ছিল। কেউ বলেন তিনি গিলবার্টকে ভালোবাসতেন কিন্তু ভালোবাসাকে ভয় পেতেন। হয়তো গার্বো নিজেও জানতেন না। “আমি কাউকে ভালোবাসিনি এ কথা বলব না। কিন্তু আমি কাউকে ধরে রাখতে পারিনি এটা সত্যি।” হলিউডের ইতিহাসে এত সুন্দর, এত বেদনাময়, এত রহস্যময় প্রেমের গল্প আর দ্বিতীয়টি নেই। একাকিত্ব, প্রত্যাবর্তন, এবং বিখ্যাত নারীদের নিঃসঙ্গতা। “কেউ অপেক্ষায় নেই জেনেও কেন মানুষ বাড়ি ফেরে?” কারণ বাড়ি আসলে মানুষ নয়, একটা অনুভূতির ঠিকানা। যেখানে একদিন উষ্ণতা ছিল, সেই শূন্য জায়গাটাও টানে হয়তো স্মৃতির জন্য, হয়তো এই আশায় যে শূন্যতাটা একদিন ভরবে। “দিন যায় কথা থাকে, মানুষ হারিয়ে যায় স্মৃতিগুলো পড়ে থাকে”--এটা একটা গভীর সত্য। মানুষ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া ছাপগুলো একটা গন্ধ, একটা আলোর কোণ, একটা শব্দ সেগুলো থেকে যায় অনেকদিন।

লিঙ্গ পরিচয়ের সাহসী খেলা

সেই রক্ষণশীল যুগে গার্বো পুরুষের পোশাক পরতেন, ছোট চুল রাখতেন। Queen Christina ছবিতে নারী হয়ে নারীকে চুম্বন করলেন, হলিউড স্তব্ধ হয়ে গেল। এই সাহস তখনকার দিনে ছিল অকল্পনীয়। এ কারণে সমালোচিতও হয়েছিলেন।

দর্শকের প্রতি উদাসীনতা

যে দর্শকেরা তাঁকে দেবীর আসনে বসিয়েছিল, তাদের প্রতি তিনি ছিলেন রীতিমতো শীতল। অটোগ্রাফ নেই, ভক্তদের সঙ্গে দেখা নেই, চিঠির জবাব নেই। অনেকে এটাকে অহংকার মনে করতেন। হলিউড ছেড়ে চলে যাওয়া মাত্র ৩৬ বছর বয়সে, ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে, হঠাৎ সব ছেড়ে দিলেন। স্টুডিও বস, সহশিল্পী, দর্শক — সবাই হতবাক। MGM বারবার ডাকল, তিনি ফিরলেন না। সমালোচকরা বললেন এ দায়িত্বহীনতা, এ বিশ্বাসঘাতকতা।

নাজি জার্মানিতে ছবি মুক্তি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর কিছু ছবি জার্মানিতে মুক্তি পেয়েছিল। যদিও তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন না, তবুও এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল।

সম্পর্কে চরম দূরত্ব

যাঁরা তাঁকে ভালোবেসেছিলেন  জন গিলবার্ট, মার্সেল স্টোরার সবাই বলতেন গার্বো সম্পর্কে পুরোপুরি নিজেকে দেননি কখনো। কাছে টানতেন, আবার হঠাৎ দূরে সরে যেতেন। এই টানাপোড়েনে অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। একাকিত্ব জীবনের শেষ পঞ্চাশ বছর তিনি কাটিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কের একটি অ্যাপার্টমেন্টে, প্রায় সম্পূর্ণ একা। বন্ধুরা বলতেন তিনি মাঝে মাঝে ফোনে কাঁদতেন আর বলতেন : “আমি কি ভুল করে ফেললাম? আমার কি আরেকটু মানুষের কাছাকাছি থাকা উচিত ছিল?” নিজেই একাকিত্ব বেছে নিয়েছিলেন, আবার সেই একাকিত্বেই কষ্ট পেতেন।

ক্যারিয়ার ছেড়ে দেওয়ার আক্ষেপ

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝেছিলেন, অভিনয়ই ছিল তাঁর আসল পরিচয়। কিন্তু ততদিনে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কাছের মানুষদের বলতেন: “আমি হয়তো অনেক আগেই থেমে গেছি। আরও কিছু করতে পারতাম।”

ভালোবাসা না পাওয়ার আক্ষেপ

সারাজীবন ভালোবাসা থেকে দূরে পালিয়েছেন, অথচ শেষ জীবনে সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলেন একজন মানুষ যে শুধু তাঁর পাশে থাকবে। কিন্তু নিজের হাতে গড়া দেয়াল ভাঙতে পারেন নি।

সুইডেনে ফিরতে না পারার আক্ষেপ জন্মভূমি স্টকহোমের কথা তিনি প্রায়ই বলতেন। যেতে চাইতেন, কিন্তু ক্যামেরার ভয়ে, মানুষের ভিড়ের ভয়ে যাওয়া হয়নি। দেশের মাটিতে আর পা দেন নি। গ্রেটা গার্বো ছিলেন এমন এক মানুষ যিনি পৃথিবীকে ভালোবাসতে ভয় পেতেন, আবার একা থাকতেও কষ্ট পেতেন। এই দুই টানের মাঝখানে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলেন, না পুরোপুরি কাছে এলেন, না পুরোপুরি দূরে গেলেন। “আমি কখনো নিজেকে পুরোপুরি বুঝিনি  তাহলে অন্যরা বুঝবে কীভাবে?”—বলেছিলেন গ্রেটা গার্বো।

মানুষ সবসময় মঞ্চে, ক্যামেরায়, আলোয় প্রায়ই ভয় পায়। কিন্তু এখানে যাদের কথা বলা হলো তারা এসবের মাধ্যমেই পরিচিতি পেয়েছেন।  গার্বো, ডায়ানা, মেরিলিন তিনজনেই এই অনুভূতির কথা বলেছেন। সৃজনশীলতা এবং নিঃসঙ্গতার সম্পর্কে ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন  “নিজের একটা ঘর দরকার”! কিন্তু সেই ঘর কখনো কখনো কারাগারও হয়ে যায়। মানসিক সমস্যা, নাকি আরও গভীর কিছু? শুধু “মানসিক সমস্যা” বললে এক কথায় বললে সরলীকরণ হয়ে যায়। এটার আসলে  মানসিক কারণ আছে, হ্যাঁ  বিষণ্নতা, অ্যাটাচমেন্ট ট্রমা। কিন্তু সামাজিক কারণও আছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বিখ্যাত নারীকে কখনো “সম্পূর্ণ মানুষ” হিসেবে দেখা হয় না, হয় দেবী নয়তো বস্তু। এবং অস্তিত্বগত কারণও আছে কিছু, একাকিত্ব আসলে নিজেকে খোঁজার জায়গা। 

এই একাকিত্বের আরেক করচা লিখে গেছেন সুনীল গাঙ্গোপাধ‍্যায় ““নীরা, তুমি কি জানো আমি একা হলে ভালো থাকি।” একা থাকা আর একাকী থাকা এই দুটো আলাদা। একা থাকলে নিজের সাথে কথা বলা যায়।” আর রবীন্দ্রনাথ তো আমাদের অনুভূতির পায়ের নুপুরে টোকা দিয়ে বলেন “যদি তোর ডাক শুনে  কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।”

একাকিত্বের মাঝে আপনার চেয়ে আপন যে-জন সেই তুমিতেই আমিটা থাকে! মানুষ বাঁচে, অভ্যস্ত হয়, কষ্ট গিলে ফেলে, তারপর নিজের ভেতর এক শক্ত দেয়াল তৈরি করে নেয়। শেষে এসে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে এক নিস্তব্ধ শূন্যতার সামনে। সবকিছু পেরিয়ে তখন একটাই পথ থাকে অজানার দিকে যাত্রা, যাকে আমরা মৃত্যু বলি !