Published : 19 Dec 2025, 09:58 AM
১. আবুল কালাম থেকে ‘আজাদ’ (মুক্ত)
বাঙালি মুসলমানের মধ্যে ভুরি ভুরি পাওয়া যায় ‘আবুল কালাম আজাদ’ নামের মানুষ। সবগুলো নামকরণই কি মৌলানা আবুল কালাম আজাদের নাম থেকে অনুপ্রাণিত? হতেও পারে। ধারণাটি এই কারণে যে মুসলমানদের মধ্যে উপমহাদেশে বা মুসলমানপ্রধান দেশগুলোতে এই নামের আর কোনো কীর্তিমান পুরুষের নাম আমাদের জানা নেই।
মৌলানা আবুল কালাম আজাদের পিতৃদত্ত নাম আবুল কালাম। পিতা মোহাম্মদ খয়রুদ্দীন ছিলেন আরবিভাষী। ইসলামিশাস্ত্রে সুপণ্ডিত খয়রুদ্দিনের রচনাবলি ১০ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল মিশর থেকে। ভারতে এসে দিল্লিতে ডেরো বেঁধেছিলেন। থাকতে চেয়েছিলেন হয়তো দিল্লিতেই। কিন্তু দুর্ঘটনায় পায়ের একটি জয়েন্ট সরে গিয়েছিল। দিল্লির ডাক্তার-হেকিম-কবরেজরা ঠিক করতে পারেননি সেই জয়েন্ট। পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বাধ্য হয়ে কলকাতায় এসেছিলেন ইংরেজ সার্জনের কাছে। চিকিৎসায় সুস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তার আর ফিরে যাওয়া হয়নি দিল্লিতে। কলকাতার গুণগ্রাহী, ভক্ত এবং ছাত্ররা খয়রুদ্দীনকে অনুনয়-বিনয় করে কলকাতাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে একপ্রকার বাধ্যই করেছিলেন। সেইসূত্রেই মৌলানা আবুল কালাম আজাদ আরবিভাষী এবং কিছুটা উর্দুভাষী হয়েও কলকাতার মানুষ এবং সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বাংলারই প্রতিনিধি। পরে অবশ্য কাজ চালানোর মতো বাংলাও শিখেছিলেন। তবে বাংলায় তিনি কিছু লিখেছিলেন এমন প্রমাণ বোধহয় নেই।
আবুল কালামের জন্ম মক্কাতে। দুই বছর বয়সে পরিবারের সাথে দিল্লিতে চলে আসা। তার পিতা কেন মক্কা ছেড়ে ভারতবর্ষে চলে এসেছিলেন তার কারণ জানা যায় না। হয়তো কিছুটা স্বচ্ছল জীবনের আশায়। হয়তো ভারতবর্ষের মুসলমানদের আরো ভালোভাবে ধর্মীয় শিক্ষায় উৎসাহিত করার মিশনারিসুলভ ইচ্ছায়। পিতা দিল্লি ছেড়ে কলকাতায় চলে এলে কিশোর আবুল কালামকেও চলে আসতে হয়েছিল পিতা-পরিবারের সাথেই। সেই ঘটনা উপরেই বলা হয়ে গেছে। তো এমন জাঁদরেল শিক্ষাবিদ পিতা যে পুত্রের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করবেন সেকথা বলাইবাহুল্য। কিন্তু, আবুল কালাম জানাচ্ছেন, তার পিতা ছিলেন “আধুনিক তথা ইংরেজি শিক্ষার ঘোরবিরোধী”। অন্য মুসলিমপণ্ডিত এবং ধর্মনেতাদের মতো তারও এই অন্ধ বিশ্বাস ছিল যে “আধুনিক শিক্ষায় ধর্মবিশ্বাস নষ্ট হয়”।
তাই তাকে, এমনকি কোনো মাদ্রাসা-মক্তবেও না পাঠিয়ে বাড়িতে আলাদা আলাদা বিষয়ের ওস্তাদ নিয়োগ দিয়ে পড়াশোনা করানো হতো। সাথে ছিল পিতার কড়া তত্ত্বাবধান।
আবুল কালাম জানাচ্ছেন-- ‘তিনি আমাকে আধুনিক শিক্ষাদানের কথা কখনোই চিন্তা করেননি। তাঁর ধারণা ছিল আধুনিক শিক্ষা ধর্মীয় বিশ্বাসকে নষ্ট করে।’
ধর্মীয় শিক্ষার শুরুতে ছাত্রদের আরবি ও ফারসি শেখানো হতো। দুই ভাষাতে কিছুটা দক্ষতা অর্জন করলে তাদের পড়ানো হতো ইসলামি র্দশন, জ্যামিতি, অঙ্ক ও বীজগণতি। সবই আরবি ভাষায়। ইসলামি ধর্মতত্ত্ব তো অবশ্যই।
পূর্ণপাঠ বা সিলেবাস শেষ করতে শিক্ষার্থীদের বয়স ২৫ বছর পেরিয়ে যেত। আবুল কালাম সেই সিলেবাস শেষ করেছিলেন ১৬ বছর বয়সে। তারপরে তিনি নিজেই পড়াতে শুরু করেন ১৫ জন ছাত্রকে। ছাত্রদের পড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন তার পিতা।
এই সময়েই আবুল কালাম স্যার সৈয়দ আহমদের কিছু রচনার সাথে পরিচিত হন। সেগুলো পাঠ করে আন্দোলিত হয়েছিলেন খুব। স্যার সৈয়দ আহমদের রচনা পাঠ করে তিনি উপলব্ধি করেন যে আধুনিক বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য অধ্যয়ন ছাড়া কোনো মানুষই আজকের বিশ্বে সত্যিকারের শিক্ষিত হতে পারে না।
তিনি ইংরেজি শিখতে শুরু করেন। বাংলাও। পড়ে ফেলেন বাইবেল। ইংরেজি, ফারসি এবং উর্দু-- এই তিনভাষার অনুবাদ পাশাপাশি রেখে তিনি বাইবেল পাঠ করেছিলেন। অবশ্যই পিতার অগোচরে।
‘আমার জন্য ভীষণ মানসিক দ্বন্দ্বের সময় ছিল এটি। ধর্মীয় ঐতিহ্য দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত একটি পরিবারে জন্ম হয়েছিল আমার। সব ধর্মীয় প্রথা সেখানে বিনাপ্রশ্নে গৃহীত হতো। প্রাচীন প্রথা ও ধ্যানধারণা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি আমার পরিবার মেনে নিত না।
অথচ বিদ্যমান প্রথা ও বিশ্বাসগুলোর সঙ্গে আমি কোনোভাবেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। নতুন এক বিদ্রোহী অনুভূতি আমার মনকে পূর্ণ করে রেখেছিল। আমি অনুভব করলাম আমাকে নিজেই সত্যকে খুঁজে নিতে হবে।’
দুই-তিন বছর তিনি প্রবল মানসিক অশান্তিতে কাটিয়েছেন। পড়াশোনা করেছেন দিনরাত। তর্ক করেছেন নিজের সাথে। ‘অবশেষে একটি সময় আসে যখন পরিবার ও বাল্যশিক্ষা কর্তৃক আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া সব পুরনো বন্ধন পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়।’
তখনই তিনি নিজেকে ঘোষণা করলেন ‘আজাদ’ বা ‘মুক্ত’।
তিনি প্রথাগত পথ এবং এবং ভাবনা নিয়ে জীবন যাপন করলে আমরা বড়জোর আরেকজন মোল্লা বা মৌলভী পেতাম।
কিন্তু পেতাম না একজন বিশ্বমনীষী আবুল কালাম আজাদকে।
তিনি নাস্তিক হননি। কিন্তু ধর্মকে গ্রহণ ও পালন করেছেন নিজের মতো করে সর্বোচ্চ সততা দিয়ে।
পৃথিবীর সকল বড়মানুষ-- লেখক, কবি, শিল্পী, দার্শনিক এটাই করেন। সেই কারণেই তারা গড় মানুষ থেকে আলাদা। তলস্তয়, রবীন্দ্রনাথ, গ্যায়টে, গ্যালিলিও-- সবাই এমন মৌলিক ছিলেন।
মৌলিক মানে মৌলবাদের ঠিক বিপরীত।
২.
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ-র পিতার নাম ছিল পুঞ্জলাল ঠক্কর। গুজরাতি হিন্দু। মাছের ব্যবসা করে তার পিতামহ প্রচুর ধনশালী হয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দু অভিজাতসমাজে জায়গা দেওয়া হয়নি তাকে। ক্ষুব্ধ হয়ে সপরিবারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন প্রপিতামহ। মুসলমান হবার পরে পিতা পুঞ্জলাল ঠক্করের নাম কী রাখা হয়েছিল তা জানা যায়নি। ইসলামে অসংখ্য গ্রুপ এবং উপ-গ্রুপ আছে। তারা ছিলেন ইসমাইলিয়া শিয়া গ্রুপে।
জিন্নাহ বড় হয়েছিলেন সম্পূর্ণ ব্রিটিশ কেতায়। ইংরেজিতে ছাড়া কথা বলতেন না। ইংরেজদের মতো পোশাক পড়তেন। ইংরেজরা যা যা খায় তিনিও সেসব খেতেন। ধর্ম নিয়ে কোনো মাথা ঘামাতেন না। কোনোদিন নামাজ-রোজা করেননি জিন্নাহ। টুপি-জোব্বা-আচকান পরেননি কখনো। কোনো ধর্মী আলোচনা বা ধর্মীয় সভায় যোগ দেননি। কারো জানাজায় যোগ দেননি। ঈদ-পরব কিছুই করতেন না। অথচ সেই তিনিই হয়েছিলেন মুসলমানদের অবিসম্বাদী নেতা। কায়েদে আজম। এই কায়েদে আজম উপাধি অবশ্য গান্ধীর দেওয়া।
আজাদ তাকে খুবই অপছন্দ করতেন। আবার জিন্নাহ-ও ছিলেন আজাদের ঘোর সমালোচক। আজাদকে তিনি বলতেন ‘কংগ্রেসের সাইনবোর্ড’। কলকাতার গড়ের মাঠে প্রধান ঈদ-জামাতে ইমামতি করতেন মওলানা আজাদ। তার ইমামতি পণ্ড করার চেষ্টা পর্যন্ত করেছেন জিন্নাহ। অন্যদিকে জিন্নাহকে অপছন্দ করলেও তাকে তার প্রাপ্য সম্মান ঠিকই দিয়েছেন আজাদ। এই রচনার পরবর্তী অংশে তার পরিচয় পাওয়া যাবে।

৩.
অন্ধ দলবাজি করতেন না আজাদ। দলের সিদ্ধান্ত অপছন্দ হলে প্রতিবাদ জানাতে দ্বিধা করতেন না। তার দাবি-- কংগ্রেস দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ বাতিলের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ভারত-ভাগের বীজ রোপণ করেছিল।
বাঙালি না হলেও কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাসের কারণে আজাদ নিজেকে বাংলার মানুষ এবং বাংলার প্রতিনিধি মনে করতেন। যেমন সোহরাওয়ার্দী ও ইস্পাহানিরা মনে করতেন তারা বাংলারই মানুষ। বাংলার সব রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের সাথে আজাদের সংযুক্তি ছিল। তাদের মধ্যে চিত্তরঞ্জন দাশকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি শব্দ লিখেছিলেন তিনি। চিত্তরঞ্জন দাশ তার গ্রন্থে সি আর দাশ নামে অভিহিত হয়েছেন বারবার।
আজাদের মতোই গান্ধীর নেতৃত্ব মেনে নিলেও দেশবন্ধু প্রকাশ্যে গান্ধীর সাথে দ্বিমত প্রকাশে দ্বিধা করতেন না। চৌরিচৌরার ঘটনার পরে গান্ধী একক সিদ্ধান্তে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ করে দিলে দেশবন্ধু তার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। দেশ ও জাতির মনোবল ভেঙে পড়েছিল অকস্মাৎ অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ করে দেওয়ার কারণে।
এই সময়টিতে সি আর দাশ এবং মওলানা আজাদ প্রায় প্রতিদিন কলকাতায় পরস্পরের বাড়িতে দেখা করতেন। আলোচনা করতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সি আর দাশ বলতেন, অসহযোগ আন্দোলন বন্ধের মাধ্যমে গান্ধী মহাভুল করেছেন। মারাত্মক সেই ভুল। আন্দোলনের সময় যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল তেমন জোয়ার ফিরিয়ে আনতে আবার বহুবছর সময় লাগবে। তিনি বিশ্লেষণ করে করে দেখিয়েছিলেন, শুধু অসহযোগ নয়, সবগুলো আন্দোলনই গান্ধীর ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ব্যর্থ হয়েছে।
‘বেঙ্গল প্যাক্ট’-এর কথায় আসা যাক। বাংলায় মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু নানা কারণে তারা শিক্ষা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে ছিল। সেই সময় সরকারি চাকুরিতে মুসলমানের অংশ ছিল ৩০%-এরও কম। কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে একমাত্র সি আর দাশই বুঝেছিলেন, হিন্দুদের প্রতি মুসলমানদের অবিশ্বাসের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক।
সি আর দাশ ঘোষণা করলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেস বাংলার ক্ষমতায় এলে জনসংখ্যা অনুযায়ী যথাযথ প্রতিনিধিত্ব অর্জন না করা পর্যন্ত সব ধরনের সরকারি চাকুরির নতুন নিয়োগে মুসলমানদের জন্য ৬০% আসন বরাদ্দ থাকবে। কলকাতা করপোরেশনের বেলায় তিনি এগিয়ে গেলেন আরো এক ধাপ। সেখানে নতুন চাকুরির ৮০% সংরক্ষিত রাখা হলো মুসলমানদের জন্য। তার বক্তব্যের সার কথা ছিল-- যতদিন না মুসলমানরা জনজীবন ও চাকুরিতে যথাযথ প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাবে, ততদিন পর্যন্ত বাংলায় প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না।
বাংলার মুসলমানরা সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে। নির্বাচনে দেশবন্ধুর স্বরাজ পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। কিন্তু উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং কংগ্রেসের অন্য নেতারা কোমর বেঁধে নামল তার বিরুদ্ধে। এত বিশ্রী বিষোদ্গার এবং গালিগালাজ তারা শুরু করলেন, তাদের সমর্থক পত্রিকাগুলো এত জঘণ্য ভাষায় আক্রমণ শুরু করল তাকে, যেগুলো ভদ্রসমাজে উচ্চারণ করা যায় বলে এর আগে কেউ ভাবতে পারত না।
চিত্তরঞ্জন দাশ তার অবস্থানে অটল রইলেন। কিন্তু তার আকস্মিক মৃত্যু ঘটল ১৯২৫ সালে। অনেকেই মনে করেন দিনের পর দিন এমন কুশ্রী ম্যালেরিয়া রোগী চিত্তরঞ্জন দাশের হার্ট অ্যাটাকের কারণ হয়েছিল। এবং সেটাই তার মৃত্যুর কারণ।
সি আর দাশের মৃত্যুর পরপরই তার অন্যতম দুই প্রধান সহযোগী মতিলাল নেহরু এবং হেকিম আজমল খান সরে গেলেন স্বরাজ পার্টি থেকে। ফলে কংগ্রেস অনায়াসে বাতিল করে ফেলতে পারল বেঙ্গল প্যাক্ট।
মওলানা আজাদ বলছেন-- এর ফলে বাংলার মুসলমানরা চিরতরে সরে গেলেন কংগ্রেস থেকে। এবং দেশবিভাগের প্রথম বীজটি রোপিত হলো।
৪.
আপনাদের মনে থাকতে পারে পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক তলস্তয়কে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি।
কারণ হিসাবে কী বলেছির নোবেল কমিটি?
বলেছিল-- “তলস্তয় যথেষ্ট খ্রিস্টান নন।”
তলস্তয় খুব জোরেশোরে খ্রিস্টান ধর্মনেতাদের ধর্মব্যবসার কথা বলতেন। বলতেন, রাশিয়ার মানুষের দুঃখ-দুর্দশার অন্যতম কারণ এই ধর্মব্যবসা। বলতেন, রাশিয়ার প্রধান চার্চ এই ধর্মব্যবসার কেন্দ্র ও প্রধান পরিচালক। তাই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে চার্চের সাথে নিজের সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। ছিন্ন করেছিলেন জনসমক্ষে ঘোষণা দিয়ে।
কিছুদিন পরে চার্চ তাকে পাল্টা বহিষ্কার করে। বহিষ্কারের খবর শুনে শুধু হেসেছিলেন তলস্তয়।
তলস্তয়ের জীবনী যারা জানেন, তারা অনেকেবই বলেছেন, শুধু সাহিত্যে নয়, তলস্তয় শান্তিতেও নোবেল পুরস্কার পেতে পারতেন। কারণ সরকার ও রাষ্ট্র পরিবর্তনে শান্তিপূর্ণ অহিংস আন্দোলনের প্রথম প্রবক্তা তিনিই।
গান্ধী যে অহিংস শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন ভারতবর্ষে, সেই অহিংস তত্ত্ব তিনি পেয়েছিলেন তলস্তয়ের কাছ থেকেই।
গান্ধীও অবশ্য নোবেল পুরস্কার পাননি।
নোবেল শান্তি পুরস্কার সিংহভাগই দেওয়া হয়েছে পৃথিবীর দেশে দেশে ও সমাজে অশান্তি সৃষ্টিকারীদেরই।
মওলানা আজাদের বইটি পড়তে পড়তে গান্ধী ও তলস্তয়ের প্রসঙ্গটি মনে এল। গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকার সময় ‘তলস্তয় ফার্ম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। তিনি তলস্তয়ের কাছে চিঠিও লিখেছিলেন। তলস্তয় চিঠির উত্তর লিখেছিলেন। তলস্তয়ের লেখা উত্তরটি পাওয়া যায় ‘এ লেটার টু এ হিন্দু’ নামের ছোট্ট পুস্তিকায়।
ভারতে কংগ্রেসের সর্বেসর্বা নেতা হয়ে (যদিও গান্ধী কখনোই কংগ্রেসের সদস্য হননি) ১৯২১ সালে গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচিগুলি ছিল-- সরকারকে দেওয়া সকল ধরনের সমর্থন প্রত্যাহার করা, সকল সরকারি খেতাব ফিরিয়ে দেওয়া, নতুন খেতাব দিতে চাইলে তা প্রত্যাখ্যান করা, সরকারি চাকুরি থেকে সকল ভারতীয়র ইস্তফা দেওয়া, আইনসভার (প্রাদেশিক পরিষদ) নির্বাচনে অংশ না নেওয়া ইত্যাদি।
মওলানা আজাদ লিখেছেন, গান্ধীর প্রস্তাবগুলি শোনামাত্র তাঁর মনেরপড়ে গেল তলস্তয়ের কথা। ১৯০১ সালেই তলস্তয় এই কর্মসূচির খসড়া প্রস্তুত করেছিলেন।
গান্ধীকে ছোট করা নয়। এই তথ্য তুলে ধরার উদ্দেশ্য হচ্ছে মওলানা আজাদের অবিশ্বাস্য পঠন-পাঠন এবং স্মৃতিশক্তির কথা মনে করিয়ে দেওয়া।
আমাদের দেশের মওলানারা পড়েন না, রাজনীতিবিদরা পড়েন না। দেশের মানুষ পড়তে যাবে কোন দুঃখে!
বিশ্বে বইপড়া দেশের তালিকায় আমাদের অবস্থান তলানিতে। সেই কারণেই সবকিছুতেই তলানিতে।

৫.
ভারতভাগ: জিন্নাহ একাই দায়ী নন। একাই ভিলেন নন।
ভারতকে অখণ্ড রাখার শেষ সুযোগ ছিল ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব। ১৯৪৬ সালের ২৩শে মার্চ মিশন দিল্লিতে পৌঁছায়। এপ্রিল মাসের ২ তারিখে দিল্লিতে পৌঁছে মওলানা আজাদ ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে শুনলেন।
ভারতকে অখণ্ড রাখার শেষ সুযোগ ছিল ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এটলি-র দেওয়া ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব।
১৯৪৬ সালের ২ শে মার্চ ক্যাবিনেট মিশন দিল্লিতে পৌঁছায়। মওলানা আজাদ তখন দীর্ঘদিন জেল খাটার পওে কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। এপ্রিল মাসের ২ তারিখে তিনি দিল্লিতে পৌঁছে ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবগুলি শুনলেন। পড়লেন গভীর মনোযোগের সাথে।
কী ছিল প্রস্তাবে?
সংক্ষেপে বলা যায়-- ভারতকে তিনটি ক্লাস্টারে ভাগ করা হবে। ‘এ’ ক্লাস্টারে অন্তর্ভুক্ত হবে হিন্দু অধ্যুষিত প্রদেশগুলো।
‘বি’ ক্লাস্টারে পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং ব্রিটিশ বেলুচিস্তান।
‘সি’ ক্লাস্টারে বাংলা এবং আসাম।
প্রদেশগুলো সব বিষয়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। ভারত রাষ্ট্রটি হবে একটি শিথিল ফেডারেশন। কেন্দ্রের হাতে থাকবে শুধু তিনটি বিষয়। প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ এবং পররাষ্ট্র। প্রত্যেক প্রদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত থাকবে প্রদেশের এখতিয়ারে। প্রদেশগুলোই ঠিক করবে তারা কোনখাতে তাদের অর্থ ব্যয় করবে। কোন দপ্তরে কত টাকা বরাদ্দ করবে। যেহেতু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের কোনো সম্ভাবনা থাকবে না, তিনটি বিষয় ছাড়া তাদের নির্বাচিত সরকার নিজেরাই সবকিছু পরিচালনা করবে, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের আধিপত্যের হাত থেকে মুসলমানরা মুক্ত থাকবে।
ক্যাবিনেট মিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব উত্থাপন করে ১৫ই মে তারিখে।
এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে কি না তা নির্ধারণ করার জন্য জিন্নাহ মুসলিম লীগের তিনদিনের বিশেষ কাউন্সিল আয়োজন করেন। তিনদিন ধরে চুলচেরা আলোচনা হলো। শেষদিনে জিন্নাহ স্বীকার করলেন-- ক্যাবিনেট মিশন যে পরিকল্পনা হাজির করেছে, তার চেয়ে ন্যায্যতম কোনো সমাধান ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য নেই। কোনোভাবেই তিনি এরচেয়ে ভালো কোনো সমাধান বের করতে পারবেন না।
কাউন্সিল জিন্নাহ-র কথা মেনে সর্বসম্মতিক্রমে তার প্রস্তাব পাশ করল।
জিন্নাহ পাকিস্তান প্রস্তাব থেকে সরে এসে ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব গ্রহণ করার ঘোষণা দিলেন।
জিন্নাহ যতই মুসলিম লীগের একচ্ছত্র নেতা হন না কেন, এই প্রস্তাব গ্রহণ করা তার জন্য মোটেই সহজ কোনো কাজ ছিল না। কারণ তিনি এবং মুসলীম লীগ ১৯৪০ সাল থেকে (শেরে বাংলার লাহোর প্রস্তাবের দিন থেকে) পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ১৯৪৬ সাল নাগাদ, অর্থাৎ ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাবের সময় সারা ভারতের সর্বস্তরে মুসলমান নেতারা পাকিস্তানের দাবিতে একমত হয়েছিলেন। জিন্নাহ এই সময় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে সরে আসায় অনেকেই হতবাক হয়ে পড়েছিলেন।
মুসলমান নেতাদের কেউ কেউ মওলানা আজাদের সাথে দেখা করতে এলেন। দীর্ঘ আলোচনার পরে আজাদ তাদের বোঝাতে সমর্থ হয়েছিলেন যে জিন্নাহ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তিনি বললেন-- পাকিস্তান পরিকল্পনা যদি কোনোভাবে সারা ভারতের মুসলমানদের উপকারে আসে, তাহলে তিনি নিজেই তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। কিন্তু সত্যটি হচ্ছে আমি যদি পরিকল্পনাটিকে মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থের দিক থেকেও দেখি, তাহলেও সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হই যে তা কোনোভাবেই মুসলমানদের উপকারে আসবে না, এবং তাদের যৌক্তিক ভীতির অবসান ঘটাতে পারবে না।
জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগ ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব গ্রহণ করায় মওলানা আজাদের মন শান্তিতে ভরে গেল। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে কংগ্রেস এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে। কারণ বেশ কয়েক বছর আগে তিনি নিজেই ভারতকে অখণ্ড রেখে সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের যে ফর্মুলা প্রস্তুত করেছিলেন তা এই ক্যাবিনেট মিশনেরই অনুরূপ। স্বয়ং গান্ধী সেই ফর্মুলা পাঠ করে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন-- আমরা বছরের পর বছর ধরে চিন্তা করেও যে যৌক্তিক সমাধান বের করতে পারিনি, তা তুমি করে ফেলেছ। কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ সবাই সেই ফর্মুলাকে গ্রহণ করার কথা বলেছিলেন।
যথারীতি কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি সর্বসম্মতিতে মেনে নিল ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব।
সারাদেশে বয়ে গেল খুশির বন্যা।
কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো পরদিন এক সংবাদ সম্মেলনে জওহরলাল নেহরু ঘোষণা করে বসলেন-- কংগ্রেস ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব পুরোপুরি মেনে নেয়নি। তারা শুধু অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেবে, এটুকুই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেবে ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাবের আরো সংশোধন বা পরিমার্জন করা হবে কি না।
মওলানা আজাদ দ্ব্যর্থহীনভাবে জানাচ্ছেন-- এটি কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত ছিল না। ছিল একান্তভাবেই জওহরলালের নিজস্ব মতামত।
সারাদেশ থমকে গেল।
এখন কী করা যায়!
মওলানা আজাদ জওহরলাল নেহরুকে পরামর্শ দিলেন, পরদিন তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে সংবাদপত্রে একটি বিবৃতি দেওয়া উচিত। কিন্তু তা করতে জওহরলাল রাজি নন। তিনি একটি হাস্যকর যুক্তি দেখালেন। মাত্র কয়েকদিন আগে মওলানা আজাদের স্থলে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন। এখন ভুল স্বীকার করলে, তার মতে, কংগ্রেস নাকি দুর্বল হয়ে যাবে। জওহরলালকে সমর্থন জানালেন সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল এবং কট্টর হিন্দু কয়েকজন নেতা। অথচ এরাই কংগ্রেসের মিটিং-এ ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব গ্রহণের পক্ষে মত প্রকাশ করেছিলেন।
উল্লেখ্য সাত বছর একটানা সভাপতি থাকার পরে মওলানা আজাদ কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন ঐ বছরই। গান্ধীসহ সর্বস্তরের মানুষের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে কংগ্রেসের সভাপতি থাকতে রাজি হননি। এছাড়াও পরবর্তী সভাপতি হিসাবে তিনিই জওহরলাল নেহরুর নাম প্রস্তাব করেছিলেন।
পরে আজাদ আফসোসের সাথে স্বীকার করেছেন তার রাজনৈতিক জীবনে এই দুই সিদ্ধান্ত ছিল সবচেয়ে বড় ভুল। তার ভুলের কারণে প্যাটেলরা নেহরুকে দিয়ে ভারতবিভক্তির কাজটি সম্পন্ন করিয়ে নিতে পেরেছিলেন।
আগেই বলা হয়েছে, জিন্নাহ এবং মুসলীম লীগ মেনে নিয়েছিল ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব। কিন্তু জওহরলালের কথা শুনে জিন্নাহ বেঁকে বসলেন। তার কথা-- ব্রিটিশরা থাকতেই যদি হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব সংশোধনের কথা বলে, তাহলে স্বাধীনতার পরে তারা তো মুসলমানদের কোনো কথাই কানে তুলবে না।
জিন্নাহ তৎক্ষণাৎ ফিরে গেলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিতে।
ভারতর্বষকে অবিভক্ত রাখার শেষ প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হলো।
একমাত্র দোহাই-গ্রন্থ। ভারত স্বাধীন হলো। মওলানা আবুল কালাম আজাদ।