Published : 07 May 2026, 11:32 PM
শৈশব থেকেই তাঁকে চিনি। কিন্তু কখন তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা— কীভাবে পরিচয় তার কোনো স্পষ্ট স্মৃতি নেই, বরং ভাঙা ভাঙা শব্দের মতো হয়তো দূরের কোনো বাড়িতে কারও গলায় ভেসে আসা কবিতায়, হয়তো বৃষ্টিভেজা দুপুরে রেডিওর অস্পষ্ট তরঙ্গে, স্কুলের অ্যাসেম্বিলিতে কিম্বা মায়ের হাতের বই অথবা পাশের বাড়ির মেয়েটির কণ্ঠে, যে সুর ঠিকমতো ধরতে পারে না, তবু গেয়ে যায়—এইসব অসম্পূর্ণতার ভেতর দিয়েই তিনি প্রথম আমার ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন। আমার কাছে তিনি কোনো নির্দিষ্ট পাঠের অভিজ্ঞতা নন; বরং ধীরে জমে ওঠা এক অনুভব।
তিনি আমার ঘরের কেউ নন—
তবু ঘরের ভেতরের বাতাসে তাঁর অদৃশ্য চলাচল। সকালের আলো জানালায় এসে থামলে, পর্দা একটু কেঁপে উঠলে, কিংবা কোনো অকারণ বিষণ্ণতা হঠাৎ শরীরের ভেতর নেমে এলে—মনে হয়, তিনি খুব কাছেই কোথাও ছিলেন, এইমাত্র সরে গেলেন।
আমার নীরবতার নিজস্ব স্বরলিপি— যেন তাঁর ভাষা বোঝে। কখনো কখনো কোনো এক অচেনা বিকেলে, হঠাৎ যখন একটি পংক্তি কিম্বা সুর আমার কন্ঠনালির ভেতর দিয়ে হেঁটে যায়—মনে হয় যেন তা কোনো শব্দ নয়, বরং স্পর্শ; যা ধীরে ধীরে রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। এভাবেই আমি তাঁকে চিনি।
তিনি কখনোই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত নন—
তাঁকে নিজের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। তিনি অন্যের কণ্ঠে, অন্যের জীবনে, অন্যের ব্যথায় বারবার ফিরে আসেন।ট্রেনে যেতে যেতে—কালো রেশমের কাপড়ে আঁচল তোলা দোলন-চাঁপার মত মুখখানি ঘিরে, জীবনের ভারে নুয়ে পড়া ক্লান্ত উপেনের ভাঙা, অস্পষ্ট উচ্চারণে; আবার কোনো উত্তপ্ত দুপুরে বীরপুরুষের মত উজ্জীবিত কিশোরের সাহসে, কোনো দূর বিদেশিনীর সুমন্দ হাসিতে তিনি যেন এক উন্মুক্ত পরিসর — যেখানে প্রত্যেকে নিজের মতো করে প্রবেশ করে।
তিনি সবার, তবুও আমার।
তিনি সেই অন্তরঙ্গ সঙ্গী, যিনি নীরবতার ভেতরেও কথা বলেন।
যখন মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন তাঁর গানই হয়ে ওঠে আমার আশ্রয়—
কখনো শান্তির, কখনো প্রতিবাদের। কবিতায় তিনি অন্তর্মুখী, দার্শনিক, কখনো গভীর বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন। “গীতাঞ্জলি”থেকে “শেষের কবিতা” — যেন একেকটি ধ্যানমগ্ন দরজা, যা খুলে দেয় নিজের ভেতরের অজানা প্রান্তর। বলে দেয়—নিজেকে জানা মানেই বিশ্বকে জানা।
তাঁর প্রেম নিবিড়, তাঁর প্রেম মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি বাঁধতে চান না—বরং ছেড়ে দিয়ে আপন করে নিতে শেখান। তাই তিনি প্রতিটি যুগেই নতুন। তাঁর আধুনিক, মুক্ত ভাবনা, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সাথে স্রষ্টার সম্পর্ক নিয়ে তাঁর গভীর উপলব্ধি—সবই আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
তাঁর নাটকগুলোর ভেতরে এই ভাবনা যেন সবচেয়ে শরীরী অথচ প্রতীকী হয়ে ওঠে—কণ্ঠ, আলো, নীরবতা, চলাফেরা—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। যেখানে গল্প আছে, কিন্তু গল্পই মূল নয়; বরং আছে এক অভ্যন্তরীণ সময়—যেখানে চরিত্ররা শুধু কথা বলে না, ধীরে ধীরে নিজেদের খুলে দেয়; নাটকগুলো ধীরে ধীরে শুধু এগিয়েই যায় না—বরং গভীর হয়। যেমন “ডাকঘর”: অপেক্ষার ভেতরের মুক্তি। যেখানে অপেক্ষা মৃত্যুর প্রতীক—কিন্তু ভয়ের নয় বরং মুক্তির। “রক্তকরবী”: ক্ষমতা ও আকাঙ্ক্ষার অন্ধকার। “রাজা”: অদৃশ্যের সঙ্গে সংলাপ, “বিসর্জন”: বিশ্বাস বনাম মানবতা।
কিন্তু তিনি আমার কাছে প্রায়শই এক “সম্পূর্ণ” স্রষ্টা—যিনি সব জানেন, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখেন. তবু তাঁকে যেন পুরো জানা হয় না। এখনো তাঁকে খুঁজি। হয়তো তিনিও নিজেকে খুঁজেছেন।
তাঁর চিত্রকর্মগুলোর দিকে তাকালে এই খোঁজ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে তিনি অনিশ্চিত, অনুসন্ধিৎসু, কখনো অস্বস্তিকর। জীবনের গোধূলিবেলায় হঠাৎ শব্দ থেকে সরে গিয়ে এইভাবে আঁকায় ডুবে যাওয়া—এ কি কেবল নতুন শিল্পচর্চা? নাকি এক নীরব গতান্তর—শব্দের সীমা থেকে অন্য এক অভিব্যক্তির দিকে?
“যেখানে শব্দ থেমে যায়, সেখানে কি তাঁর আঁকা শুরু?”
হয়তো শব্দ তাঁর অনুভবের সম্পূর্ণতাকে ধরতে পারেনি। তাই তিনি খুঁজেছেন অন্য এক ভাষা—যার কোনো ব্যাকরণ নেই, কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থ নেই, কিন্তু আছে অদ্ভুত এক মুক্তি। তাঁর ছবিগুলো তাঁর লেখার মতো নয়—সেখানে সুরেলা ভারসাম্য নেই, নেই স্বচ্ছ বর্ণনা; বরং আছে অন্ধকার, অসম্পূর্ণতা—এক অচেনা জগৎ, যেখানে রেখাগুলো নিজেরাই কথা বলে।
তাই প্রশ্ন—এই পরিবর্তন কেন? সহজ উত্তর চাইলে হয়তো নিজেই একরকম এড়িয়ে যেতেন:
“সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে,
সহজ কথা যায় না বলা সহজে।”
ভাষা আসলে একটি সামাজিক চুক্তি। আমরা যা বলি, তা এমনভাবে বলি যাতে অন্যে বুঝতে পারে। কিন্তু আঁকার ক্ষেত্রে সেই দায় অনেকটাই সরে যায়। সেখানে শিল্পী নিজের অচেতন স্তরের আরও কাছে পৌঁছতে পারেন—শব্দের ব্যাখ্যাযোগ্যতার বাইরে গিয়ে। আর তাই যা প্রকাশ পায়, তা পুরোপুরি বোঝার জন্য নয়; বরং অনুভব করার জন্য। তাঁর শেষ জীবনের এই চিত্রকর্মগুলো হয়তো শব্দের আড়ালে তাঁর এক অন্য সত্তা—তাঁর অজানা মানসিক স্তরের এক “অজ্ঞাত” নিরীক্ষন, রঙ ও রেখার মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রকাশিত দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কোনো অনুভব—তাঁর নীরবতার নিজস্ব ভাষা। কবিতায় যে সংযত বিষণ্ণতা, যে নিয়ন্ত্রিত আবেগ—এখানে এসে তা এক অসংলগ্ন প্রায় স্বাপ্নিক জগৎ। কিন্তু এই স্বপ্ন শান্ত নয়। এর ভেতরে আছে এক অদ্ভুত অস্থিরতা, এক অব্যক্ত অস্বস্তি।
আর এই অস্বস্তিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ এখানেই তিনি আবার নতুন করে শুরু করেন, আবার শেখেন, আবার খুঁজে ফেরেন— জীবনের শেষ প্রান্তেও নিজেকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে দ্বিধা করেন না। এই সাহস—নিজেকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার এই শক্তি, এই প্রবণতাই—তাঁর সৃষ্টিকে আজও জীবন্ত করে রাখে। শেষের ভেতর থেকেও তিনি জন্ম দেন নতুন পথ—শব্দের পরে নীরবতায়, নতুন অর্থে, নতুন অনুভবে। তিনি আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন—আমার চেতনা, আমার অনুভবে। অজানার সামনে, একটি অসমাপ্ত রেখার পাশে। চেনা—অচেনা পথের ধারে, একটি দীর্ঘ প্রতিধ্বনির মতো—তিনি ‘আমার রবীন্দ্রনাথ।' যে থাকে অন্তরে—তবু তাঁকে খুঁজি, তবু তাঁর পথ চেয়ে থাকি—তাঁরই ভাষায় বলি—
“আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।”