Published : 23 Jan 2026, 07:02 PM
১. ভূমিকা: বশীর আল্হেলালের সাহিত্যিক অবস্থান
কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক–এই তিনটি প্রধান অভিধায় বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে পরিচিত ছিলেন বশীর আল্হেলাল। গবেষক হিসেবে তাঁর শ্রম, নিষ্ঠা, অনুসন্ধিৎসা শ্রদ্ধেয় ও অনুসরণীয়। আশির দশকে, আমাদের প্রাথমিক তারুণ্যে তাঁকে দেখেছি সবচেয়ে সক্রিয় কর্মকাল অতিক্রম করতে। দেখতে তিনি যেমন ছিলেন সৌম্যকান্তিময় তেমনি ছিল তাঁর স্মিত ও প্রসন্ন ব্যক্তিত্ব! জীবনবোধে, সৃষ্টিশীলতার স্বভাবে, পরিশ্রমী আত্মনিবেদনে ও নিঃশব্দ ধৈর্যে তাঁর ব্যক্তিত্ব এমনই প্রভাময় ছিল যে যে-কোন সংবেদনশীল মানুষেরই মনে তা ছিল সমীহ জাগানিয়া!
তাঁর কথাসাহিত্য পূর্ব-বাংলার সমাজস্বভাব ও সংগ্রামমুখরতার উত্থান-পতনে সঞ্জীবিত। গল্প, উপন্যাস, কিশোর-সাহিত্য, অনুবাদ, গবেষণা—সবগুলো ক্ষেত্রেই তাঁর সাহিত্যপ্রয়াস বিস্তৃত। বিশেষত ‘ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস’ (১৯৮৫) এবং ‘বাংলা একাডেমির ইতিহাস’ (১৯৮৬)—বইদুটি তাঁকে ইতিহাস-গবেষক হিসেবে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক, ইতিহাস-গবেষক কিংবা প্রাবন্ধিক-সমালোচক হিসেবে তিনি ছিলেন সমাদরণীয়। ৮৫ বছরের আয়ু পেলেও শেষের প্রায় বছর দশেক ক্রমস্মৃতিভ্রংশতায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছিলেন। বাংলা একাডেমিতে তিনি ছিলেন প্রাবন্ধিক আবদুল হকের সহকর্মী। আবদুল হক সম্পর্কিত আমার গবেষণাসূত্রে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলে ব্যক্তিগত আলাপে আমাকে নিজের সে অস্বস্তির কথা জানিয়েওছিলেন একদিন। তাঁর কাজের বিস্তারিত খোঁজ করতে গিয়ে মনে হলো, কাজের মধ্যেই ছিল তাঁর নিজের জীবন উপভোগের গভীরতা। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের শুভচিন্তায় নিজেকে রেখেছেন নিয়োজিত। ব্যক্তিজীবনে তাঁকে যেমন পরিশীলিত সাংস্কৃতিকতার অনুসারী থাকতে দেখেছি তেমনি তাঁকে মনে হয়েছে ন্যায্যতার বোধে চালিত একজন ব্যক্তি হিসাবে সক্রিয়। ভাষা কিংবা চিন্তা চর্চায় দক্ষতা অর্জনের বাহাদুরি তাঁর কাঙ্ক্ষিত ছিল না; তিনি চেয়েছিলেন চর্চার মধ্য দিয়ে উৎকর্ষে পৌঁছতে। অন্য দিকে সবসময়ের লক্ষ্য ছিল তাঁর বিচারের মানদণ্ড যেন সংকীর্ণ হয়ে না পড়ে। সে কারণেই হয়তো জীবনবোধের রূপান্তর পর্যবেক্ষণে তিনি বস্তুনিষ্ঠতার পথেই চলতে পেরেছিলেন। আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১) ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারের (১৯৯৩) মতো গুরুত্বপূর্ণ দুএকটি পুরস্কারে তিনি ভূষিত হলেও তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের যথেষ্ট বিচারমূলক আস্বাদন বা সমাদর হয়নি। কেবল তাই নয়, তিনি যে এতটা দায় কাঁধে নিয়ে ব্যাপ্ত হয়ে নিরন্তর কাজ করেছেন সে ব্যাপারে বাংলাদেশের সাহিত্য-সমাজ কৌতূহলও দেখায় নি তেমন একটা। এই ধরনের অঙ্গীকার বোধসম্পন্ন মানুষের অস্তিত্বকে যে আমাদের সাহিত্য-সমাজ এখনো আমলে নিতে শেখেনি এই উপলব্ধি ও দুঃবোধ নিয়েই বশীর আল্হেলালের জীবন ও কর্মের দিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি রাখার সামান্য চেষ্টা করেছি।
২. শৈশব–শিক্ষা–গঠনপর্ব
বশীর আল্হেলালের জন্ম ৬ জানুয়ারি ১৯৩৬, মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামে, এক পণ্ডিত মুসলিম পরিবারে। নিজের নামে সৈয়দ যুক্ত না থাকলেও তাঁরা ছিলেন সৈয়দ বংশের প্রতিনিধি। তাঁর বাবা সৈয়দ মুহাম্মদ আলী আসমার উত্তর ভারতের বিশিষ্ট একাধিক শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠ নিয়েছিলেন। সেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতাও করেছিলেন নিজের পাঠক্রম শেষে। তাঁর সাহিত্য চর্চার ভাষা ছিল আরবি ফারসি ও উর্দু; ছিলেন ইউনানি চিকিৎসকও। শিক্ষক ছিলেন বশীর আল্হেলালের পিতামহও! ফারসি ভাষায় কবিতা লিখে ছিলেন সুপরিচিত। বাঙালি সংস্কৃতি ও উত্তর ভারতের মুসলিম সাংস্কৃতিকতায় তাঁদের পরিবার ছিল সমৃদ্ধ। উত্তর ভারতজুড়ে আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষার বিখ্যাত পণ্ডিতের ছেলে নেয়ামাল বশীরের কপালে চন্দনবাটা দিয়ে হাতেখড়ি হয়েছিল। নেয়ামাল বশীর ছিল তাঁর পরিবার নির্ধারিত নাম। তাঁদের তিন ভাইয়ের নাম—নেয়ামাল ওয়াকিল, নেয়ামাল বাসির ও নেয়ামাল বশীর। ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। তাঁর অগ্রজ নেয়ামাল বাসিরও লিখতেন। ভাইয়ের নামের সঙ্গে পাঠকেরা তাঁর নাম গুলিয়ে ফেলতেন বলে একসময় নিজের নামটি বদলে বশীর আল্হেলাল করে নিয়েছিলেন।
বশীর আল্হেলালের শৈশব কেটেছিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় তাঁর জন্মগ্রাম তালিবপুরেই; ভাষাশহীদ আবুল বরকত ও গায়ক আব্দুল আলীমের মতো ব্যক্তিত্বও জন্মেছিলেন ঐ গ্রামেই। গ্রামের এইচ.ই. হাই স্কুলের প্রাইমারী সেকশনে তাঁর পড়াশোনার শুরু। চতুর্থ শ্রেণিতে মাসিক দুই টাকা বৃত্তিও পেয়েছিলেন। সেখানেই পড়াশোনা করেছেন ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত। ১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালে বশীর আল্হেলালের বড় দুই ভাই পূর্ব-বাংলায় চলে আসেন। কিছু দিন পর তিনিও আসেন পূর্ব-বাংলার রাজশাহীতে; মেজ ভাই নেয়ামাল বাসিরের কাছে। সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ হাই স্কুলে ১৯৪৯ সালে। সেই সেতাবগঞ্জ হাই স্কুলে থেকেই ১৯৫১ সালে মেট্রিক পাশ করেন।
দেশভাগের পর বশীর আল্হেলালের দুই ভাই তৎকালীন পাকিস্তানে থেকে গেলেও ১৯৫২ সালে তিনি ফিরে যান জন্মভূমি পশ্চিমবঙ্গে। সে সময় পাকিস্তানে যাওয়া-আসার জন্য ভিসা লাগতো না বলে যাওয়াা আসা ছিল আগের মতোই বাধাহীন। কলকাতায় মামাদের ব্যবসা ছিল। সেই সূত্রেই কলকাতায় মামাদের বাসায় বাস করতে থাকেন মায়ের সঙ্গে। ভর্তি হন কলকাতার সরকারি কলেজে। ১৯৫৪ সালে এই কলেজ থেকে আই.এ. পাশ করেন দ্বিতীয় বিভাগে। এরপর তিনি বাংলায় অনার্সে ভর্তি হন জলপাইগুড়ির আনন্দচন্দ্র কলেজে। পশ্চিমবঙ্গের গৌতম গুহ রায়ের ভাষায়,
পঞ্চাশের জলপাইগুড়ি সুবর্ণখচিত সময় নিয়ে উজ্জ্বল। দেবেশ রায়, সুরজিৎ দাশগুপ্ত, অশ্রুকুমার সিকদার, অর্ণব সেন, অমিতাভ দাশগুপ্ত, সুরজিত বসু, কার্তিক লাহিড়ী, ভবানী সরকার প্রমুখ তখন এই শহরের মানুষ। একই আড্ডার, এবং স্পষ্টতই সবাই বামপন্থী আদর্শের সৃজনসেনা। বশীর আল্হেলালরা থাকতেন নবাববাড়ি সংলগ্ন মুর্শিদাবাদ হাউসে, পরে স্টেশন রোডে।
ফেসবুক পোস্ট, সোমবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় বিভাগে অনার্স পাশ করেন এই কলেজ থেকেই। আবার কলকাতায় ফিরে যান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় এম.এ. ক্লাসে ভর্তি হন ১৯৫৮ সালে। ওই সময়ই যুক্ত হন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে। এক পর্যায়ে কলকাতা কমিউনিস্ট পার্টিরও সদস্য হন এবং পার্টির কর্মী হিসাবে অর্জন করেন লাল কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা। রাজনীতির কর্মী হতে গিয়েই যেন সমাজ ও মানুষের পাঠ নেয়ার দীক্ষা হয় তাঁর। এই দীক্ষা তাঁর জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছিল। গুরুত্ব দিয়ে লেখালেখিরও শুরু মূলত এই দেখা থেকেই। ১৯৬০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বাংলায় এম.এ. পাশ করেন তিনি।
৩. বাংলা একাডেমি ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব
১৯৬৯ সালে যোগ দেন বাংলা একাডেমিতে সহ-অধ্যক্ষ পদে; পরে যথাক্রমে উপ-অধ্যক্ষ ও পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় ২৪ বছর বাংলা একাডেমিতে দায়িত্ব পালন করে অবসর নেন ১৯৯৩ সালে। বাংলা একাডেমিতে তাঁর কর্মরত থাকার কালে তাঁকে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যবোধের অনুকূল প্রকৃতই দায়িত্বশীল একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বাংলা একাডেমির কর্মপরিচালনায়, নীতিনির্ধারণে, বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশে ও সমকালীন বিতর্ক মোকাবেলায় তাঁর ভূমিকা মঞ্চের পাদপ্রদীপের আলোয় থাকা প্রদর্শনবাদীদের মতো ছিল না; বরং তাঁর ভূমিকা ছিল অন্তঃশীল দায়িত্ববানের। তাঁর সযত্ন তত্ত্বাবধানের কারণে বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চার অনেক প্রয়োজনীয় বই প্রকাশিত হয়েছিল মানসম্পন্ন হয়ে। বাংলা একাডেমি থেকে ভাষা-আন্দোলনের ও বাংলা একাডেমির ইতিহাস লিখবার দায়িত্ব তাঁকে দেয়ার পেছনে তাঁর ব্যক্তিত্বের এই দায়িত্বশীলতাই ছিল মূল কারণ।
প্রসঙ্গত বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের লেখকদের ছোটগল্পের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সংকলন ‘বাংলাদেশের ছোটগল্প’ (১৯৮৪) বইটির কথা মনে পড়ছে। বশীর আল্হেলাল ছাড়াও এর সম্পদক মণ্ডলীতে ছিলেন আবু জাফর শামসুদ্দীন, সরদার জয়েনউদ্দীন, হাসান হাফিজুর রহমান, রাহাত খান, আসাদ চৌধুরী, রশীদ হায়দার, সুব্রত বড়ুয়া এবং এ. কে. এম. হাবীবুল্লাহ খোন্দকার। শেষোক্ত জন ছিলেন সম্পাদনা পরিষদের আহ্বায়ক! গল্প নির্বাচনে সকলেরই সম্মিলিত ভূমিকা থাকলেও গল্পের ও লেখকদের পরিচয় তুলে ধরার জন্য জরুরি ভূমিকাটি লিখবার দায়িত্ব কিন্তু পড়েছিল বশীর আল্হেলালের ওপরই! দীর্ঘ ভূমিকাটিতে সংকলিত প্রতিটি গল্পের ও তার লেখকের বৈশিষ্ট্য চিহ্নগুলো অতি সংক্ষেপে কিন্তু স্পষ্ট করে তুলে ধরেছিলেন তিনি। সামগ্রিক দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ছোটগল্প লেখকদের রচনাকে দেখার ভঙ্গি হিসাবেও এই ভূমিকার গুরুত্ব রয়েছে!

৪. গল্পকার হিসেবে পরিচয়
বশীর আল্হেলালের নাম আমি ছোটবেলা থেকেই জানতাম তাঁর ‘আনারসের হাসি’ বইটির জন্য। জানতাম যে এই লেখক ছোটদের জন্য নিয়মিত গল্প লেখেন! পরে একটু বড় হয়ে যখন ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র পাঠক হই, তখন, আশির দশকের শুরুর দিকের এক ঈদসংখ্যা ‘বিচিত্রা’য় পড়ি তাঁর ‘ঘৃতকুমারী’ উপন্যাস! বিভিন্ন পত্রিকায় মাঝে মাঝে গল্পও দেখেছি। তবে ‘ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস’ বইটি বের হবার আগে পর্যন্ত তাঁর গবেষক পরিচয় সম্পর্কে জানা ছিল না তেমন। বর্তমান রচনার জন্য তাঁর রচনাবলি ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে দেখলাম লেখকজীবনের শুরুতে তিনি মূলত কল্পনামুখ্য সাহিত্যেরই চর্চা করতেন। বড়দের এবং ছোটদের মিলিয়ে ৫টি গল্প-সংকলন ও ৭টি উপন্যাস দিয়ে যদি তাঁর কথাসাহিত্যিক সত্তাকে সূত্রবদ্ধ করতে চাই তাহলে বলা যায়, বশীর আল্হেলাল গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবে মূলত মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনসংকট, সামাজিক রূপান্তর, গ্রামীণ-শহুরে দ্বন্দ্ব এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অস্থির বাস্তবতাকে গভীর মানবিক দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। তাঁর গল্পে দেখা যায় সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র অথচ তীব্র অভিজ্ঞতার সূক্ষ্ম রূপায়ণ; ক্ষুধা, বঞ্চনা, শ্রম, স্বপ্ন, ভয়ের মতো দৈনন্দিন বাস্তবতার অন্তর্লিখিত টানাপড়েন। অন্য দিকে উপন্যাসে তিনি বৃহত্তর সময়-ইতিহাসের অভিঘাতকে ব্যক্তিজীবনের ভেতর প্রবাহিত করেছেন। ‘কালো ইলিশ’, ‘শেষ পানপাত্র’ বা ‘ঘৃতকুমারী’ উপন্যাসে স্বাধীনতা-উত্তর সমাজের দ্রুত পরিবর্তন, নগরায়ণ, শ্রেণি-সংঘাত ও মানসিক অস্থিরতা একদিকে যেমন ধরা পড়ে, অন্যদিকে ‘জীবনের সুখ’ বা ‘নূরজাহানদের মধুমাস’–এ মানবসম্পর্ক, নারী-পুরুষের অভিজ্ঞতা, গ্রামীণ জীবনের ধীর ছন্দ ও সময়ের গভীরতা এক মহাকাব্যিক বিস্তারে ফুটে ওঠে। সবক্ষেত্রেই তাঁর ভাষা সংযত, বর্ণনা মিতব্যয়ী; কিন্তু চরিত্র নির্মাণে রয়েছে গভীর সহানুভূতি ও মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা। ফলে একই সঙ্গে তিনি সময়ের দলিলকার, মানবজীবনের ব্যাখ্যাকার এবং সমাজ-ইতিহাসের নীরব পর্যবেক্ষক। অর্থাৎ একজন পরিণত কথাসাহিত্যিক হিসেবে চিহ্নিত করার মতো অনেক কিছুই রয়েছে তাঁর গল্প-উপন্যাসে।
গল্প-সংকলন ‘স্বপ্নের কুশীলব’ (১৯৬৭) বইটির কথা আগেই উল্লিখিত হয়েছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পরই বের হলো যথাক্রমে ‘প্রথম কৃষ্ণচূড়া’ (১৯৭২), ‘আনারসের হাসি’ [কিশোর গল্প-সংকলন] (১৯৭৪), ‘বিপরীত মানুষ’ (১৯৭৭), ‘ক্ষুধার দেশের রাজা’ (১৯৮২), গল্পসমগ্র, প্রথম খণ্ড, (২০০৯), আরেকটি বইয়ের নাম পেয়েছি ‘কাণ্ডারী’(২০১৪)’, বইটি ছোটদের গল্পের। একটি গল্প অনেকগুলো আঁকা ছবি দিয়ে বিন্যস্ত!
‘স্বপ্নের কুশীলব’ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলো হলো, ‘প্রাণের আকুতি’, ‘ঢেঁকিশালের স্বপ্ন’, ‘নির্বাসিত রাজপুত্র’, ‘ছুটন্ত জঙ্গলে’, ‘আবদুল্লা-পত্নীর কাহিনী’, ‘আসমান মঞ্জিল’, ‘স্বপ্নের কুশীলব’, ‘দিন ফুরোনোর আগে’, ‘কলির যৌবন’, ‘কারিগর’ ও ‘ময়না’।
‘ক্ষুধার দেশের রাজা’ (১৯৮২) বইয়ে রয়েছে ১০ টি গল্প। গল্পগুলো হলো, ‘রক্তে সোনার ব্যাঙ্ক’, ‘প্রাগৈতিহাসিকদের সমস্যা’, ‘কাঙাল’, ‘ক্ষুধার দেশের রাজা’, ‘নদীর হোটেল’, ‘হাওয়াই-ব্রিজ’, ‘বিদ্যের হাঁস’, ‘কবির পৃথিবী’, ‘ধরণের মাশুল’, ‘পাতা কুড়ানোর দল’।
৫. উপন্যাসে সমাজ-ইতিহাসের রূপান্তর
তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসগুলো হচ্ছে ‘কালো ইলিশ’ (১৯৭৯), ‘ঘৃতকুমারী’ (১৯৮৪), ‘শেষ পানপাত্র’ (১৯৮৬), ‘নূরজাহানদের মধুমাস’ (১৯৮৮), ‘শিশিরের দেশে অভিযান’ (১৯৯০), ‘যে পথে বুলবুলিরা যায়’ (২০১৪) ‘জীবনের সুখ’ (২০১৫), ধারাবাহিক প্রকাশ শুরু হয়েছিল ফজলুল আলম সম্পাদিত ‘সহস্রাব্দ’ পত্রিকায় ২০১১ সালে)।
বশীর আল্হেলাল তাঁর সময়ের উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিক। আমাদের তরুণ বয়সে তাঁকে কথাসাহিত্যিক হিসাবেই চিনতাম। তাঁর উপন্যাসগুলো গড়ে উঠেছে মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট, সামাজিক পরিবর্তন, নগরায়ণ, শ্রেণিবিভেদ, গ্রামীণ জীবনের শহুরে রূপান্তরকে কেন্দ্র করে। একটি কিশোর উপন্যাসসহ তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসসংখ্যা ৭টি।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল সামাজিক বাস্তবতা ‘কালো ইলিশ’ (১৯৭৯) উপন্যাসের কেন্দ্রে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, এবং সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসা অনিশ্চয়তার আবহ এখানে ঘনীভূত। বশীর আল্হেলাল এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন—স্বাধীনতার স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংঘর্ষ কীভাবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ক্ষতবিক্ষত করে। চরিত্রগুলো ব্যক্তিগত সংকটের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর জাতীয় সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। উপন্যাসটি যেন এক অস্থির সময়ের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক দলিল।
‘ঘৃতকুমারী’ (১৯৮৪) উপন্যাসে লেখক মানুষের অন্তর্গত ক্ষত, দহন ও নিরাময়ের প্রতীক হিসেবে ‘ঘৃতকুমারী’ বা অ্যালোভেরার রূপক ব্যবহার করেছেন। এক ধরনের নিম্নস্বর, সংযত ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন গ্রামীণ-শহুরে জীবনের দ্বন্দ্ব, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপড়েন, এবং ব্যক্তিগত বেদনার স্তরগুলোকে। চরিত্রগুলো এখানে বাহ্যিকভাবে সাধারণ, কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ জগৎ গভীরভাবে জটিল। বশীর আল্হেলালের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এই উপন্যাসে বিশেষভাবে উজ্জ্বল।
‘শেষ পানপাত্র’ (১৯৮৬) স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, শ্রেণি-সংঘাত, ভূমিদস্যুতা, এবং মধ্যবিত্তের ভয়ের এক জীবন্ত দলিল। কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র আবদুল আজিজ একজন ভীতু, দ্বিধাগ্রস্ত, মধ্যবিত্ত স্কুলশিক্ষক; তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এখানে সামাজিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। গ্রাম-শহরের সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, এবং পরিবর্তনের অভিঘাত এখানে অত্যন্ত বাস্তবভাবে ফুটে উঠেছে। উপন্যাসটি একদিকে সময়ের ইতিহাস, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত মানসিকতার অন্তর্লিখিত নকশা।
‘নূরজাহানদের মধুমাস’ (১৯৮৮) উপন্যাসে নারীর জীবন, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক বাস্তবতার জটিলতা এক সূক্ষ্ম বর্ণনায় উঠে আসে। বশীর আলহেলাল এখানে নারীর অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে একটি আবহমান বাঙালি সমাজের প্রতিচিত্র নির্মাণ করেছেন। ‘মধুমাস’ শব্দটি যেমন রোমান্টিকতার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে জীবনের কঠিন সত্য, সীমাবদ্ধতা ও সংগ্রাম। নারী-পুরুষ সম্পর্ক, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত স্বপ্ন—সব মিলিয়ে উপন্যাসটি এক বহুমাত্রিক মানবিক কাহিনি।
‘যে পথে বুলবুলিরা যায়’ (২০১৪) উপন্যাসে বশীর আল্হেলাল মানুষের স্বপ্ন, যাত্রা, এবং জীবনের অনিশ্চয়তাকে এক ধরনের কাব্যিক বর্ণনায় ফুটিয়ে তুলেছেন। শিরোনামেই আছে এক ধরনের রূপক—বুলবুলির পথ মানে এমন এক যাত্রা, যা দৃশ্যমান নয়, কিন্তু অনুভবযোগ্য। চরিত্রগুলো এখানে জীবনের অর্থ খুঁজতে থাকে, কখনো ব্যর্থ হয়, কখনো নতুন পথ খুঁজে পায়। মানবিকতা, সম্পর্ক, এবং সময়ের প্রবাহ—এই তিনটি উপাদান উপন্যাসটিকে নির্মাণ করে।
‘জীবনের সুখ’ (২০১৫) তাঁর অন্যতম বৃহৎ ও পরিণত উপন্যাস। একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত এক বিস্তৃত মানবজগৎ। তরুদণ্ডি গ্রামের মানুষ, তাদের সম্পর্ক, সংঘাত, প্রেম, বেদনা, ধর্মীয়-সামাজিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে উপন্যাসটি একটি ক্ষুদ্র সমাজের মহাকাব্যিক প্রতিচ্ছবি। লেখক নিজেই বলেছেন, উপন্যাসটির নায়িকা আছে, কিন্তু নায়ক নেই—অর্থাৎ পুরুষ চরিত্রগুলো সমষ্টিগতভাবে উপস্থিত হলেও কাহিনির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক নারী। গ্রামীণ জীবনের ধীর-স্থির ছন্দ, সময়ের প্রবাহ, এবং মানুষের অন্তর্গত পরিবর্তন—সব মিলিয়ে এটি তাঁর সবচেয়ে পরিণত রচনাগুলোর একটি।
৬. গবেষক আল্হেলাল
বশীর আল্হেলালের দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা টের পাওয়া যায় তাঁর গবেষণাকর্মে। ভাষা-ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ, এবং প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস রচনায় তিনি বিজ্ঞানদৃষ্টি তথা পূর্বধারণামুক্ত মন নিয়ে বিচার করেছেন। তাঁর রচিত গবেষণাধর্মী ইতিহাসগ্রন্থ ‘ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস’ (১৯৮৫) এবং ‘বাংলা একাডেমির ইতিহাস’ (১৯৮৬) যেমন পরিশ্রমী তেমনই অনুসন্ধান ও উপস্থাপন নিপুণতার দৃষ্টান্ত। ৮০০ পৃষ্ঠার ‘ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস’ ভাষা-আন্দোলনের সবচেয়ে বিস্তৃত, সুশৃঙ্খল ও প্রামাণ্য দলিলনির্ভর বই। প্রেক্ষাপট, দলিল, সাক্ষাৎকার, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, ভাষা-আন্দোলনের সমাজ-মনস্তত্ত্ব, বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ এতে নির্মোহভাবে বিবেচিত হয়েছে।
আর ‘বাংলা একাডেমির ইতিহাস’ (১৯৮৬) বইটি বাংলা একাডেমির জন্ম, বিকাশ, সাংগঠনিক কাঠামো, সাংস্কৃতিক ভূমিকা—সবকিছু নিয়ে একটি সামগ্রিক ও বিস্তৃত ইতিহাস। এই দুটি ইতিহাসধর্মী বই লিখবার জন্য প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ক্রমপরম্পরা রচনা করতে যে কতটা অভিনিবেশ প্রয়োজন তা কেবল এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীরাই অনুধাবন করতে পারবেন। এমনকি বইটির উৎসর্গপত্রেও তিনি পরিচয় দিয়েছিলেন নিজের ইতিহাস চেতনার গভীরতার! বইটি উৎসর্গ করেছিলেন বাংলা একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বাংলা একাডেমির প্রথম রূপকার স্পেশাল অফিসার মুহম্মদ বরকতউল্লাহ এবং বাংলা একাডেমিকে যিনি জাতির স্বপ্নসৌধরূপে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন বাংলা একাডেমির সেই প্রথম পরিচালক ড. মুহম্মদ এনামুল হকের পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশে!
প্রবন্ধ ও সমালোচনামূলক অন্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে, ‘সাম্প্রতিক কবি সাম্প্রতিক কবিতা’ (১৯৭৫) বইটি; পরের সংস্করণে অবশ্য নাম বদলে হয় ‘আমাদের কবিতা’। তাঁর একটি প্রবন্ধ-সংকলন আছে, নাম ‘আমাদের বিদ্বৎসমাজ’ (২০০৬)। এই বইটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ; আরেকটি প্রবন্ধ-সংকলনের নাম ‘তাঁদের সৃষ্টির পথে’ (১৯৯৩)।
‘আমাদের বিদ্বৎসমাজ’ বইয়ের প্রবন্ধগুলির প্রথম প্রকাশের স্থান-কাল থেকে তাঁর পঠন পাঠন ও সমাজ-রাষ্ট্র-সংস্কৃতি ভাবনার স্বরূপ অনুভব করা যায়। প্রবন্ধগুলোর নাম ‘“গদ্য-পদ্যের দ্বন্দ্ব”–বাংলা একাডেমীর অন্যতর একুশের সংকলন 'নিবেদন' (১৯৮৩); 'সংস্কৃতির মন্দ দিক'–কলকাতার 'চতুরঙ্গ' (জুলাই ১৯৮৬); 'ঢাকা বাংলা সংস্কৃতির রাজধানী হবে?'–'দৈনিক আজকের কাগজ' (১৯ নভেম্বর ১৯৯৯); নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ'–'দৈনিক জনকণ্ঠ' (২৫ মে ১৯৯৩); 'বাংলা গদ্যের বিকাশ ও মুসলমান সাহিত্য-সমাজ'– ত্রৈমাসিক 'উত্তরাধিকার' (জুলাই-সেপটেম্বর ১৯৯৫); ‘আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ'–'দৈনিক জনকণ্ঠ' (৬ অকটোবর ১৯৯৫); 'সাহিত্যের স্বাধীনতা'–দৈনিক 'ভোরের কাগজ' (১৪ এপ্রিল ১৯৯৬); 'সাহিত্যে আধুনিকতার দরকার ছিল না'–দৈনিক 'ভোরের কাগজ' (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭); ‘বিদ্যাসাগর ও বাংলা গদ্য'–'মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা' (ত্রয়োদশ বর্ষ, ১ম সংখ্যা, এপ্রিল-জুন ১৯৯৭); 'মীর মশাররফ হোসেনের মূল্যায়নের সমস্যা'–পাক্ষিক 'শৈলী' (১৬ নভেম্বর ১৯৯৭); 'আমাদের বিদ্বৎসমাজ'–পাক্ষিক 'শৈলী' (১ জুলাই ১৯৯৮); 'অনুকরণ আধুনিক নয়'– দৈনিক 'প্রথম আলো' (১৪ এপ্রিল ১৯৯৯); 'স্বাধীনতার স্মারক উৎসব ও রবীন্দ্র-ইকবাল-বঙ্কিম-নজরুল'–দৈনিক 'প্রথম আলো' (১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৯)।
এ ছাড়াও রয়েছে বাংলা ভাষা সম্পর্কিত গবেষণাধর্মী বই ‘প্রশাসনিক পরিভাষা’ (১৯৭৫), ‘বাংলা গদ্য’ (১৯৮৫), ‘আদর্শ বাংলা বানান’ (১৯৯০), ‘বাংলা উচ্চারণ’ (২০০১), ‘বাংলা ভাষার নানান বিবেচনা’ (২০০১) ও ‘কিশোর বাংলা উচ্চারণ মঞ্জরী’ (২০০২)। ভাষা বিষয় ছাড়াও তিনি সমাজ রাজনীতি বিষয়ে প্রচুর লিখেছেন। ‘‘মৌলবাদ কি? মৌলবাদী কারা?’ (২০০০) তাঁর রচিত এই ধারার বই।

৭. ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস: একটি মূল্যায়ন
ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসচর্চায় পথিকৃৎ বলে বদরুদ্দীন উমরের নাম এতটাই নিনাদিত যে বশীর আলহেলালের কাজটিকে সমনোযোগ পর্যালোচনা করে দেখা হয়নি। বইটিতে রয়েছে অনেক অজানা ও দুষ্প্রাপ্য তথ্যের সমাহার। প্রসঙ্গত বদরুদ্দীন উমরের 'পূর্ব বাঙলার ভাষা-আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি' বইটির সঙ্গে বশীর আল্হেলালের বইটির পার্থক্য হলো, উমর প্রধানত তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি এবং 'সাপ্তাহিক নও-বেলাল' পত্রিকার ওপর নির্ভর করেছেন। ফলে তাঁর বয়ান নিজের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণ ধারায় চলছে। পথিকৃৎ রচনা বলে ইতিহাসের অনুসন্ধিৎসু পাঠকের মনে এমনই অভিঘাত সৃষ্টি করে রেখেছে যে বশীর আল্হেলালের অনুসন্ধিৎসার দিকে উল্লেখযোগ্য মনোযোগ পড়েনি। তাঁর বইয়ে 'সাপ্তাহিক ইত্তেফাক', 'আনন্দবাজার পত্রিকা'সহ বিভিন্ন পত্রিকা এবং আরো অনেক দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য দলিলপত্রের ব্যবহার আছে। ভূমিকা থেকে জানা যায়, 'তথ্য-সংগ্রহে হাত দিয়ে হঠাৎ দেখি, একটি অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্য অপেক্ষা করছিল। দেখা গেল, আমার সর্বাগ্রজ জনাব নেয়ামাল ওয়াকিল-এর সংগ্রহেই রয়েছে দুর্লভ বেশকিছু পত্রপত্রিকা, যার মধ্যে রয়েছে 'সাপ্তাহিক ইত্তেফাক'-এর মস্ত সংগ্রহ, এবং ভাষা-আন্দোলনের কিছু দুর্লভ প্রচারপত্র, পুস্তিকা ও অন্যান্য দলিল। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর আরো মূল্যবান সংগ্রহ কীটদষ্ট হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। তবু তাঁর এই অমূল্য সংগ্রহের সন্ধান না পেলে এ-ইতিহাস আরো অপূর্ণ থেকে যেত।'
প্রসঙ্গত ভাষা-আন্দোলন গবেষক এম আবদুল আলীমকে উদ্ধৃত করা যায় এভাবে,
বশীর আল্হেলাল অন্যান্য ইতিহাসকারের মতোই মূলত ঢাকার ভাষা-আন্দোলনকে তাঁর 'ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস' গ্রন্থে স্থান দিলেও অপরাপর গ্রন্থগুলো থেকে তাঁর গ্রন্থটি অনেকটাই পূর্ণাঙ্গ চরিত্রের। বদরুদ্দীন উমর গুরুত্ব দিয়েছেন ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তানের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর, সেগুলোর সঙ্গে ভাষা-আন্দোলনকে স্থান দিয়েছেন; পক্ষান্তরে বশীর আল্হেলাল ভাষা-আন্দোলনকেই কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন। বশীর আল্হেলাল তাঁর ‘ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস' গ্রন্থটিকে দশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। প্রথম অধ্যায়ে ভাষা-আন্দোলনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছেন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে স্থান দিয়েছেন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। তৃতীয় চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে ১৯৪৭সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা-আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে বায়ান্ন-উত্তর কালের একুশের চেতনা লালন এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিস্তার সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। বাংলা ভাষা ও বর্ণ সংস্কারে মুসলিম লীগ সরকারের অপপ্রয়াসের বিস্তারিত বিবরণ তথ্যপূর্ণভাবে তুলে ধরেছেন। সবমিলিয়ে গ্রন্থটি ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেছে। যতটা সম্ভব নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। কাউকে অধিক মূল্যায়ন আবার কাউকে অবমূল্যায়ন কোনোটিই তিনি করেননি; বরং ইতিহাসে যাঁর যা ভূমিকা তার অনুপুঙ্খ বয়ান হাজির করেছেন। একেবারে ত্রুটিমুক্ত না হলেও ইতিহাসকে সাধ্যমতো নিরপেক্ষ রূপদানে তিনি সচেষ্ট হয়েছেন। নিজের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করতে তিনি এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করেননি। ঢাকার বাইরের ভাষা-আন্দোলনকে 'ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস'-এ স্থান দিতে না পারায় তিনি এক ধরনের মনোকষ্ট বোধ করেছেন এবং অনাগতকালের কোনো গবেষকের ওপর সে দায়িত্ব বর্তিয়ে স্বস্তি খুঁজেছেন। তিনি লিখেছেন : 'মনের মঞ্চে ফাঁকা-ফাঁকা একটা ভাবের দুঃখ নিয়ে গবেষণাই বলুন আর ইতিহাস বলুন, শেষ করেছিলাম। মনকে বুঝ দিয়েছিলাম, মফস্বলের ইতিহাস অন্য কেউ লিখছেন, লিখবেন। এভাবে আমি আমার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লেখার কাজ শেষ করেছিলাম ওই অতৃপ্তি নিয়ে যে, মফস্বলের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বাদ থাকল।'
–[রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস চর্চায় বশীর আল্হেলাল, এম. আবদুল আলীম, বাংলা ট্রিবিউন, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১]
এই ইতিহাস রচনায় তিনি সমকালীন পত্রপত্রিকা ও বইয়ের সাহায্য যেমন নিয়েছেন তেমনি মীমাংসায় পৌঁছার চেষ্টা করেছেন সন্দেহজনক তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সূক্ষ্ম ও নির্মোহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারিতে মোহাম্মদ সালাহুদ্দীনের শহীদ হওয়া নিয়ে পরদিন পত্রিকায় যে খবর প্রকাশিত হয়েছিল তা যে ভুল ছিল, ওই নামে কেউ যে প্রকৃতপক্ষে শহীদ হননি, সে ব্যাপারে যখন তিনি তথ্য প্রমাণের দ্বারা নিশ্চিত হন তখন দ্বিতীয় সংস্করণ প্রস্তুতের সময় সে তথ্য সংশোধন করে দেন। একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভাঙার ব্যাপারে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা নিয়েও যে বিভ্রান্তি প্রচারিত ছিল, তারও একটি যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা তাঁর বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে রয়েছে। কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মুজফ্ফর আহমদকে নিয়ে তমদ্দুন মজলিশের নেতাদের উত্থাপিত অভিযোগ যে ঠিক নয় তিনি হাজির করেছেন তার প্রমাণও। ভাষা আন্দোলনের আদি পর্বে আবদুল হকের ঐতিহাসিক ভূমিকারও যথাযথ মূল্যায়ন তিনি করেছেন এই বইয়ে। তাঁর মনোযোগ ছিল ভাষা-আন্দোলনের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণেও। বিশেষত, তাঁর মনোযোগ এড়ায়নি যে, পক্ষের শক্তির মধ্যেই তিনি অনুভব করেছেন নানা রকম শ্রেণি-বৈশিষ্ট্য। এর সূক্ষ্মতর ব্যাখ্যায়ও গবেষকসুলভ নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। সামগ্রিক অর্থে ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস ও তাৎপর্য যে কেবল ভাষা-আন্দোলনের কালসীমাতেই থেমে নেই, এর প্রভাব যে কালাতিক্রমী–সেই মর্মবাণীটি তাঁর এই বইয়ে ফুটে উঠেছে। পাঠকেরা বাঙালি সংস্কৃতির একটি সামগ্রিক রূপ অনুধাবনেও সমর্থ হবেন এই বই থেকে–এটাও এই বইয়ের একটি বড় দিক।
'ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস' বইটি ছাড়াও ভাষা-আন্দোলন বিষয়ে তিনি রচনা করেছিলেন 'ভাষা-আন্দোলনের সেই মোহনায়' (২০০৩) শিরোনামের আরেকটি বই। তাঁর ভাষা-আন্দোলন বিষয়ের বই নতুন প্রজন্মের গবেষকদেরও কৌতূহলী করে তুলবে।
৮. কিশোর সাহিত্য ও অনুবাদ
সহজ ভাষা, রসবোধ, মানবিকতা—এই তিন গুণে তাঁর কিশোর সাহিত্য আলাদা। ‘আনারসের হাসি’ (১৯৭৪), কিশোর সাহিত্য সংরূপের মধ্যে রয়েছে গল্প-সংকলন ‘আনারসের হাসি’ (১৯৭৪) ও কিশোর উপন্যাস ‘শিশিরের দেশে অভিযান’ (১৯৯০)। কল্পনাগৌন রচনার মধ্যে রয়েছে ‘আদর্শ বাংলা বানান’ (১৯৯০), ‘বাংলা উচ্চারণ’ (২০০১), ‘বাংলা ভাষার নানান বিবেচনা’ (২০০১) নামের বইগুলো। সবধরনের পাঠকের কাজে আসলেও এগুলো প্রধানত কিশোরদেরই উপযোগী। তবে ‘কিশোর বাংলা উচ্চারণ মঞ্জরী’ (২০০২) বইটি ছোটদের কথা মাথায় রেখেই লেখা। ‘বিষাদসিন্ধু’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘জীবন-ক্ষুধা’–ছোটদের জন্য এই তিনটি ক্ল্যাসিক সাহিত্যের তিনটি সহজসংস্করণও রচনা করেছিলেন তিনি। ছোটদের গল্পের বই ‘আনারসের হাসি’তে (১৯৭৪) সংকলিত হয়েছে ৭টি গল্প। গল্পগুলো হলো, ‘প্রাণ-ভোমরা’, ‘আনারসের হাসি’, ‘নিষ্ঠুর’, ‘ভাগ্যবান শিয়ালের গল্প’, ‘মোড়ল মোরগ’, ‘কাণ্ডারী’, ‘শক্ত ফুপা’।
‘শিশিরের দেশে অভিযান’ (১৯৯০) মূলত কিশোর-কিশোরীদের জন্য লেখা এক রোমাঞ্চধর্মী উপন্যাস, যেখানে শিশুমন, পারিবারিক সম্পর্ক, এবং কৌতূহল-চালিত অভিযাত্রা মিলেমিশে এক প্রাণবন্ত জগৎ তৈরি করেছে। বশীর আল্হেলাল এখানে শিশুর দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তুলে ধরেছেন তাদের আনন্দ, ক্ষোভ, কল্পনা, এবং বাস্তবতার সংঘর্ষকে সহজ অথচ গভীরভাবে। ভাষা ও বর্ণনার সরলতা এই উপন্যাসকে পাঠযোগ্য ও স্মরণীয় করে তুলেছে।
বাংলা ভাষার একজন সাহিত্যিক হিসেবে এই ভাষাটিকে বড় ভালোবাসতেন তিনি। বাংলা ভাষার বানান, উচ্চারণ, ভাষিক প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, ব্যাকরণের নানা খুঁটিনাটি বিষয়ে তিনি ভাবতেন। এ বিষয়ে একেবারে কম লেখেননি। 'আদর্শ বাংলা বানান: নিয়ম ও শব্দকোষ', 'বাংলা ভাষার নানান বিবেচনা', 'বাংলা উচ্চারণ' বইগুলো তার ভাষাভাবনা ও ভাষাসংবেদনার স্মারক হয়ে থাকবে। 'কিশোর বাংলা উচ্চারণ মঞ্জরি' বইটি কেবল কিশোর-কিশোরীদেরই জন্যে রচিত হলেও বয়স্ক পাঠক-পাঠিকাদেরও পাঠ্য হতে পারে। বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, ভাষা-আন্দোলন, বাংলা একাডেমি বশীর আল্হেলালের জীবনচর্যার অংশ ছিল। এতেই বোঝা যায় মানুষটির চারিত্র। ছোটদের জন্য জীবনী লিখেছিলেন ‘ছোটদের ইব্রাহীম খাঁ’ (১৯৯৭) নামে। দ্রুতপঠন হিসাবে বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক ‘গল্পবীথি’ তিনি সম্পাদনা করেছন,
একটি কাহিনিমূলক অনুবাদ বইও রয়েছে তাঁর; ছোটদের জন্য বই ‘এশিয়ার লোক-গল্প’ (১৯৭৯), মুক্তিযুদ্ধ প্রাসঙ্গিক ‘একাত্তরের গণহত্যা: হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট’ (২০১১) তিনি অনুবাদ করেছেন।
১৯৭৯ সালের যুগস্লাভিয়া ভ্রমণ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত আহরণে সীমিত থাকেনি। দেশটির পনেরোজন গল্পকারের গল্প অনুবাদের বইরূপ ‘যুগোস্লাভিয়ার গল্প’ (১৯৮২) প্রকাশের মাধ্যমে দায়িত্বশীলতার পরিচয়ও দিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত বাঙালি পাঠকের কাছে সম্ভবত যুগোস্লাভিয়ার গল্পের এটিই একমাত্র সংকলন। হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টের অনুবাদ ‘একাত্তরের গণহত্যা: হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট’ (২০০১) তাঁর রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক সচেতনতার পরিচায়ক। এ ছাড়াও ছোটদের জন্য তাঁর অনুবাদ গল্প-সংকলন ‘এশিয়ার লোকগল্প’ (১৯৭৯) ছাড়াও ‘দেশে আসা’ (১৯৯০) নামে আরেকটি বই।
৯. ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই ছাত্র রাজনীতি ও কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয়তার পাশাপাশি তিনি প্রচুর পড়াশোনা ও লেখালেখি করতেন। এম.এ. পাশ করার পর কলকাতায় বশীর আল্হেলালের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল হজ কমিটির চাকরি দিয়ে। সে সময় কংগ্রেসের সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদের পুত্র আকরাম খানের দায়িত্বে কলকাতা থেকে মুসলমানদের একটি পত্রিকা বের হতো। পত্রিকাটি বের হতো সপ্তাহে ৩ দিন। হজ কমিটির চাকরির পাশাপাশি তিনি এই পত্রিকায়ও চাকরি করতেন। সাংবাদিকতা ও চাকরির পাশাপাশি তখনই লেখালেখিও চলতে থাকে। তাঁর বাবা ফার্সি, উর্দু ও আরবি ভাষায় লেখালেখি করলেও বশীর আল্হেলাল ছোটবেলা থেকে বাংলায় লিখতেন। তাঁর প্রথম গল্পের বই ‘স্বপ্নের কুশীলব’ (১৯৬৭) বের হয় কলকাতা থেকেই। কবিতাও লিখতেন তিনি। কিন্তু কবি হিসাবে তেমন পরিচিতি হয়নি। কবিতার বইও বেরিয়েছিল একটি–‘কলাবতী ও অতিথি’ নামে। ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ (১৯৭৭) নামে একটি নাটকও আছে তাঁর। কেবল কিশোরপাঠ্য জীবনীই নয় ‘প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ’-র একটি সম্পন্ন জীবনীও (১৯৮৮) লিখেছিলেন!
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পশ্চিমবঙ্গের এখানে-সেখানে নতুন করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ১৯৬৮ সালে মাকে নিয়ে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। তাঁর ঢাকায় আসবার সময়টিতে বাংলাদেশের সমাজ ছিল এক মহাপরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—সব মিলিয়ে সময়টা ছিল রাজনৈতিক আন্দোলনে উত্তাল। কলকাতায় থাকা কালেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁর যে যুক্ততা তা-ই তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে বাঙালির স্বাধিকার-আন্দোলনের সমর্থনে। এমন যাঁর সংবেদনশীল প্রাণ তা যে জেগে উঠবে তা-ই তো স্বাভাবিক।
ব্যক্তি হিসাবে তিনি ছিলেন উদার ও মুক্তবুদ্ধির একজন মানুষ। তাঁর ব্যক্তিত্বের সৌম্যতার পটভূমিতে তাঁর পিতৃমাতৃকুলের পরিশীলিত সাংস্কৃতিক ভূমিকার কথা হয়তো বলা যাবে। কিন্তু একজন ব্যক্তিমানুষের সঙ্গে তাঁর পরিবেশ ও প্রতিকূলতাকে নিজের জন্মগত ব্যক্তিস্বভাব কিভাবে সামলে চলে তারও নিশ্চয় ভূমিকা থাকে। বন্ধু মারুফ রায়হান তাঁর ফেসবুকের এক পোস্টে বশীর আল্হেলালের একমাত্র ভ্রমণসাহিত্য ‘বেলগ্রেডের ডাক’ (১৯৯১) বইটি নিয়ে ছোট্ট আলোচনা প্রসঙ্গে সে বই থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করেছিলেন। এটি লেখা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ায় আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়ে ফিরে এসে। যুগোস্লাভিয়ায় ভ্রমণের কাহিনী বশীর আল্হেলালের আগে কেউ বাংলায় লিখেছেন কিনা আমার জানা নেই। হয়তো এমন একটি বিরল অভিজ্ঞতার কথা লিখবার একটা চাপ লেখক সত্তার দিক থেকে অনুভব করেছিলেন। এ কথাও মনে রাখতে হবে, তিনি যখন বইটি লেখেন তখনো ইন্টারনেট বাংলাদেশে সুলভ নয়, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ তখনো ব্যক্তিগত ব্যবহারের নাগালে আসেনি। একটি রচনা হাতে লেখা ও সম্পাদনায় অনেক বেশি সময় ব্যয় করতে হতো। তারপরও সচরাচর যে মাধ্যমে তিনি লেখেন না তেমন মাধ্যমে একটি বই লিখবার প্রেরণা যে অনুভব করেছিলেন তার একটা গুরুত্ব নিশ্চয়ই আছে। এই বইটির একটা আলাদা মূল্য তো নিশ্চয়ই আছে সেই ভ্রমণের স্বাদু কথন হিসাবেই। কারণ স্বভাবতই কথাসাহিত্যিক হিসাবে তাঁর ভাষায় যেমন এক ধরনের সরলতা আছে তেমনি আছে মননবাহিতাও। কিন্তু ব্যক্তি হিসাবে তিনি যে মুক্তবুদ্ধি, উদার ও অগ্রসর দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ তার পরিচয়ও আছে এই বইয়ে। মারুফ রায়হানের অনুভবেও তা ভালোভাবে ধরা পড়েছে। তিনি উদ্ধৃত করেছেন ‘বেলগ্রেডের ডাক’ থেকে,
স্টুয়ার্ডেসের দিকে ভালো করে তাকালাম। ওঁকে আমাদের ভাষায় বিমানবালা বলা যাবে কিনা তাই ভাবছি। মেয়েদেরকে ললিত লবঙ্গলতার মতো করে দেখতে বা পেতে আমাদের অর্ধ-নারীশ্বর হৃদয় ভালোবাসে বলেই আমাদের ভাষাতেও ওইরকম সব ললিত এলায়িত শব্দ প্রচুর রচিত হয়ে আছে। নারীতে আমরা ব্যক্তিত্ব দেখতে চাই না বলেই ওইসব শব্দে আমরা তাদের ভূষিত করি। কিন্তু অঙ্গের ভূষণ যে সব সময় ভূষণ নয়, সেগুলি অনেক সময় অঙ্গের অপমান, কারণ পুরুষের চোখের ও মনের কামচরিতার্থতা ছাড়া তার আর কোনো ভূমিকা নেই, এই জিনিসটি সেই নারীও বোঝেন না, নিজের অঙ্গে সেই অপমানকে নিয়ে তিনি অনায়াসে ঘোরেন, এমনকি মনে করেন, এই তাঁর সাধনা, এই তাঁর অর্চনা, ভূষণের নামে অঙ্গে পুরুষের লোভকে জ্বালিয়ে রাখা। জ্যাটের এই বিমানে মেয়েটি সামান্য ছিটের অতি সাধারণ একটি হাফ-শার্ট আর স্কার্ট পরেছেন। ব্যস্, এই তাঁর পোশাক। তার ওপর চুল বেটাছেলের মতো করে ছাঁটা (আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরের বেটাছেলে অবশ্যই নয়, মুক্তিযুদ্ধের আগের বেটাছেলে)। কে এঁকে বিমানবালা বলবে? মন ভোলানো বা যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যে তাঁর কাজ নয় সেটি সহজে বোঝা যায়। যে কাজ পুরুষের সে কাজ তাঁরও। তিনি বালা বা ললনা নন, তিনি নারী, তিনি মানুষ। তিনি কমও নন, বেশিও নন। নারী-পুরুষের এই যে এঁদের প্রকৃত সমতা, অকৃত্রিম সমতা, এই জিনিসটি বড় ভালো।
উদ্ধৃতাংশটি ছোট হলেও এখানে তাঁর সমগ্র জীবনবোধেরই পরিচয় পাওয়া যায়। এই বই যখন লেখা চলছিল তখনকার বাংলাদেশে মুসলমান সমাজের যে সামগ্রিক মনোভঙ্গি ছিল তার সাপেক্ষেই নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন তিনি। সে দৃষ্টিভঙ্গি তখনকার তুলনায় বেশ অগ্রসর তা নজরে আসে আমাদের। এই ভাষা কারুময়তায় ন্যূন হতে পারে, কিন্তু সমৃদ্ধ সৎ পর্যবেক্ষণে কথাসাহিত্যিক সত্তাই এখানে মুক্তি পেয়েছে।
ব্যক্তিজীবনে ১৯৬৯ সালে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফিরোজা বেগমকে বিবাহ করেন; তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। সংসার জীবনেও তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল মানুষ! বশীর আল্হেলালের কন্যা লায়েকা বশীর তাঁর বাবার লেখা থেকে নিম্নলিখিত উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন,
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ২৫ বছর পর (১৪ ডিসেম্বর ১৯৯৬) বশীর আল্হেলালের বিবেচনায় 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা'-র অর্থ কী ছিল, দেখে নিই–
১. দেশে শান্তি আনা। প্রতিদিন যে নির্দোষ মানুষগুলিকে হত্যা করা হচ্ছে, তা বন্ধ করা। অন্যান্য বীভৎস অপরাধ বন্ধ করা। মানুষের অসহায় আতঙ্ক, অবিশ্বাস, হতাশা দূর করা।
২. রাষ্ট্রনায়করা যা মুখে বলেন, সেইমতো কাজ করা।
৩. ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের অবসান।
৪. শোষণের অবসান।
৫. সাধারণ মানুষকে কাজ দেয়া, তাদের খেটে খাওয়ার ব্যবস্থা।
৬. দেশের চাষের জমি কৃষকের হাতে তুলে দেয়া।
৭. প্রত্যেক গৃহহীন পরিবারকে একটি গৃহ দেয়া।
৮. নিরক্ষরতা দূর করা।
৯. গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার।
১০. মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা।
১১ সংস্কৃতির শতদল বিকশিত হওয়া।
১২.ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করা।
১৩. নারীর সমান অধিকার।
১৪. মত প্রকাশের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা।
১৫. মুক্তিযুদ্ধের নব নব সম্ভাবনা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে মেয়ের দ্বারা উদ্ধৃত বশীর আল্হেলালের উল্লিখিত ১৫ টি শর্ত আজও কি গভীর ভাবে প্রাসঙ্গিক নয়? এ সম্পর্কিত বিবেচনা দেখলেও কি তাঁর মনের সৌম্য গড়নটির উৎস বোঝা যায় না? বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ততা নিপীড়িত মানুষের জন্য মমতাময় করেছে। তাঁর নৈতিক সমর্থন থেকেছে মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অংশ নিয়েছেন তাঁদের মনে জন্ম নেয়া শুভবোধের প্রতি! সাধারণ মানুষ, কৃষক, নারী, গণতন্ত্র, ন্যায্যতা, মত প্রকাশের অধিকার–এই সবই তো শুভবোধের চিহ্ন!
১০. উপসংহার: বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তির ধারায় তাঁর স্থান
বাংলাদেশের সমালোচনা-সাহিত্য অপরিণত বলে নির্দিষ্ট দুএকটি দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে সাহিত্য বিচারে সক্ষম নয়! সম্ভবত বশীর আল্হেলাল এই পরিস্থিতির শিকার। বয়সের দিক থেকে তিনি আমাদের পঞ্চাশের দশকের লেখকদের সমবয়সী। সে সময়ের কথাসাহিত্যে প্রচলিত যে জীবনদৃষ্টির তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন সৃষ্টির কাল বিবেচনায় তিনি পরের প্রজন্মের সমকালীন। সে সময়ের উপন্যাসের আঙ্গিকগত মূল্যায়নে সাধারণত শিল্পবিপ্লবোত্তর ইয়োরোপীয় মানদণ্ডে বিচার করা হয়। ফলে বাংলাদেশের মানুষের যাপিত জীবন সম্পর্কে বাস্তবতার ভিত্তিতে ভেবে দেখা হয় না সেই আঙ্গিকের উপন্যাস সম্ভব কিনা। সম্ভবত এ কারণেই পঞ্চাশের দশকে যাঁদের শুরু তাঁদের সঙ্গে তাঁর নাম আসে না; আবার ষাটের দশকের যে লেখকদের সমকালের লেখক হিসেবে তিনি সক্রিয় ছিলেন জীবনদৃষ্টির ভিন্নতার কারণে তিনি সেখানেও দলছুট! শিল্পবিপ্লবের আবির্ভাব না হলেও ষাটের দশকে নানা বাস্তবতায় বিত্তের সীমিত প্রভাব নগরজীবনে পড়ে বলে এই সময়ের জীবনদৃষ্টিতে কিছু বদল ঘটে। মর্মত বশীর আল্হেলাল সে পথে চললেও তাঁর সামগ্রিকতা পূর্বতন ধারার সঙ্গেই থাকতে চায়!
এ তো গেল কথাসাহিত্যিক হিসাবে তাঁকে মূল্যায়নে সংকটের দিক। অন্য দিকে, প্রবন্ধসাহিত্য মূল্যায়নের সমস্যার কারণ হলো, ১৯২০-এর দশকে মুসলিম সাহিত্য সমাজের লেখকদের হাতে বাংলাদেশের প্রবন্ধ-সাহিত্যে মননবাহী যে ধারার সূচনা ঘটেছিল গদ্যলেখক হিসাবে বশীর আল্হেলাল সে ধারারই প্রতিনিধি রয়ে গেছেন। বিষয়বস্তুর দিক থেকে যতটা ব্যকরণিক বৈশিষ্ট্য ভাবগত অনুষঙ্গে ততটা কল্পনারঞ্জিত নয় তাঁর গদ্য; তাঁর গদ্য বরং সরল ভাববাহী কিংবা মননশীল হলেও ষাটের কারুময়তার দিকে পথ চলেনি। ফলে বাংলাভাষার প্রশ্নে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও ষাটের দশকের গদ্যধারার প্রতিনিধি না হওয়ায় সেদিক থেকে মূল্যায়নেও তিনি বাদ পড়ে যান।
দীর্ঘ শ্রম ও সাধনা বশীর আল্হেলালের গদ্যের স্বাতন্ত্র্যকে যে নিজস্ব মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে তার জন্য দরকার মুক্ত ও আলাদা বিচার-মানদণ্ড। তাঁর গদ্যের যথার্থ মূল্যায়নের জন্য আমাদের সেদিক থেকে সক্ষম হয়ে উঠতে হবে!
শেষের টীকা:
এই রচনায় যে কটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে তার সূত্র প্রতিটি উদ্ধৃতির সঙ্গেই দেয়া হয়েছে। বইয়ের টেক্সট ও বিভিন্ন তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য এই লেখকের নিজের সংগ্রহ যেমন ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি সংগ্রহে না-থাকা বইয়ের ক্ষেত্রে লেখকের পাঠস্মৃতির সঙ্গে রকমারিডটকম ও গুডরিডস সহ বিভিন্ন বিপণন পোর্টাল, নানান লাইব্রেরির অনলাইন ক্যাটালগ এবং ফেসবুকের পুরোনো বই বিক্রির বিজ্ঞাপনের সঙ্গে উপস্থাপিত বিভিন্ন বইয়ের অংশবিশেষের পিডিএফ কপি দেখা হয়েছে। বশীর আল্হেলালের কন্যা লায়েকা বশীর এই লেখকের বারংবারের জিজ্ঞাসার উত্তর যেমন পরিবারের সূত্রে সরবরাহ করেছেন তেমনি সরবরাহ করেছেন বেশ কিছু বইয়ের পিডিএফও!